প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

[১] মলা মাছের কৃত্রিম প্রজনন ও আগামীর সম্ভাবনা

নুরুল হক : [২] মলা, পুষ্টির আধার এক মাছের নাম। এর ইংরেজি নাম গড়ষধ পধৎঢ়ষবঃ.এর বৈজ্ঞানিক নাম অসনষুঢ়যধৎুহমড়ফড়হ.পুষ্টি মানের দিক দিয়ে মলা মাছ একটি আদর্শ মাছ।এতে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন এ,ডি, ছাড়াও আছে প্রচুর পরিমানে ক্যালসিয়াম,ফসফরাস, আয়রনসহ অনেক খনিজ পদার্থ।

[৩] শিশুদের ভিটামিন’ এ’ এবং ‘ডি’ এর অভাব পুরনে মলা মাছের চেয়ে ভালো ও সহজ উৎস আর হতে পারে না।এ ছাড়াও ক্যলসিয়াম,ফসফরাস ও অন্যান্য খনিজ পদার্থের নির্ভরযোগ্য উৎস হচ্ছে এই মলা মাছ।

[৪] বাড়ন্ত শিশু ও তাদের মায়েদের ক্যালসিয়ামের চাহিদা পূরণ করে এই মলা মাছ। ১০০ গ্রাম মলা মাছে আছে, ক্যালসিয়াম ৮৫৩ মি. গ্রা.,আয়রন ৫.৭ মি. গ্রা.,ভিটামিন এ ২০০০ ইউনিট।

[৫] আমাদের দেশে আগে হাওর বাওড় বিল ইত্যাদিতে প্রচুর পরিমাণে মলা মাছ পাওয়া যেত। কিন্তু বর্তমান সময়ে এসব হাওর বাওড় বা বিলের অধিকাংশই শুকিয়ে যাওয়ার ফলে অথবা আমরা নিজেরাই প্রাকৃতিক প্রজনন এলাকাগুলো শুকিয়ে ফেলি।

[৬] সেজন্য প্রাকৃতিক ভাবে মলা মাছের প্রজনন করার উৎস সংকুচিত হয়ে গেছে। যে কারণে জলাশয়ে এখন আর আর মলা মাছের প্রাচুর্যতা নেই। সেজন্য একে চাষের আওতায় আনার জন্য বিজ্ঞানী ও এদেশের মৎস্য খামারীরা পরিশ্রম করে যাচ্ছেন। সফলতাও পাচ্ছেন।

[৭] বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা মলা মাছের চাষের উপর কাজ করেছেন।তাদের পদ্ধতিতে স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় মলা মাছের পোনা উৎপাদন হতো।প্রথমে কোন বড় মাছ চাষের পুকুরে বিল বা কোন প্রাকৃতিক জলাশয় থেকে কিছু মাতৃ মলা মাছ পুকুরে ছেড়ে দেয়া হতো। তাতে বর্ষা মৌসুম এলে পুকুরে নিজেরাই প্রাকৃতিকভাবে প্রজনন করতো।এতে চাহিদা অনুযায়ী উৎপাদন হতো না।

[৮] এত ছোট মাছকে হরমোন ইনজেকশন দিয়ে ডিম পাড়ানো ছিল অত্যন্ত জটিল ও কঠিন। ময়মনসিংহের ‘ব্রহ্মপুত্র ফিস সীড কমপ্লেক্স( হ্যাচারি)। তাদের উদ্ভাবিত মলা মাছের কৃত্রিম প্রজননের সফলতা মৎস্য সেক্টরে এক বিরাট বড় বিপ্লবের দ্বারপ্রান্তে এখন।

[৯] মলা মাছ পুকুর থেকে তুলে ফেলার অল্প কিছুক্ষণের মধ্যে মারা গেলেও কৃত্রিম প্রজননে উৎপাদিত রেনু পানি সহযোগে পলি ব্যাগে অক্সিজেন দিয়ে অনায়সে দেশের এক প্রান্ত হতে অন্য প্রান্ত পর্যন্ত পরিবহন করা যায়। আবার রেনু থেকে পোনা উৎপাদন করাও খুবই সহজ।কার্প জাতীয় মাছের পোনা উৎপাদনের মতোই খুবই সহজ পদ্ধতি।

[১০] নার্সারি ব্যবস্থাপনাও সহজ।ক্যাট ফিস জাতীয় মাছের নার্সারি ব্যবস্থাপনায় মৃত্যহার থাকলেও মলা মাছের নার্সারি ব্যবস্থাপনা মিস হওয়ার কোন সম্ভাবনা নেই।সংখ্যার দিক থেকেও এর উৎপাদন অনেক। [১১] এক কেজি বা এক হাপা রেনুতে অনায়াসে ৫ লক্ষাধিক পোনা উৎপাদন হয়ে থাকে। দুই ধাপে এর চাষ করা যায়।প্রথমত নার্সারি পুকুরে নার্সিং করে পরবর্তীতে চাষ পুকুরে স্থানান্তর করে এবং দ্বিতীয়ত বড় মাছের পুকুরে সরাসরি রেনু ছেড়েও এর কাঙ্খিত উৎপাদন করা যায়।

[১২] মিশ্র চাষে (তেলাপিয়া,পাঙ্গাস,রুই জাতীয় মাছ,পাবদা ছাড়া অন্যন্য সব ক্যাট ফিস মাছের সঙ্গে মিশ্র) মলা মাছে কোন খাবার দেয়ার প্রয়োজন নেই।চাষের অন্য মাছকে খাবার দেয়ার ফলে পানিতে উৎপাদিত ফাইটোপ্ল্যাংকটন খেয়েই মলা বেড়ে উঠে।এতে পানির গুণাগুণ থাকে ভাল যা সাথী হিসাবে অন্যান্য মাছের উৎপাদনের জন্য সহায়ক ভূমিকা পালন করে।

[১৩] মলা পুকুরের পানিতে উৎপাদিত প্রাকৃতিক খাবার খেয়ে বেড়ে উঠে সেজন্য পুকুরে উৎপাদিত মলা মাছ হাওড় বাওড় বিলের মলা মাছের চেয়ে স্বাদ বা পুষ্টির কোন তারতম্য হয় না।

[১৪] পুকুরে খাবার ছাড়াই শতাংশ প্রতি ৫-১০ কেজি মলা মাছ উৎপাদিত হচ্ছে। সেই হিসেবে বাংলাদেশের সকল পুকুরের মলা মাছের চাষ হলে এর উৎপাদনের আরও বাড়বে।

লেখক: চারবারের রাষ্ট্রীয় পদকপ্রাপ্ত মৎস্য খামারি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী

 

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত