প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

দীপক চৌধুরী: পর্বতসম বাধা ডিঙ্গিয়ে এগিয়ে চলা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারকে বাধাগ্রস্তকারীরা ষড়যন্ত্রে লিপ্ত

দীপক চৌধুরী: আমরা এমনই এক দুর্ভাগা জাতি যে, কীভাবে প্রতিপক্ষকে ছোট করা সম্ভব সেটাই একমাত্র চিন্তা করে থাকেন একশ্রেণির রাজনৈতিক নেতা-আমলা। অথচ হওয়া উচিৎ, দলমতের ঊর্ধ্বে উঠে মানুষের কল্যাণে কাজ করে যাওয়া। যারা মানুষের জন্য রাজনৈতিক বয়ান দেন তারা সময়-সুযোগে মানুষের বিরুদ্ধেই যান। এটা তাদের রাজনৈতিক কৌশল। যেনো প্রতিপক্ষকে কীভাবে ঘায়েল করা যায়। আমরা দেখছি, জানি বা গণমাধ্যমেও খবরগুলো আসে এভাবে যে, মন্ত্রীকে ঘায়েল করতে জেলার এমপিরা একজোট। তখন আদর্শ অনুপস্থিত থাকে। কে কোন্ দলের বা কোনব্যক্তির লোক সেটা মুখ্য থাকে না। খোদ দলের ভেতরই এরকমটি হয়ে থাকে। মূলত ব্যক্তিস্বার্থের মধ্যে যখনই বনাবনির বিরোধ বাঁধে তখনই সমস্যা। প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক দল সবসময়ই ক্ষমতাসীনদের তুলাধোনায় করায় ব্যস্ত থাকেন। দক্ষিণ এশিয়ায় এটা বেশি। আর বাংলাদেশ হচ্ছে এই চরিত্র বৈশিষ্টের সূতিকাগার। অনেকেরই মনে থাকার কথা, করোনার ভ্যাকসিন নিয়ে কী রকম তুলকালাম ঘটে গেছে। ইন্ডিয়ার সেরাম ইন্সস্টিটিউটের কোভিসিল্ড নিয়ে শুরুতে নানান কথা বলে ভয়ংকর উত্তাপ ছড়ানো হয়েছিল। আর, এখন টিকা পাচ্ছি না কেনো, কেনো মাত্র একটি দেশে সঙ্গে চুক্তি করা হয়েছিল- এটা নিয়ে প্রতিপক্ষকে পর্যুদস্ত করা হচ্ছে। কী বিচিত্র দেশ!

যখন আমাদের দেশে টিকা প্রথম দেওয়ার আয়োজন চলে তখন ‘আওয়াজ’ ওঠে, ‘ইন্ডিয়ান টিকা’ কী না কী মিশিয়ে দিয়েছে?’ এটি নিয়ে কুশ্রী রাজনীতি হয়ে গেল এখানে। ভ্যাকসিন বিশ্বের বহু দেশ পায়নি। এর চাহিদা এতো বেশি যে, বড়বড় দেশগুলোর মধ্যে এটি নিয়ে কাড়াকাড়ি শুরু হয়েছে। কিন্তু এই দেশে কোবিড-১৯ ভ্যাকসিন এসেছে বঙ্গবন্ধুকন্যার সফল কূটনৈতিক দক্ষতার কারণে। অথচ এই ভ্যাকসিন নিয়ে পরিকল্পিতভাবে নানা বিতর্ক করানো হয়েছে। গলা তুলে চিৎকার করে প্রচার করা হলো, ভ্যাকসিন রাষ্ট্রপতি-প্রধানমন্ত্রীকে আগে দিতে হবে। যারা এই অপপ্রচার চালালো তারা কিন্তু জানেন, ভ্যাকসিন এদেশের মানুষের জন্য আশীর্বাদ হয়ে দাঁড়াবে। যাই হোক, তবু ভ্যাকসিন এসেছে। ভারত সরকার সার্বিক সহযোগিতা করেছে। যাতে শুরুতে ভ্যাকসিন গ্রহণে সাধারণের মধ্যে ভীতি দূর করা যায় এজন্য চিকিৎসক এবং সেনাবাহিনীর পদস্থ কর্মরতাদেরও ভ্যাকসিন দেওয়া হয়। টেলিভিশনের সুবাদে ভিডিও কনফারেন্সে ( ২৭-০১-২০২১) দেখেছি রেনু ভেরোনিকা কস্তা, রাজধানীর কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের এক সেবিকা। সংবাদপত্র টেলিভিশন সবখানে কয়েকদিন আলোচনায় ছিলেন এই একজন সেবিকা। তিনিই প্রথম করোনা ভ্যাকসিন গ্রহণ করেন। এখন অনেকের কাছেই পরিচিত এক নাম। দেশের প্রথম করোনা ভ্যাকসিন গ্রহণের পর এক গাল হেসে তিনি বলেছেন ‘জয় বাংলা’। প্রথম টিকা পাওয়া বাকি চারজন হলেন, এ হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. আহমেদ লুৎফুল মোবেন, স্বাস্থ্য অধিদফতরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. নাসিমা সুলতানা, মতিঝিল বিভাগের ট্রফিক পুলিশ সদস্য মো. দিদারুল ইসলাম এবং বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এম ইমরান হামিদ।
এটা প্রমাণিত সত্য, আসলে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা উন্নয়ন ও অগ্রগতির কিংবদন্তি।

এদেশে যা কখনো সম্ভব হতো না, দরিদ্রদের পক্ষে যা ছিল অসম্ভব তা-ই সম্ভব করেছেন শেখ হাসিনা। দেশে চলমান উন্নয়নের মাঝেই প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা করেছিলেন, দেশে কোনো মানুষ গৃহহীন থাকবে না। সরকার সব ভূমিহীন, গৃহহীন মানুষকে ঘর তৈরি করে দেবে। প্রধানমন্ত্রীর এমন ঘোষণার পর মুজিববর্ষে ছিন্নমূল ও দুস্থ ভূমিহীন-গৃহহীনদের আধাপাকা টিনশেড ঘর নির্মাণ করে দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়। এটা প্রমাণিত, দেশের সরকার এমন হতদরিদ্রদের পাশে সব সময়ই থাকে। জাতির পিতার জন্মশতবর্ষ উপলক্ষ্যে এবার নতুন এক ইতিহাস সৃষ্টির উদ্যোগ। বিশ্বের সর্ববৃহৎ আশ্রয়ণ প্রকল্পের উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী। প্রধানমন্ত্রী তাঁর সরকারী বাসভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে মূল অনুষ্ঠানে সংযুক্ত হয়ে অনুষ্ঠান উদ্বোধন করেন। অনুষ্ঠানে ৬৬ হাজার ১৮৯টি ভূমিহীন-গৃহহীন পরিবারকে জমি ও গৃহ প্রদান করা হয় এবং একই সাথে ৩ হাজার ৭শ’ ১৫টি পরিবারকে ব্যারাকে পুনর্বাসন করা হয়। এই প্রকল্প বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে অসহায় ভূমিহীন ও গৃহহীন ৯ লাখ পরিবারের স্বপ্ন পূরণ হবে। ইস্পাত কঠিন মনোবলে পর্বতসম বাধা ডিঙ্গিয়ে ক্রমেই এগিয়ে চলেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। পেছনে নানা ষড়যন্ত্র চলেছে। এই কদিন আগেও একটি ষড়ষন্ত্র আমরা দেখলাম।

পাশাপাশি এটাও মনে রাখা দরকার, সরকারের অগ্রগতি ও উন্নয়নকে দুর্নীতিবাজ ব্যক্তিরা গোষ্ঠীস্বার্থে বাধাগ্রস্ত করতে চাইছে। ‘গোল্ডেন মনির’ কী একদিনে তৈরি হয়েছিল? এ সরকার আমলের ১২ বছরের মাথায় তার কাহিনি বের হলো। কিন্তু কেনো? অনেক আগে তার শত শতকোটি টাকা ও অপকর্মের তথ্য পাওয়ার কথা। এতোদিন কী ‘ভূতের মতো’ হাওয়ায় ঘুরে বেড়াচ্ছিল যে, তাকে দেখা যায়নি? জি কে শামীম কী হঠাৎ হয়ে উঠেছিল?
এসব খবর এখন ঘনঘন সামনে চলে আসছে যা মানুষকে বিস্মিত করছে। এটি এখন ভয়েরও বিষয়। বিনাবিচারের প্রসঙ্গও উঠেছে। পুলিশের গুলিতে অব. মেজর সিনহা হত্যার পর এ প্রশ্নটা জোরালোভাবে আসে। দুদকের পরিচালক কীভাবে ঘুষের বিনিময়ে ডিআইজিকে রক্ষা করার প্রতিশ্রুতি দেন তা শুনে অনেকেই এখন বিস্মিত। দুর্নীতি করার জন্য দুর্নীতি দমন কমিশনের পরিচালক এনামুল বাছিরের জেল। পুলিশের ডিআইজি মিজানুর রহমান কারাবন্দি এখন। ডিআইজি প্রিজন বজলুর রশীদ সীমাহীন ঘুষবাণিজ্যে নিমগ্ন থাকায় এখন কারাগারে। তারা এখন বিচারের মুখে। কারাকর্মকর্তার সীমাহীন অপকর্ম ও দুর্নীতি কী একদিনে হয়েছে? দীর্ঘ বছরের ভয়ংকরতা।

ভয়াবহ ক্যাসিনো বাণিজ্যের সূত্রে রাজধানীর নারিন্দায় স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা দুই ভাই এনু-রুপমের টাকার গুদাম, পুরান ঢাকায় টাকার জোরে অখ্যাত ব্যক্তির ওয়ার্ড কাউন্সিলর মনোনয়ন পাওয়া, যুবমহিলা লীগ নেত্রীর মাস্ক টেণ্ডারি, আরেক যুবলীগ নেত্রী পাপিয়ার প্রতিদিন তিন লাখ টাকা হোটেল মনোরঞ্জনের বিল। ভাবা যায়? দুর্নীতি কোথায় পৌঁছেছে? পাপিয়ার সঙ্গে সাংসদ, দলের প্রভাব সৃষ্টিকারী নেতার দহরম মহরমের খবর তো সরকারি দলের জন্য পীড়াদায়ক। অনিয়ম করে ব্যাংক কর্মকর্তার মাধ্যমে হাজার কোটি টাকা লোপাট হয়েছে। তদন্ত হচ্ছে। শিক্ষার ব্যাপারে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিলেও কাজ হচ্ছে না। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ থাকার পরও ইচ্ছামতো লাখ লাখ টাকা সেমিস্টার ফি নেওয়া চলছেই। শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপুমনি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে বলেন একরকম, বিশ্ববিদ্যালয় বলে অন্যরকম।

আমাদের মাথাপিছু আয় এখন ২,২২৭ ডলার। প্রবাসী আয়ে বাংলাদেশের স্থান সপ্তম। রিজার্ভ ৪৫ বিলিয়ন ডলার। এসব সম্ভব হয়েছে শেখ হাসিনার জন্য। কিন্তু বুকের ছাতি ছোট হয়ে যায় দুর্নীতিবাজদের কারণে। বর্ধিত সময়েও শেষ হয় না কোনো সেতুর কাজ, সড়ক যোগাযোগের কাজ। কখনো কখনো পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) বলে, ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধ পুনঃনির্মাণের জন্য অর্থসহায়তা চেয়ে মন্ত্রণালয়ে প্রকল্প প্রস্তাব পাঠানো হয়। সেই প্রস্তাব যখন পাশ হয় তখন মানুষ অনেকে জানেই না। স্বাভাবিক সময়েই জীর্ণ, ভাঙাচোরা বাঁধ উপচে অনেক লোকালয়ে পানি ঢুকে কিন্ত মেরামত হয় না। এমন বহু উদাহরণ রয়েছে। যখনই দেশে বড় কোনো ঝড়-জলোচ্ছ্বাস হয়, তখনই এসব বাঁধের উচ্চতা বৃদ্ধি নিয়ে আলোচনা হয়। কিন্তু ঘূর্ণিঝড়-তুফান থেমে গেলে আলোচনাও থেমে যায়। দক্ষিণাঞ্চলের বা উপকূলের মানুষের জীবনযাত্রা নিয়ে যারা খোঁজ রাখবেন তারা ব্যস্ত থাকেন নিজেদের ধান্দায় এ কারণে বাঁধগুলোর সুরক্ষাব্যবস্থার দুর্বলতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। দরিদ্রের পক্ষে শুধু পানিসম্পদ উপমন্ত্রী এনামুল হক শামীম চাইলেই কী সবকিছু হবে! তার দেশপ্রেম আছে, মানুষ ও দলের জন্য ভালোবাসা আছে। কিন্তু এ সেক্টর চালানোর মতো কঠিন কাজ কমই আছে এদেশে। একশ্রেণির দুর্নীতিবাজ ইঞ্জিনিয়ারের কৌশল আর চালাকির কাছে সৎ মানুষ অসহায়।

চারবারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কয়েকমাস আগে বলেছেন, ‘আমাদের দুর্ভাগ্য হলো যে কিছু কিছু লোক থাকে, সবকিছুতেই একটা নেতিবাচক মনোভাব তারা পোষণ করে। যতই ভালো কাজ করেন, সবসময় তাদের কিছু ভালো লাগে না। এরকম ‘ভালো না লাগা’ রোগে ভোগে তারা। এ রোগের কী চিকিৎসা আছে আমি জানি না।’

গৃহহীনকে ঘর দেওয়া, ভিক্ষুকের ভিটেয় সেমিপাকা ঘর নির্মাণ করে দেওয়ার চেয়ে বড় মাপের সেবা আর কী হতে পারে! সত্যিকার অর্থেই তো শেখ হাসিনা মানবতার মা। এখন বিএনপি গণতন্ত্র শেখাচ্ছে। অতীতে বিএনপি-জাপা সরকারের শাসনামলে দরিদ্র মানুষকে গৃহনির্মাণ করে দেওয়ার কথা কী তারা কল্পনা করেছিল?

তবে এটাও সত্য, সরকারে থাকা কিছু ব্যক্তির দুর্নীতি, কিছু আমলার দুঃসাহস ও অবিনীত আচরণ, একশ্রেণির এমপির অপকর্ম, কতিপয় মন্ত্রীর অযোগ্যতাই শেখ হাসিনার সুবিশাল অর্জন ম্লান করার জন্য যথেষ্ট। এ সরকার টানা সাড়ে বারো বছর ক্ষমতায়। এ সময়ে আওয়ামী লীগে হাইব্রিডদের উত্থান ঘটেছে, তাদের পোয়াবারো। অথচ দলের কঠিন মুহূর্তে, দুঃসময়ে-আন্দোলন-সংগ্রামে ত্যাগী নেতা-কর্মীরা জীবন দিলেও এখন তারা নেই। ইতিহাস বলে যে, দুঃসময়ে ‘হাইব্রিডদের’ খুঁজেও পাওয়া যাবে না। তখন ‘সোনাই’ হায় হায় করতে হবে!

ত্যাগী নেতা- কর্মী, সাংবাদিক, কবি-লেখক, শিক্ষক, চিকিৎসকেরা দলের কোনো কোনো নেতা-মন্ত্রীর কাজে এখন বিরক্ত। সাংবাদিকতা করার সময় মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পক্ষে থাকায়, দুর্নীতি-অনিয়মের বিরুদ্ধে লেখায় জাতীয় পার্টি-বিএনপির নেতা-মন্ত্রীর চক্ষুশূল হতে হয়েছিল অনেককে। এখনো সুবিধাবাদীদের রোষানলে তারা। ফলে কলামিস্ট ও কথাসাহিত্যিকদের অনেকে এখন লোকচক্ষুর অন্তরালে থাকতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন।
বঙ্গবন্ধুকন্যা জননেত্রী ক্ষমতায় থাকলেও একশ্রেণির দলীয় হাইব্রিড নেতা ও আমলার প্রশ্রয়ে দুর্নীতিবাজেরা সুযোগ পাচ্ছে! বিএনপি ‘গণতন্ত্রে’র জন্য মরিয়া দেখালেও এটা যে জাতির সঙ্গে মশকরা, প্রহসন করা কিন্তু জনগণ বুঝতে সক্ষম। তবে এটা সত্যি, মানুষের ভরসার জায়গা শেখ হাসিনা। মানুষের বিশ্বাস, তাঁর নেতৃত্বে এ জাতি মাথা উঁচু করে দাঁড়াবেই বিশ্বের বুকে।

লেখক : উপসম্পাদক, আমাদের অথনীতি, সিনিয়র সাংবাদিক ও কথাসাহিত্যিক

 

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত