প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

হাসান মোরশেদ: ফিলিস্তিন কি বাংলাদেশের পক্ষে ছিলো?

হাসান মোরশেদ: এই আলাপটা ওঠেছে জোরেসোরে। কিছু তথ্য ইতস্ততঃ ঘুরছে। ফিলিস্তিনের গ্র্যান্ড মুফতি পাকিস্তানের পক্ষে বিবৃতি দিয়েছিলো, ইসরাইল ১৯৭১ এর এপ্রিল মাসে একবার এবং ১৯৭২ এর শুরুতে আরেকবার স্বীকৃতি দিয়েছিলো- দুবারই বাংলাদেশ সরকার গ্রহণ করেনি, ইসরাইল তাদের অস্ত্রের একটা চালান এবং কলেরার টিকা ভারতকে দিয়েছিলো এবং বাংলাদেশ (শুধু) ভারতের কাছ থেকে অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ নিয়েছে সঙ্গে শরনার্থীরা কলেরার টিকাও। ফিলিস্তিনি পত্রিকায় বাংলাদেশকে সহানুভূতি জানিয়ে একটা লেখা প্রকাশ হয়েছিলো এমন সংবাদ পাওয়া গেলোও সেটা একজন ভারতীয়ের আরবীতে দেয়া বিজ্ঞাপন। আরব রাষ্ট্রগুলো বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিপক্ষে ছিলো। উপরের সবগুলো তথ্য সঠিক। ‘তাহলে নিশ্চয়ই ফিলিস্তিন বাংলাদেশের পক্ষে ছিলো না ’ এই সিদ্ধান্তে আসার আগে আপনাকে পড়তে হবে সোভিয়েত- ফিলিস্তিন সম্পর্ক নিয়ে৷ ধরেই নিচ্ছি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সোভিয়েতের সুপ্রীম ভূমিকা সম্পর্কে আপনার জানা আছে।

১৯১৭ সালে সোভিয়েত গঠনের পর লেনিন এবং সোভিয়েত কমিউনিষ্ট পার্টি জায়নবাদের বিপক্ষে স্পষ্ট অবস্থান ঘোষনা করেন। ১৯১৯ সালে অভিবাসী ইহুদীরা কমিউনিস্ট পার্টি অফ ফিলিস্তিন গঠন করলে কমিনট্রনে তাদেরকে সভ্য করার শর্ত হিসেবে বলে দেয়া হয়  ‘to support the national freedom of the Arab population against the British-Zionist occupation.’ ১৯৩০ সালে কমিউনিষ্ট ইন্টারন্যাশনালের নির্বাহী কমিটি ঘোষনা করে- ‘ঃthe expression of the exploiting, and great power oppressive strivings, of the Jewish bourgeoisie.’ কিন্তু ১৯৪৮ সালের মে মাসে ইসরাইল রাষ্ট্র ঘোষিত হলে প্রথম স্বীকৃতি দেয় সোভিয়েত ইউনিয়ন। মনে রাখতে হবে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ জয় করে স্ট্যালিনের সোভিয়েত তখন সুপার পাওয়ার। সুপার পাওয়ারের অভিভাবকত্ব নিয়ে তারা তখন সমস্যার সমাধান ভাবছে। কিন্তু আরবের কমিউনিষ্ট পার্টিগুলো স্ট্যালিনের এই সিদ্ধান্ত অগ্রাহ্য করে। এসময় থেকে স্ট্যালিনের পুরো সময় সোভিয়েতের বিদেশ নীতি জায়োনিস্ট, তাদের হিসেব ছিলো নতুন রাষ্ট্র ইসরাইল হবে প্রো-সোভিয়েত। প্রথম কয়েকবছর ছিলোও।  কিন্তু ইসরাইল ক্রমশঃ প্রো-আমেরিকান হয়ে উঠলে, সোভিয়েত আবার প্রো-আরব অবস্থানে ফিরে যায়।

১৯৫৫ সাল থেকে সোভিয়েত আবার জায়োনিস্টদের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নেয়। ১৯৬৪ সালে পিএলও গঠিত হলে সোভিয়েত এদের সমর্থন দেয়া শুরু করে। ১৯৬৭ সালের জুন মাসের যুদ্ধে ইসরাইলের কাছে আরব রাষ্ট্রগুলোর পরাজয়ের পর পিএলওকে আরো ঘনিষ্ঠভাবে সহযোগিতা শুরু করে সোভিয়েত। এ বছরই ইয়াসির আরাফাত প্রথম মস্কো সফর করেন, পরের বছর পিএলও’র চেয়ারম্যানের পদে অধিষ্ঠিত। এরপর আর সোভিয়েত- পিএলও সম্পর্ক পিছন ফিরে তাকায়নি আশির দশকে গর্বাচেভ ক্ষমতায় আসার আগ পর্যন্ত। পিএলও এবং অন্যান্য গেরিলা দলের প্রশিক্ষণ, অস্ত্র, অর্থ সবই নিয়ন্ত্রণ করতো কেজিবি। ইয়াসির আরাফাতকে ইসরাইল, আমেরিকা সহ পাশ্চাত্য শক্তি ‘মস্কো ম্যান’ বলে ডাকতো। ১৯৭৪ সালে মস্কোতে পিএলও দূতাবাসও চালু করে। ১৯৮৮ সালে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠিত হলে, এটারও প্রথম স্বীকৃতি দাতা হলো সোভিয়েত ইউনিয়ন। (১৯৪৮ সালে ইসরাইলেরও প্রথম স্বীকৃতিদাতা!)

এবার ফিরে আসি বাংলাদেশ প্রসঙ্গে : ১৯৭১ এর মুক্তিযুদ্ধের সময় ফিলিস্তিনি জনগণের অবিসংবাদিত নেতা ‘মস্কো ম্যান’ ইয়াসির আরাফাত। ভারত বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে প্রকাশ্যে সর্বাত্মক হয়েছে, আগষ্ট মাসে সোভিয়েতের সমর্থন ও সহযোগিতা নিশ্চিত হবার পর। ফিলিস্তিনের পাশাপাশি ইরাক এবং সিরিয়া এই দুই আরব রাষ্ট্রও তখন সোভিয়েতের স্যাটালাইট। তারা কি মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীতা করেছিলো? খোঁজ নেন। আমাদের মুক্তিযুদ্ধ যখন তুঙ্গে, পাকিস্তান সেনাবাহিনীর নির্বিচার হত্যাযজ্ঞ চালাচ্ছে বাংলাদেশে এবং আমরা প্রতিরোধ করছি ঠিক তখন পিএলও লড়ছে জর্দান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে, নিহত হয়েছে ৫ থেকে ২৫ হাজার ফিলিস্তিনি, সেই হত্যাযজ্ঞের অন্যতম জেনারেল একজন পাকিস্তানি- জিয়াউল হক। হত্যাযজ্ঞের শিকার হতে হতে পিএলও/ ফিলিস্তিনিরা পাকিস্তানকে সমর্থন জানাচ্ছিলো? আরেক কমিউনিষ্ট রাষ্ট্র কিউবার সঙ্গে ফিলিস্তিনের সম্পর্ক তো সর্বজন বিদিত। ফিদেল ক্যাস্ট্রো এবং আরাফাতের সম্পর্ক ছিলো ব্যক্তিগত বন্ধুর মতো। আরাফাত অন্ততঃ আটবার কিউবা সফর করেছেন। এখন পর্যন্ত কিউবা ফিলিস্তিন সমর্থন প্রশ্নে কোনো আপোষ করেনি। বাংলাদেশের সঙ্গে কিউবার এবং ক্যাস্ট্রোর সঙ্গে বঙ্গন্ধুর হৃদ্যতাও কেউ চাইলে মিলিয়ে নিতে পারেন। সিদ্ধান্ত প্রত্যেকের নিজস্ব। ফেসবুকে উড়ে বেড়ানো এই সেই কন্টেন্টের বদলে নিজে জেনে সিদ্ধান্ত নিলে সেটা সঠিক হবার সম্ভাবনা বেশি থাকে। ফেসবুক থেকে

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত