প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

দীপক চৌধুরী: আয়নাবাজি, চঞ্চল চৌধুরী এবং সাংস্কৃতিক অঙ্গন ও আমাদের দায়বদ্ধতা

দীপক চৌধুরী: চঞ্চল চৌধুরীর মতো গুণী অভিনেতার জন্মদাত্রীকে ‘রত্নগর্ভা মা’ বলে যেখানে আমাদের গর্বিত হওয়ার কথা সেখানে সোশাল মিডিয়ায় তাঁর একটি পোস্টকে কেন্দ্র করে তুলকালাম কাণ্ড ঘটে গেলো। তিনি ছোট ও বড় পর্দার জনপ্রিয় অভিনেতা। পোস্ট করা ছবিটি অন্য গ্রহের ছিল না, ছিল মায়ের ছবি। এবার ৯ মে বিশ্বজুড়ে পালিত হওয়া ‘মা দিবস’-এ মাকে বিশেষভাবে শ্রদ্ধা জানাতে হাসিমুখে মায়ের একটি ছবি ফেসবুকে পোস্ট করেছিলেন তিনি। ছবির ক্যাপশনে ছোট্ট করে লিখেন, ‘মা’। এ ছবিতে মায়ের কপালে ও সিঁথিতে ছিলো সিঁদুর। সিঁদুরশোভা কপাল দেখেই তীব্র বিদ্বেষমূলক মন্তব্য ছুড়েছেন ‘তারা’। এরপর ক’দিন ধরে বিস্ময়ের সঙ্গে আমরা দেখলাম, সাংস্কৃতিক অঙ্গনে জড়িতদের পক্ষ থেকে বিষয়টির অনাকাঙ্ক্ষিত প্রতিবাদ হয়নি।

যদিও দুয়েকজন দায়সারাগোছের প্রতিবাদ করেছেন। নিউজপোর্টাল আমাদের সময় ডটকম লিখেছে, ধর্মীয় উগ্রপন্থীদের এমন মন্তব্যে চঞ্চল চৌধুরী বিব্রত হলেও তিনি বলেছেন, ‘আমি ধর্মের কারণে পরিচিত না। কর্মের মাধ্যমে পরিচিত। আমার যা কিছু অর্জন, যা কিছু পরিচিতি সব আমার কাজের কারণে। এ দেশের মানুষজনই আমাকে ভালোবেসে এই অবস্থানে নিয়ে এসেছেন। ফলে আমার ধর্মীয় পরিচয় কী সেটা মুখ্য বিষয় নয়। কর্মই আমার মূল পরিচয়।’ যারা ধর্ম নিয়ে কটাক্ষ করেছেন তাদের প্রতি বিশেষ কোনো মন্তব্য নেই চঞ্চলের। তাঁর মতে, ‘এদের নিয়ে আমি তেমন কিছু বলতে চাই না। এটা তাদের ক্ষুদ্রতা-দৈন্যের প্রকাশ। এসব রুচিহীন মন্তব্যকারীদের জন্য আমার করুণা হয়।’ অপর এক প্রশ্নের জবাবে চঞ্চল চৌধুরী বলেন, ‘এগুলো একটা পরিকল্পনার অংশ। মানুষজনকে বিব্রত করার জন্য একটি গোষ্ঠী সংঘবদ্ধভাবে এসব করে থাকে। এরা সংখ্যায় সামান্য হলেও সংঘবদ্ধ।’

হাঁ, এই সংঘবদ্ধের উৎসমুখ আমরা খুঁজে বের করি না কেন, দমন করি না কেন? আসলে এখন স্বাভাবিক সময় নয়। খাদ্য, চিকিৎসা, শিক্ষা, কর্ম-নিরাপত্তা নিয়ে যেখানে মানুষ উদ্বিগ্ন সেখানে এই সাম্প্রদায়িক শক্তির মাথায় ‘সাম্প্রদায়িক প্রাদুর্ভাব’ প্রবেশ করে চলেছে অবলীলায়, বিনাবাধায়! করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে পৃথিবী এখন বিধ্বস্ত। ব্যবসা-বাণিজ্য, উৎপাদন, যোগাযোগ, চলাচলে ব্যাঘাত ঘটছে। স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ। আমদানি-রপ্তানি-বিনিয়োগ ব্যাহত হচ্ছে। ইউরোপ-আমেরিকা, ভারত, ইরান, ইতালীর অবস্থা যেখানে ভয়াবহ সেখানে বাংলাদেশ কী কিছু! ক্ষমতা আর বিপুল বিত্ত-সম্পদ হাতে থাকা দেশ ও মানুষগুলো যেখানে অসহায় সেখানে এদেশে সাম্প্রদায়িক শক্তির বিষদাঁত সুদৃঢ় হচ্ছে কীভাবে?

আমি ভেবে অবাক হই যে, মৌলবাদী ও উগ্রগোষ্ঠীর এতো দুঃসাহস হলো কীভাবে! বিদ্বেষপোষণকারীদের সংখ্যা যতই কম হোক না কেন ‘এখনই এদের রুখে দিতে হবে’ এটা বলা পর্যন্তই যেন দায়িত্ব শেষ করছি। ওরা আমাদের বাঙালি সংস্কৃতি ও এর চারণভূমির জন্য মারাত্মক হুমকি। আমাদের বাউলগান, জারিগান, যাত্রাপালাসহ সবধরনের তৃণমূল সংস্কৃতিও আক্রান্ত। এজন্য রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ ও কর্মপন্থা নির্ধারণ জরুরি। বিশ্বাস করি, বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পক্ষেই এটি সম্ভব।

আমাদের চলচ্চিত্র জগৎ এবং এর বর্তমান দৈন্যতা নিয়ে প্রায়ই গণমাধ্যমে হা-হুতাশ শুনি। অথচ এখানে ‘ওয়ার্ল্ড ক্লাশ’ তারকা ও নির্মাতা আছেন। তাঁদের দক্ষতা-যোগ্যতা কী নেই? বিভিন্ন সীমাবদ্ধতায় তারকা-নির্মাতাদের ধরে রাখতে পারি না। ব্যর্থতা আমাদেরই। সেই জায়গা-সুযোগ দিতে পারছি কোথায়? বিশ্বায়নের এ যুগে ঘরে বসে হলিউড-বলিউড-টালিউডের সিনেমা আমরা দেখতে পাচ্ছি। ‘ওয়ার্ল্ড ক্লাশ’ তারকা আমাদেরও আছেন, কেন বললাম এর উদাহরণ টেনে আজ লেখাটি বড় করতে চাই না। কারণ, শব্দসংখ্যা বাড়ানো যাবে না, সীমিত পরিসরে লিখতে হবে।

চলচ্চিত্র, টেলিছবি, নাটক, বিজ্ঞাপনহ সকলক্ষেত্রেই চমৎকার পারফর্মিংয়ে দারুণ জনপ্রিয় তারকা চঞ্চল চৌধুরী, একথা আমরা জানি। এ বিষয়ে বলার আগে আমার সাধারণ একটি অভিজ্ঞতা ‘শেয়ার’ করছি। স্কুল-কলেজে পড়ার সময় লুকিয়ে সিনেমা দেখার প্রবণতা ছিল। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে এসে শারীরিক ও মানসিক স্বাধীনতা পাওয়ায় বেছে বেছে সিনেমা দেখেছি।
অনেক আগের কথা। পল্টনে সন্ধানী পত্রিকায় সম্ভবত ঈদসংখ্যার জন্য মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক একটি গল্প জমা দিয়ে পলওয়েলের সামনে রিকশা খুঁজছি। ঠিক তখনই আমার প্রিয় সুদেহী ও সুদর্শন এক ব্যবসায়ী বন্ধুর আবির্ভাব। বাল্যকালের এ বন্ধু উচ্চশিক্ষিত ও বহুমুখী মেধাবী। সিনেমার পোকা। ওই সময় আমারও অফুরন্ত অবসর। তাঁর ইচ্ছায় ১৯৮৪- তে খ্যাতিমান পরিচালক আমজাদ হোসেনের ‘ভাত দে’ নামের সিনেমাটি মধুমিতায় উপভোগ করি। এরপর আর সিনেমা হলে ঢুকিনি।

যদিও চিত্রালী পত্রিকায় সাংবাদিক হিসেবে চার বছর কাজ করেছি। অবিশ্বাস্যভাবে প্রায় বত্রিশ বছর পর আবার সিনেমা হলে ঢুকতে হলো। সেই মধুমিতায়ই ‘আয়নাবাজি’ দেখতে। এবং এটা কাকতালীয়ভাবে যে, আমার সেই পুরনো ব্যবসায়ী বন্ধুরই অনুরোধে। ‘আয়নাবাজি’ সিনেমা দেখতেই হবে, সিনেমাটি নিয়ে খুব কথা হচ্ছে। সাংবাদিকতা পেশা ও লেখকজীবনের অর্থকড়ির টানাপড়েনের মধ্যে এটা এক ধরনের বিলাসিতা মনে হলেও ব্যবসায়ী বন্ধুর আগ্রহে সিনেমাহলে ঢোকা। সময়টা ছিল ২০১৬ খ্রিস্টাব্দের শেষদিকে। চলচ্চিত্রের নাম, আয়নাবাজি। উপভোগ করলাম মন ভরে। চঞ্চল চৌধুরীর অভিনয়ে সঙ্গী বন্ধুটিও মুগ্ধ। কিন্তু অন্য কারণে ভীষণ খেপে গেলো। তাঁর বক্তব্য, জেলের ভেতর কারারক্ষীকে মানসিক অসুস্থ করে তোলা সম্ভব নয়। সিনেমাটিতে টেলিভিশনে যেভাবে ‘ক্রাইমের’ খবরটি প্রচার করা হলো তা অবাস্তব, মানে কোন্ টিভি চ্যানেলের খবর এটি তাও দেখানো হলো না। টাইট নিরাপত্তায় যুদ্ধাপরাধীদের রাখা হয় যে কারাগারে সেই ‘কাশিমপুর কারাগার’ না দেখালেই কী হতো না? এক পর্যায়ে তাকে থামালাম। তবে বন্ধুও একমত হয়ে স্বীকার করলো যে, গুণী চলচ্চিত্র নির্মাতা অমিতাভ রেজার পক্ষেই চমৎকার নতুন ধারার মুভি নির্মাণ করা সম্ভব হয়েছে।

কোনো নির্মাতাকে অসম্মান, ছোট করা বা আঘাত দেওয়ার জন্য নয়, এদেশে এমন সুন্দর মুভি হয়েছে কিনা আমি জানি না। তবে এটুকু বলতেই পারি নায়ক-নায়িকাসহ সিনেমার অন্য কুশীলবদের দিয়ে চমৎকার অভিনয় আদায় করে নেওয়ার অসাধারণ যোগ্যতা এই স্কলার নির্মাতার মধ্যে আছে। এককথায় অমিতাভ রেজা অসাধারণ। ভীষণভাবে দেখিয়েছেন আমাদের সমাজ বাস্তবতা। এবং এটি সম্ভব হয়েছে তুমুল জনপ্রিয় অভিনেতা চঞ্চল চৌধুরীর কারণেই। ‘আয়নাবাজি’ সিনেমায় চঞ্চলের একইসঙ্গে নিরীহ একজন জাহাজকর্মী, জেলখানার কয়েদি, আসামী, সাধারণ নাগরিক কিংবা শান্ত প্রেমিক থেকে ভয়ংকর রাজনীতিবিদের চরিত্রে পদার্পণ করার মধ্য দিয়ে আমরা সত্যিই অবাক হই। ‘আয়নাবাজি’তে গুণ্ডাপাণ্ডা পরিবেষ্টিত প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ নিজাম সাঈদ চৌধুরীকে দেখেছি আবার কখনো অসহায়, কখনো প্রতিবাদী আয়নার অভিব্যক্তিও দেখেছি। এই যোগ্যতার কারণে চঞ্চল চৌধুরীকে নতুন করে চিনতে পারলেন যেন দর্শকরা। তাঁর অভিনীত অসংখ্য নাটক, টেলিছবি, চলচ্চিত্র দেখেছি টিভিতে। আমরা এটাও জানি, ‘আয়নাবাজি’তে তাঁকে জীবনের রঙ্গমঞ্চে ‘ইন্টারেস্টিং’ চরিত্রের মানুষ ‘করে তোলা’র মূল কারিগর অবশ্যই অমিতাভ রেজা। নিষ্ঠুর সমাজে বিরাজ করা আমাদের ‘সামাজিক বিষবাস্প’ অত্যন্ত মুন্সীয়ানায় তিনি তুলে ধরেছেন ‘আয়নাবাজি’তে। সেইরাতে ঘরে ফিরেই কয়েকটি বিষয় জানতে ও ধন্যবাদ জানাতে আইজি প্রিজনসকে মোবাইলে ফোন করলাম। তিনি সিলেটের মানুষ, জেদী, স্পষ্টবাদী অথচ সরল। ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ ইফতেখার উদ্দীন চমৎকার ব্যক্তিত্বের অধিকারী। দীর্ঘ প্রায় পাঁচ বছর আইজি প্রিজনস ছিলেন। সময়টা গুরুত্বপূর্ণ তো ছিলোই। তখন স্বাধীনতাবিরোধী যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসি কার্যকর করা হচ্ছিল। যেহেতু কাশিমপুর কারাগার ও কারারক্ষী চরিত্র দেখানো হয়েছে এজন্যেই কিছু কথা জানতে চাই ‘আয়নাবাজি’ প্রসঙ্গে। আবেগ উতলা হয়ে উঠেছে আমার। কিন্তু রেসপন্স না পাওয়ায় ক্ষুদ্র মেসেজ দিয়ে রাখলাম।

সৈয়দ ইফতেখার পরদিন সকাল দশটায় মোবাইল ফোন ব্যাক করলেন। দীর্ঘসময়, প্রায় আধঘণ্টা তাঁর সঙ্গে কথা হয়েছিল ফোনে। কারাগার ব্যবহার থেকে শুরু করে ‘আয়নাবাজি’র বিভিন্ন প্রসঙ্গ ও কাশিমপুর কারাগারে শুটিং নিয়ে। ভালো সিনেমার জন্য শুধু যে গল্প, চরিত্র, কুশীলব, শুটিং স্পটই বড় তা কিন্তু নয়, এরকম একটা ধারণা পেয়েছিলাম সৈয়দ ইফতেখার উদ্দীনের কাছ থেকে। জরুরি হচ্ছে প্রস্তুত-প্রণালী ও উপস্থাপন। তাঁর মতে, ‘আমাদের চলচ্চিত্রে অবশ্যই পরিবর্তন দরকার। আমাদের মধ্যে কাউকে না কাউকে এগিয়ে আসতে হবে, কাজটি করতে হবে, আরেকজনের জন্য কাজটি ফেলে রাখা চলবে না।’ তুখোড় নির্মাতা অমিতাভ রেজা, চঞ্চল চৌধুরী ও ‘আয়নাবাজি’ প্রসঙ্গে আলোচনায় তিনি বিভিন্ন দেশের চলচ্চিত্রের উদাহরণ তুলে ধরলেন এবং জোর দিয়ে বললেন, ‘ওরা পারলে আমরা কেন পারবো না।’ তাঁর সঙ্গে আলাপের বিস্তারিত অন্য একদিন আলোচনা করবো।

আজ এটা বুঝতেই হবে, উগ্রধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতা যেখানে আমাদের চলচ্চিত্র, নাটক, মঞ্চনাটকসহ সংস্কৃতির সকল পথে সবচেয়ে বড় বাধা সুতরাং অপশক্তির তীব্র আক্রমণের বিরুদ্ধে সকল স্তর থেকেই কার্যকরী প্রতিবাদ করতে হবে। তা না হলে আমরা চঞ্চল চৌধুরীদের মতো গুণী তারকাদের হারাবো। দুঃখ হয়, ঊনিশশ একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও ইতিহাসের শিক্ষা আজো অনেকে অস্বীকার করে চলতে চান। সেই দিনগুলো আমাদের চিরস্মরণীয় করে রাখতে হবে।

পুনশ্চ, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্যসচিব মো. নজিবুর রহমানের কক্ষে সৈয়দ ইফতেখার উদ্দীনের সঙ্গে আমার দেখা হয়েছিল ২০১৯-এ। কিছু কথার মধ্যেও তিনি ‘আয়নাবাজি’ নিয়ে মন্তব্য করেছিলেন এই বলে, আমাদের বদলাতে হবে, বদলে যেতে হবে, বিশ্বের সঙ্গে তাল মেলাতে হবে, এগিয়ে যেতে হলে পুরনো চিন্তা বদলে ফেলতে হবে, দায়িত্ব নিতে হবে। কেনো যেনো এটা স্পষ্ট মনে হলো যে, সিনেমাটি তাঁর মনে রেখাপাত করেছিল।

লেখক : উপসম্পাদক, আমাদের অর্থনীতি, সিনিয়র সাংবাদিক ও কথাসাহিত্যিক

 

সর্বাধিক পঠিত