প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

টিকা না দিয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা বেশ ঝুঁকিপূর্ণ: ড. সৈয়দ আনোয়ার হোসেন

ভূঁইয়া আশিক রহমান : [২] শিক্ষাবিদ অধ্যাপক ড. সৈয়দ আনোয়ার হোসেনর বলেছেন, শিক্ষামন্ত্রণালয় এখন রুগ্ন [৩] করোনাকালে সরকারের অনলাইনে শিক্ষাকার্যক্রম সফল হয়নি, ক্লাসের নামে হয়েছে প্রহসন [৪] শিক্ষা খাতে বরাদ্দ কম, সে কারণে শিক্ষকদের বেতন-ভাতাও কম [৫] বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো রাষ্ট্রের ভেতরে থেকে রাষ্ট্রের মতো কাজ করছে [৬] প্রত্যেক দুর্নীতিগ্রস্ত উপাচার্যকে তার মেয়াদ শেষ করতে দিয়েছে শিক্ষামন্ত্রণালয় [৭] করোনাকালে অর্থকষ্টে পড়ে পেশা পরিবর্তন না করে শিক্ষকদের শিক্ষার সঙ্গে থাকা দরকার।

[৮] বাংলাদেশ তথা বিশে^ করোনা কিংবা বিভিন্ন দেশে লকডাউন থাকা সত্তে¡ও সবকিছু অনেকটাই স্বাভাবিকভাবে চলছে। তবে এই করোনায় সবচেয়ে বেশি বিপন্ন ও বিঘিœত হয়েছে শিক্ষাকার্যক্রম। কিন্তু চাইলেই কি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়া যাবে বা দেওয়া উচিত? শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দিলে মানুষের গুচ্ছ সমাবেশ হবে। বেশি মানুষ কাছাকাছি এলে সংক্রমণ শঙ্কা বাড়বে।

[৯] ঈদের আগে বা পরে মানুষের যাতায়াতেও স্বাধ্যবিধি মানা হয়নি। বাংলাদেশে আসলে কোথাও কোনো স্বাধ্যবিধি নেই। সেজন্যই প্রশ্ন উঠছে, সব খোলা থাকলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা থাকবে কেন? আমার মনে হয়, সরকার চায় সংক্রমণ কম থাকুক। সে চেষ্টা তারা নানানভাবে করে যাচ্ছে।

[১০] শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের টিকা দেওয়ার কাজ এখনো শেষ হয়নি। টিকার সংকট চলছে। টিকা না দিয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা বেশ ঝুঁকিপূর্ণ হবে বলে মনে হয় আমার কাছে। [১১] করোনা নিয়ে সরকারের কোনো নীতি আছে কিনা আমার সন্দেহ আছে। সবকিছুই হচ্ছে যখন যেমন তখন তেমনÑ এমন একটা পরিস্থিতি। এডহক ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত। সে কারণে করোনা নিয়ে সরকারের সিদ্ধান্ত সুচিন্তিত কিনা এ নিয়ে আমার সংশয় আছে।

[১২] করোনা পরিস্থিতিতে শিক্ষামন্ত্রণালয় সঠিক কোনো দিকনির্দেশনা দিতে পারছে বলে মনে হয় না। আমাদের শিক্ষামন্ত্রণালয় স্বাস্থ্যমন্ত্রণালয়ের কাছকাছি চলে গেছে। শিক্ষামন্ত্রণালয় এখন একটি রুগ্ন মন্ত্রণালয়। সেজন্য বর্তমান বিপন্ন এবং ভবিষ্যতেও সংকটাপন্ন। [১৩] শিক্ষ ও শিক্ষার্থীদের টিকা না দিয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা ঠিক হবে না। কারণ জীবনটাই বড়। টিকার ব্যবস্থা করুক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের টিকা দেওয়া শেষ হোক, তারপর শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুলে দিক সরকার।

[১৪] করোনায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ছিলো, এটা ঠিক। তবে অনলাইন ক্লাসের নামে একটা প্রহসনও হয়েছে। তবে অনলাইন কøাসের কারণে শিক্ষা বিঘিœত হয়েছে, এটা আমি বিশ^াস করতে চাই না। কেননা প্রতিষ্ঠানের বাইরেও নিজেকে নিজে শিক্ষিত করা যায়। সেই কাজটি কতোটুকু হয়েছে, তা নিয়ে আমার সন্দেহ আছে। [১৫] করোনাকালে সরকারের অনলাইনে শিক্ষাকার্যক্রম সফল হয়নি। কারণ অনলাইন ক্লাসে অংশগ্রহণের মতো ব্যবস্থা অনেকেরই সামর্থ্য ছিলো না বা নেই। এটা ঠিক হয়নি। ডিজিটাল বাংলাদেশে সবকিছুই অনলাইনে সফলভাবে করা যাবে, এমনটি ভাবাও ঠিক নয় বলে আমি মনে করি।

[১৬] শিক্ষা নিয়ে সরকারের এখন অগ্রাধিকার ভিত্তিক চিন্তা করা দরকার। টিকা সংস্থান গেলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের টিকা নিশ্চিত করে অবিলম্বে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা উচিত। স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা দরকার। কারণ প্রায় দেড় বছরের বেশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকলে একটি দেশের শিক্ষা বিপন্ন হয়। সারা বিশ্বেই শিক্ষা খাতে বিপন্ন দশা। [১৭] আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্যে অনেক লেজেগোবরে অবস্থা আছে। সেটা ঠিক করতে হবে। আবার করোনায় আমাদের বিপন্ন দশা। ফলে শিক্ষামন্ত্রণালয়ের সামনে কয়েকটি চ্যালেঞ্জ আছে, তা মোকাবেলা করার কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে।

[১৮] করোনায় অনেক বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক চাকরি হারিয়েছেন। তাদের ব্যাপারে সরকারের সুনজর দেওয়া প্রয়োজন। কোনো প্রণোদনার আওতায় আনা যায় কিনা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে, চিন্তা করা উচিত। গণমাধ্যমে দেখছি, করোনায় চাকরি বা বেতন না পেয়ে পেশা পরিবর্তনে বাধ্য হয়েছেন। এটা দুঃখজনক। [১৯] দেশে শিক্ষা ব্যবস্থাপনা এমনিতেই ছিলো না। অব্যবস্থাপনা আরও নড়বড়ে করে দিলো। মানে মরার ওপর খাড়ার ঘা হয়ে গেলো করোনা।

[২০] শিক্ষা খাতের বাজেট নিয়ে আমি চিন্তিত নই। কারণ শিক্ষাও একটি দুর্নীতিগ্রস্ত খাত। আমাদের ৪৬টি পাবলিক বিশ^বিদ্যালয়ের মধ্যে প্রায় তিন ভাগের একভাগ বিশ^বিদ্যালয় উপাচার্য সম্পর্কে দুর্নীতির অভিযোগ আছে। আসছে জাতীয় বাজেটে শিক্ষা খাতে বেশি বরাদ্দ দাবি করবো, কারণ শিক্ষা খাতের বাজেট পর্যাপ্ত নয়। তবে যতোটুকু বরাদ্দ শিক্ষা খাতে হচ্ছে তাতে যেন দুর্নীতি না হয়। সঠিকভাবে বাজেটের অর্থ ব্যয় করা হয়, তারও একটা ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।

[২১] শিক্ষা খাতে বরাদ্দ কম থাকার কারণে শিক্ষকদের বেতন-ভাতা উল্লেখযোগ্য নয়, যা তাদের প্রাপ্য। তবে যারা বেসরকারি প্রতিষ্ঠান তারা শিক্ষকদের বেতনভাতা ঠিকমতো দেয় না। অর্থাৎ শিক্ষা ব্যবস্থায় পুঁজিবাদী শোষণ প্রক্রিয়াটি চলামান আছে। সেক্ষেত্রে সরকার কিছুই করেনি। শিক্ষকদের প্রতি আমার আহŸান হচ্ছে, পেশা পরিবর্তন না করে কোনো রকম জীবিকা নির্বাহ করা দরকার। শিক্ষার সঙ্গে থাকা উচিত।

[২২] বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো রাষ্ট্রের ভেতরে থেকে রাষ্ট্রের মতো কাজ করছে। শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে যে টিউশন ফি আদায় করা হয়, তার নীতিমালা থাকা দরকার। শিক্ষকদের যে বেতন-ভাতা দেওয়া হয়, তারও নীতি থাকা প্রয়োজন। নীতির বাইরে কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চললে তা বন্ধ করে দেওয়া উচিত। যদিও সরকারের কোনো ক্ষেত্রেই কোনো নীতি নেই, সমস্যাটা এখানেই হয়েছে।

[২৩] শিক্ষকেরা পড়ালেখা কম করেন তা ঠিক নয়। বরং লেখাপড়া না করে চলতে পারেন বলেই তা করেন। যেমন পাবলিক বিশ^বিদ্যালয়ে অনেক শিক্ষক আছেন, যাদের কোনো গবেষণা বা কোনো কিছুই নেই। অথচ তারা অধ্যাপক বা উপাচার্য হয়ে যান। সারাদেশে শিক্ষাসংক্রান্ত সুস্পষ্ট নীতি থাকলে এমনটি হতো না। [২৪] শহর, বন্দর বা গ্রাম বলিÑ কোথাও শিক্ষায় সুস্পষ্ট নীতি নেই। যে যেখানে যেভাবে পারছে শিক্ষা ব্যবস্থাপনা করছে, সমস্যা সেখানেই।

[২৫] শিক্ষা খাতের দুর্বলতা হচ্ছে নীতিহীনতা ও অব্যবস্থাপনা। দুটো বড় দুর্বলতা। শিক্ষা খাতে বা শিক্ষা প্রশাসনে কোনো দায়বদ্ধতা নেই। যেমন ধরুন, বাংলাদেশ মঞ্জুরী কমিশন অনেক উপাচার্যের বিরুদ্ধে তদন্ত করে প্রতিবেদন দিয়েছে, শাস্তির সুপারিশও করেছে। কিন্তু শিক্ষামন্ত্রণালয় প্রত্যেক দুর্নীতিগ্রস্ত উপাচার্যকে তার মেয়াদ শেষ করতে দিয়েছে। তারপর তারা লম্ফঝম্ফ করেছে। সর্বশেষ দৃষ্টান্ত রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয়ের উপাচার্য। চোর পালানোর পর বুদ্ধি বাড়লে তো লাভ নেই। চোর যেন আসতে না পারে, সেই বুদ্ধি করতে হবে।

[২৬] পরীক্ষায় ভালো ফল ভালো শিক্ষার পরিচায়ক নয়। ভালো শিক্ষার পরিচয় বহন করবে শিক্ষার্থীদের জ্ঞান-গরিমা। সেই জ্ঞান-গরিমা তারা কতোটুকু অর্জন করতে পারে, সেটাই আমাদের কাছে বিবেচ্য বিষয়। বিশেষ করে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার সময় দেখা যায়, জিপিএ ফাইভ পাওয়া শিক্ষার্থীরা ইংরেজি-বাংলায় অকৃতকার্য হয়। কাজে দেখা যাচ্ছে যে, মাধ্যমিক-উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষাব্যবস্থার দারুণ ক্রটি রয়ে গেছে। সুতরাং ফল বিপর্যয় তখন হয় যখন শিক্ষার্থীদের জ্ঞান-গরিমার সীমাবদ্ধতা প্রকট হবে।

[২৭] বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা যে সংকটে আছে তার থেকে উত্তরণের জন্য যথার্থ শিক্ষাবিদদের পরামর্শ দরকার। সরকারি শিক্ষাবিদদের পরামর্শ নয়, যারা দলমত নির্বিশেষ, শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে, শিক্ষা প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত, যারা সমাজের স্বীকৃতি এবং গৃহীত তাদের অভিমত নিতে হবে। তাদের অভিমতের প্রেক্ষাপটে যে সুপারিশমালা তৈরি হবে, সেটি যদি সরকার আন্তরিকভাবে বাস্তবায়ন করে, তাহলে শিক্ষাব্যবস্থার সংকট দূর হবে। [২৮] শিক্ষাব্যবস্থার হালহকিত নিয়ে কিন্তু নানাবিদও প্রশ্ন উঠছে। আমরা মোটা দাগে বলতে পারি, শিক্ষাব্যবস্থা একটা দারুণ সংকটের মধ্যে পড়েছে। এই সংকট থেকে উত্তরণ ঘটাতে না পারলে দেশ ও জাতির জন্য অশনি সংকেত।

 

 

 

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত