শিরোনাম

প্রকাশিত : ২৮ মে, ২০২১, ১১:০৭ দুপুর
আপডেট : ২৮ মে, ২০২১, ১১:০৭ দুপুর

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী: বাজেটে শিক্ষাবরাদ্দ এবং শিক্ষার মানন্নোয়ন

মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী : প্রতিবছরই বাজেটে শিক্ষার বরাদ্দ নিয়ে সরকার জনগণকে বলার চেষ্টা করে থাকে যে, সরকার শিক্ষাকে বিশেষভাবে অগ্রাধিকার দিয়ে থাকে। আমরাও বাজেটে একটা মোটা অংকের বরাদ্দ দেখতে পাই। দেশে অগণিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সরকারি বরাদ্দকৃত অর্থ পেয়ে চলছে। মোটকথা বরাদ্দের সিংহভাগ ব্যয় করা হয় শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন এবং অবকাঠামোগত সুযোগ-সুবিধা নির্মাণে। এই ধারা যুগ যুগ ধরে চলে আসছে। এবারও আসছে সপ্তাহে সংসদের অধিবেশন বসতে যাচ্ছে। তাতে অর্থমন্ত্রী ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেট উপস্থাপন করবেন। তাতে অতীতের ধারাবাহিকতাই রক্ষা করা হবে। তবে গেলো বছর এবং এ বছর বৈশ্বিক মহামারি করোনায় গোটা বিশ্বের মতন বাংলাদেশও আক্রান্ত।
করোনা সংক্রমণে আমাদের দেশে সবচাইতে বেশি সময় ধরে মুখ থুবড়ে পড়ে আছে শিক্ষাব্যবস্থা। গেলো বছর কয়েকবার উদ্যোগ নিয়েও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চালু করা যায়নি। এবছর ১৩ জুন থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়ার পরিকল্পনা আছে। কিন্তু খুলে দেওয়া নির্ভর করবে করোনা সংক্রমণের গতি-প্রকৃতির ওপর। যদি সংক্রমণ কিছুটা কমে আসে, তাহলে ধীরে ধীরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়ার চেষ্টা করা হবে। এরই মধ্যে একবছর তিন মাস প্রায় অতিক্রান্ত হতে চললো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে।

শহরাঞ্চলে কিছুটা অনলাইনে শ্রেণিপাঠ নিয়ে কিছু কিছু বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষার্থীদের ধরে রাখার চেষ্টা করেছে। কিন্তু সরকারি প্রাথমিক, মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় এবং এমপিওভূক্ত স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসা প্রায় শতভাগই শিক্ষাক্রম থেকে অনেকটা বিচ্ছিন্ন ছিলো।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় এসাইনমেন্ট প্রবর্তন করে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের কিছুটা শিক্ষার সঙ্গে রাখার চেষ্টা করেছে। তবে নিয়মিত পঠন-পাঠন থেকে বেশিরভাগ শিক্ষার্থী দূরে থেকেছে। সুতরাং সামনের দিনগুলোতে শিক্ষাক্রমে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা ফিরে আসতে পারবে কিনা সেটি দেখা যাবে অল্প কিছুদিন পর থেকে। যদি ফিরে আসা সম্ভব হয়, তাহলে দীর্ঘ একবছরের বেশি সময় ধরে যে ক্ষতিটি শিক্ষাখাতে ঘটে গেছে তার কতোটা পুষিয়ে নেওয়া যাবে, সেটি মস্তবড় চ্যালেঞ্জের বিষয়।

কথা উঠেছে- সংক্ষিপ্ত সিলেবাস করে শিক্ষাক্রমকে এগিয়ে নেওয়া। তবে শিক্ষাক্রম সংক্ষিপ্ত করা হলে শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবনে দীর্ঘমেয়াদে যে ক্ষতি হবে সেটি তাদের সারা জীবনের জন্য পিছিয়ে দেবে। সে কারণে সিলেবাস সংক্ষিপ্ত করা নয়, বরং বহাল রেখে ছুটি কমিয়ে নয় মাসে শিক্ষাকার্যক্রম শেষ করার ধারাবাহিকতা অন্তত চার বছর বজায় রাখা হলে শিক্ষার্থীরা প্রয়োজনীয় শিক্ষালাভ করতে সক্ষম হবে।

করোনার কারণে গোটা বিশ^ নতুনভাবে টিকে থাকার লড়াইতে অবতীর্ণ হতে যাচ্ছে। এক্ষেত্রে শিক্ষাব্যবস্থাও আগের মতো নয়, বরং নতুনভাবে ঢেলে সাজাতে হবে। আমাদের দেশে শিক্ষাব্যবস্থায় মানের সংকট গোড়া থেকে ওপর পর্যন্ত বিরাজ করছে। প্রাথমিক শিক্ষায় নানা ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে গড়ে উঠছে। এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কী পড়ানো হচ্ছে, কীভাবে শিশুদের তৈরি করা হচ্ছে, তা সরকারের প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নজরধারীতে থাকা দরকার। পঞ্চম শ্রেণিপর্যন্ত শিক্ষার্থীদের মানসম্মত শিক্ষা দেওয়া গেলে তাদের শিক্ষা-জীবন অনেকটাই এগিয়ে চলে।

কিন্তু সমস্যা হচ্ছে প্রাথমিক স্তরেই বেশিরভাগ শিক্ষার্থী প্রয়োজনীয় মানসম্মত শিক্ষা লাভের সুযোগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পায় না। এক্ষেত্রে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং অভিবাবকদের দুর্বলতা রয়েছে। প্রয়োজন হচ্ছে গ্রামাঞ্চলের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং অভিভাবকদের শিক্ষার্থীদের নিয়মিত লেখাপড়ার চর্চায় যুক্ত করার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখা। তাহলে শিশুরা মানসম্মত শিক্ষা নিয়ে ওপরের শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হতে পারবে।

গ্রামের শিক্ষার্থীদের মধ্যে নিয়মিত পঠন-পাঠনে বড়সংখ্যক শিক্ষার্থী পিছিয়ে পড়ে। তাদের প্রয়োজনীয় পাঠদানে তৈরি করার ক্ষেত্রে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও অভিভাবকদের যত্নের অভাব থাকায় অনেকেই ওপরের শ্রেণিতে ঝরে পড়ে যায়। এরা আর শিক্ষাজীবনে মানের প্রতিযোগিতায় থাকতে পারে না। একসময়ে তাদের বেশির ভাগই শিক্ষাবিমুখ হয়ে পড়ে। মাধ্যমিক স্তরেও সমস্যা একইরকম। ফলে বেশির ভাগ শিক্ষার্থী মাধ্যমিক শিক্ষার গন্ডি সাফল্যের সঙ্গে অতিক্রম করতে পারে না। ওপরের স্তরেও পঠন-পাঠন এবং শ্রেণিপাঠ শিক্ষার্থীদের উচ্চতর শিক্ষার জন্য আগ্রহী করতে পারছে না। সে কারণে বিরাটসংখ্যক শিক্ষার্থী উচ্চমাধ্যমিক স্তরেই আশানুরূপভাবে গড়ে উঠতে পারছে না। এরপরে উচ্চশিক্ষায় কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, মাদ্রাসা ইত্যাদিতে যেসব শিক্ষার্থী ভর্তি হয় তাদের একটি সামান্য অংশই কর্মমুখী সৃজনশীল উদ্ভাবনী এবং জাতীয় জীবনে প্রয়োজনীয় অবদান রাখার মতো শিক্ষা-দক্ষতা নিয়ে বের হয়ে আসতে পারে।

সিংহভাগ শিক্ষার্থী মানের সংকট এবং জাতীয় জীবনে কর্মক্ষেত্রের সুযোগ নেই- এমন সব বিষয়ে অপরিকল্পিতভাবে উচ্চশিক্ষার সনদ নিয়ে বের হচ্ছে, যা তাদের বেকার জীবনে প্রবেশ করতে বাধ্য করছে। সুতরাং এ ধরনের শিক্ষাব্যবস্থা রেখে নয়, রবং ঢেলে সাজিয়ে আমাদের নতুন করে শিক্ষাব্যবস্থা তৈরি করতে হবে। যেখানে প্রতিটি শিশুই জ্ঞান, দক্ষতা, মেধাচর্চা, জীবনবোধ গঠন, বৈশ্বিক বাস্তবতা অনুযায়ী নিজেদের তৈরি করতে পারবে। সেজন্য আমাদের ব্যাপকসংখ্যক ভোকেশনাল, প্রযুক্তি, টেকনিক্যাল এবং উচ্চতর শিক্ষায় গবেষণা ও উচ্চদক্ষতা সম্পন্ন মানবসম্পদ তৈরির শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।

এর জন্য বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় ব্যাপক সংস্কার সাধন এবং মেধাবী, দক্ষ শিক্ষক নিয়োগের ব্যবস্থা করতে হবে। সেভাবেই আমাদের শিক্ষার বাজেটটি নির্ধারণ করতে হবে। তাহলেই আমরা প্রতিবছর ধাপে ধাপে শিক্ষাব্যবস্থায় বিরাজমান অব্যবস্থাপনা দূর করার মাধ্যমে বর্তমান বৈশ্বিক চাহিদার সঙ্গে নিজেদের নতুন প্রজন্মকে শিক্ষায় শিক্ষিত করতে সক্ষম হবো। এর কোনো বিকল্প আমাদের সম্মুখে খোলা নেই।

লেখক : শিক্ষাবিদ। অনুলিখন : আমিরুল ইসলাম

 

  • সর্বশেষ