প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

সীমান্তের জেলায় করোনা সংক্রমণ আতঙ্ক: বিপণন জটিলতায় ক্ষতির মুখে আমচাষী ও ব্যবসায়ী

নিউজ ডেস্ক: চাঁপাইনবাবগঞ্জসহ দেশের সীমান্ত অঞ্চলগুলোতে শনাক্ত হচ্ছে নভেল করোনাভাইরাসের ভারতীয় ধরন। এতে দেশজুড়ে দেখা দিয়েছে আতঙ্ক। বিশেষ করে করোনা সংক্রমণের ঊর্ধ্বগতির কারণে দেশের সবচেয়ে বড় আমের মোকাম চাঁপাইনবাবগঞ্জে ছয়দিন ধরে চলছে কঠোর লকডাউন। রাস্তায় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ প্রশাসনের তত্পরতায় অতি জরুরি প্রয়োজন ছাড়া কেউ ঘরের বাইরে যেতে পারছে না।

লকডাউনের শুরুতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, আম বেচাকেনায় সংশ্লিষ্টরা এ বিধিনিষেধের আওতার বাইরে থাকবেন। আম পরিবহনেও কোনো বাধা নেই। তার পরও সংক্রমণের শঙ্কায় ঢাকাসহ দূরের ব্যবসায়ীরা আম কিনতে চাঁপাইনবাবগঞ্জ যাচ্ছেন না। এতে চাঁপাইনবাবগঞ্জে আম বিপণনে ধস নেমেছে। এছাড়া সীমান্তবর্তী সাতক্ষীরা, মেহেরপুরসহ আরো কয়েকটি প্রধান আম উৎপাদনকারী জেলায়ও পাইকারের অভাবে বিপণন সংকট দেখা দিয়েছে।

দেশের আম বেচাকেনার সবচেয়ে বড় মোকাম চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার কানসাট প্রতি বছর এ সময় চাষী-পাইকার ও সংশ্লিষ্টদের ভিড়ে মুখর থাকে। অথচ এবার তার উল্টো চিত্র দেখা যাচ্ছে। লকডাউনের কারণে জেলার বেশির ভাগ মানুষই গৃহবন্দি। পাইকারদেরও তেমন আনাগোনা নেই। ফলে এ বছর আম বাজারে আসতে শুরু করলেও কঠোর লকডাউনের কারণে জমে ওঠেনি বেচাকেনা। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন জেলার আমচাষী, ব্যবসায়ী ও আড়তদাররা। তাদের দাবি, কঠোর লকডাউনের কারণে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে ব্যাপারীরা আসতে না পারায় বাজারের এ দশা। এ অবস্থায় আম বিক্রি নিয়ে চরম দুশ্চিন্তায় রয়েছেন জেলার চাষী-ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্টরা।

গতকাল সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, আমের ডালি নিয়ে ক্রেতার অপেক্ষায় বসে আছেন ব্যবসায়ীরা। কিন্তু দেখা নেই ক্রেতার। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, করোনা প্রতিরোধে জেলা প্রশাসনের দেয়া সপ্তাহব্যাপী কঠোর লকডাউনের কারণে কানসাট আমবাজারের এ অবস্থা। কঠোর লকডাউনে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের ব্যাপারীরা আসতে না পারায় উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন আমচাষী ও ব্যবসায়ীরা। ক্রেতা না পাওয়ার আশঙ্কায় আম পেকে গেলেও গাছ থেকে পাড়ছেন না চাষীরা। করোনার প্রভাব থাকায় চাঁপাইনবাবগঞ্জের আম নিতে অনীহা অনেক ব্যাপারীর।

কানসাট বাজারের আড়তদার হিমেল আলী জানান, আমচাষীরা লকডাউনের কারণে বাজারে আম নিয়ে আসতে ভয় পাচ্ছেন। আম পেকে গেলেও লকডাউনের কারণে অনেকে আম পাড়ছেন না। কারণ ক্রেতা না থাকলে আম পেড়ে কার কাছে বিক্রি করবেন? কয়েকদিন ধরে আড়তে বসে আছেন; চাষীরা আম নিয়ে আসছেন না। বাইরের ক্রেতা না আসায় দামও অনেক কম।

আমচাষী রুবেল আহমেদ বলেন, কঠোর লকডাউনের কারণে একদিকে গাছে আম নষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে প্রকৃত দাম না পেয়ে হতাশ হচ্ছেন আমচাষীরা। এ বিষয়ে সরকার ও নীতিনির্ধারণী মহলকে গুরুত্ব দিয়ে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত। বাইরের জেলা থেকে যাতে ক্রেতারা আসতে পারেন, সে ব্যাপারে গুরুত্ব দেয়া দরকার।

আম ব্যবসায়ী শফিকুল ইসলাম বলেন, বাগান কেনা আছে, গাছেই আম পাকতে শুরু করেছে। পাড়তে পারি না বলে বাগানেই নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। বাজারে পাইকারি ব্যবসায়ীরা আসতে না পারার কারণে এ অবস্থা হয়েছে।

কানসাট আম আড়তদার সমবায় সমিতি লিমিটেডের সাধারণ সম্পাদক ওমর ফারুক চৌধুরী টিপু বলেন, অনলাইনে আম বিক্রির কথা বললেও তা সম্ভব নয়। কেননা অনলাইনে মাত্র পাঁচ ভাগ আম বিক্রি হয়। বাকি ৯৫ ভাগ আম এ বাজার থেকেই বিক্রি হয়। বাইরের ব্যাপারীরা না এলে এ বাজার জমবে না। এতে এলাকার আমচাষী ও ব্যবসায়ীদের দুর্ভোগের শেষ থাকবে না।

এ বিষয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জ-১ (শিবগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য ডা. শামিল উদ্দিন আহমেদ শিমুল বলেন, প্রশাসনের আয়োজনে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা ব্যাপারীদের জন্য করোনা টেস্টের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এছাড়া তাদের জন্য বিশেষ কয়েকটি হোটেলের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। এদিকে মহামারী করোনার প্রভাবে সাতক্ষীরার মৌসুমি আম ব্যবসায়ীরা সর্বস্বান্ত হয়ে পড়েছেন। করোনা সংক্রমণ ছাড়াও ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে গত এক সপ্তাহে আম পরিবহন ব্যাহত হয়। বাইরের ব্যবসায়ীরাও সাতক্ষীরায় তেমন আসেননি। এতে স্থানীয় বাজারে অর্ধেক দামে হিমসাগর ও ল্যাংড়া আম বিক্রি করে ব্যাপক লোকসান গুনতে হয়েছে মৌসুমি ব্যবসায়ীদের।

গতকাল সাতক্ষীরার সুলতানপুর বড়বাজারে তালা উপজেলার নগরঘাটা গ্রাম থেকে রফতানি উপযোগী ২০ মণ হিমসাগর আম বিক্রি করতে আসেন ব্যবসায়ী মোকলেছ উদ্দিন। তিনি বলেন, সকাল ৯টার দিকে সুলতানপুর বাজারে পৌঁছেন। বেলা ২টার দিকে বিক্রি করতে পারেন সেই আম। জেলার বাইরের কোনো ব্যাপারী না পেয়ে অবশেষে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের কাছে ১ হাজার ৪৫০ টাকা মণ দরে বিক্রি করেন ২০ মণ হিমসাগর আম। মোকলেছ উদ্দিন বলেন, গত বছর এ সময় হিমসাগর আম পাইকারি বিক্রি করেন প্রতি মণ ২ হাজার ৬০০ টাকায়। ৫ লাখ টাকার বাগান কিনে অন্তত দেড় লাখ টাকা লোকসান যাবে বলে আশঙ্কা করছেন তিনি।

সাতক্ষীরা সদর উপজেলার ফিংড়ি গ্রামের মৌসুমি আম ব্যবসায়ী ইউনুস আলী জানান, ১০ বছর ধরে এলাকার আমবাগান ক্রয় করেন। গাছে মুকুল আসার সঙ্গে সঙ্গে আগাম টাকা দিয়ে বাগান মালিকদের কাছ থেকে এসব বাগান কিনে রাখেন তিনি। চলতি মৌসুমেও ৬ লাখ টাকা দিয়ে আটটি বাগান কিনেছেন। তিনি বলেন, বাগান কেনার পর পরিচর্যা, বিভিন্ন ধরনের ওষুধ-কীটনাশক স্প্রে ও শ্রমিকের মজুরি দিয়ে আরো কমপক্ষে ২ লাখ টাকা খরচ হয়েছে। মোট ৮ লাখ টাকা বাগান ক্রয়মূল্য পড়েছে তার। এ পর্যন্ত বাগানের প্রায় ৯০ শতাংশ আম বিক্রি করে সাড়ে ৪ লাখ টাকা পাওয়া গেছে। বর্তমানে গাছে যে পরিমাণ আম আছে তা বিক্রি করলে হয়তো আরো ১ লাখ টাকা হতে পারে। ফলে চলতি মৌসুমে আড়াই থেকে ৩ লাখ টাকা লোকসান হয়েছে তার। করোনা মহামারীর কারণে বাইরের ব্যাপারী না আসায় এ আম খুবই অল্প মূল্যে স্থানীয় বাজারে বিক্রি করায় এ লোকসান হয়েছে। গত বছর একই পরিমাণ বাগান কিনে সব খরচ তুলেও ২ লাখ টাকা লাভ হয়েছিল।

সাতক্ষীরা আমচাষী কল্যাণ সমিতির সভাপতি লিয়াকাত হোসেন জানান, এক দশকের মধ্যে চলতি মৌসুমে আমের বাজার সবচেয়ে মন্দা যাচ্ছে। অন্যান্য বছর ঢাকা, চট্টগ্রাম, বরিশালসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে পাইকারি ব্যবসায়ীরা এ জেলায় এসে আম কিনে নিয়ে যেতেন। কিন্তু করোনা মহামারীর কারণে ওই ব্যবসায়ীরা এবার আসতে পারেননি। তাই চলতি মৌসুমে অন্তত ৭০-৮০ শতাংশ আম বিক্রি হয়েছে স্থানীয় বাজারে। ফলে ন্যায্যমূল্য না পেয়ে চাষী ও ব্যবসায়ীরা লোকসানে পড়েছেন।

অন্যদিকে সীমান্তবর্তী মেহেরপুর জেলায় শুরু হয়েছে আম সংগ্রহ। বাগানে বাগানে আম পাড়ার ধুম চলছে। মেহেরপুরের আম সুস্বাদু হওয়ায় দেশের বিভিন্ন বাজারের পাশাপাশি ইউরোপের বিভিন্ন দেশে রফতানি হতো। ঝড়-বৃষ্টি না হওয়ায় আমের ফলন ভালো হলেও বাইরের ব্যাপারীরা আসছেন না। তবে করোনাভাইরাসের কারণে জেলার বাইরে থেকে বড় ব্যবসায়ীরা না এলেও অনলাইনের মাধ্যমে জেলার অনেক শিক্ষিত বেকার-যুবক বিক্রি করছে এসব বাগানের আম। ফলে বড় ক্রেতা না থাকলেও অনলাইন ভরসায় জেলার আম চলে যাচ্ছে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন বাজারে। এভাবে ক্ষতি পুষিয়ে নিচ্ছেন আমচাষী ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা। – বণিক বার্তা

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত