প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ঢাকার পার্ক-উদ্যানে কংক্রিট আচ্ছাদন বাড়ছে

নিউজ ডেস্ক: রাজধানী ঢাকায় যেসব পার্ক বা উদ্যান রয়েছে সেখানে কংক্রিটের আচ্ছাদনের পরিমাণ বাড়ছে। ৬৮ একর আয়তনের সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের উন্নয়ন প্রকল্পের প্রস্তাবিত নকশায় অবকাঠামো, কংক্রিট ও ধূসর এলাকার পরিমাণ শতকরা ৩৭ ভাগ। গুলশানে অবস্থিত সাড়ে নয় একরের বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ পার্কের ক্ষেত্রেও এ পরিমাণ ৩৭ ভাগ। ২৩ একরের ওসমানী উদ্যানের নকশায় ধূসর এলাকার পরিমাণ ৫২ ভাগ। ১ দশমিক ২ একরের বনানী পার্কের ক্ষেত্রে তা ৪২ ভাগ। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) করা এক সমীক্ষা প্রতিবেদনে বিষয়টি উঠে এসেছে।

সোহরাওয়ার্দী উদ্যানসহ ঢাকা শহরে সাম্প্রতিক সময়ে উদ্যান-পার্কের সৌন্দর্যবর্ধন ও উন্নয়নের জন্য নেয়া পরিকল্পনা নকশার ওপর বিআইপির করা সমীক্ষার ফলাফল গতকাল উপস্থাপন করা হয়। ‘উদ্যান-পার্কের উন্নয়ন প্রকল্প ও প্রকৃতি-পরিবেশ সুরক্ষা’ শীর্ষক ভার্চুয়াল পরিকল্পনা সংলাপে প্রতিবেদনটির ওপর আলোচনাও করা হয়।

বিআইপির সমীক্ষায় দেখা যায়, উদ্যান-পার্কের উন্নয়ন প্রকল্পের মাধ্যমে অবকাঠামো, কংক্রিট ও ধূসর এলাকা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। বিপরীতে উদ্বেগজনক হারে কমছে সবুজ এলাকার পরিমাণ। সমীক্ষায় বলা হয়, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের প্রকৃতি-পরিবেশ ও সবুজকে ধ্বংস করে দিয়ে উন্নয়ন প্রকল্প প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং তা সাম্প্র্রতিক সময়ে এ ধরনের গণপরিসরের পরিকল্পনা ও নকশা প্রণয়নে পরিকল্পনাগত আদর্শ অনুসরণের বিচ্যুতির ধারাবাহিকতা।

সম্প্রতি ঢাকাসহ নগর এলাকার বিভিন্ন পার্ক-উদ্যানের পরিকল্পনা ও নকশায় প্রকৃতি-পরিবেশ-প্রতিবেশকে প্রাধান্য না দিয়ে মাত্রাতিরিক্ত অবকাঠামো নির্মাণ ও কংক্রিট ব্যবহার করা হচ্ছে। এ প্রবণতা শুধু সোহরাওয়ার্দী উদ্যানেই নয়, ওসমানী উদ্যানসহ সমসাময়িক অনেক পার্ক ও গণপরিসর নির্মাণ পরিকল্পনা নকশায় দেখা গেছে, যা পরিকল্পনাগত, পরিবেশগত ও সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকে অত্যন্ত উদ্বেগজনক বলে সংলাপের আলোচনায় উঠে আসে।

এ সময় উদ্যান-পার্কের উন্নয়ন প্রকল্প ও প্রকৃতি-পরিবেশ সুরক্ষায় বিআইপি আটটি প্রস্তাব দেয়। এর মধ্যে রয়েছে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ যত দ্রুত সম্ভব বন্ধ করে প্রস্তাবিত প্রকল্পের পরিকল্পনাগত বিশ্লেষণ ও পরিবেশ-প্রতিবেশগত প্রয়োজনীয় সমীক্ষা করা। এরপর প্রয়োজনীয় সংশোধনী এনে ও পরিমার্জন করে প্রকল্পের বাস্তবায়ন। প্রকল্প প্রণয়নে যথাযথ পেশাজীবী অর্থাৎ নগর পরিকল্পনাবিদ, স্থপতি, নগর নকশাবিদ, প্রকৌশলী, উদ্যানতত্ত্ববিদ, বাস্তুতন্ত্র ও প্রতিবেশ বিশেষজ্ঞ, সমাজবিজ্ঞানীসহ প্রয়োজন অনুসারে বিশেষজ্ঞদের অন্তর্ভুক্ত করা। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের উন্নয়ন প্রকল্পের পরিকল্পনা ইমারত নির্মাণ বিধিমালার আওতায় গঠিত ‘নগর উন্নয়ন কমিটি’র মতামত সাপেক্ষে অনুমোদনের মাধ্যমে বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়া। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানসংশ্লিষ্ট উন্নয়ন প্রকল্পের নকশায় পেশাজীবীদের ‘প্রফেশনাল কোড অব এথিকস ও স্ট্যান্ডার্ড প্র্যাকটিস’-এর ব্যত্যয় ঘটে থাকলে স্থাপত্য অধিদপ্তরের উচিত সে বিষয়ে ব্যবস্থা নেয়া। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানসংশ্লিষ্ট উন্নয়ন প্রকল্পের মাধ্যমে গাছ কাটা বা পরিবেশ-প্রতিবেশের ক্ষতির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা নেয়া। যেন দেশের আর কোথাও পরিবেশ-প্রতিবেশকে ধ্বংস করে উন্নয়ন ও সৌন্দর্যবর্ধনের নামে হঠকারী কাজ করা না হয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মতো বাংলাদেশের উদ্যান, পার্ক, খেলার মাঠ, গণপরিসর পরিকল্পনা ও রক্ষণাবেক্ষণে পেশাজীবীদের সমন্বয়ে বিশেষ সংস্থা গঠনের উদ্যোগ নেয়া। দেশের সব উদ্যান-পার্কের পরিকল্পনা ও নকশা প্রণয়নে অবকাঠামো-কংক্রিট নির্মাণের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে প্রকৃতি-পরিবেশকে অক্ষুণ্ন রেখে উন্নয়ন পরিকল্পনা করা।

বিআইপির সাধারণ সম্পাদক পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খানের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সংগঠনের সভাপতি পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক ড. আকতার মাহমুদ। এতে অংশ নেন সংগঠনটির সহসভাপতি পরিকল্পনাবিদ মো. আরিফুল ইসলাম, যুগ্ম সম্পাদক পরিকল্পনাবিদ মোহাম্মদ রাসেল কবির, ঢাকার বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক পরিকল্পনাবিদ মো. আশরাফুল ইসলামসহ অন্য বিশেষজ্ঞরা।

সংলাপের মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করে অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, শহর পরিকল্পনার ক্ষেত্রে আদর্শ পরিকল্পনাগত পদ্ধতি অনুসরণ না করে বৃক্ষনিধনসহ উদ্যানের গাছপালা, পরিবেশ-প্রতিবেশ বিনষ্ট করার মাধ্যমে উন্নয়ন প্রকল্প প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা হচ্ছে, যা ঢাকার সাম্প্রতিক পরিবেশ বিপর্যয়ের একটি কারণ। ইমারত নির্মাণ বিধিমালায় সুস্পষ্টভাবে বলা আছে, পাবলিক পার্ক ও খোলা পরিসরে যেকোনো ইমারত নির্মাণের জন্য অনুমোদনের প্রয়োজন হবে। খোলা পরিসরের শতকরা ৫ ভাগের বেশি জায়গায় অবকাঠামো হতে পারবে না। অথচ এসবের কিছুই মেনে চলা হচ্ছে না।

এ সময় ঢাকার বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা প্রকল্পের পরিচালক মো. আশরাফুল ইসলাম বলেন, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের প্রস্তাবিত পরিকল্পনা ‘উন্মুক্ত স্থান, উদ্যান এবং প্রাকৃতিক জলাধার সংরক্ষণ আইন, ২০০০’-এর ধারা ও মূল চেতনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। পার্ক-উদ্যানের পরিকল্পনার ক্ষেত্রে গণশুনানি ছাড়া যেন কোনো প্রকল্প অনুমোদন দেয়া না হয়, সেদিকে লক্ষ রাখার কথাও বলেন তিনি। পাশাপাশি তিনি পেশাজীবী সংগঠনগুলোকে পার্ক-উদ্যান রক্ষায় আরো বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান।

আলোচনায় উঠে আসে, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান উন্নয়নের নামে বস্তুনিষ্ঠ পরিকল্পনাগত বিশ্লেষণ ছাড়াই প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করছে। এসব পরিকল্পনা পরিবেশের প্রতি সংবেদনশীল বা জনবান্ধব কিনা তা যাচাই করা হয় না। উন্নয়নের নামে গৃহীত প্রকল্পে কোনো গণশুনানি বা পেশাজীবী সংস্থার মতামত নেয়া হয় না। উদ্যান, পার্ক বা গণপরিসরের মতো জায়গায় কংক্রিটের অবকাঠামো নির্মাণের মাধ্যমে সামাজিক বৈষম্য সৃষ্টি করা হচ্ছে। বক্তারা অবিলম্বে এসব বন্ধের দাবি জানান।

বিআইপি সভাপতি অধ্যাপক ড. আকতার মাহমুদ এ ধরনের স্বেচ্ছাচারমূলক কাজ অবিলম্বে বন্ধের দাবি জানান। তিনি উন্মুক্ত স্থান, উদ্যান বা পার্কের চরিত্র নষ্ট করে উন্নয়ন প্রকল্পের নকশার প্রবণতা বন্ধ করে প্রকৃতি ও পরিবেশকে প্রাধান্য দিয়ে পরিকল্পনা প্রণয়নের আহ্বান জানান পেশাজীবী ও সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি।

বিআইপির সমীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান রাজধানীর পরিবেশ-প্রতিবেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণসহ মুক্তিযুদ্ধের নানা স্মৃতিও এর সঙ্গে জড়িত। তাই সঠিক পরিকল্পনার মাধ্যমে এ উদ্যানের স্মৃতি ও পরিবেশ দুটোই রক্ষা করা উচিত। – বণিক বার্তা

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত