প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

মারুফ কামাল খান: ইসরাইলের বেপরোয়া আচরণ মাত্রা ছাড়িয়েছে, আর আস্কারা নয়

মারুফ কামাল খান: বাংলাদেশি পাসপোর্টে মুদ্রিত ইসরাইল ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা ই-পাসপোর্ট থেকে তুলে দেওয়ার পর সত্য, তথ্য, ধারণা, কল্পনা মিলিয়ে ঝুলিয়ে গুবলেট করে অনেকে বিভ্রান্তিকর প্রচার চালাচ্ছেন। যে দেশের তরুণেরা একসময় ফিলিস্তিনের মুক্তিযুদ্ধে শামিল হয়ে দলে দলে জীবন দিয়েছে, আজ সে-দেশেই এমন বিভ্রান্তিকর প্রচারণা! এর জবাবে কিছু কথা বলা দরকার।

একজন লিখেছেন, ছোটবেলা থেকে এদেশের লোক ইহুদি-নাসারা বিরোধী ওয়াজ শুনে শুনেই নাকি খামাখা ইসরাইল-বিরোধী হয়েছে। মৌলভিদের ইহুদি-নাসারা সংক্রান্ত বয়ান পুরাই ধর্মীয়। আর ফিলিস্তিনিদের আন্দোলন একটি জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক আন্দোলন। আগ্রাসনে বিপন্ন একটা জাতির স্বাধীনতা যুদ্ধ। দুটোকে মিলিয়ে একাকার করে দেখলে হবে না। জুডাইজম ও জায়নিজমকে একত্রে মিশিয়ে ফেললেও চলবে না। ফিলিস্তিনিদের লড়াই এন্টি-সেমিটিক বা ইহুদি-বিদ্বেষী লড়াই নয়। নৃতাত্ত্বিক পরিচয়ে ফিলিস্তিনি ও আরবরাও সেমিটিক। ফিলিস্তিনি মুক্তি আন্দোলনের নেতা ইয়াসির আরাফাতের উপদেষ্টাদের মধ্যেও ইহুদি ছিলেন। ইহুদি বংশোদ্ভূত নোয়াম চমস্কির মতন অনেক মানবতাবাদী ইহুদিই ইসরায়েলি আগ্রাসনের বিরোধী। অর্থোডক্স ইহুদিরা তো ধর্মীয় বিবেচনাতেই ইসরাইল রাষ্ট্রবিরোধী। তারা বিশ্বাস করে তাদের প্রতিশ্রুত মেসিয়াহ্ এলে তার নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত হবে ইহুদি ধর্মরাষ্ট্র। তার আগে এমন একটি রাষ্ট্র গঠন ইহুদি ধর্মের পরিপন্থী।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার পরপরই ইসরাইল সম্পর্কে নেওয়া নীতি ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে নয়, মানবিক ও রাজনৈতিক বিবেচনাপ্রসূত সিদ্ধান্ত ছিলো। আগ্রাসন, আধিপত্য, উগ্র সাম্প্রদায়িকতা, জাতিবিদ্বেষের বিরুদ্ধে ফিলিস্তিনিদের স্বাধীনতা ও মুক্তির সংগ্রামে একাত্ম হতেই এই নীতি জাতীয় পর্যায়ে গৃহিত হয়েছিল। ইসরাইল পুরনো বাইবেলে বলা পৌরাণিক ধর্মকাহিনির ওপর ভর করে নানান চক্রান্ত, নিপীড়ন, আগ্রাসনের পথ ধরে স্থাপিত একটা রাষ্ট্র। যে ইহুদিরা নিজেরাই বারবার দেশ হারিয়ে গণহত্যা, নির্যাতন, দেশান্তর, বন্দীত্ব, বাধ্যশ্রমের শিকার হয়েছে তারাই আগ্রাসী ও জালিমের ভূমিকায় নেমেছে। লাখ লাখ ফিলিস্তিনিকে সপরিবারে ভিটেমাটি ছাড়া করেছে, উচ্ছেদ করে শরণার্থী বানিয়ে তাদের জমিতে রাষ্ট্র বানিয়েছে। এই অন্যায় ধর্মরাষ্ট্র স্থাপনে সহযোগী জাতিসংঘ ও অন্যান্য সাম্রাজ্যবাদী দেশ ফিলিস্তিনিদের পৃথক রাষ্ট্র স্থাপনের জন্য যেটুকু জমি বরাদ্দ রেখেছিল তারও বেশির ভাগই ইসরাইল গায়ের জোরে অবৈধভাবে ইহুদি বস্তি বসিয়ে এবং সেনা হানাদারি করে দখল করেছে। এখন বিচ্ছিন্ন এক চিলতে গাজা ছাড়া প্যালেস্টাইনের জন্য বরাদ্দ করে রাখা জমির প্রায় পুরোটাই তাদের দখলে।

মুসলিম, ইহুদি, খ্রিস্টান এই তিন সম্প্রদায়ের মানুষের কাছেই পবিত্র ধর্মস্থান রূপে বিবেচিত স্পর্শকাতর স্পট, স্থাপনা ও নিদর্শনগুলোও তারা অন্যায়ভাবে নিয়ন্ত্রণ করছে এবং সেখানে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করছে। জেরুজালেম-সহ পশ্চিম তীরে তাদের পুলিশ ও সেনা চৌকি যখন যেমন খুশি তেমন স্বেচ্ছাচারিতা ও অত্যাচার চালাচ্ছে। ইসরাইল নামের এই রাষ্ট্রটি সত্যিকারের ইহুদি ধর্মও নয়, পলিটিক্যাল জায়োনিস্ট থিয়োরির বাস্তবায়ন। এ রাষ্ট্রের শাসকেরা বাইবেলে বর্ণিত বনি ইসরাইলিও নয়, তারা ইউরোপের শ্বেতাঙ্গ আশকেনাজি ইহুদি। কাজেই ওল্ড টেস্টামেন্ট বা মিথোলজি অনুযায়ী এই জমি আল্লাহ্ বনি ইসরাইলকে কোভেনান্ট বা চুক্তি করে দিয়েছেন বলে যে কথা তারা বলে, সেই দাবিও আশকেনাজি ইহুদিদের বেলায় প্রযোজ্য নয়। সেই ভুয়া দাবিতে বহুকাল ধরে এই ভূখণ্ডের ভূমিপুত্র ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদ করা যায় না। তবুও শান্তির খাতিরে সংখ্যাগুরু ফিলিস্তিনি-সহ প্রায় সবাই অসলো চুক্তির টু-স্টেট সমাধান মেনে নিয়েছে। কিন্তু তা এখনো ইসরাইলি অনমনীয়তার কারণে বাস্তবায়িত হয়নি। কারণ ইসরাইল তাদের দখল করা ভূমি ছাড়তে রাজি নয়। তারা জোর করে বসানো ইহুদি বস্তি তুলতে রাজি নয়।

তারা ইসরাইল থেকে উচ্ছেদ করা বিভিন্ন দেশে বসবাসরত লাখ লাখ ফিলিস্তিনি উদ্বাস্তুকে ফিরিয়ে নিতে রাজি নয়। তারা ফিলিস্তিনের রাজধানী পূর্ব জেরুজালেম ছাড়তে রাজি নয়। চারদিকে ইসরাইল আর তার মাঝে বিচ্ছিন্ন ও টুকরো কয়েকটি ফিলিস্তিনি এলাকার বাইরে আর কিছুই তারা ছাড়বে না। এভাবেই ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র গঠনকে তারা অসম্ভব করে তুলেছে। সংঘাত বন্ধ করে শান্তি স্থাপনের আরেকটি বিকল্প প্রস্তাব হচ্ছে ‘ওয়ান স্টেট সলিউশন।’ মুসলিম, ইহুদি, খ্রিস্টান নির্বিশেষে সবাই মিলে একটি বহুজাতিক আধুনিক অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হবে। সেখানে প্রতিটি নাগরিকের থাকবে সব বিষয়ে সমান অধিকার। সবাই অবাধে তাদের নিজ নিজ ধর্ম পালনের স্বাধীনতা ভোগ করবে।

ফিলিস্তিনি উদ্বাস্তুরা ফিরে আসবে তাদের নিজস্ব ভূমিতে। ইসরাইল এটাও মানে না। তারা ইহুদি ধর্মরাষ্ট্রের পরিচয় মুছতে রাজি নয়। তারা রাজি নয় ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের সমান নাগরিক অধিকার দিতে। তাদের ভয় এতে জায়োনিস্টিরা সংখ্যালঘু হয়ে শাসনক্ষমতা হারিয়ে ফেলতে পারে। ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে জেরুজালেমে মার্কিন দূতাবাস বসিয়ে এবং কটি আরব দেশকে ইসরাইলের সঙ্গে তথাকথিত ‘আব্রহাম অ্যাকর্ড’ স্বাক্ষরে বাধ্য করে ইসরাইলকে আরও আস্কারা দিয়ে পরিস্থিতি বেশি জটিল করে গেছেন। বর্তমানে ইসরাইলের বেপরোয়া আচরণ মাত্রা ছাড়িয়েছে। এই নাজুক সময়ে তাদের আরও আস্কারা ও সায় দেওয়াটা আসলে মানবতা ও সভ্যতার বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ারই শামিল। ফেসবুক থেকে

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত