প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ইয়াসে আর্থিক ক্ষতি আম্ফানের চেয়ে দ্বিগুণ

নিউজ ডেস্ক: ঘূর্ণিঝড় ইয়াসের প্রত্যক্ষ কোনো তাণ্ডব ছিল না দেশের দক্ষিণ উপকূলে। কোনো ঘর ভাঙেনি, গাছপালা উপড়ে পড়েনি। তেমন কোনো প্রাণহানির ঘটনাও ঘটেনি। তবু এই ঝড়ের প্রভাবে আর্থিক ক্ষতি দৃশ্যমান ঝড়ের ক্ষতির চেয়েও অনেক বেশি। নেপথ্যে রয়েছে পূর্ণিমার জোয়ার। ইয়াসের প্রভাবে অধিক উচ্চতার জলোচ্ছ্বাসে দক্ষিণ উপকূলে বাঁধ, মাছের ঘের ও ফসলের ক্ষতির পরিমাণ গত বছরের মে মাসে আঘাত হানা ঘূর্ণিঝড় আম্ফানের প্রায় দ্বিগুণ। জলোচ্ছ্বাসে ডুবেছে সুন্দরবন। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে খাদ্য-বাসস্থান ও জীববৈচিত্র্য।

বাস্তবতা হলো সাগর থেকে ধেয়ে আসা একের পর এক ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস আর প্রবল জোয়ারে গত ১০ বছরে উপকূলীয় জনপদে যে পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে, তার চেয়ে অনেক কম অর্থ ব্যয়ে উপকূলে টেকসই বাঁধ নির্মাণ করা সম্ভব। তাতে কমত প্রাণ ও সম্পদহানি। উপকূলবাসীর আগামী দিনগুলো হতো সুরক্ষিত। বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত এবং পানি উন্নয়ন বোর্ডের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের বক্তব্যেই এমন হিসাব পাওয়া গেছে।

ইয়াসের প্রভাবে সরকারি হিসাবে বরিশাল বিভাগের ছয় জেলায় মৎস্য খাতে ক্ষতি হয়েছে ৮২ কোটি আট লাখ টাকা। আম্ফানে এই জেলাগুলোতে ২৫ কোটি ৫৩ লাখ টাকা মূল্যের বিভিন্ন প্রজাতির মাছ ভেসে যায়। শুধু বরিশাল জেলার ৫৭টি ইউনিয়নের ৮৮৩টি পুকুর ও ৩৬৯টি ঘেরের মাছ ভেসে গিয়ে ক্ষতি হয়েছে প্রায় দুই কোটি ৮৩ লাখ টাকা। বিভাগীয় মৎস্য বিভাগ আম্ফানের পর ক্ষতির যে তালিকা দিয়েছিল তাতে বলা হয়েছিল, আম্ফানে বিভাগের মৎস্য সম্পদের যে পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে, তা সর্বশেষ সিডরের পর আর হয়নি।

বিভাগীয় মৎস্য বিভাগ জানাচ্ছে, ইয়াসের প্রভাবে জোয়ার-জলোচ্ছ্বাসে বরিশাল বিভাগে দুই হাজার ৮৬১ হেক্টর আয়তনের ১৭ হাজার ২০৯টি ঘের ও পুকুরের দুই হাজার ৫৩৫ টন মাছ ভেসে গেছে। অবকাঠামোর ক্ষতি হয়েছে ছয় কোটি ৯৬ লাখ টাকার সমপরিমাণ। এতে মৎস্য খাতে প্রাথমিক ক্ষতির আর্থিক পরিমাণ ৮২ কোটি আট লাখ টাকা।

পাউবো বরিশাল আঞ্চলিক প্রধান প্রকৌশলী কার্যালয় সূত্র জানায়, ঘূর্ণিঝড় ইয়াসের প্রভাবে বিভাগের ছয় জেলায় ২৭২টি স্থানে ৮৮.৬ কিলোমিটার বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে ৪৯টি স্থানে সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ২৪.২ কিলোমিটার। আংশিক ক্ষতি হয়েছে ২২৩টি স্থানে ৬৪.৪ কিলোমিটার বাঁধের। এ ছাড়া ৩৬টি স্থানে নদীর পার ভেঙে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৬.২৮ কিলোমিটার। নদীতীর সংরক্ষণকাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ১০টি স্থানে ১.৮ কিলোমিটার। পানির তোড়ে ৪৫টি স্থানের স্লুইস গেট, রেগুলেটর ও অন্যান্য অবকাঠামোর ক্ষতি হয়েছে।

পাউবোর বরিশাল আঞ্চলিক কার্যালয়ের প্রধান প্রকৌশলী নুরুল ইসলাম সরদার বলেন, প্রাথমিক হিসাবে এই ঝড়ে প্রায় ৮৮ কিলোমিটার বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পূর্ণাঙ্গ হিসাব পেতে আরো কয়েক দিন সময় লাগবে।

পাউবো খুলনা অঞ্চলের প্রধান প্রকৌশলী মো. রফিকউল্লাহ জানান, খুলনা অঞ্চলে বাঁধের মোট দৈর্ঘ্য দুই হাজার ২০০ কিলোমিটার। এর মধ্যে খুলনা উপকূলভাগে বেড়িবাঁধ রয়েছে ৮৭০ কিলোমিটার। ইয়াসের প্রভাবে ১২০ কিলোমিটার বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ২০টি জায়গায় বাঁধ ভেঙে গেছে। এই অঞ্চলের ২৩টি পোল্ডারের মধ্যে খুলনা জেলার তিনটি ও সাতক্ষীরা জেলার পাঁচটি পোল্ডার বেশি ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে।

যত ঝড় তত ক্ষতি : ঘূর্ণিঝড় সিডর খুলনা ও বরিশাল এলাকায় তাণ্ডব চালিয়েছিল। ঝড়ে তিন হাজরের বেশি মানুষ মারা যায়। ক্ষতিগ্রস্ত হয় ৩২টি জেলার ২০ লাখ মানুষ। সরকারি হিসাবেই সাত লাখ ৪২ হাজার ৮৮০ একর জমির ফসল সম্পূর্ণ এবং ১৭ লাখ ৩০ হাজার একর জমির ফসলের আংশিক ক্ষতি হয়েছিল। ভেসে যায় কয়েক লাখ গবাদি পশু।

উপকূলে ২০০৯ সালে ২৫ মে আঘাত হানে ঘূর্ণিঝড় ‘আইলা’। প্রাণ হারায় ১৯৩ জন। গৃহহীন হয় প্রায় তিন লাখ মানুষ। প্রায় ৯৭ হাজার একরের আমন ক্ষেত লোনা পানিতে বিনষ্ট হয়। প্রায় ৭৩ হাজার কৃষক ও কৃষি মজুর বেকার হন। পানীয় জলের উৎস সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যায়। জলবায়ু উদ্বাস্তু হয় কয়েক হাজার পরিবার। মাঝে ঘূর্ণিঝড় কোমেন, রোয়ানু ও মোরা দক্ষিণ উপকূলে আঘাত না হানলেও এসবের প্রভাবে প্রবল জোয়ারে কৃষির ক্ষতি হয়েছিল। পরে ঘূর্ণিঝড় ফণীর আঘাতে প্রাণহানি কম হলেও ঘরবাড়ি, বাঁধ, সড়ক ও কৃষিতে ৫৩৬ কোটি ৬১ লাখ ২০ হাজার টাকার ক্ষতি হয়।

দিক বদল করে ২০১৯ সালের ৯ নভেম্বর অতি প্রবল ঘূর্ণিঝড় বুলবুল ভারতের উপকূলে আঘাত হানার পর স্থলভাগ দিয়ে বাংলাদেশে আসায় ক্ষতির পরিমাণ ছিল আশঙ্কার চেয়ে কম। ওই ঝড়ে মারা যায় ২৪ জন। প্রায় ৭২ হাজার ২১২ টন ফসলের ক্ষতি হয়, যার আর্থিক মূল্য ২৬৩ কোটি পাঁচ লাখ টাকা। সুন্দরবনেরও ব্যাপক ক্ষতি হয়।

পাউবোর পরিসংখ্যান বলছে, সারা দেশে ১১ হাজার ৪৩০ কিলোমিটার বাঁধ রয়েছে। এর মধ্যে উপকূলীয় এলাকা সুরক্ষার জন্য রয়েছে পাঁচ হাজার ১৬০ কিলোমিটার, যার মধ্যে তিন হাজার ৩০০ কিলোমিটার বাঁধ রয়েছে বিভাগের বরিশাল, পটুয়াখালী, বরগুনা, পিরোজপুর, ভোলা ও ঝালকাঠিতে।

বরিশাল বিভাগের ছয় জেলায় ৮২টি পোল্ডারের আওতায় ৫২৭টি বাঁধ রয়েছে। এর মধ্যে সিডরে প্রায় এক হাজার ৫৮০ কিলোমিটার বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরবর্তী সময়ে আইলার আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয় প্রায় ৭২ কিলোমিটার বাঁধ। আম্ফানে ক্ষতি হয় ১৬১ কিলোমিটার বাঁধের। সর্বশেষ ইয়াসের প্রভাবে ২৭৭টি পয়েন্টে ৮৮ কিলোমিটার বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

পাউবো বরিশাল অঞ্চলের প্রধান প্রকৌশলী নুরুল ইসলাম সরকার বলেন, বিভাগের ছয় জেলায় প্রায় তিন হাজার ৩০০ কিলোমিটার বাঁধ রয়েছে। ষাটের দশকে নির্মিত বাঁধগুলোর উচ্চতা বিভিন্ন কারণে কমে আসছে। উচ্চতা বাড়িয়ে টেকসই বাঁধ নির্মাণ করা গেলে ঝড়ে ক্ষতির পরিমাণ অনেকটাই কমে আসবে। কারণ বাঁধ ভেঙেই জান-মালের ক্ষতি হচ্ছে।

টেকসই বাঁধ নির্মাণের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরে এই প্রকৌশলী বলেন, প্রতি মিটার বাঁধের উচ্চতা বাড়াতে গড়ে দুই লাখ ৫০ হাজার টাকা খরচ হবে। কিলোমিটারপ্রতি খরচ দাঁড়াবে ২৫ কোটি টাকা। আর টেকসই বাঁধের জন্য নদী শাসনের জন্য মিটারপ্রতি খরচ পড়বে আরো চার লাখ ৫০ হাজার টাকা। সেই হিসাবে টেকসই বাঁধের জন্য কিলোমিটারপ্রতি খরচ দাঁড়াবে গিয়ে ৭০ কোটি টাকা। টাকার অঙ্কে এটা বেশি মনে হলেও ক্ষতির দিক বিবেচনায় নিলে তা খুবই কম। উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, শুধু ঘূর্ণিঝড় ফণীর কারণে সরকারি হিসাবে ৫৩৬ কোটি ৬১ লাখ ২০ হাজার টাকার ক্ষতি হয়েছিল। এই পরিমাণ অর্থ দিয়ে প্রায় সাড়ে সাত কিলোমিটার টেকসই বাঁধ নির্মাণ করা যায়। – কালের কণ্ঠ

সর্বাধিক পঠিত