প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

রাজিয়া সুলতানা জেনি: মিস্টার কে আর মরণোত্তম, একটি রিভিউ

রাজিয়া সুলতানা জেনি: দুটো টেলিফিল্ম দেখলাম। বঙ্গ ওটিটি প্ল্যাটফর্মে। নতুন উদ্যোগ। উপন্যাস অবলম্বনে টেলিফিল্ম। অ্যাডের অত্যাচারে বিভিন্ন টিভি চ্যানেলের নাটক আর টেলিফিল্ম দেখা অনেক কাল আগেই ছেড়েছি। মাঝে কিছুদিন ইউটিউবে কয়েকটা নাটক দেখেছিলাম। এরপরে রণে ভঙ্গ দিই।

এরপরে যে কটা দেখেছি সেগুলো দেখেছি হয় কন্ট্রোভার্সির জন্য আর নয়তো সুনাম শুনে। ‘১৪ই আগস্ট’ আর ‘তকদীর’। ১৪ই আগস্ট ভালো না লাগলেও মনে হয়েছে এটা হতে পারে একটা ‘শুরু’। ভিজুয়ালের বেশ কিছু ব্যাবহার ছিল। মনে হয়েছিল বাংলা নাটকগুলো হয়তো ফিল্মিক হতে শুরু করেছে। ডায়লগ আর পাল্টা ডায়লগের শৃঙ্খল থেকে বেরিয়ে আসছে বাংলাদেশের নাটক। আর তকদীর দেখে বেশ খুশি হয়েছিলাম। সিরিজগুলো সুন্দরভাবে ডিজাইন করা মনে হয়েছে। সাসপেন্স শেষ পর্যন্ত ধরে রেখেছেন। ভিজুয়ালের ব্যবহার এটাতেও খারাপ করেননি পরিচালক। পূর্ণিমার কাহিনিকে সেন্টার করাটা উদ্দেশ্য ছিলো কিনা জানি না, বাট সেটাকে মুখ্য বিষয় মনে হয়নি।

যাইহোক, এবার আবার টেলিফিল্ম দেখতে বসলাম। কারণ মাহাবুব মোর্শেদ আর সাদাত হোসেইন। তাঁদের লেখা উপন্যাস অবলম্বনে যেহেতু টেলিফিল্ম, তাই এবার প্রত্যাশা ছিলো দুটো। কাহিনি আর ফিল্ম দুটোই দারুণ কিছু হবে। প্রথম দেখলাম মিস্টার কে। মাহাবুব মোর্শেদের উপন্যাস অবলম্বনে টেলিফিল্ম। শুরুটা ভালোই হয়েছিল। কাহিনী একটু এগিয়ে গেলে বুঝতে পারলাম, এটা ছিল লেখকের ড্যান ব্রাউনের সৃষ্ট চরিত্র রবার্ট ল্যাংডনের রেপ্লিকা তৈরির চেষ্টা। নতুন আইডিয়া, অনুমানবিদ্যা। এতোদূর পর্যন্ত চলে। অ্যাক্সেপ্টেবল। কিন্তু এরপরের কাহিনী জাস্ট ল্যাজেগোবরে।

অনুমানবিদ্যার পেছনের লজিক কি, কি কি তথ্যের ভিত্তিতে তিনি অনুমান করছেন, কীভাবে অ্যানালাসিস করে বিভিন্ন সিদ্ধান্তে পৌঁছে যাচ্ছেন, সেসব ব্যাখ্যা নেই। ল্যাংডন বা শার্লক হোমস কিংবা ফেলুদা, যে চরিত্রের উদাহরণই টানি না কেন, প্রতিটা ক্ষেত্রেই ব্যাখ্যা ছিল। যে সিদ্ধান্তে তিনি আসছেন, তার পেছনের লজিকগুলো স্পষ্ট বলা হচ্ছিল। সেই সঙ্গে অন্য অপশানগুলো কেন বাতিল, এই ব্যাখ্যাও। মূল উপন্যাসে কি ছিল জানি না, তবে ফিল্মে, জাস্ট এসবের কোন বালাই-ই নেই।
এ ধরনের গল্পে আরও একটা ব্যাপার থাকে, পাঠক বা দর্শকদের অনুমান করার জন্য কিছু ক্লু। যদিও ক্রিপটিক রাখা হয়, কখনও কখনও মিসলিডিং হয়, তারপরও, পাঠক বা দর্শককে ইনভল্ভড রাখা হয়। এ ধরনের গল্পের জন্য এটা অতীব জরুরি শর্ত। সেটা ছিল না। হঠাৎ বাচ্চা ছেলেটার ‘তুমি আমার বাবা না’ টাইপ ডায়ালগ দিয়ে কিছু কিছু জায়গায় ক্রিপটিক ম্যাসেজ দেয়ার চেষ্টা করেছেন, কিন্তু সেসব করতে গিয়ে ম্যাসেজিং অতি দুর্বোধ্য করে ফেলেছেন পরিচালক। সবচেয়ে দুর্বল অংশ লেগেছে, কোনো লজিক দর্শানো ছাড়াই হঠাৎ হঠাৎ নায়ক চরিত্র একটা করে তথ্য ঘোষণা করতে লাগলেন। কেন, কীভাবে এই সিদ্ধান্তে আসছেন, তার ব্যাখ্যা নেই।

ফলে ফিল্মের শুরুটা দারুণ একটা সম্ভাবনা তৈরি করেও শেষ পর্যন্ত হতাশ করেছে। এনোয়ে, ফিল্মটাকে আউট অফ ফাইভ, টু দেয়া যায়।

দ্বিতীয় টেলিফিল্ম দেখলাম ‘মরনোত্তম’। সাদাত হোসেইনের লেখা উপন্যাস অবলম্বনে। এই মুহূর্তের অন্যতম বেস্ট সেলার রাইটারের গল্প, তাই প্রত্যাশাও ছিল। শুরুটা ড্রামাটিক। আগ্রহ তৈরি হচ্ছিল, পেছনে খুব ইন্টেরেস্টিং কোনো কাহিনী হবে। যদিও ইলিয়াস কাঞ্চনের মেলো ড্রামাটিক অভিনয় বেশ বিরক্তিকর লাগছিল। কান্না প্রকাশের জন্য ‘উহু’ ‘উহু’ করা জরুরি না, এই বর্ষীয়ান অভিনেতাকে এই ব্যাপারটা বোঝানোর কেউ কি ছিল না? দ্বিতীয় বিরক্তিকর ব্যাপার ছিল পদে পদে উপদেশ।
যাইহোক কাহিনি আরেকটু এগিয়ে গেলে বোঝা যায়, সমসাময়িক ঘটনা থেকে রাইটার বেশ কিছু টপিক চুজ করেছেন। সব মিলিয়ে টপিক ছিল আড়াইটা। এমপিওভুক্তি নিয়ে অনিয়ম, কিছুটা আপন জুয়েলার্সের কাহিনী, আর ফেসবুক পোস্টকে কেন্দ্র করে হিন্দু নির্যাতনের টিপিক্যাল ফর্মুলার আধাটা। ডায়ালগ, চরিত্র সবই গতানুগতিক। কাহিনীও বেশ প্রেডিক্টেবল। চেয়ারম্যানের নিজের নামে স্কুল করতে চাওয়া, সুন্দরী একটি মেয়ের ইভটিজিংয়ের শিকার হওয়া, অতি অতি কমন স্টোরি। অবশ্য বখাটে ছেলের বাপকে দিয়ে রেপ এক্সপেক্ট করিনি। পরের অংশ রুটিন মাফিক এগিয়েছে, সেই আইনের কাছে গিয়ে কোন সুরাহা না হওয়ার টিপিক্যাল গল্প। যদিও পুলিশকে ভিলেন বানাবার সাহস পায়নি পরিচালক, সিস্টেমের দোষ দিয়ে ব্যাপারটাকে উহ্য রেখেছেন।

নাটকের সবচেয়ে বিরক্তিকর অংশ ছিল ডায়ালগ। কিছু কিছু জায়গায় বিশেষ করে কবির ডায়ালগগুলো ক্রিস্প হলেও বেশির ভাগ জায়গায় ডায়ালগ ছিল ঘ্যানঘ্যানে। সুযোগ পেলেই নৈতিকতা শিক্ষা। হেড মাস্টারের চরিত্র, চেয়ারম্যানের চরিত্র পঞ্চাশ বছর আগেও যেভাবে তৈরি করা হত, এবারও সব এক ছাঁচে তৈরি। একজন অতি অতি সৎ আরেকজন বদের বদ। এক কবি চরিত্র ছাড়া চরিত্র সৃষ্টিতে কোনো নতুনত্ব নেই। সাথে ফাও হিসেবে ছিলে একজন হেল্পার টিচার, একজন উদ্বিগ্ন কন্যা। এই ফর্মুলা থেকে কবে বেরোব আমরা? এনিওয়ে, এন্ডিংটা আউটস্ট্যান্ডিং বলবো না, অ্যাভারেজ বলবো, আর সেই সাথে প্রেডিক্টেবলও। এরপরে জনতার উদ্দেশ্যে আরেক দফা নীতি বাক্য। সেই সাথে মিডিয়াকে নিয়ে একটু স্যাটায়ারের চেষ্টা। আউট অব ফাইভ, ওয়ান দেওয়া যায়।

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত