প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

প্রবীর বিকাশ সরকার: জাপানের শিক্ষাচিন্তা অনুকরণীয়

প্রবীর বিকাশ সরকার: মানাবিএতে/মিচি নো হাকাসে তো/নারু হিতো মো/অশিয়ে নো অইয়া নো/মেগুমি ওয়াসুরু না। এটা জাপানি ওয়াকা কবিতার ক’টি পঙক্তি, যার বাংলা অর্থ- শিক্ষালাভ করে বড় মানুষ হওয়ার পরেও সেই শিক্ষককে কৃতজ্ঞতা জানাতে ভুলে যেও না। প্রাচীনকালে মুনি-ঋষিদের যুগ তো বটেই, ব্রিটিশ-ভারতের যুগেও শিক্ষার মূল্য ও মর্যাদা ছিল ভারতবর্ষে সবকিছুরই ঊর্ধ্বে। এমনকি পাকিস্তান আমলেও শিক্ষা ও শিক্ষকের মর্যাদা উচ্চপর্যায়ের ছিলো। সেটা ঝট করে নেমে গেলো- বলা যায় বিলীন হয়ে গেলো স্বাধীনতার পর! ‘অটো-প্রমোশন’ পরিকল্পনাটি ছিলো বাংলাদেশের শিক্ষার প্রথম ধস। না পড়েই পাস! পরবর্তীকালে যোগ হতে লাগলো না শিখিয়েই শিক্ষক। অস্বীকার করার মতো উদাহরণ নেই যে, শিক্ষাঙ্গন হয়ে উঠলো অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্য। স্বাধীনতা পেলে কীভাবে একটি জাতি বিশৃঙ্খল হয়ে পড়ে তার সবচে বড় উদাহরণ হচ্ছে স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলো।

কিন্তু অতীতের দিকে যদি তাকাই দেখি যে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছিলো ‘প্রাচ্যের অক্সফোর্ড’ হিসেবে খ্যাত। বিদেশি বিদগ্ধ শিক্ষক, শিক্ষাবিদ এবং গবেষকরা অধ্যাপনার কাজ করে গেছেন এবং অনেক অগ্রসর বিদ্যালয় এবং মহাবিদ্যালয় পূর্বাঞ্চলে স্থাপিত হয়েছে ব্রিটিশ আমলেই। সেগুলোতে বিদ্বান, পণ্ডিত এবং শিক্ষানুরাগী শিক্ষকরা শিক্ষা দিয়েছেন। তাঁদের আর্থিক অবস্থা সন্তোষজনক ছিলো না ঠিকই, কিন্তু সামাজিক মর্যাদা ও অবস্থান ছিলো ঈর্ষণীয়। এই পূর্বাঞ্চলের একাধিক উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছিলো অনেক বিদেশি ছাত্ররাও। এই যে সুমহান একটি ঐতিহ্য গড়ে উঠেছিল শত বছর ধরে স্বাধীনতার পর সেটা ভেস্তে গেলো। অরও উন্নত না হয়ে, সেই শিক্ষাব্যবস্থাটা রাতারাতি অসভ্য, বর্বরতার দিকে নিয়ে যাওয়া হলো। কেন? কী কারণে? তার একমাত্র উত্তর মেধাহীন চিন্তা এবং বেপরোয়া রাজনীতি।

দুঃখজনক হলে সত্য যে, দেশ-বিদেশের সঙ্গে সৃজনশীল ভাববিনিময় এবং সুশিক্ষার আদানপ্রদান আজ একটা দীর্ঘশ্বাসবহ ইতিহাস মাত্র বাংলাদেশে! কিন্তু এশিয়ার কথাই যদি ধরি, তাহলে সমগ্র এশিয়া মহাদেশের প্রথম শিল্পোন্নত রাষ্ট্র হচ্ছে জাপান। কীভাবে সম্ভব হলো? অথচ ‘নিপ্পন’ তথা ‘জাপান’ ছিলো একটি গ্রামীণ সভ্যতার দেশ। কীভাবে সে মাত্র ২০-২৫ বছরের মধ্যে আধুনিক হয়ে উঠলো? কীভাবে পাশ্চাত্য শ্বেতাঙ্গদের উন্নত রাষ্ট্রগুলোর সমকক্ষ হয়ে উঠল সে এক বিস্ময়! এর মূলে রয়েছে সর্বস্তরে মাতৃভাষায় আধুনিক শিক্ষার সুযোগ প্রদান এবং সমাজের অন্যতম প্রধান মর্যাদাসম্পন্ন পেশা হিসেবে শিক্ষকের উপযুক্ত মূল্য পরিশোধক পরিকল্পনা গ্রহণ। এর কোনো প্রকার বিকল্প নেই এটা আধুনিক জাপানের প্রথম শাসক তথা মেইজি (১৮৬৮-১৯১২) সরকার সহজেই অনুধাবন করতে পেরেছিলেন।

অবশ্য ইতিহাসেরও আগে ইতিহাস থাকে, সেই অনুযায়ী এদো যুগ তথা সামুরাই যুগে (১৬০৩-১৮৬৮) শিক্ষার প্রতি সামরিক শাসকরাও ছিলেন একনিষ্ঠ অনুরাগী এবং অগ্রসর। ‘তেরাকোইয়া’ বা ‘মন্দির-আশ্রমভিত্তিক শিক্ষা’ এই যুগের একটি অনুকরণীয় অধ্যায়, যা পরবর্তীকালে সুদূরপ্রসারী হয়েছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর বিধ্বস্ত পরিস্থিতিতেও। প্রকৃত শিক্ষার আলো একবার বুকে ধারণ করলে সেটা মৃত্যু পর্যন্ত অনির্বাণ থাকে।

মেইজি যুগে জাপান পাশ্চাত্য সভ্যতার সমকক্ষ হতে চেয়ে প্রথমেই অগ্রাধিকার দিলো আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থার দিকে। মেইজি সরকার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, জার্মানি, নেদারল্যান্ডস, ফ্রান্স প্রভৃতি উন্নত দেশের অনেক মেধাবী শিক্ষক ও প্রযুক্তিবিদকে কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগ দিলেন। তাঁদের উচ্চপারিশ্রমিক দেওয়ার বাজেট তৈরি করলেন। ফলে জাপানের প্রতিটি ক্ষেত্রেই দ্রুত আধুনিক শিক্ষার প্রভাব পড়তে লাগলো। শিক্ষা বিপ্লব শুরু হলো জাপানে। কৃষির উন্নয়ন, ভারী শিল্পকারখানা স্থাপন, বিজ্ঞানচর্চা, প্রযুক্তি-উদ্ভাবন, সমরাস্ত্র উৎপাদন, নগরায়ন, স্থাপত্য নির্মাণ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে অভাবনীয় জোয়ার এলো। যা এশিয়ায় প্রাচীনকালে ভারতবর্ষের বৌদ্ধযুগে দেখা গিয়েছিলো। প্রচুর বিহার-মহাবিহার স্থাপিত হয়েছিলো যেগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ের মানদণ্ডে আজও বিবেচ্য। এর শত-হাজার বছর পর, সমগ্র এশিয়ায় জাপান প্রথম শিল্পবিপ্লব ঘটাতে সক্ষম হলো একমাত্র আধুনিক শিক্ষাকে কাজে লাগিয়ে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের পর।

জাপানে শিক্ষার এই অগ্রগতির পেছনে মূলত কাজ করেছে এবং আজও করে চলেছে ‘জাতীয়তাবোধ’ তা আর না বললেও চলে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ছাইসদৃশ ধ্বংসপ্রাপ্ত জাপান একইভাবে উঠে দাঁড়াতে সক্ষম হয়েছিল মাত্র ২০ বছরের মধ্যে ‘অলৌকিক অর্থনৈতিক শক্তি’ হিসেবে প্রধানত শিক্ষা ব্যবস্থাকেই অগ্রাধিকার দিয়েছিল বলেই। সম্পূর্ণভাবে মাতৃভাষায় পুঁথিগত বিদ্যা এবং ব্যবহারিক শিক্ষার অপূর্ব সমন্বয় ঘটিয়েছিলো।

জাপানের এই ঐতিহাসিক মহান শিক্ষাবিপ্লবকে অনুসরণ করেছিল আজকের এশিয়ার উন্নত রাষ্ট্রগুলো ৪০ বছর আগেই। এই ইতিহাসকে অনুসরণ করে বাংলাদেশও শিক্ষার ক্ষেত্রে বিপ্লব ঘটাতে পারত বঙ্গবন্ধুর আমলেই। কিন্তু তার লক্ষণ ছিলো না বরং রাজনীতির রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছিলো দেশের প্রতিটি মহাবিদ্যালয় এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। পরবর্তী সরকারগুলো সেই অবস্থাকে আরও শোচনীয় করে ত তুলেছিলো, তার শিকার হয়েছি আমি নিজেই। অথচ সদ্যস্বাধীন দেশটির প্রথম অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত ছিলো শিক্ষাকে, যেমনটি জাপান করেছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস হয়ে।

এখন যা করতে পারে বাংলাদেশ তা হলো: মাতৃভাষায় শিক্ষার মান বৃদ্ধি, ব্যবহারিক শিক্ষা সম্প্রসারণ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে একেবারেই দুর্নীতি ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্তরাখা, সৃজনশীল-উদ্ভাবনী শিক্ষার জন্য বিদেশি শিক্ষক-প্রশিক্ষক নিয়োগদান এবং সর্বোপরি সরকারি- বেসরকারি সর্বপ্রকার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকবৃন্দের উচ্চগুরুদক্ষিণা প্রদান এবং তাঁদের জীবনজীবিকা নিশ্চিত চিন্তামুক্তরাখার ব্যবস্থা করা। জাতির সেবাদানকারীরা পেটে ক্ষুধা নিয়ে, সাংসারিক সমস্যার পাহাড় ঠেলে আর যাই হোক ছাত্র-ছাত্রীকে শিক্ষা দিতে সম্পূর্ণ অক্ষম, ফলে অশিক্ষা-কুশিক্ষায় বৃদ্ধিপ্রাপ্ত প্রজন্ম রাষ্ট্রকে দুর্বল করে এবং জাতির অবহ বোঝা হয়ে দাঁড়ায়।

করোনার এই ক্রান্তিকালে সরকারের শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট শিক্ষা বিষয়ক চিন্তাবিদদের জন্য একটি বিরাট সুযোগ এই যে, করোনা পরবর্তীকালে রাষ্ট্রের শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে চিন্তা করা। কীভাবে মাতৃভাষাকে কেন্দ্র করে সুশিক্ষক তৈরি করা যায়, প্রতিটি নার্সারি, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে মাতৃভাষায় আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করা যায় এই বিষয়ে একনিষ্ঠভাবে চিন্তা করা। করোনা মহামারিতেও কীভাবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে চালু করা যায়? উত্তরণের পথ খুঁজে বের করা ছলে-বলে-কৌশলে। কেননা, করোনা পরবর্তী পৃথিবী নিয়ে উন্নত দেশগুলো নানা রকম চিন্তাভাবনা করছে, নতুন নতুন পরিকল্পনা ও কৌশল গ্রহণের কথা ভাবছে। অগ্রাধিকার দেওয়া হবে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি এবং ব্যবহারিক প্রশিক্ষণকে। ধর্মকে নয়। ধর্মগুরুকে নয়। প্রকৃত শিক্ষাপ্রাপ্ত শিক্ষককে, প্রযুক্তিবিদকে, শিক্ষানুরাগীকে অগ্রাধিকার দেওয়ার বিকল্প নেই। আগে উপযুক্ত শিক্ষক তারপর শিক্ষার্থী। জাপানও শত শত বছর ধরে এই চিন্তার অগ্রগামী একটি রাষ্ট্র। শিক্ষাব্রতী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর পাঁচবার জাপান সফর করে তাই দেখেছিলেন স্বচক্ষে। তাই তিনি শান্তিনিকেতনের ব্রহ্মবিদ্যালয়, বিশ্বভারতীতে জ্ঞানী, গুণী, উদারচিত্তধারী শিক্ষানুরাগী শিক্ষক খুঁজে খুঁজে এনেছিলেন। একদা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ও তাই করেছিলো। সেই ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে হবে নতুন যুগের নতুন চাহিদাকে মোকাবেলা করে। বাংলাদেশের চলমান উন্নয়নকে ধরে রাখতে হলে উন্নত বিশ্বের সঙ্গেই পাল্লা দিতে হবে। এটাই যুগের বাস্তবতা। লেখক : রবীন্দ্রগবেষক ও কথাসাহিত্যিক

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত