প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

রুমা মোদক: কেবল সন্তান  জন্মদানেই মাতৃত্ব নয়

রুমা মোদক: মাতৃত্বে মহত্ত্ব কিছু নেই। বরং পিতৃত্বে আছে। আমার এ কথায় অনেকেই জিভ শানিয়ে তেড়ে আসেন। বুঝে কিংবা না বুঝে। কিন্তু আমি যা বলি, ভেবে চিন্তে, অভিজ্ঞতা জাড়িত হয়ে বলি। অন্যের যুক্তি যুক্তিসংগত হলে মত পাল্টাতে কুণ্ঠিত হই না। কমলা ভাসিন কী বলেছেন আমি তখনো জানি না, যখন আমি আবিষ্কার করেছি, মাতৃত্বে মহত্ত্ব কিছু নেই। আমি আবিষ্কার করেছি যখন আমি নিজে মা হয়েছি। যখন নিজে মা হয়েছি তখন অদ্ভূত কিছু আবিষ্কার আমার মা সংক্রান্ত অনেক মিথ ভেঙেচুরে আমাকে স্তম্ভিত করেছে। আমি এই অসম্ভব আবিষ্কারগুলো কারও সঙ্গে প্রকাশ্যে বলতে পারিনি মানুষের প্রথাগত ভাবনায় ধাক্কা দেওয়ার সাহসের অভাবে।

মাতৃত্ত্বে মহত্ত্ব নেই। আছে জৈবিকতা। প্রাণি জগতের সব প্রাণির নারী প্রজাতি সন্তান ধারণ করে। মানুষও করে। ব্যাপারটা পুরোই জৈবিক, শব্দটি শুনতে খারাপ শোনালে বলি, ব্যাপারটি প্রাকৃতিক। প্রকৃতি প্রদত্ত দায়। স্তন্যপায়ী প্রাণি হিসেবে একটি নির্দিষ্ট সময় সন্তান গর্ভধারিণীকে লালন পালন করতে হয়, এও প্রাকৃতিক। কোনো মহত্ত্ব নেই।

একটা নির্দিষ্ট সময়ে মানব সন্তান যখন লালন পালনে মা কেন্দ্রিকতা থেকে বেরিয়ে আসে বা আসার সময় হয়, দেখি সব মায়েরা উৎকণ্ঠিত বাচ্চা খায় না, বাচ্চা খায় না। বাচ্চা লালন পালনরত একজন মাও পাবেন না এই অভিযোগ নেই! আমার বাবা তখন বলতেন, বাচ্চাদের বাবাও, আরে খিদে লাগলে খাবে। না খেয়ে যাবে কই। সদ্য মা হওয়ার উন্মাদনা এতে প্রবোধ মানতো না।

ধীরে ধীরে আবিষ্কার করি, এই যে বাচ্চা খাচ্ছে না, বাচ্চা খাচ্ছে না বলে আমি ব্যতিব্যস্ত, আমার স্বাভাবিক জীবন ব্যহত। আমার খাওয়া ঘুম হারাম, আদতে বাচ্চাতো ঠিক দৌড়াচ্ছে, খেলছে তার সব স্বাভাবিক। আমি কেন অস্থির! অস্থির তো আমি আমার জন্য। বাচ্চা খেলে আমি সন্তুষ্ট, আমার স্বস্তি। নিজের সন্তুষ্টি, স্বস্তির জন্য তার পেছন পেছন দিনমান দৌড়াচ্ছি আমি। ঠিক এই কাজটি করছি তার ব্যক্তিজীবন গড়ে দিতেও ঠিক এই নিজের স্বস্তি, সন্তুষ্টি আর সামাজিক ইগোকেই প্রাধান্য দিই আমরা। আর পরে সন্তানকে দোষ দিই- তোর জন্য এতো কষ্ট করেছি।

সন্তান হওয়ার পর আমার দ্বিতীয় আবিষ্কার তার জীবনের যাবতীয় যন্ত্রণা, ব্যথা, কষ্টের জন্য দায়ী আমি। আমি মা হতে চাই। সামাজিক কারণ সবচেয়ে বেশি ক্রিয়াশীল এই প্রত্যাশার কাছে। অন্যান্য প্রাণির ক্ষেত্রে যা কেবলই জৈবিক, মানুষের ক্ষেত্রে বিদ্যা, বুদ্ধি, প্রযুক্তির কারণে তা নিয়ন্ত্রণ যোগ্য। মা হতে চাওয়ার সামাজিক বাসনা আমাকে তাড়িত করে, সন্তান ধারণের জন্য আমি তাই ডাক্তারেও শরণাপন্ন হই। সেই সন্তান জন্ম নেওয়ার পর আবিষ্কার করি, সে যে জ্বরে কষ্ট পায়, নানা অসুখে-বিসুখে, কিংবা পার্থিব সব জ্বালা যন্ত্রণায় তো আমি এনে ফেলেছি তাকে। জন্ম না নিলে তো সে এসব পেতো না। মাতৃত্ত্বে কোনো মহত্ত্ব নেই। যা করছি নিজের তাগিদে করছি। প্রকৃতি প্রদত্ত তাগিদ, সামাজিক তাগিদ।

হ্যাঁ পিতৃত্বে মহত্ত্ব আছে। কমলা ভাসিন যাকে বলেছেন, মাতৃত্ব, যে একজন পুরুষও মা হতে পারে। এই মা লৈঙ্গিক মা নয়। বরং একটা বোধ। প্রকৃতি পুরুষকে দায় দেয়নি, গর্ভধারণের, লালন পালনের। প্রাণি জগতের অধিকাংশ প্রাণির দায় নেই পিতৃত্বের, পরিচয়ও নেই। মানুষ সব প্রাকৃতিক দায়-দায়িত্বহীন হয়েও সন্তানের লালন পালন করে, দায় নেয় দায়িত্ব নেয়। এখানেই তার মহত্ত্ব। এখানেই তার মাতৃত্ত্ব।

পুরুষ সেই মহত্ত্ব অর্জনে ব্যর্থতা ঢাকতে সব দায়িত্ব নারীর ওপর চাপাতেই নারীর মাতৃত্বকে মহত্ত্ব দেয়। আর নারী সেই মহৎ হওয়ার ফাঁদে পা দিয়ে সন্তান পালনের সব দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেয়। অথচ সন্তান লালন-পালনের যে সামাজিক দায়িত্ব তার অর্ধেকটা যদি নারীর হয়, অর্ধেকটা পুরুষের। আদতে নারী এই নিয়ে মহৎ হওয়ার দায় থেকে বের হতে পারে না, যেভাবে পুরুষ পারে। সন্তান ফেলে চলে যাবার উদাহরণ মায়ের কয়টা আছে? যতোটা আছে পুরুষের। এই পিতৃত্ব অস্বীকার করা পুরুষদের মধ্যে সামাজিক কিংবা মানবিক বোধ জন্ম না নিলেই বা আমরা কী করতে পারি? আইন তার আর্থিক দণ্ড দিতে পারে বটে, কিন্তু যে পুরুষের আর্থিক সংগতিই নেই?

কমলা ভাসিন মায়ের ও পিতা হবার কথা বলেছেন। আমি এই ক্ষেত্রে যতোটা ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের প্রাবল্য কিংবা অস্তিত্বের সংকট দেখি ততোটা পিতৃতন্ত্রের প্রভাব দেখি না। ঢোঁড়াইয়ের মায়ের কথা মনে পড়ে। ভিক্ষুকের কাছে সন্তানকে ফেলে রেখে গিয়ে যে দ্বিতীয়বার বিয়ে করেছিলো। তাঁর এই অস্তিত্ব রক্ষার সংকটে যে স্বার্থপরতা তা সারভাইভালের শর্ত।

তবে কি নারীর মাতৃত্ত্ব কখনোই মহৎ হতে পারে না? পারে। যখন সে রাস্তার ঘুঁটে কুড়ানির সন্তানটিকেও নিজের সন্তানের মতো আলিঙ্গন করতে পারে, ঘরের গৃহকর্মী মেয়েটিকেও নিজের সন্তানের মতো একইরকম খাবার প্লেটে তুলে দেয় তখনই সে মহৎ মা। কেবল সন্তান  জন্মদানেই মাতৃত্ব নয়। ফেসবুক থেকে

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত