প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

সময় নষ্ট না করে পার্বত্য চট্টগ্রামে গ্যাস অনুসন্ধান শুরু জরুরি

ডেস্ক রিপোর্ট : শনিবার এনার্জি এন্ড পাওয়ার আয়োজিত ‘মিসড অপরচুনিটি: হাইড্রোকার্বন এক্সপ্লোরেশন এই চট্টগ্রাম হিল ট্রাকস’ শীর্ষক ভার্চুয়াল সেমিনারে এমন মতামত উঠে আসে। সেমিনার সঞ্চালনা করেন এনার্জি এন্ড পাওয়ারের এডিটর মোল্লাহ আমজাদ হোসেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূ-তত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. বদরুল ইমাম বলেন, আমরা গ্যাস খুঁজে বেড়াচ্ছি। সীতাপাহাড় ও পটিয়ায় গ্যাস রয়েছে, সেখানেতো উদ্যোগ নেওয়াই যায়। আমরা এখনও সফলভাবে হিলে যেতে পারিনি। যদি আপনি ত্রিপুরা বিবেচনায় নেন, তাহলে পার্বত্য এলাকায় কোনো বিতর্ক থাকে না। ত্রিপুরার মতো একই সম্ভাবনা। ত্রিপুরা ১৬০টি কূপ খনন করে ১১টি গ্যাস ফিল্ড আবিস্কার করেছি। আর আমরা মাত্র ১৪টি কূপ খনন করেছি। ওরা কোথাও গেছে আর আমরা কোথায় পড়ে আছি। অল্প কর্মদিয়ে আমরা কি সাধন করতে চাই সেটি চিহ্নিত করা উচিত। বিদেশ নির্ভরতা থাকতে পারে, তবে পুরোপুরি নির্ভর করে বসে থাকলে চলবে না। পলিটিক্যাল কারণে অনেক সিদ্ধান্ত নেই, যা দেশের জন্য মঙ্গল হয় না। বার্মা বাংলাদেশের উপর দিয়ে ভারতে গ্যাসের পাইপলাইন নিতে চেয়েছিল, দেইনি। তখন বিএনপি সরকার ছিল।

একেকটি স্ট্যাকচারে এক-দুটি কূপ খনন করার পর গ্যাস পাওয়া না গেলে জবাবদিহি নেওয়া হয়। এটি করলে চলবে না। এটি একটি খেলার মতো, আপনি যতোই ডাটা আনেন, নিশ্চিত করে বলতে পারবে না গ্যাস পাবেন। আমাদের মাইন্ডসেট বদলাতে হবে। যারা এসব কাজের সঙ্গে জড়িত তাদের ও পলিসি মেকারদের মাইন্ডসেট বদলাতে হবে। আমরা যে পথে রয়েছি এই পথে সফলতা সম্ভব না। বাপেক্সের দুর্বলতার মধ্যে একটি দুর্বলতা হচ্ছে, তাদের এক সময় আমব্রেলা ছিল। এখন কিন্তু আমব্রেলা নেই। বাস্তবতা থেকে অনেক দূরে রয়েছি।

তিনি আরও বলেন, ত্রিপুরা ননকনভেনশনাল ওয়ে থেকে গ্যাস উত্তোলন করছে। সাধারণ এন্ট্রিক্লাইনে ড্রিল করা হয়, ওরা দুটো হিলের মধ্যে ভ্যালি থেকে সিনক্লাইনে ড্রিল করছে। তারা সিনক্লাইন রিজার্ভ থেকে গ্যাস উত্তোলন করছে। হিলে সমস্যা হলে এসব এলাকায় যেতে পারে বাপেক্স।

ইউএমসি বাংলাদেশ অপরেশনের সাবেক ভিপি এম ফরিদউদ্দিন বলেন, পার্বত্য এলাকা নিয়ে গঠিত ২২ নম্বর ব্লকের জমির পরিমাণ ৩.৩ মিলিয়ন একর। ২০টিরও বেশি ওয়াল্ড ক্লাস স্ট্যাকচার রয়েছে। ইউএ্নসি ১৪টি সট্যাকচার হাইলাইট করেছে। তারা এখানে তেলের সম্ভাবনার কথা বলেছিল। পরবর্তীতে এক্সপ্রোনেট আমেরিকা যখন আসে। তখন তারা গ্যাস তোলার উদ্যোগ নিলেন। আমি পার্টনার হিসেবে কাজ করার জন্য ২০০১ সালে গেইলের সঙ্গে যোগাযোগ করলাম। যখন পেট্রোবাংলা দেখলো ভারতীয় কোম্পানি রয়েছে তখন কাজটি করতে দেওয়া হলো না।

সীতাপাহাড়-৩ ও পটিয়া-২ এখানে ৫ টিসিএফ গ্যাস পাওয়া সম্ভব। সেখানে কি করতে হবে সব বলা আছে। করোনার কারণে বড় কোনো কোম্পানিকে আনা যাবে না। আমি সাজেস্ট করবো, যেখানে সহজে যাওয়া যায়Ñ দ্রুত এই দুইটা ফিল্ডে কাজ শুরু করা উচিত। সীতপাহাড়ে হাইপ্রেসার জোন বলা হলেও বাস্তবতা কিন্তু তা নয়। সীতাপাহাড়ে ২১ ফুট গ্যাস পাওয়া গেলো, পটিয়ার ৭ ফুট গ্যাস পাওয়া গেলো।

আপস্ট্রিম অ্যান্ড ডাউনস্ট্রিম সার্ভিসেস’র সিইও এম জসিম উদ্দিন বলেন, পটিয়ার ইতিহাস পুরনো। সেখানে ৩ হাজার মিটারে গিয়ে পাইপ আটকে যায়। দেড় হতে ২ হাজার মিটারে গ্যাস পাওয়া যায়। আর ৩ হাজার মিটারের নিচে তেলের চিহ্ন পাওয়া যায়। সীতাকুন্ডে কাজ করেছি সেখানে তেল সম্পৃক্ত স্যান্ড স্টোনে পাওয়া যায়। উথালচক্রাতে কাজ করেছি একেবারে সীমান্তে। সেখানেও তেলের স্যাম্পল কালেকশন করি।

তিনি বলেন, অস্ট্রেলিয়াম কনসালটেন্ট জন হামস এসেছিলেন তিনি প্রথম টার্বিটাইট আবিস্কার করেন। এটি একটি অস্ট্রে-আফিকান টার্ম, বিশেষ ধরনের স্তর, টার্বিটাইট স্তরে তেল ও গ্যাসের সংযোগ রয়েছে। পার্বত্য এলাকা ৮টি টার্বিটাইট স্তরের সন্ধান পান। তিনি আসাম জিওলজির সঙ্গে তুলনা করেছে। কিছু কোম্পানি রয়েছে যারা অনেক সময় সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে। এটিও একটি বড় সমস্যা, আমরা নাইকোর ক্ষেত্রে দেখেছি।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালেয়র ইনস্টিটিউট অব এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স এর পরিচালক প্রফেসর গোলাম সাব্বির সাত্তার বলেন, পার্বত্য এলাকায় প্রচুর সম্ভাবনা রয়েছে। কূপ খনন কম হয়েছে। এই সব অঞ্চলকে ড্রিলিংয়ের আওতায় আনতে পারিনি। তবে হ্যাঁ ইনটেন্স হোল্ডিং ফলের কারণে যে সমস্যাগুলো রয়েছে, রির্জাভার রকসের সার্ফেসে কিছু সমস্যা রয়েছে। তারপরও আমি মনে করি প্রুভেন পেট্রোলিয়াম সিস্টেম হিসেবে আনতে পারি। ন্যারো স্ট্যাকচারের পাশে যেগুলো রয়েছে হাইড্রোকার্বনের সম্ভাবনা রয়েছে। ত্রিপুরা এবং বাংলাদেশ একই অবকাঠামোতে অবস্থান করছে। তারা অনেক উৎপাদন করছে এই স্টাকচার থেকে। আমাদের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত দরকার। পার্বত্য এলাকা নিয়ে এনার্জির পৃথক সেল হওয়া জরুরি। আন্তর্জাতিক পেট্রোলিয়াম রাজনীতিতে সক্ষমতা বাড়ানো উচিত।

আন্তর্জাতিক জ্বালানি বিশেষজ্ঞ এনার্জি এন্ড পাওয়ার’র কন্ট্রিবিউটিং এডিটর ইঞ্জিনিয়ার খন্দকার আবদুস সালেক বলেন, গ্যাস ক্রাইসিস রয়েছে এটা সবাই জানি। বিশাল সম্ভাবনাময় এই এলাকা ফেলে রাখা মোটেই ভালো কাজ হয়নি। ওই সময়ে কেনো হয়নি, ভূ-রাজনীতির কোনো বিষয় ছিল কিনা বলা কঠিন।

ওইখানে পাইপ স্টাক হতে পারে, ফিসিং হতে পারে। তখন বাপেক্স কি সিঙ্গাপুর থেকে সরাসরি যন্ত্রপাতি আনতে পারবে। জরুরি ভিত্তিতে পিএসসি অথবা জেভি করা উচিত। অবশ্যই সেখানে প্রণোদনা দেওয়া উচিত। ব্লো আউট হতে পারে, সেই ঝুঁকি বিবেচনা করেই যেতে হবে। এখানে গ্যাস এবং তেলের সম্ভাবনা রয়েছে। বাপেক্সকে স্বাধীনতা দিতে হবে কাজ করার জন্য। তাদের বোর্ডকে শক্তিশালী করতে হবে। ওএনজিসি মডেল ফলো করতে দেন। বাপেক্সকে কখনই পেট্রোবাংলা নিজের সন্তান মনে করেনি।

মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাপেক্সের সাবেক এমডি মর্তুজা আহমেদ ফারুক। তিনি বলেন, আমরা দীর্ঘদিন যাবত গ্যাস সংকটের মধ্যে আছি। অনুসন্ধান কার্যক্রম যেভাবে করা উচিত ছিল যেভাবে করতে পারিনি। বিশেষ করে পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে যে বিশাল সম্ভাবনা ছিল কাজে লাগাতে পারিনি। পার্বত্য এলাকায় ১১০ বছরে ১৪টি কূপ খনন করা হয়েছে। ১টি ডিসকভার হয়েছে সেমুতাং (১৯৬৯)। বিশেষ করে পটিয়া জলদ্ধি সীতাপাহাড়, ও কাচালং স্ট্যাকচার খুবই সম্ভাবনাময়।

ইন্ডিয়াল ওয়েল, বার্মা ওয়েল ওজিডিসি কাজ করেছে। বাপেক্স কোনো কূপ খনন করেনি এখানে।। সীতাকুন্ডে ইন্ডিয়াল ওয়েল কোম্পানি মাত্র হাজার মিটার খনন করতে পেরেছিল। জিওলজিক্যাল কারণে বেশি করতে পারেনি। সীতাপাহাড়ে ২হাজার মিটার করতে গিয়ে ব্লো আউট হয়েছে। সীতাকুন্ড-৫ কূপ খনন করতে ৪ বছর সময় লেগেছে। কারণ বেশ কিছু হেজার্ড ছিল। এই এলাকাটি বেশ জটিল। অনেকে মনে করে বাপেক্স সব জায়গায় পারবে। কিন্তু এখানে অনেক জটিল, কোনো জটিলতা তৈরি হলে বাপেক্স দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। এটি তাদের বড় বাঁধা।

পার্বত্য এলাকা খুবই সম্ভাবনাময়। ভালো ভালো ১৭টি স্ট্যাকচার রয়েছে। অনেক কূপ খনন করা দরকার। একটি কূপ খনন করার পর উন্নয়নের সময়ে ড্রাই হয়ে যেতে পারে। সেখানে একাধিক কূপ খননের প্রয়োজন পড়তে পারে। গ্যাস রিসোর্স ২০১১ সমীক্ষায় দেখা গেছে ১১টি স্ট্যাকচারে ৪৩ টিসিএফ, ২৩ টিসিএফ উত্তোলনযোগ্য বলা হয়েছে।

অনসোর পার্টে বেশিকিছু সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছে। ১১ টিসেএফ গ্যাসের বিষয়ে সম্ভবনাময় বলা হয়েছিল। কেনো সম্ভাবনাময় বলছি, উপরে ত্রিপুরা এবং পাশে মায়ানমার অনেক গ্যাস আবিষ্কার করেছে। ত্রিপুরা ১১টি গ্যাস ফিল্ড আবিষ্কার করেছে। ৭টি গ্যাস ফিল্ডের ৭৫টি কূপ দিয়ে দৈনিক উৎপাদন করছে ১৫০ এমএমসিএফডি। আগামী ২ বছরের মধ্যে ১৫৩টি কূপ খননের পরিকল্পনা নিয়েছে। তার নিচেই পার্বত্য চট্টগ্রাম আমরা নিয়ে বসে আছি। বিষয়টি অবহেলিত হয়ে আছে। সেইভাবে কাজ হয়নি বললেই চলে।

২০১০ সালে একটি কোম্পানি উন্নয়ন প্রস্তাব দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে। পরে মন্ত্রণালয় মিটিং করে, কিভাবে জেভি করা যায়, তখন বাপেক্স আগ্রহি দেখিয়েছিল। থাইল্যান্ডের পিটিটিপি, মালয়েশিয়ার পেট্রোনাস, রাশান গ্যাজপ্রমসহ অনেক কোম্পানিকে চিঠি পাঠানো হয়। ৫টি কোম্পানি আগ্রহ দেখায় ফাইনালি ২টি প্রস্তাব পাওয়া যায়। একটি প্রস্তাব অসম্পূর্ণ দেখা যায়, সিনোপেক সিংলির প্রস্তাবের ভিত্তিতে সঙ্গে একটি প্রাথমিক চুক্তি করা হয়। তারা ১০০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করার কথা ছিল। গ্যাসের দামের প্রস্তাব করা হয়েছিল ২.৭ ডলার প্রতি এমসিএফ। যা নাইকোর ক্ষেত্রে ছিল ২.১ ডলার।

তাদের প্রস্তাবে ৪টি স্ট্যাকচারে ৫০ শতাংশ ৫টিসিএফ গ্যাসের সম্ভাবনার কথা বলেছিল। তখন সংকট ছিল, মন্ত্রণালয় হোক আর পেট্রোবাংলার কারণে হোক চুক্তিটা আর হয়নি। তারা কাজ করলে অনেক বড় কাজ হতে পারতো। ওশান এনার্জির কাছে অনেক ইনফরমেশন ছিল। সে কারণে তারাও উচ্চাভিলাসী ছিল।

২০১৫ সালে আবার বাপেক্স ৪টি স্ট্যাকচারের বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়া হয়। ৪টি কোম্পানি শর্টলিস্ট করা হয়। চায়নার জিওজেড পেট্রোলিয়াম কোম্পানি প্রস্তাবটি ভালো বিবেচনা করা হয়। তাদের প্রস্তাবটিতে বাপেক্সের শেয়ার বাড়ানো হয়। মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনও পাওয়া যায়। কিন্তু চুক্তির আগে কোম্পানিটি পিছিয়ে যায়। এরপর যে উদ্যোগ নিয়েছিল সেটি আর হয়নি। পাহাড়ি এলাকায় অনেক সম্ভাবনা রয়েছে। তবে শুধু বাপেক্সের একার পক্ষে সম্ভব না। ন্যাশনাল কোম্পানির জন্য টেকনিক্যাল এবং ফিন্যান্সিয়ালি জটিল। বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে, হাইপ্রেসার জোনে কাজ করতে হবে। বাপেক্সকে যদি দেওয়া হয়, হাই ক্যাপাসিটি রিগ লাগে, ব্লোআউট হতে পারে, তখন দ্রুত বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিতে হয় যা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের পক্ষে কঠিন।

তিনি বলেন, আমাদের গ্যাস ক্রাইসিস যেটা রয়েছে। পার্বত্য এলাকায় দ্রুত কাজ করার বিকল্প নেই। জেভি করে হতে পারে, আবার পিএসসির অধিনেও হতে পারে। অভিজ্ঞ কোম্পানির সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করে এগিয়ে নেওয়া উচিত। নিঃসন্দেহে বলা যায় এখানে কাজ করলে গ্যাস সংকট দূর করতে সহায়ক হবে।

সুপারিশমালা : ১. পটিয়া ও সীতাপাহাড়ে গ্যাসের আধার রয়েছে দ্রুত গ্যাস উত্তোলনে যাওয়া উচিত। ২. পার্বত্য এলাকায় দ্রুত কাজ করার বিকল্প নেই, জেভি/পিএসসির অধিনে হতে পারে। ৩. বিদেশ নির্ভরতা থাকতে পারে, তবে পুরোপুরি নির্ভর করে বসে থাকলে চলবে না। ৪. পার্বত্য এলাকায় গ্যাসের বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। ৫. বাপেক্সের পক্ষে পিপিআর ফলো করে কাজ করা কঠিন। ৬. বাপেক্সকে কাজের স্বাধীনতা দিতে হবে, বোর্ডকে শক্তিশালী করা দরকার। ৭. পার্বত্য এলাকা নিয়ে এনার্জির পৃথক সেল হওয়া জরুরি।

সর্বাধিক পঠিত