প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

জাকির তালুকদার: চাই কপালে একটি হাতের স্পর্শ, সেটি মায়ের

জাকির তালুকদার: মাকে নিয়ে আমার কোনো আদিখ্যেতা নেই। প্রথাগত চিন্তার মানুষ তিনি। সংসারের কাজকর্ম, ধর্মকর্ম, সাধ্যমতো সামাজিকতা পালন- এসব নিয়েই থাকেন। প্রথাগত চিন্তার সূত্রেই ধরে নেন সংসার যতো বড়ই হোক, একজনই সেটিকে বহন করবে। যেমনটি আব্বাও করেছিলেন। তাই মাত্র ২৫ বছর বয়সে কোনোকিছু বোঝার আগেই অপ্রস্তুত আমার কাঁধে সংসারের সম্পূর্ণ বোঝা তুলে দিলেন তারা।

ডাক্তার মানেই টাকার কোনো অভাব নেই। অন্যদের মতো আমার মা-বাবার ভাবনাটাও সেই রকমই ছিল। কিন্তু একজন জুনিয়র ডাক্তার যে নিজের হাতখরচটা জোগাড় করতেই হিমশিম খায়, সেটি তাদের কাছে বিশ্বাসযোগ্য ছিল না। তাই তাদের দাবি মেটাতে হবে, নইলে মাফ নাই। মাফ নাই মানে কোনো মাফ নাই। বাজারের ফর্দ, কারেন্টের বিল, বাড়ির খাজনা, ছোট ভাই-বোনদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের খরচের বিল, বই-খাতার দামের স্লিপ, তাদের আব্দারের তালিকা- সব আমার টেবিলে রাখা হয়। ঘরে ফিরলেই যাতে চোখে পড়ে। কোত্থেকে দেব আমি সেটি কারো ভাবনার বিষয় নয়। দিতে হবে। আশ্চর্যের ব্যাপার হচ্ছে সবই পূরণ করেছি আমি। কী অমানুষিক শারীরিক এবং মানসিক পরিশ্রম যে করতে হয়েছে আমাকে।

বেশ কয়েকবছর লেখালেখি বন্ধ ছিল। আবার যখন লেখালেখিতে ফিরলাম, লেখা পত্রিকাতে ছাপা হলে খুশি হতেন আব্বা-মা দুজনেই। কিন্তু এখানেও সেই প্রথাগত চিন্তাই। লেখালেখি তাদের চোখে শখের জিনিস। তার জন্য উপায়-উপার্জনে ঘাটতি পড়বে কেন? আমার প্রতি মায়ের ভালোবাসায় কোনো ঘাটতি নেই। কিন্তু অতৃপ্তি এবং বিরক্তিও আছে প্রচণ্ড। কেন অন্য ডাক্তারদের মতো অঢেল উপার্জন করি না আমি? তার ও তাদের রাগকে অবৈধ মনে করি না আমি। কিন্তু লেখালেখিকেই জীবনের প্রধান কাজ বলে গ্রহণ করেছি।

চাকরির শুরুতে ঠিক করেছিলাম, আমার ২০ লাখ টাকা জমলেই সবকিছু ছেড়ে শুধু লেখালেখি নিয়েই থাকব। মাসে ২০ হাজার টাকা ইন্টারেস্ট দিয়ে হয়ে যাবে সংসারের সব খরচ। ৩০ বছর পরেও ২০ লাখ টাকা জমা হয়নি আমার। তবে এতো বছরে পরিবারের সবার অন্ন-বস্ত্র, চিকিৎসা, শিক্ষা, বাসস্থানের উন্নতির জন্য ব্যয় হয়েছে সব উপার্জন।

প্রথাগত মাতা-পুত্রের সম্পর্ক আমাদের। তবু তীব্র মাথাব্যথায় কাতরানোর সময় বা জ্বরে গা পুড়ে যাওয়ার সময়, বা তীব্র হতাশায় বালিশে মুখগুঁজে শুয়ে থাকার সময় চাই কপালে একটি হাতের স্পর্শ। সেটি মায়ের। লেখক : কথাসাহিত্যিক।

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত