প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

পুলক ঘটক: চীন বাংলাদেশের প্রকৃত বন্ধু হোক

পুলক ঘটক: সংযুক্ত ছবিটি বাংলাদেশে চীনের উপরাষ্ট্রদূত হুয়া লং ইয়ানের ফেসবুক থেকে নেওয়া, যা গত ১২ মে প্রথম আলোতে প্রকাশিত হয়েছে। ছবির দৃশ্যমান বিষয় হল চীনের উপহারের টিকা বাংলাদেশে পৌঁছেছে। এর প্রতীয়মাণ বিষয় হল চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের বন্ধুত্ব। আর অন্তর্নিহিত বিষয় হলো চীনের বাণিজ্য, বড় নির্মম বাণিজ্য। অষুধ নিয়ে বাণিজ্য -যে অষুধ মানুষের প্রাণ বাঁচাতে পারে; করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মর্মান্তিক শ্বাসকষ্টে প্রাণবায়ু বের হয়ে যাওয়া থেকে বহু মানুষকে রক্ষা করতে পারে।

গত ৬ মে দৈনিক সমকালে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল, “উপহারের টিকায়ও শর্ত!” কি সেই শর্ত? এক. উপহারের টিকা বাংলাদেশকে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায়, নিজ খরচে নিয়ে আসতে হবে। এ জন্য বাংলাদেশকে বিমান পাঠাতে হবে। দুই. ওই টিকা প্রথমে বাংলাদেশে সরকারি বিভিন্ন প্রকল্প ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত চীনের নাগরিকদের বিনামূল্যে আগে দিতে হবে। এরপর বাংলাদেশের নাগরিকদের মধ্যে টিকা বিতরণ করা যাবে। চীনের শর্ত পূরণ করেই “উপহারের” টিকা এনেছে সরকার।

বাংলাদেশে কি পরিমাণ চীনের নাগরিক আছে সেই সংখ্যা সমকালের প্রতিবেদনে উল্লেখ নেই। তবে গত ১৩ ফেব্রুয়ারী দৈনিক ইত্তেফাকে প্রকাশিত ”বাংলাদেশ-চীন দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য, আড়ালেই রয়ে গেছে পর্যটন সম্ভাবনা” একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, “গড়ে প্রায় ১ লাখ চীনের নাগরিক বাংলাদেশে অবস্থান করেন।” চীনা দূতাবাস, চীনের বিভিন্ন প্রকল্প এবং ব্যবসা বাণিজ্যের কাজে তারা বাংলাদেশে থাকেন এবং যাতায়াত করেন। বর্তমানে করোনা ভাইরাসের কারণে এই সংখ্যা কম হওয়ার কথা। সংখ্যা কমে অর্ধেকে পরিণত হলেও হবে ৫০ হাজার; কম বা বেশি হতে পারে। তাদের প্রত্যেককে দুই ডোজ করে দিলে লাগে প্রায় এক লাখ টিকা। বাকি থাকে কত? এই চার লাখ টিকা হল বাংলাদেশের জনগণের জন্য চীনের উপহার। এবার বলুন চীন থেকে ঐ টিকা আনার ব্যয় কত? খরচ যতই হোক, পাচ্ছেন কিন্তু মাত্র ৪ লাখ টিকা। একটি পন্যবাহী বিশেষ বিমান রিজার্ভ করে চীন যাওয়া-আসার জন্য মোট কতো টাকা লাগতে পারে জানিনা। তবে সমকালের ঐ প্রতিবেদনেই স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলেছেন, “এই টিকা আনতে বিমান ভাড়া বাবদ যে ব্যয় হবে, তা চীনা টিকা কেনার চেয়ে বেশি হতে পারে…… এখন লোকসান হলেও চীনের উপহারের টিকা নিতে হচ্ছে। কারণ, উপহারের টিকা গ্রহণ না করলে পরবর্তী সময়ে তাদের কাছ থেকে টিকা পাওয়া নিয়ে সমস্যা হতে পারে।”

উল্লেখ্য, ভারত বাংলাদেশকে উপহার হিসেবে দিয়েছে ৩৩ লাখ ডোজ টিকা। সেগুলো তারা তাদের ব্যয়ে তাদের বিমানে বহন করে উপহার হিসেবে পাঠিয়ে দিয়েছে।

এখানে আরেকটি বিষয় আছে। কোনো জিনিস বাজারে ছাড়তে গেলে তার বিশ্বাসযোগ্যতা ও চাহিদা বাড়াতে হয়। এজন্য কিছু প্রমোশনাল উদ্যোগ নিতে হয়। গত ৭ মের আগ পর্যন্ত চীনের সরকারি কোম্পানি সিনোফার্মের টিকায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অনুমোদন ছিল না। চীনের রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা ও সখ্য সেইসব দেশের সঙ্গে, যেসব দেশে গণতন্ত্র এবং মানবাধিকার সংকটাপন্ন। এরকম কিছু দেশ- যারা সুসম্পর্ক না থাকায় বা অন্য কোনো কারণে ভারত কিংবা ইউরোপ-আমেরিকার কোনও দেশ থেকে পর্যাপ্ত টিকা পায়নি -তারা চীনের ঐ টিকা জরুরী ব্যবহারের জন্য অনুমোদন দিয়েছিল। রাশিয়ারও একই অবস্থা; তারাও তাদের স্পুতনিক-ভি টিকার অনুমোদন এবং নিজস্ব মিত্রমন্ডলীতে বাজার তৈরির প্রচেষ্ঠায় আছে। এ অবস্থায় চীনাফার্মের পন্যটি বাংলাদেশে জরুরী ব্যবহারের অনুমোদন চীনের জন্য খুব দরকারি ছিল। এরকম একটি সময়ে ২০ এপ্রিল পাঠানো চিঠিতে চীন বাংলাদেশকে জানায়, তারা সিনোফার্মের তৈরি করোনার পাঁচ লাখ টিকা দিতে আগ্রহী। “টিকার মান যাচাই ও মানবদেহে প্রয়োগের অনুমোদন দিলে চীন যেকোনো সময় এই টিকা পাঠাবে,” গত ২৫ এপ্রিল সাংবাদিকদের বলেছিলেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আবুল বাশার খুরশীদ আলম। বাজার ধরার জন্য বিভিন্ন ওষুধ কোম্পানি ডাক্তারদের কাছে যেমন স্যাম্পল পাঠায়, এই ব্যাপারটিও সেরকম কিনা? একি উপহার, না বাণিজ্য কৌশল?

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থায় অনুমোদনের আগেই বাংলাদেশে অনুমোদনের জন্য চীনের দিক থেকে রীতিমত চাপ ছিল। গত ১০ মে চীনের রাষ্ট্রদূত লি জিমিং পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. আব্দুল মোমেনর উপস্থিতিতে প্রকাশ্যেই বলেছিলেন, “বাংলাদেশ অনুমোদন না দেওয়ার কারণে চীনের টিকা আসতে দেরি হয়েছে।” এরপর ২৯ এপ্রিল সিনোফার্মের টিকা জরুরি ব্যবহারের অনুমোদন দেয় বাংলাদেশ। টিকা পেতে চীনের নেতৃত্বাধীন ছয়টি দেশের নতুন প্ল্যাটফর্ম ‘ইমারজেন্সি মেডিকেল স্টোরেজ ফ্যাসিলিটি ফর কোভিড ফর সাউথ এশিয়া’-তেও যোগ দিতে হয়েছে বাংলাদেশকে।

আসুন দেখি চীনের এই টিকার দাম কত? টিকা সংকট মোকাবেলায় গত ১৯ মে (বুধবার) চীনা প্রতিষ্ঠান সিনোফার্মের তৈরি এক কোটি ডোজ টিকা কেনার অনুমোদন দিয়েছে বাংলাদেশ সরকার। অথচ দামের বিষয়টি গোপন রেখেছে। চীনও বিষয়টি প্রকাশ করেনি। ঐদিন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বেনার নিউজে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতি ডোজ টিকার দাম কত হবে এ ব্যাপারে কিছু জানাতে অস্বীকৃতি জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, “সেটা বলা যাবে না। কারণ আমরা চীনের সাথে একটি নন-ডিসক্লোজার এগ্রিমেন্ট স্বাক্ষর করেছি।” বাংলাদেশের নাগরিকরা জানতে পারবে না, কতো টাকায় সরকার টিকা কিনল! যাহোক, দৈনিক সমকালে গত ১০ মে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে ভারত, চীন এবং রাশিয়ার টিকার দামের একটি তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদনটি বলছে, ”রাশিয়া ও চীনের টিকার মূল্য সেরাম ইনস্টিটিউট ও কোভ্যাক্সের টিকার তুলনায় যথাক্রমে আড়াই গুণ ও চার গুণ বেশি পড়বে।”

আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্ম গ্লোবাল অ্যালায়েন্স ফর ভ্যাকসিন অ্যান্ড ইমিউনাইজেশনের (গ্যাভি) কোভ্যাক্স ফ্যাসিলিটি থেকে ফাইজারের তৈরি এক লাখ ৬ হাজার ডোজ করোনা ভাইরাসের টিকা কিনতে চাচ্ছে বাংলাদেশ। কোভ্যাক্স থেকে মোট জনসংখ্যার ২০ শতাংশ হারে ছয় কোটি ৮০ লাখ ডোজ টিকা বিনামূল্যে পাওয়া যাবে। সমকালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ”বিনামূল্যের ২০ শতাংশের বাইরে কোভ্যাক্সের টিকার প্রতি ডোজের দাম পড়বে সাত ডলার করে। আর ভারতের সেরামের প্রতি ডোজের দাম পড়েছে পাঁচ ডলার করে। অন্যদিকে, চীনের টিকা সিনোফার্মের প্রতি ডোজের নূ্যনতম মূল্য ১৯ ডলার। বিভিন্ন দেশে এই টিকা ১৯ থেকে ৩৮ ডলার পর্যন্ত বিক্রি করা হয়েছে। অন্যদিকে, রাশিয়ার টিকার প্রতি ডোজ বিক্রি করা হয়েছে ১২ থেকে ২৪ ডলার করে। ওই দাম নিয়ে বর্তমানে দরকষাকষি করছে চীন ও রাশিয়া।” স্বাস্থ্য বিভাগের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার বরাত দিয়ে পত্রিকাটি বলেছে, “চীন ও রাশিয়ার টিকা বেশি কেনা হলে চার থেকে পাঁচ গুণ বেশি অর্থ ব্যয় হবে। এ ব্যয় বহন করা বাংলাদেশের জন্য কঠিন।”

আজকের সংবাদ হল, চীন বন্ধুত্বের নিদর্শন হিসেবে আরও ৬ লাখ করোনা ভেকসিন উপহার হিসেবে দিতে চেয়েছে। এটি ভাল খবর। আমরা আশা করব চীন বন্ধুত্বের উপহার পাঠানোর ক্ষেত্রে আর কোনো শর্ত দেবে না। উপহার যেভাবে পাঠাতে হয় সেভাবেই পাঠিয়ে দেবে। বাংলাদেশ সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সাথে শত্রুতা নয়, এই নীতিতে বিশ্বাসী। চীনের সঙ্গে সম্পর্ক রাখা যাবে না, অথবা এই খারাপ সময়ে চীনের কাছ থেকে টিকা কেনা যাবেনা, এরকম ধারণায় কখনো বিশ্বাস করিনা। চীনের সঙ্গে সম্পর্ক থাকবে, বাণিজ্য থাকবে। এর সঙ্গে বন্ধু রাষ্ট্রের মানুষের প্রতি মানবিক বোধ ও কমিটমেন্ট থাকবে না কেন? চীন বাংলাদেশের প্রকৃত বন্ধু হোক। ফেসবুক থেকে

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত