প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

[১] য‌শো‌রে শেখ রাসেল ডিজিটাল ল্যাব গ্রাম-গ‌ঞ্জে তৈরী কর‌ছে দক্ষ ক্ষু‌দে মানবসম্পদ

র‌হিদুল খান: [২] পঞ্চম শ্রেণির ছাত্র আইমান আসিফ মেরিন বাস করে গ্রামে। শহর থেকে যার দুরত্ব ৪০ কিলোমিটার। কিন্তু সেখানে বসেই আইমান স্বপ্ন দেখছে বড় হয়ে উদ্যোক্তা হবে। এ হাতছানি দিচ্ছে তারই স্কুলে প্রতিষ্ঠিত শেখ রাসেল ডিজিটাল ল্যাব।

[৩] যশোর জেলার শার্শা উপজেলার টেংরালী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির ছাত্র আইমান আসিফ মেরিন। ২০১৬ সালে যখন ভর্তি হয় সেবছরই স্কুলে প্রতিষ্ঠিত হয় শেখ রাসেল ডিজিটাল ল্যাব। আর তখন থেকেই তার স্কুলে আসার আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু ল্যাবটি। এমন আকর্ষণ আর অনুভূতি তার সহপাঠী একই গ্রামের জাহিদ হাসান ও আনিশা রহমানের মতো আরো অনেকের।

[৪] অন্য এক শিক্ষার্থী তানজির এলাহি নোমানের ইচ্ছে বড় হয়ে প্রোগ্রামার হবার। কম্পিউটারের জটিল কোডিং আর সফটওয়্যারের দিকে ঝোঁক তার। নোমান যশোরের মণিরামপুর উপজেলার মশ্মিমনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। একই বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী স্বর্ণা দত্ত। শ্রেণি রোল এক হওয়ায় সে অন্যদের কাছে অনন্য হলেও স্বর্ণার কাছে অনন্য তার স্কুলের শেখ রাসেল ডিজিটাল ল্যাব। এই ল্যাবের মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম যেন তার দূরন্ত শৈশবকে আরো বেশী আনন্দময় করে তুলেছে, বাড়িয়ে দিয়েছে শেখার আগ্রহ। স্বর্ণার কথা যেন অনুরণিত হয় অন্যদের কণ্ঠেও।

[৫] জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আজন্ম লালিত স্বপ্ন ছিলো সোনার বাংলা গড়ার। সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে ২০০৮ সালের ১২ ডিসেম্বর ঘোষিত হয় দিন বদলের পালা রূপকল্প ২০২১। তথ্য প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে দক্ষ মানব সম্পদ তৈরি আর ক্ষুধা দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার দূর্বার অভিযাত্রা। সেই বিশাল কর্মযজ্ঞের মধ্যে অন্যতম ছিলো শেখ রাসেল ডিজিটাল ল্যাব। ২০১৪ সালের ২৩ ডিসেম্বর একনেকের সভায় প্রকল্পটি প্রথম অনুমোদন লাভ করে। ৩৯৭.৭৭৭৫ কোটি প্রাক্কলন ব্যয় ধরা হয় এবং মেয়াদ নির্ধারণ করা হয় ২০১৫ সালের জুন থেকে ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। আইসিটি ডিভিশনের উদ্যোগ ও ইয়াং বাংলার সহযোগিতায় ২০১৫ সাল থেকে শুরু হয় সারাদেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কম্পিউটার ও ভাষা প্রশিক্ষণ ল্যাব স্থাপন। জাতির পিতার কনিষ্ঠপুত্র শেখ রাসেলের নামকরণে প্রকল্পের নাম রাখা হয় শেখ রাসেল ডিজিটাল ল্যাব। ২০১৬ সালের ১৩ আগস্ট গণভবণ থেকে একযোগে সারাদেশে স্থাপিত শেখ রাসেল ডিজিটাল ল্যাবের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

[৬] মশ্মিমনগর স্কুলের প্রধান শিক্ষক হোসনেয়ারা বলেন, শিক্ষার্থীদের জন্য আলাদা করে আইসিটি শিক্ষা নয় শিক্ষায় আইসিটি যুক্ত করে শিক্ষাকে আনন্দময় করতে হবে। সেই প্রত্যাশাকে প্রাপ্তিতে রূপায়ন করছে শেখ রাসেল ডিজিটাল ল্যাব।

[৭] টেংরালীর প্রধান শিক্ষক ফেরদৌসি রহমান জানালেন আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই), রোবটিকস, ব্লকচেইন, বিগ ডাটার মতো নতুন প্রযুক্তি পৃথিবীকে দ্রুত বদল করে দিচ্ছে। সেই বদলে যাওয়া প্রযুক্তির সাথে শিক্ষার্থীদের দক্ষ করে গড়ে তুলতে তৃণমূলে শিক্ষার আলো ছড়াচ্ছে শেখ রাসেল ডিজিটাল ল্যাব।

[৮] প্রকল্পের আওতায় সারাদেশে মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক, মাদ্রাসা ও সমমানের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ৪০০১টি শেখ রাসেল ডিজিটাল ল্যাব, ১৬০টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শেখ রাসেল ডিজিটাল ক্লাসরুম এবং সৌদি আরবে অবস্থিত বাংলাদেশ ইন্টারন্যাশনাল স্কুলে ১৫টি ল্যাবসহ সর্বমোট ৪ হাজার ১৭৬টি শেখ রাসেল ডিজিটাল ল্যাব স্থাপন করা হয়। কার্যকারীতার নিরিখে পরবর্তীতে এ সংখ্যা ৮ হাজারে উন্নীত করা হয়। প্রযুক্তিতে শিক্ষার্থীদের দক্ষতা অর্জনের আরোবেশী সুযোগ করে দিতে ২০২০-২১ অর্থ বছরে আরো ৫ হাজার ল্যাব স্থাপনের উদ্যেগ নিয়েছে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ। ২০২৫ সালের মধ্যে দেশে আরও ৩৫ হাজার আধুনিক শেখ রাসেল ডিজিটাল ল্যাব এবং ভবিষ্যতে সারাদেশের প্রতিটি জেলার ২ হাজার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কম্পিউটার ল্যাব স্থাপন হবে বলে আইসিটি তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে।

[৯] কম্পিউটার শিক্ষা সম্প্রসারণ, কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি, কর্মদক্ষতা এবং ভাষাগত দক্ষতা ত্বরান্বিত করার জন্যে এর মধ্যে খুলনা জেলায় ৫৯, বাগেরহাটে ৫৮, সাতক্ষীরায় ৪৮, যশোরে ৯১, মাগুরায় ৩৫, নড়াইলে ৩২, ঝিনাইদহে ৫৩, কুষ্টিয়ায় ৫৪, চুয়াডাঙ্গায় ২৯ ও মেহেরপুরে ২২টি সহ খুলনা বিভাগে ৪৮১টি ল্যাব ও ১৫টি ক্লাসরুম স্থাপন করা হয়। এই সব ল্যাব এখন শিক্ষার্থী, শিক্ষক, বেকার ও যুবদের সোনালী সমৃদ্ধির সুযোগ সৃষ্টি করে দিচ্ছে।

[১০] যশোর জেলায় ৯১ টি শেখ রাসেল ডিজিটাল ল্যাব ও দুটি ডিজিটাল ক্লাসরুম চলমান আছে। এর মধ্যে যশোর সদর উপজেলায় ১৯টি, শার্শায় ১১টি, চৌগাছায় ৭টি, ঝিকরগাছায় ১২টি, অভয়নগরে ১০, বাঘারপাড়ায় ৫, মণিরামপুরে ১৬, কেশবপুরে ১১টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শেখ রাসেল ডিজিটাল ল্যাব আছে। এর সাথে শার্শা ও মণিরামপুরে আছে একটি করে ডিজিটাল ক্লাসরুম। প্রতি জেলা ভিত্তিক একটি ডিজিটাল ল্যাব ভাষা প্রশিক্ষণ কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হবে। যশোর জেলায় নির্বাচিত প্রতিষ্ঠানটি হচ্ছে যশোর সদর উপজেলার ছাতিয়ানতলা-চুড়ামনকাটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়। শেখ রাসেল ডিজিটাল ল্যাব থেকে ইংরেজি, ফ্রেঞ্চ, স্প্যানিশ, জার্মান, জাপানীজ, কোরিয়ান, রাশিয়ান, আরবী ও চাইনিজ নয়টি ভাষার উপর প্রশিক্ষণ নেয়া যাবে। যার মাধ্যমে ভাষা নির্ভর ফ্রিল্যান্সিং, আউটসোর্সিং এবং অন্যান্য কর্মদক্ষতাকে ত্বরান্বিত করার পাশাপাশি বিদেশ গমনেচ্ছুকদের দক্ষ কর্মী হিসেবে গড়ে তুলবে। এর জন্য সরকারিভাবে তৈরি করা হয়েছে ভাষাগুরু নামের একটি বিশেষ সফটওয়্যার।

[১১] এ বিষয়ে যশোর জেলা প্রশাসক তমিজুল ইসলাম খান বলেন, শেখ রাসেল ডিজিটাল ল্যাব স্থাপন সরকারের সময়োপযোগী কার্যকর একটি পদক্ষেপ। ইন্টারনেট সংযোগসহ আধুনিক প্রযুক্তি সমৃদ্ধ শেখ রাসেল ডিজিটাল ল্যাবে শিক্ষার্থীরা গ্রামে থেকেই আধুনিক শিক্ষার সুযোগ সুবিধা পাচ্ছে। তৃণমূল পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের কম্পিউটার, গ্রাফিক্স এনিমেশন বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশিক্ষণের পাশাপাশি নয়টি প্রয়োজনীয় ভাষা শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি করেছে। বিদেশী ভাষা শিক্ষার ফলে ফ্রিল্যান্সিং এবং বৈদেশিক চাকুরীর ক্ষেত্র বৃদ্ধি পাচ্ছে।

[১২] বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রোগ্রামিং হবে ভবিষ্যতের ভাষা। কেননা এটি যন্ত্রের সঙ্গে মানুষ এমনকি যন্ত্রের সঙ্গে যন্ত্রের যোগাযোগের মাধ্যম। চতুর্থ শিল্পবিপ্লবকে সামনে রেখে দক্ষ জনশক্তি তৈরিতে ষষ্ঠ শ্রেণী থেকে দ্বাদশ শ্রেণী পর্যন্ত কম্পিউটার শিক্ষা বাধ্যতামূলক করেছে সরকার। শৈশব ও কৈশোর থেকেই যেন শিক্ষার্থীরা আইসিটি লেটারেট হতে পারে। সে স্বপ্ন পূরণের দূর্বার অভিযাত্রায় শেখ রাসেল ডিজিটাল ল্যাব আলোক বর্তিকা হয়ে পথ দেখাচ্ছে সবাইকে। সম্পাদনা: হ্যাপি

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত