প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

মোহাম্মদ হানিফ: বঙ্গোপসাগরে চীনের প্রবেশ বাংলাদেশে আধিপত্যের লড়াইয়ে চীনের কাছে ভারত কি হেরে যাচ্ছে?

মোহাম্মদ হানিফ: শক্তির শক্তি হলো টাকা। অর্থ না থাকলে শক্তিশালী দেশ রাতারাতি হয়ে যেতে পারে ভিখারি। সারা বিশ্বে এই অর্থ সম্পদে ক্রমেই শক্তিশালী হয়ে উঠেছে চীন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ার ফলে এখনি সবাই বিদায় ঘণ্টা শুনতে পাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের।  হয়তো আর দুই যুগ পর চীন হবে বিশ্বের মোড়ল। আর সেক্ষেত্রে চীনের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক থাকাটা অনেক দেশের জন্য আশীর্বাদও হয়ে উঠতে পারে। কারণ সারা বিশ্বে প্রভাব সৃষ্টিতে চীন মুখ্য ভূমিকা রাখতে চলেছে। অপর একটি শক্তি হলো ভারত। সাপে নেউলে সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে উভয় দেশ কোনো তিক্ততা রাখতে চায় না। কিন্তু ভারতের সঙ্গে চীনের বাণিজ্য এক প্রকার অসম। ২০১৭-১৮ সালে বাণিজ্য ঘাটতি চীনের পক্ষে ছিলো প্রায় $৬৩ বিলিয়ন। চীনে ভারতের রপ্তানি ছিলো মাত্র ১২ বিলিয়ন ডলার যার বিপরীতে চীন থেকে প্রায় ৭৫ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি করা লেগেছে ভারতকে। অবশ্য বিগত বছরে বাণিজ্য ঘাটতি ভারত কিছুটা হলেও কমিয়ে আনতে পেরেছে।

এখন আসি বাংলাদেশ প্রসঙ্গে। বাংলাদেশ যে ভবিষ্যতে বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম অংশীদার হতে চলেছে সেটা সারা বিশ্বের কাছেই স্বীকৃত। আর এজন্যই সারা বিশ্বের ফোকাস এখন বাংলাদেশের দিকে। বিনিয়োগে এগিয়ে আসছে বিশ্বের নামকরা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান।  জেনারেল ইলেক্ট্রিক, সিমেন্সের মতো কোম্পানি এদেশের ব্যবসা প্রসার নিয়ে আলাদাভাবে কাজ করে যাচ্ছে, যেটা একসময় ভাবাই যেতো না। সুমিতোমো, সজিত কর্পোরেশন,  মিতশুবিশি সহ প্রচুর জাপানিজ জায়ান্ট কোম্পানি এদেশে বিনিয়োগ করতে চলেছে অথবা করেছে। সৌদি আরব, জার্মানি, নেদারল্যান্ডস-সহ ইউরোপীয় বহু দেশ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক নতুন মাত্রায় নিয়ে যেতে আগ্রহী হয়ে উঠেছে।

আর সব থেকে বেশি যে ব্যাপারটা লক্ষ্য করা যাচ্ছে সেটি হলো চীনের উপস্থিতি। ভারতের প্রভাব বলয়ের দেশ হিসাবে বাংলাদেশ সুপরিচিত ছিলো। ভারতের আপত্তির কারণে বাংলাদেশ একসময় সাবমেরিন কেনা থেকে পিছু হটে। কিন্তু দিন যতো গড়াচ্ছে বাংলাদেশে ভারতের উপস্থিতি মলিন হয়ে যাচ্ছে অন্যান্য দেশের কাছে। বিশেষ করে চীনের কাছে।

সরাসরি চীনকে বাংলাদেশ সোনাদিয়া গভীর সমুদ্র বন্দরের কাজ দেয়নি ভারত-সহ অনেক দেশের আপত্তি থাকার কারণে। তবে ভারত বা অন্য দেশের আপত্তি থাকার চেয়ে বেশি ছিলো বাংলাদেশের স্বার্থ। যেহেতু স্বল্প দূরত্বে মাতারবাড়িতে গভীর সমুদ্র বন্দরের জন্য জাপানের অর্থ সহায়তা পাওয়া গেছে তাই এখানে চীনকে দিয়ে অতিরিক্ত আরেকটি বন্দর করানো বোকামি। তবে বিকল্প হিসাবে চট্টগ্রাম বন্দরের বে টার্মিলানের সাথে চীনকে যুক্ত করার সম্ভাবনা রয়েছে। অন্যদিকে পায়রা বন্দরের কাজও পুরোপুরি ভারত বা চীন কাউকে না দিলেও গুরুত্বপূর্ণ অংশটি চীনকে দিয়েছে বাংলাদেশ।  ভারত কে হয়ত একটি টার্মিলান করতে দেবে।

সবকিছু ছাপিয়ে বেশ গোপনে হুট করে বাংলাদেশ যে কাজটি করেছে সেটা হয়তো বেশ অপ্রত্যাশিত ছিলো। বাংলাদেশ দেশের প্রথম এবং বৃহত্তম সাবমেরিন বেজ করার কাজ চীনকে দিয়ে দিয়েছে। এই সিদ্ধান্ত ভারতের জন্য যে স্বস্তিকর নয় সেটা বুঝতে গেলে রকেট সায়েন্স জানা লাগে না। এর আগেও বাংলাদেশ কে নিজের প্রভাব বলয়ে আনার জন্য ভারত চেষ্টার কমতি রাখেনি। ভারতের ক্ষেত্রে সব থেকে বড় হুমকি ছিল ২০১৬ সালে চীনের প্রেসিডেন্টের বাংলাদেশ সফর এবং $২৪ বিলিয়ন ডলারের চুক্তি। সমসাময়িক জাপানের সাথেও $৬ বিলিয়ন ডলারের চুক্তি করে বাংলাদেশ।  মূলত চীনের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক গভীর করার অন্যতম নিয়ামক হিসাবে কাজ করেছে এটি। এর জবাবে ভারতের আসলে কিছুই করার ছিল না। তবুও তারা $১ বিলিয়ন ডলার ঋন চুক্তি করে। এর পরে $২ বিলিয়ন ডলারের লাইন অব ক্রেডিট চুক্তি হয়। তারপর $১০ বিলিয়ন ডলারের। কিন্তু এই অর্থের ছাড় ভারত করেনি। সামর্থ্য এখানে বড় প্রশ্ন। চীন যেমন ভাবে পারবে ভারতের পক্ষে সেভাবে মোকাবেলা করা সম্ভব নয়।

দেশের স্টক এক্সচেঞ্জের নিয়ন্ত্রণেও ভারত চীনের কাছে পরাস্ত হয়। সব শেষ,  প্রতিরক্ষা এমওইউ করে তারা ভেবেছিল হয়তো চীনের প্রভাব কিছুটা হলেও কমানো সম্ভব হবে। কিন্তু সেটা তো হয়নি বরং সাবমেরিন বেজের মতো স্পর্শকাতর কাজের দায়িত্ব চীন পেয়ে গেছে। ১০৩০০ কোটি টাকার এই বেজ করা থেকে এটুকু অনুমান করা যায় যে বঙ্গোপসাগরে চীনের উপস্থিতি এক প্রকার নিশ্চিত। যেটা হয়তো সমুদ্র বন্দর দিয়ে এককভাবে বাংলাদেশ দেয়নি সেটা সাবমেরিন বেজের মাধ্যমে দিয়ে দিলো। তবে এক্ষেত্রে বাংলাদেশের স্বার্থ হলো সমদ্র বন্দর যেহেতু একটি দেশের অর্থনীতির অন্যতম শক্তিশালী ভীত্তি, তাই কোনো একক দেশের কাছে বাংলাদেশ নির্ভর করেনি। ভারতও না। চীনও না। তবে সাপোর্টিভ বন্দর হিসেবে মাতারবাড়িতে জাপানের ওপর নির্ভর করেছে কারণ জাপান অঞ্চলিক কুৎসিত রাজনীতিতে কখনো জড়াবে না বাংলাদেশে।

চীনের উদ্দেশ্য সফল। এখানে বলে রাখা ভালো, যে দেশের গুরুত্বপূর্ণ মেগা পকল্পের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এখনো দুটি দেশকে প্রাধান্য দিয়েছে। জাপানকে দিয়ে মেট্রোরেল,  মাতারবাড়ি, ঢাকা চট্টগ্রামের তিনটি ব্রিজের মতো কাজ করিয়েছে অথবা করাচ্ছে। অন্যদিকে এগুলো বাদে এক প্রকার সকল মেগা প্রজেক্টে রয়েছে চীনের সুস্পষ্ট উপস্থিতি।

ভারতকে বাংলাদেশ কিছু কাজ দিয়েছে তবে তার অধিকাংশ হলো ভারতীয় খঙঈ-এর অধিনের প্রকল্পগুলো। এর বাইরে বাংলাদেশে ভারতের অর্থনৈতিক উপস্থিতি এক প্রকার সীমিত হয়ে গেছে। রাজনৈতিক প্রভাব এখনো ভারতের রয়েছে। তবে বর্তমান সময়ে সকল প্রভাবের মূল ভিত্তি হলো অর্থনীতি। এজন্যই রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়েও ভারত ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের নিয়ন্ত্রন নিতে ব্যর্থ হয়েছে চীনের কাছে। আমি আগেও বলেছি, এখনো বলেছি, বাংলাদেশ চীন সম্পর্ক এমন পর্যায়ে পৌছেছে যে যদি কোন প্রকল্পে ভারত এবং চীন উভয় দেশ আগ্রহ প্রকাশ করে সেখানে দেখা গেছে বাংলাদেশ এক প্রকার বিনা দ্বিধায় চীনকে বেছে নিচ্ছে। ভারতের আপত্তি সত্ত্বেও চিন থেকে সাবমেরিন কেনা, ঘাটি করার দায়িত্ব দেওয়া, মেগা প্রজেক্টগুলোর কাজ দেওয়া ভারতের জন্য চরম অস্বস্থির হলেও খোলামেলাভাবে এই বিষয়ে ভারত বাংলাদেশ কে কোনো চাপও দিতে পারছে না। কারণ অফিশিয়ালি ভারত বাংলাদেশের বন্ধু রাষ্ট্র। তাই অনেকটা অনিচ্ছা সত্ত্বেও হজম করতে হচ্ছে চীনের আধিপত্য। দাদা গিরি হয়তো সামনের দিনগুলোতে আরো ম্লান হয়ে যাবে। তবে বাংলাদেশের উচিত বর্তমান ভারসাম্য বজায় রাখা। যেখানে চীন ভারতের প্রকাশ দ্বন্দ্ব জাপানের মতো দেশকে বেছে নেওয়া। কারও ব্লকে থাকা কোনো কৃতিত্বের বিষয় নয়। তবে সবার সঙ্গে মর্যাদার সম্পর্কে থাকা কৃতিত্বের।

বি.দ্র: আমি লিখতে গেছিলাম সম্পূর্ণ ভীন্ন টপিকে। কীভাবে ভারতের ওপর বাংলাদেশ নির্ভরশীলতা কমিয়ে আনছে। ভারত বাজার কিভাবে হারাচ্ছে এসব নিয়ে। কিন্তু বড় হয়ে যাবে তাই এই অংশের আলোচনা বাদ দিলাম। তবে সুযোগ পেলে এটা নিয়ে লিখবো। কারণ বেশ কিছু বড় ঘটটা ঘটেছে যেগুলা সম্মানিত মেম্বারগণ হয়তো লক্ষ্য করেননি। সূত্র : Babugonj Kantha – বাবুগঞ্জ কন্ঠ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত