প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ট্রাম্পের চীন বৈরীতার পথ ধরলেন বাইডেন

রাশিদ রিয়াজ : এশিয়া বিষয়ক হোয়াইট হাউসের শীর্ষ কর্মকর্তা বলেছেন চীনের সঙ্গে এক পথ অনুসরণ করার মার্কিন অধ্যায় শেষ হয়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্র বরং চীনের সঙ্গে তীব্র প্রতিযোগিতার যুগে প্রবেশ করেছে এবং এর কারণ বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশটির প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং তা কঠোর হাতে নিয়ন্ত্রণ করছেন। যুক্তরাষ্ট্রের সিকিউরিটি কাউন্সিলের ইন্দো-প্যাসিফিক এ্যাফেয়ার্সের সমন্বয়ক কার্ট ক্যাম্পবেল পরিস্কার করেই বলেন এতদিন চীনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যে ব্যস্ততম ‘এনগেজমেন্ট’ এর কথা বলা হতে তা কার্যত উবে গেছে। স্ট্যামফোর্ড ইউনিভার্সিটি আয়োজিত ‘ইউএস পলিসি টুয়ার্ডস চায়না উইল নাও অপারেট আন্ডার এ নিউজ সেট অব স্ট্রাটেজিক প্যারামিটারস’ শীর্ষ এক আলোচনা সভায় কার্ট ক্যাম্পবেল বলেন, দুটি দেশ এখন প্রবল প্রতিযোগিতার মুখোমুখি অবস্থানে দাঁড়িয়েছে। ব্লুমবার্গ

কার্ট বলেন প্রেসিডেন্ট শি জিন পিংয়ের চীনা নীতি দেশটির সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের এধরনের অবস্থানের পরিবর্তনে মুখ্য ভূমিকা পালন করেছে। ভারতের লাদাখ সীমান্তে চীনের সামরিক সংঘর্ষ, অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক প্রচারণা, ‘ওলফ ওয়ারিয়র’ বা নেকড়ে যোদ্ধার মত কূটনীতি ছাড়াও বেইজিংয়ের কঠোর আচরণ যা কঠোর শক্তি বা শক্ত শক্তির দিক অনুসরণ করে পরিবর্তনের এমন এক প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে যা আমাদের ইঙ্গিত দিচ্ছে চীন ভবিষ্যতে এ নীতি বহালে আরো কঠিনভাবে প্রতিজ্ঞ ও আগ্রাসী হয়ে উঠবে। শুধু কার্ট ক্যাম্পবেল নয়, এমনকি মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি ক্যাথরিন তাই এবং চীনা ভাইস প্রিমিয়ার লিউয়ের মধ্যে ফোনালাপের শুরুতেই ক্যাথরিন জানান উভয় দেশ অনেক বড় চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। এরই মধ্যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট তার গোয়েন্দা সংস্থাগুলো উহানে কোভিডের উৎস সম্পর্কে নতুন তদন্ত করে আগামী ৩ মাসের মধ্যে প্রতিবেদনে জমা দিতে বলার পর দুটি দেশের মধ্যে নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে। বাইডেন এক বিবৃতিতে বলেন কোভিড ভাইরাস সংক্রামিত প্রাণির সঙ্গে মানুষের যোগাযোগের মাধ্যমে নাকি ল্যাবরেটরিতে দুর্ঘটনার কারণে ছড়িয়ে পড়ে তা সুনির্দিষ্টভাবে জানা জরুরি। কারণ গোয়েন্দা সংস্থাগুলো এ নিয়ে সংশয়ে রয়েছে। ওয়াশিংটনে অবস্থিত চীনের দূতাবাস বলেছে, এ ইস্যু নিয়ে রাজনীতি করলে তদন্ত বিঘ্নিত হবে। চীনের সরকারি মিডিয়া গ্লোবাল টাইমস বলছে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় সংক্রমণ বিশেষজ্ঞ ড. অ্যান্থনি ফাউচি কোভিডের উৎস অনুসন্ধানের যে তাগিদ দিচ্ছেন তা নৈতিক অবক্ষয়ের পর্যায়ে পড়ে।

কোভিডের উৎস নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র রাজনীতি করছে বলে অভিযোগ তুলেছে ওয়াশিংটনে অবস্থিত চীনের দূতাবাস। বেইজিং বলছে কিছু রাজনৈতিক শক্তি রাজনৈতিক কারসাজি এবং ব্লেম গেম স্থির করেছে। এছাড়া করোনা ভাইরাসের উৎস কি বা কোথায় তা দ্বিতীয় দফায় তদন্তের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। ঠিক এ সময়ে ওয়াশিংটনের অভিযোগ জোরালো হয়েছে যে, চীনের উহান সিটির ইনস্টিটিউটট অব ভাইরোলজি থেকে করোনা ভাইরাস ছড়িয়েছে। এর প্রেক্ষিতে তদন্তকারীদেরকে অধিক সুবিধা দেয়ার জন্য চাপ বৃদ্ধি পেয়েছে চীনের ওপর। বার বার এ অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে আসছে চীন। তারা বলছে, করোনা ভাইরাস নিয়ন্ত্রণে নিজেদের ব্যর্থতা থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নেয়ার চেষ্টা করছে যুক্তরাষ্ট্র ও অন্য কিছু দেশ। ওয়াশিংটনে কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশন্স-এর বিশ্ব স্বাস্থ্য বিষয়ক সিনিয়র ফেলো ইয়ানঝোং হুয়াং বলেছেন, গবেষণাগার থেকে করোনা ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার যে ধারণা তার জন্য চীনই দায়ী। কারণ, সব কিছু খোলামেলা করার ক্ষেত্রে ঘাটতি আছে চীনের। এটা একটা বড় ফ্যাক্টর। তিনি বলেন, এই হাইপোথিসিস প্রমাণ করার বাস্তবে আসলে কিছু নেই। এই মহামারির উৎস সন্ধানের ক্ষেত্রে খুব গুরুত্বপূর্ণ এবং বাস্তবসম্মত বিষয় হলো স্বচ্ছতা গড়ে তোলা, যাতে আস্থা বৃদ্ধি পায় তদন্তে।

অন্যদিকে গ্লোবাল টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যদি গবেষণাগার থেকে করোনা ছড়িয়ে পড়ার তত্ত্বের ওপর আরো তদন্ত করতে হয়, তাহলে ফোর্ট ডেট্রিক গবেষণাগারসহ নিজেদের সব প্রতিষ্ঠানে তদন্ত করতে দেয়া উচিত যুক্তরাষ্ট্রের। নিরপেক্ষ তদন্তের বিষয়ে প্রচারণা চালাচ্ছেন থিংক ট্যাংক আটলান্টিক কাউন্সিলের সিনিয়র ফেলো জেমি মেটজল। তিনি বলেছেন, চীন সুস্পষ্টত এ বিষয়টিকে আন্তর্জাতিকীকরণের চেষ্টা করছে।

দক্ষিণ চীন সাগর নিয়ে বেইজিংয়ের দাবি, ঝিনজিয়াং প্রদেশে মানবাধিকার, হংকং ও তাইওয়ানের ভবিষ্যত, অর্থনৈতিক টানাপড়েন, ফাইভ জি প্রযুক্তি নিয়ে বিতর্কে বিশে^ সেমিকন্ডাক্টর সরবরাহে ঘাটতি সহ বিভিন্ন ইস্যুতে দুই দেশ আর এক সঙ্গে চলার মত অবস্থান হারিয়ে ফেলেছে। বিশেষ করে জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে দুই দেশের মতপার্থক্য অনেক বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। রেনমিন বিশ^বিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল এ্যাফেয়ার্সের পরিচালক ও সাবেক কূটনীতিক ওয়াং ইওয়েই বলেন যুক্তরাষ্ট্রের ‘এনগেজমেন্টের’ অর্থই হচ্ছে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অবস্থায় চীনকে কব্জা করে ফেলা। কারণ যুক্তরাষ্ট্র পরিস্কার দেখছে চীন তার নিজের অর্থনীতিকে অতিক্রম করে গেছে সুতরাং ওয়াশিংটন বেইজিংকে ধারণ করে শৃঙ্খলিত করে অর্থনৈতিকভাবে আর অগ্রসর হতে দিতে চায় না। তবে কার্ট ক্যাম্পবেলের মত ঝানু কূটনীতিকরা জানেন উত্তেজিত চীনা কূটনীতিকদের কিভাবে দরকষাকষিতে ফিরিয়ে আনতে হয়। গত মার্চে কার্ট ক্যাম্পবেল সহ অন্যান্য মার্কিন কর্মকর্তারা তাদের চীনা প্রতিযোগিদের সঙ্গে আলোচনায় বসেই মানবাধিকার, বাণিজ্য ও আন্তর্জাতিক জোট নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।

ক্যাম্পবেলের অভিযোগ ছিল প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং অর্থনীতিতে আগ্রহী নয় বরং মতাদর্শগতভাবে গভীর সংবেদনশীল। ২০১২ সালে শি ক্ষমতায় এসে এর আগের ৪০ বছরের সম্মিলিত চীন নেতৃত্বকে বিচ্ছিন্ন করেন। ফলে চীনা পলিটব্যুরোর সদস্য ইয়াং জিয়াচি এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ইয়ের মতো শীর্ষস্থানীয় চীনা কূটনীতিকরা চীনের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার বৃত্তের একশ মাইলের কাছাকাছি কোথাও নেই। ক্যাম্পবেল এও সতর্ক করে দেন যুক্তরাষ্ট্র ভারত, জাপান, অস্ট্রেলিয়াকে নিয়ে যে কোয়াড জোটকে অগ্রগামী করছে তা চীনের বিরুদ্ধে মার্কিন প্রচেষ্টার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠবে। কারণ আমরা বিশ্বাস করি আগ্রাসী চীনকে মোকাবেলায় মিত্র, অংশীদার ও বন্ধুভাবাপন্ন দেশগুলোকে নিয়েই আগাতে হবে। চীনা নীতিকে এশীয়ার ভাল নীতি মেনেও ক্যাম্পবেল বলেন এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র একটি ইতিবাচক অর্থনৈতিক দৃষ্টি নিয়েই আগাতে চাইছে। ক্যাম্পবেল এও জানিয়ে দেন এই প্রথমবারের মত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এশিয়ায় অর্থনৈতিক স্বার্থে কৌশলগত মনোযোগের পাশাপাশি সামরিক শক্তিকেও ইন্দো-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে ফিরিয়ে আনছি।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত