প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

স্বল্প মেয়াদী আমন ধানের আধুনিক জাত

ড. এম. মনজুরুল আলম মন্ডল: বাংলাদেশের আয়তনের তুলনায় জনসংখ্যা অত্যাধিক। ২০৩০ সালের মধ্যে কৃষিতে এসডিজি অর্জনে একই জমিতে বেশি করে ফসল ফলানোর বিকল্প নেই। এসডিজি অর্জনে বর্তমানের চেয়ে ২০৩০ সারের মধ্যে একই জমিতে দ্বিগুণ খাদ্য উৎপাদন করতে হবে। খাদ্য উৎপাদন দ্বিগুণ করতে হলে এক ফসলি জমিকে দুই ফসলি, দুই ফসলি জমিকে তিন ফসলি এবং তিন ফসলি জমিকে চার ফসলি জমিতে পরিণত করতে হবে। আর এ জন্য আমন মৌসুমে স্বল্প মেয়াদী (সর্বোচ্চ জীবনকাল ১২০ দিন) ধানের জাত চাষের বিকল্প নেই।

বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট ও বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট বেশ কিছু স্বল্প মেয়াদী উচ্চ ফলনশীল আমন ধানের জাত উদ্ভাবন করেছে।

ব্রি ধান ৫৬ : খরাপ্রবণ এলাকায় চাষ উপযোগী আগাম জাত। জীবন কাল ১০৫-১১০ দিন। বিনাধান-৭ এর চেয়ে ৫ দিন এবং ব্রি ধান৩৩ এর চেয়ে ১০ দিন আগে পাকে। প্রজনন পর্যায়ে ১০-১২ দিন বৃষ্টি না হলেও ফলনের তেমন কোন ক্ষতি হয় না। গাছের উচ্চতা ১১৫ সেমি। ডিগ পাতা খাড়া ও লম্বা। দানা একটু মোটা ও লম্বা। স্বাভাবিক অবস্থায় ফলন ৪.৫-৫.০ টন/হেক্টর এবং খরা অবস্থায় ৩.৫ টন/হেক্টর।

ব্রি ধান৫৭ : মধ্যম মাত্রার খরা সহনশীল জাত। জীবন কাল ১০০-১০৫ দিন। জীবনকাল স্বল্প মেয়াদী হওয়ায় খরা আসার পূর্বেই ধানের দানা দুধ অবস্থা থেকে আধা শক্ত অবস্থায় চলে আসে। তাই এ জাতটিকে খরা পরিহারকারী জাত হিসাবে গণ্য করা যায়। ধানের দানা চিকন এবং অগ্রভাগ অনেকটা সোজা। চারের আকার আকৃতি প্রচলিত জিরাশাইল এর মত। গাছের উচ্চতা ১১০-১১৫ সেমি। ফলন ৪.০-৪.৫ টন/হেক্টর।

ব্রি ধান৬২ : জীবন কাল ১০০ দিন। স্বল্প জীবনকাল হওয়ার কারণে এ জাতটি সহজেই খরা এড়িয়ে যেতে পারে। আমন ধান কেটে অনায়াসে আগাম গোল আলু, বা রবিশস্য লাগানো সম্ভব। এ ধানের জাত মধ্যম মানের জিংক সমৃদ্ধ হওয়ায় জিংকের অভাব জনিত অপুষ্টি লাঘবে সহায়ক হবে। ধানের দানা লম্বা, সরু এবং রং সাদা। চালে জিংকের পরিমাণ ১৯ মিলিগ্রাম/কেজি। গাছের উচ্চতা ৯৮ সেমি। ফলন ৩.৫-৪.৫ টন/ হেক্টর।

ব্রি ধান৬৬ : খরা সহনশীল জাত। প্রজনন পর্যায়ে ১৫-২০ দিন বৃষ্টি না হলেও ফলনের তেমন কোন ক্ষতি হয় না। মাটির আর্দ্রতা ২০% এর নীচে হলেও এ জাতটি ভাল ফলন দিতে সক্ষম। গাছের উচ্চতা ১১৮-১২০ সেমি। ডিগ পাতা খাড়া, প্রশস্ত ও লম্বা। জীবন কাল ১১০-১১৫ দিন। স্বল্প জীবনকাল হওয়ার কারণে এ জাতটির ধান কেটে অনায়াসে রবিশস্য (আলু, সরিষা, মসুর, টমেটো, ভুট্টা ইত্যাদি) লাগানো সম্ভব। চাল মাঝারি লম্বা ও মোটা।স্বাভাবিক অবস্থায় ফলন ৪.৫-৫.০ টন/হেক্টর এবং প্রজনন পর্যায়ে খরা খরা দেখা দিলে ৪.০-৪.৫ টন/হেক্টর।

ব্রি ধান ৭১ : অত্যন্ত খরা সহনশীল জাত। প্রজনন পর্যায়ে ২১-২৮ দিন বৃষ্টি না হলেও ফলনের তেমন কোন ক্ষতি হয় না। মাটির আদ্রতা ২০% এর নীচে হলেও এ জাতটি ভাল ফলন (৩.৫ টন/হেক্টর) দিতে সক্ষম। গাছের উচ্চতা ১১৮-১২০ সেমি। ডিগ পাতা খাড়া ও লম্বা এবং পাতার রং গাঢ় সবুজ। জীবন কাল ১১৪-১১৭ দিন। চাল মাঝারী লম্বা ও মোটা এবং রং সাদা। স্বাভাবিক অবস্থায় ফলন ৪.৫-৫.০ টন/হেক্টর, মধ্যম মাত্রার খরা হলে ৪.০ টন/হেক্টর। খরা প্রবন বৃষ্টি নির্ভর এলাকায় এ ধান আবাদ করার পর মসুর, ছোলা, বার্লি, তিসি আবাদের সুযোগ তৈরি হবে।

ব্রি ধান ৭৩ : লবণাক্ততা সহনশীল ধানের জাত। চারা অবস্থায় ১২ ডিএস/মি. লবণাক্ততা সহ্য করতে পারে। অংগজ বৃদ্ধি থেকে প্রজনন পর্যায় পর্যন্ত ৮ ডিএস/মি. লবণাক্ততা সহ্য করতে পারে। জাতটির জীবনকাল কম হওয়ায় উপকূলীয় লবণাক্ত অঞ্চলে ফসল কর্তনের পর মধ্যম উচঁ থেকে উঁচু জমিতে সূর্যমুখী ও লবন সহনশীল সরিষা ও সয়াবিন আবাদের সুযোগ তৈরি হবে। গাছের উচ্চতা ১২০-১২৫ সেমি। ডিগ পাতা খাড়া। জীবন কাল ১২০-১২৫ দিন। চাল মাঝারি চিকন, সাদা ও ভাত ঝরঝরে। স্বাভাবিক অবস্থায় ফলন ৪.৫-৫.০ টন/হেক্টর, মধ্যম মাত্রার লবণাক্ততায় ২.৮ টন/ হেক্টর।

ব্রি ধান ৭৫ : গাছের উচ্চতা ১০১-১১০ সেমি। কান্ড শক্ত তাই হেলে পড়ে না এবং শীষ থেকে ধান ঝরে পড়ে না। ডিগ পাতা খাড়া, প্রশস্ত ও লম্বা। জীবন কাল ১১০-১১৫ দিন। স্বল্প জীবনকাল হওয়ার কারণে এ জাতটির ধান কেটে অনায়াসে রবিশস্য (আলু, সরিষা, মসুর, ভুট্টা, গম, টমেটো লাগানো সম্ভব। ধানের দানার রং সোনালি এবং মাঝারি চিকন। চালে সামান্য সুগন্ধি আছে তবে রান্না করার সময় সুগন্ধি অনেক বেশি পাওয়া যায়। সারের মাত্রা অন্যান্য উফশী জাতের চেয়ে ২০% কম লাগে। ফলন ৪.৫-৫.০ টন/হেক্টর।

ব্রি ধান৯০ : সুগন্ধিযুক্ত ছোট দানার চাল সমৃদ্ধ ধানের জাত। দানার আকার আকৃতি-আকৃতি ব্রি ধান৩৪ এর মত। গাছের উচ্চতা ১১০ সেমি। কাণ্ড শক্ত, সহজে হেলে পড়ে না এবং ধান পাকার পরও গাছ সবুজ থাকে। ডিগ পাতা খাড়া। জীবন কাল ১১৫-১২৫ দিন। ব্রি ধান৩৪ এর চাইতে ২২ দিন কম সময় লাগে। স্বল্প জীবনকাল হওয়ার কারণে এ জাতটির ধান কেটে অনায়াসে রবিশস্য (আলু, সরিষা, মসুর, গম, মটর ইত্যাদি) লাগানো সম্ভব। দানা ছোট, চিকন ও সুগন্ধিযুক্ত। ফলন ৪.৫-৫.০ টন/হেক্টর।

ব্রি ধান ৯৫ : গাছের উচ্চতা ১২০ সেমি। কান্ড শক্ত তাই হেলে পড়ে না এবং শীষ থেকে ধান ঝরে পড়ে না। ডিগ পাতা খাড়া, প্রশস্ত ও লম্বা। জীবনকাল ১২৫ দিন। স্বল্প জীবনকাল হওয়ার কারণে এ জাতটির ধান কেটে অনায়াসে রবিশস্য (আলু, সরিষা, মসুর, ভ’ট্রা, গম, টমেটো ইত্যাদি) লাগানো সম্ভব। গড় ফলন ৫.৭ টন/হেক্টর।

ব্রি হাইব্রিড ধান ৪ : রোপা আমনের উচ্চ ফলনশীন আগাম জাত। জীবনকাল ১১৮ দিন। গাছের উচ্চতা ১১২ সেমি। চাল মাঝারি চিকন ও সাদা। ফলন ৬.৫ টন/ হেক্টর।

ব্রি হাইব্রিড ধান ৬ : ঢাকা, চট্টগ্রাম ও যশোর অঞ্চলে চাষ উপযোগী রোপা আমনের উচ্চ ফলনশীন আগাম জাত। জীবনকাল ১১০-১১৫ দিন। স্বল্প জীবনকাল হওয়ার কারণে এ জাতটির ধান কেটে অনায়াসে রবিশস্য (আলু, সরিষা, মসুর, গম, টমেটো ইত্যাদি) লাগানো সম্ভব। গাছের উচ্চতা ১০৫-১১০ সেমি। কান্ড শক্ত তাই হেলে পড়ে না। চাল সরু ও লম্বা এবং ভাত ঝরঝরে। ফলন ৬.০-৬.৫ টন/ হেক্টর।

বিনাধান-৭ : গাছ খাট ও কাণ্ড শক্ত বিধায় হেলে পড়ে না এবং শীষ থেকে ধান ঝরে পড়ে না। গছের উচ্চতা ১০০ সেমি। ডিগ পাতা খাড়া, প্রশস্ত ও লম্বা। জীবন কাল ১১৫-১২০ দিন। স্বল্প জীবনকাল হওয়ার কারণে এ জাতটির ধান কেটে অনায়াসে রবিশস্য (আলু, সরিষা, মসুর, গম, টমেটো ইত্যাদি) লাগানো সম্ভব। চাল লম্বা ও চিকন। ভাত খেতে সুস্বাদু। ফলন ৪.৮-৫.৫ টন/হেক্টর।

বিনাধান-১১ : আকস্মিক বন্যা সহিষ্ণু স্বল্প মেয়াদী ধানের জাত। ২০-২৫ দিন পর্যন্ত জলমগ্নতা সহ্য করতে পারে। গাছ খাট ও কাণ্ড শক্ত বিধায় হেলে পড়ে না এবং শীষ থেকে ধান ঝরে পড়ে না। ডিগ পাতা খাড়া, প্রশস্ত ও লম্বা। জীবন কাল ১১৫-১২০ দিন এবং জলমগ্নœ অবস্থায় ১৩০-১৩৫ দিন। স্বল্প জীবনকাল হওয়ার কারণে এ জাতটির ধান কেটে অনায়াসে রবিশস্য (আলু, সরিষা, মসুর, গম, টমেটো ইত্যাদি) লাগানো সম্ভব। ধানের দানা মাঝারি মোটা ও লম্বা। ভাত খেতে সুস্বাদু। এ জাতের ধান থেকে ভাল মানের মুড়ি পাওয়া যায়। ফলন জলমগ্ন অবস্থায় ৪.৫ টন/হেক্টর এবং স্বাভাবিক অবস্থায় ৫.০-৫.৫ টন/হেক্টর।

বিনাধান-১৫ : প্রিমিয়াম কোয়ালিটির চাল সমৃদ্ধ স্বল্প মেয়াদি জাত। জীবনকাল ১১৫-১২০ দিন। গাছ খাট (৯৫ সেমি) ও কান্ড শক্ত বিধায় হেলে পড়ে না এবং শীষ থেকে ধান ঝরে পড়ে না। ডিগ পাতা খাড়া, কিছুটা চিকন ও লম্বা। দানা লম্বা ও চিকন। ভাত খেতে সুস্বাদু। স্বল্প জীবনকাল হওয়ার কারণে এ জাতটির ধান কেটে অনায়াসে রবিশস্য (আলু, সরিষা, মসুর, গম, টমেটো ইত্যাদি) লাগানো সম্ভব। জাতটির চাল বিদেশে রপ্তানিযোগ্য। ফলন ৪.৫-৫.০ টন/হেক্টর।

বিনাধান-১৬ : স্বল্প মেয়াদী ও উচ্চ ফলনশীল আমন ধানের জাত। জীবন কাল ১০০-১০৫ দিন। জীবনকাল স্বল্প মেয়াদী হওয়ায় খরা আসার পূর্বেই ধানের দানা দুধ অবস্থা থেকে আধা শক্ত অবস্থায় চলে আসে। তাই এ জাতটিকে খরা পরিহারকারী জাত হিসেবে গণ্য করা যায়। গাছ খাট (৯৭ সেমি) ও কান্ড শক্ত বিধায় হেলে পড়ে না এবং শীষ থেকে ধান ঝরে পড়ে না। ডিগ পাতা খাড়া ও লম্বা। চাল লম্বা ও চিকন। স্বল্প জীবনকাল হওয়ার কারণে এ জাতটির ধান কেটে অনায়াসে রবিশস্য (আলু, সরিষা, মসুর, গম, ভ’ট্রা ইত্যাদি) লাগানো সম্ভব। ভাত খেতে সুস্বাদু। ফলন ৫.০-৫.৫ টন/হেক্টর।

বিনাধান-১৭ : স্বল্প মেয়াদী, খরা সহিষ্ণু (৩৫% পানি কম প্রয়োজন) ও উচ্চ ফলনশীল আমন ধানের জাত। উচ্চ ফলনশীলনতার কারণে এ জাতকে সুপার রাইস ও বলা হয়। প্রতি শীষে ধানের সংখ্যা ২৫০-২৭০ টি। জীবন কাল ১১২-১১৮ দিন। গাছ খাট (৯৭ সেমি) কান্ড শক্ত বিধায় হেলে পড়ে না। ডিগ পাতা খাড়া, চওড়া ও লম্বা। জাতটি চাষাবাদে ৩০% ইউরিয়া কম লাগে। চাল লম্বা ও চিকন। ভাত ঝরঝরে এবং রান্নার পর ভাত দীর্ঘক্ষণ রাখলে নষ্ট হয় না। স্বল্প জীবনকাল হওয়ার কারণে এ জাতটির ধান কেটে অনায়াসে রবিশস্য (আলু, সরিষা, মসুর, গম, ভুট্ট লাগানো সম্ভব। ফলন ৬.৮ টন/হেক্টর।

বিনাধান-২২ : স্বল্প মেয়াদী ও উচ্চ ফলনশীল আমন ধানের জাত। জীবন কাল ১১২-১১৫ দিন। গাছ খাট (৯৩ সেমি) ও কাণ্ড শক্ত বিধায় হেলে পড়ে না এবং শীষ থেকে ধান ঝরে পড়ে না। ধান পরিপক্ক অবস্থায় ডিগ পাতা খাড়া, সবুজ থাকে। চাল লম্বা ও চিকন। স্বল্প জীবনকাল হওয়ার কারণে এ জাতটির ধান কেটে অনায়াসে রবিশস্য (আলু, সরিষা, মসুর, গম, ভুট্টা ইত্যাদি) লাগানো সম্ভব। ভাত খেতে সুস্বাদু। ফলন ৬.১ টন/হেক্টর।

বিনাধান-২৩ : আলোক অসংবেদনশীল দেশের জোয়ারভাটা, লবণাক্ততা ও বন্যা কবলিত এলাকার জন্য আমন মৌসুমে চাষ উপযোগী। স্বল্প মেয়াদী ও উচ্চ ফলনশীল আমন ধানের জাত। জীবন কাল ১১৫-১২৫ দিন। গাছের বাড়ন্ত ও পরিপক্ক অবস্থায় ৮ ডিএস/মি. মাত্রার লবণাক্ততা ও ১৫ দিন জলমগ্নতা সহ্য করতে পারে। ধান পরিপক্ক অবস্থায় ডিগ পাতা খাড়া ও সবুজ থাকে। চাল মাঝারি চিকন। স্বল্প জীবনকাল হওয়ার কারণে এ জাতটির ধান কেটে অনায়াসে রবিশস্য (আলু, সরিষা, সয়াবিন, রসুন, গম, ভ’ট্রা ইত্যাদি) লাগানো সম্ভব। ভাত খেতে সুস্বাদু। ফলন ৫.৫ টন/হেক্টর।

লেখক: মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট।

 

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত