প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

দীপক চৌধুরী: সাংবাদিকদের আন্দোলনকে রাজনৈতিক ‘অস্ত্র’ বানানোর চেষ্টা!

দীপক চৌধুরী: একটি ছোট ঘটনা যে কত বড় আকার ধারণ করতে পারে এর টাটকা উদাহরণ হচ্ছে- প্রথম আলোর লাঞ্ছিত সাংবাদিক রোজিনা ইসলামের ঘটনা। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে অতিউৎসাহী কিছু কর্মকর্তা কর্তৃক তাকে হেনস্তার ঘটনায় আর যাই একটি খারাপ উদাহরণ হয়ে থাকবে। সরকারের লাভ-ক্ষতির বিষয়টি তো পড়ে। সাংবাদিকদের আন্দোলনকে এখন রাজনীতিকরণের চেষ্টাও চলছে। রোজিনা হেনস্তার নিন্দা জানিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর পদত্যাগ চাইলেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। অথচ একশ্রেণির দুর্নীতিবাজ আমলাদের দুর্নীতি-দুঃসাহস কিছুই তিনি দেখলেন না। আন্দোলনকারীদের বিষয়টি যেনো ‘রাজনৈতিক অস্ত্র’ বানানোর চেষ্টা বিএনপির। এটাই স্পষ্ট ফুটে উঠলো। আমরা জানি, এই ঘটনার রাজনীতিকরণের পরিণিতি ভয়ংকর ক্ষতিকারক হবে। অবশ্য, শুরুতেই বিএনপি এমন ঘটনায় ভীষণ উল্লসিত।

সম্প্রতি তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ বলেছেন, বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সাংবাদিকদের মান-মর্যাদা ও সম্মান রক্ষায় বদ্ধপরিকর এবং সাংবাদিকদের কল্যাণে যেকাজগুলো বাংলাদেশে করেছেন সেটি অতুলনীয় ও অভাবনীয়। এক্ষেত্রে রোজিনা ইসলাম যাতে সুবিচার পান সেটি অবশ্যই আমরা নিশ্চিত করবো।’ মেধাবী এই রাজনীতিক ও মন্ত্রী আরো বলেছেন, ‘বাংলাদেশকে নিয়ে তো অনেক খেলা আছে, আমাদের দেশ এতো এগিয়ে যাচ্ছে, পাকিস্তান থেকে এগিয়ে গেলো অনেক দূর, ভারতকেও অনেক ক্ষেত্রে পিছনে ফেলে দিল, সেটি তো অনেকের সহ্য হয় না। সেই কারণে দেশকে নিয়ে নানা ষড়যন্ত্র আছে। সেজন্য একেক সময় একেক ইস্যু তৈরি করার অপচেষ্টা চালানো হয়।’ তিনি উল্লেখ করেন, ‘অভাবনীয়ভাবে এবার প্রধানমন্ত্রী ১০ কোটি টাকা অনুদান দিয়েছেন, যে জন্য পুরো সাংবাদিক সমাজ তার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছে।’ অন্যদিকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেনও রোজিনা ইসলাম ইস্যুকে ‘অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক’ বলে অভিহিত করেছেন। মোমেন মন্তব্য করেন, কিছু সরকারী কর্মচারীর কারণে ঘটে যাওয়া পরিস্থিতি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সামাল দেয়া উচিত ছিল। তিনি আরও বলেন, ‘এই ঘটনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে বিভিন্ন মহল থেকে প্রশ্নের সম্মুখীন করেছে।’

কয়েক বছর ধরেই লক্ষ্য করে আসছি একশ্রেণির সরকারি কর্মকর্তা রয়েছেন তারা নিজেদের ‘ফেরেস্তা’ হিসেবে প্রচার করে থাকেন। তারা উঁচু চেয়ারে বসে সময়-সময়, কথায় কথায়, বক্তৃতার লাইনে-লাইনে রাজনীতিবিদের মতো ‘রাজনৈতিক’ বক্তৃতা দিয়ে থাকেন। যা রাজনীতিকরা দিতে পারেন ‘আমলারা’ নয়, যেনো ভুলেই যান তারা প্রজাতন্ত্রের কর্মচারি। এরমধ্যে অতিউৎসাহী ও সুযোগসন্ধানী ব্যক্তিরাও রয়েছে। তারা ‘রঙ’ বদলাতে দক্ষ। বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া তাদের আদর্শ ছিলো। বিভিন্ন সময় প্রমাণিতও হয়েছে, তারা কখনো বঙ্গবন্ধুকন্যার শুভাকাক্সক্ষী নয়। তা না হলে দুর্নীতি করে টাকার পাহাড় বানিয়ে এখন জেলখানায় থাকবেন কেনো? ‘দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স’ নীতি নিয়ে চলা শেখ হাসিনাকে তারা ক্ষতিগ্রস্ত করেছেন। এই সুযোগসন্ধানীরা রাতারাতি ‘ধনী’ হয়ে যান। দেশের ভেতর ‘দুর্নীতির শিরোমণি’ হিসেবে পরিচিতরা বিদেশে চলে যান দিব্যি। এক দুর্নীতিবাজ এমপি আরব দেশে গিয়ে ধরা খেয়েছেন, এখন সেখানে জেলে।

এটা কে না জানে, ঘুষ ও দুর্নীতি, যা আগাছার মতো সব ভালো গাছকে মেরে ফেলতে চায়। সরকারের ভাল ভাল কাজগুলোকে বিতর্কিত করছে এখন এসব দুর্নীতিবাজরা। কেন দুর্নীতিবাজদের ‘লাগাম’ টেনে ধরা যাচ্ছে না- এ প্রশ্ন এখন প্রায়ই শোনা যায়। তবে এটাও সত্য, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আমলে বিচার হচ্ছে। ছাড় দেওয়া হচ্ছে না দুর্নীতিবাজদের। তারপরও অনেকের দুরকম ব্যাখ্যা। কাজ হয়নি কিন্তু সরকারি অর্থ খরচ হয়ে গেছে কিংবা কাজ তেমন হয়নি অথচ অর্থ খরচ হয়ে গেছে- এমন প্রকল্পেরও আমরা দেখা পাচ্ছি গণমাধ্যমের সুবাদে। এখন সবচেয়ে আলোচিত বিষয়ের নাম করোনাভাইরাস। এই কোবিড-১৯ আমলেও জুম মিটিংয়ে কীভাবে চা-নাস্তা সিঙাড়ার জন্য লাখ লাখ টাকা বিল হয়? এটা ভাবতে হবে! স্বীকার করতেই হয় যে, ইস্পাত কঠিন মনোবলে পর্বতসম বাধা ডিঙ্গিয়ে ক্রমেই এগিয়ে চলেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। পাশাপাশি এটাও মনে রাখা দরকার, সরকারের অগ্রগতি ও উন্নয়নকে দুর্নীতিবাজ ব্যক্তিরা গোষ্ঠীস্বার্থে বাধাগ্রস্ত করতে চাইছে। বিনাবিচারের প্রসঙ্গও উঠেছে। পুলিশের গুলিতে অব. মেজর সিনহা হত্যার পর এ প্রশ্নটা জোরালোভাবে আসে । ক্যাসিনো বাণিজ্যের সূত্রে দুই ভাইয়ের টাকার গুদাম, দুর্নামে যুক্ত আওয়ামী যুবলীগের সাবেক কমিটি বাতিল, যুবমহিলা লীগ নেত্রীর মাস্ক টেণ্ডারি, আরেক যুবলীগ নেত্রীর প্রতিদিন তিন লাখ টাকা হোটেল মনোরঞ্জনের বিল। ভাবা যায়? পাপিয়ার সঙ্গে সাংসদ, দলের প্রভাব সৃষ্টিকারী নেতার দহরম মহরমের খবর তো সরকারি দলের জন্য পীড়াদায়ক। ব্যাংক কর্মকর্তার মাধ্যমে হাজার কোটি টাকা লোপাট। দুদকের পরিচালক কীভাবে ঘুষের বিনিময়ে পুলিশের ডিআইজি মিজানুর রহমানকে রক্ষা করার প্রতিশ্রুতি দেন তা শুনে অনেকেই এখন বিস্মিত। দুর্নীতি করার জন্য দুর্নীতি দমন কমিশনের পরিচালক এনামুল বাছিরের জেল। পুলিশের ডিআইজি মিজানুর রহমান কারাবন্দি। পুলিশের এসপি বাবুল আক্তার বহু নাটক সাজিয়েও স্ত্রী মিতু হত্যা থেকে রেহাই পাননি। ডিআইজি প্রিজন বজলুর রশীদ সীমাহীন ঘুষবাণিজ্যে নিমগ্ন থাকায় এখন কারাগারে। তারা এখন বিচারের মুখে। ঘুষ খাওয়া ও ঘুষ দেওয়ায় এতো দক্ষ ছিলেন যে, ইতিহাসে ‘ঘুষবিদ হিসেবে’ তাদের নাম লেখা থাকবে। শিক্ষার ব্যাপারে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিলেও কাজ হচ্ছে না। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ থাকার পরও লাখ লাখ টাকা সেমিস্টার ফি নেওয়া চলছেই। ‘গোল্ডেন মনির’ কী একদিনে তৈরি হয়েছিল? এসব ‘রাঘব বোয়ালরা’ জেলে। রক্ষা পাননি।

অবশ্য, সমালোচকরাও স্বীকার করেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারের কারণে দুর্নীবাজদের এখন গ্রেপ্তার করা হচ্ছে, জেল খাটছে, বিচার চলছে। এই রীতি-পদ্ধতি দীর্ঘদিন এদেশে ছিল না। এখন অন্যায়কারী ধরা পড়লে তিনি যতো উচ্চতম ব্যক্তি বা সমাজের যেকোনো স্ট্যাটাসেরই হোন না কেন, তাদের কাউকে ছাড় দেওয়া হচ্ছে না। শেখ হাসিনা সরকার আমলে নিজ দলের (সাবেক) মন্ত্রী, এমপি, নেতা, জনপ্রতিনিধি, নামিদামি ব্যবসায়ী, প্রভাবশালী কর্মকর্তাও জেলে গেছেন।

গোটা বিশ্ব জানে, রাজনীতির কঠিন ময়দানে জাতির জনকের এই কন্যা বাংলাদেশের সবচেয়ে বেশি সময়ের প্রধানমন্ত্রী। তাঁর কারণেই আজ টেকসই উন্নয়নের মহাসড়কে দেশ। মোট চারবারের প্রধানমন্ত্রী তিনি। টানা তিনবারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত বারো বছর ধরে দুঃসাহসী নেতৃত্ব দিয়ে দেশের জনগণকে যেমন আত্মবিশ্বাসী করে তুলেছেন ঠিক তেমনি স্বয়ংসম্পূর্ণ বাংলাদেশ গড়ে তুলতে এক বিস্ময়কর সাফল্য অর্জন করতে সমর্থ হয়েছেন। কিন্তু এসব ভালো কাজ করলেই কী হবে? এসবের পিছনে কিন্তু ষড়যন্ত্রকারীরাও লেগে রয়েছে।
ছিটমহল সমস্যার সমাধানসহ সহস্রাধিক ইস্যুতে সরকারের ইতিহাস সৃষ্টি মানুষকে আকৃষ্ট করে আছে। ছিটমহল নিয়ে এরশাদ-বিএনপি-জামায়াত অর্থাৎ আওয়ামী লীগ বিরোধী সকল শক্তি একজোট হয়েছিল। সেসব দল প্রচার করত-এটি নাকি গোলামি চুক্তি। খালেদা জিয়ার ভাষণের মূল আকর্ষণ ছিল ‘গোলামি চুক্তি।’ এটা ছিলো তার অস্ত্র। আমরা কেনো ভুলে যাই! যদিও তারা ক্ষমতায় থেকেও এর কিনার করতে পারেনি। কিন্তু ৬৮ বছর পর এক ঐতিহাসিক বিজয় নিয়ে এলো শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার। সুতরাং এখন, লাঞ্ছিত সাংবাদিক রোজিনার ন্যায়বিচার চাই।

লেখক : উপসম্পাদক, আমাদের অর্থনীতি, সিনিয়র সাংবাদিক ও কথাসাহিত্যিক

 

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত