প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

[১] মেঘনায় অবাধে চলছে গলদা-বাগদা চিংড়ির পোনা আহরণ

জহিরুল ইসলাম: [২] নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে লক্ষ্মীপুরের মেঘনা নদীতে অবাধে চলছে গলদা ও বাগদা চিংড়ির পোনা আহরণ। এতে ধ্বংস হচ্ছে নদী ও সামুদ্রিক বিভিন্ন প্রজাতির মাছের পোনা। জেলেরা ১টি চিংড়ি পোনার জন্য নষ্ট করছেন শত-শত প্রজাতির মাছ। ফলে মেঘনায় দিন দিন অস্থিত্বের সংকটে পড়েছে গলদা-বাগদাসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ, নষ্ট হচ্ছে জীব বৈচিত্র। জেলেরা প্রকাশ্যে গলদা-বাগদা চিংড়ির পোনা আহরণ করলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা।

[৩] নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার মজুচৌধুরীর ঘাট, বুড়ির ঘাট, কমলনগর উপজেলার মতিরহাট, মাতাব্বরহাট, সাহেবেরহাট, লুধুয়া ঘাট, রায়পুর উপজেলার মেঘনা নদীর বিভিন্ন ঘাট এলাকায় ও রামগতি উপজেলার চর গজারিয়াসহ মেঘনা নদীর বিস্তৃণ এলাকা জুড়ে চলছে গলদা-বাগদা চিংড়ি পোনা ধরার মহাউৎসব। এ পোনা অতি ক্ষুদ্র হওয়ায় তা ধরতে যে জাল ব্যবহার করা হয় তাতে ধ্বংস হয় বিভিন্ন প্রজাতির মাছের পোনাও। এ জন্য নদীতে চিংড়ি পোনা শিকার নিষিদ্ধ করেছে সরকার। তবে সে নিষেধাজ্ঞা মানছে না জেলেরা।

[৪] এপ্রিল-জুন এ তিন মাস মেঘনার উপকূলীয় অঞ্চলে গলদা-বাগদাসহ বিভিন্ন প্রজাতির রেনু অবস্থান করে এবং জোয়ারের সাথে এসব রেনু পোনা পাড়ে চলে আসে। আর এ সুযোগে অসাধু এক শ্রেনীর মৎস্যজীবি জেলেরা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উদাসীনতায় গলদা-বাগদা চিংড়ি পোনা ধরতে গিয়ে নদী ও সামুদ্রিক প্রজাতের বিভিন্ন পোনা নিধন করছেন। এতে ধ্বংস হচ্ছে নদী ও সামুদ্রিক প্রজাতির রেনু পোনা।

[৫] সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, লক্ষ্মীপুরের রামগতি থেকে চাঁদপুরের ষাটনল পর্যন্ত ১০০ কিলোমিটার মেঘনা নদী এলাকা জুড়ে চলছে গলদা-বাগদা চিংড়ির পোনা ধরার মহাউৎসব। জেলে, শিশু ও বৃদ্ধ সবাই মশারি এবং ঠেলা জাল নিয়ে চিংড়ি রেণু আহরণ করছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে স্থানীয় প্রভাবশালী লোক জনদের ছত্রছায়ায় মহাজনরা জেলেদের ঋণের টাকা দিয়ে পোনা ধরতে বাধ্য করছেন।

[৭] পোনা আহরণের জন্য মহাজনরা নদী পাড়ে অবৈধভাবে গড়ে তুলেছে অসংখ্য টিনের ঘর। ক্ষমতার ধাপট দেখিয়ে সরকারের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে প্রকাশ্যে নদীর পাড়ে চলছে গলদা-বাগদা চিংড়ি পোনার ব্যবসা। এছাড়া রাতের বেলায় টাকার বিনিময় গলদা-বাগদা চিংড়ি পোনার ট্রাক পারা-পারে সহযোগিতা করার অভিযোগ রয়েছে মৎস্য কর্মকর্তা, স্থানীয় রাজনীতিবিদ ও প্রভাবশালীদের বিরুদ্ধে।

[৮] একজন জেলে প্রতিদিন ৫০০ থেকে সর্বোচ্চ ১৫০০ পোনা ধরতে পারে। প্রতিটি পোনা তাঁরা আড়তদারের কাছে ২ থেকে আড়াই টাকা দরে বিক্রি করেন। আড়তদার চিংড়ি ঘের-মালিকদের কাছে প্রতিটি পোনা সাড়ে তিন থেকে চার টাকা দরে বিক্রি করেন। মহাজনরা অগ্রিম ঋণ দেয়ায় পোনা শিকারে উৎসাহী হয়ে উঠছে জেলেরা।

[৯] রেনু পোনা শিকারী জুলহাস, রাসেল ও পিয়ারা বেগম জানান, গলদা চিংড়ির পোনা ধরা যে অবৈধ, তা তারা জানেন। কিন্তু বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ না থাকায় নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও পেটের দায়ে বাধ্য হয়েই রেনু পোনা শিকার করতে হচ্ছে তাদের।

[১০] রেনু ব্যবসায়ী তসলিম উদ্দিন জানান, মেঘনার গলদা চিংড়ির পোনা অল্প সময়ে বড় হয়ে যায়। এ জন্য যশোর, খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরাসহ দেশের চিংড়ি ঘের মালিকদের কাছে মেঘনার পোনার কদর বেশি। জেলেদের কাছ থেকে তারা রেনু পোনা কিনে গলদা ও বাগদা চিংড়ির ঘের মালিকদের কাছে বিক্রি করেন। এ ব্যবসায় তাদের লাখ লাখ টাকা বিনিয়োগ রয়েছে। এর সঙ্গে এই এলাকার মানুষের জীবন-জীবিকা জড়িত। তাই তারা পোনা না ধরে থাকতে পারে না। প্রতি মৌসুমে এখানে শতাধিক কোটি টাকার গলদা চিংড়ির পোনা বিক্রি হয়।

[১১] স্থানীয়রা জানায়, এক সময় এ অঞ্চলে অনেক মাছ পাওয়া যেতো। চিংড়ির পোনা আহরণ করতে গিয়ে মাছের প্রজাতি ধ্বংস হয়ে গেছে, এর ফলে নদীতে আর আগের মতো মাছ পাওয়া যায় না। চিংড়ির পোনা বাছাইয়ের সময় বাইলা, সুরকা, পোয়া, পাঙাশ, বাছা, বাতাসি, পাবদাসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছের ডিম ও পোনা নষ্ট হয়ে যায়। প্রাকৃতিক উৎস থেকে বেপরোয়াভাবে এই রেণু ধরা বন্ধ করা অতিবজরুরী।

[১২] লক্ষ্মীপুর জজ কোর্টের আইনজীবী এডভোকেট মোশারফ হোসেন মিঠু জানান, ২০০০ সালের ২১ সেপ্টেম্বর মৎস্য ও পশু সম্পদ মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনে দেশের উপকূলীয় এলাকায় মাছের পোনা আহরণ নিষিদ্ধ করেন। তারপরেও এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী স্থানীয় জেলেদের দিয়ে নদী থেকে মাছের পোনা আহরণ করাচ্ছে। স্থানীয় প্রশাসনকে ‘ম্যানেজ’ করেই অবাধে চলছে এ রেণু সংগ্রহ।

[১৩] জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. বিল্লাল হোসেন গলদা ও বাগদা পোনা ধরার কথা স্বীকার করে বলেন, বিষয়টি আমাদের নজরে রয়েছে, নদীতে চিংড়ির রেণু পোনা ধ্বংস করা অবৈধ, যারা অবৈধ ভাবে রেণু পোনা আহরণ করছেন অবশ্যই তাদেরকে আইনের আওতায় আনা হবে। এক শ্রেনীর অসাধু মৎস্য ব্যবসায়ীদের কারণে নদী থেকে পোনা ধরা বন্ধ করা যাচ্ছেনা। পোনা আহরণ বন্ধে প্রয়োজনে অভিযান আরো জোরদার করা হবে। ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে অভিযান চালিয়ে মৎস্য সংরক্ষণ আইনের আওতায় তাদেরকে শাস্তির ব্যবস্থা করা হবে। সম্পাদনা: সাদেক আলী

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত