প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

[১] মৃত্যুর পরও দেখার মতো কেউ নেই তাই আমার শেষ ঠিকানা বৃদ্ধাশ্রম !

হ্যাপি আক্তার: [২] ছেলেমেয়েদের সুখের জন্য নিজের বাড়ি ছেড়ে ঠাঁই পান রাজধানীর আগারগাঁওয়ের বাংলাদেশ প্রবীণ হিতৈষী নিবাসে। সমবয়সীদের সঙ্গে জীবনের গল্প করে সময় কাটাচ্ছিলেন ৭০ বছরের জামালপুরের মাহমুদা আলম। কিন্তু এপ্রিলের দ্বিতীয় সপ্তাহে করোনা শনাক্ত হয় তার। এর তিন দিনের মাথায় পাড়ি জমান পরপারে। মাহমুদা আলমের ব্যক্তিগত নথি ঘেঁটে তার ছেলে ও মেয়ের মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করেন প্রবীণ হিতৈষী সংঘের কর্মকর্তারা।

[৩] প্রবীণ হিতৈষী সংঘের কর্মকর্তারা বলছেন, সমাজসেবা অধিদপ্তর পরিচালিত ৫০ শয্যাবিশিষ্ট বৃদ্ধাশ্রমে এ মুহূর্তে ৪৩ বৃদ্ধ ও বৃদ্ধা রয়েছেন।

[৪] মাহমুদা আলম এর খবর দেয়ার জন্য সাত থেকে আটবারের চেষ্টায় যোগাযোগ হয়। কিন্তু মায়ের মৃত্যুর সংবাদ পেয়েও প্রিয় মুখখানি শেষবারের মতো দেখা বা মরদেহ নেওয়ার বদলে আপনজনেরা জানিয়ে দেন, সরকারি উদ্যোগেই যেন লাশ দাফন করে দেওয়া হয়। প্রবীণ নিবাস থেকে সরকারি উদ্যোগেই মরদেহ দাফনের ব্যবস্থা করা হবে। তবে স্বজনদের আসতে হবে। এরপর তাই হয়।

[৫] ২০২০ সালের বৈশ্বিক করোনা মহামারীর পর করোনা বা বার্ধক্যজনিক এবং নানা জটিলতায় প্রাণ হারিয়েছেন এখানকার চারজন। কিন্তু করোনা পজিটিভ ছাড়াও প্রতিটি মৃত্যুর ঘটনাতেই দেখা গেছে, বাবা-মায়ের লাশ গ্রহণ করতে চান না তাদের ছেলেমেয়েরা। এ বিষয়ে সংঘের সভাপতি মো. আবদুল মান্নান আমাদের সময়কে বলেন, ‘নিবাসীদের মধ্যে যারা এখানে মারা যান, তাদের আত্মীয়স্বজনরা ফোন ধরেন না। ফোন ধরলেও আসতে চান না। বলে- আপনারা মাটি দিয়ে দেন। কিন্তু এখানে প্রবীণদের ভর্তির সময় আত্মীয়স্বজনদের কাছ থেকে লিখিত নেওয়া হয় যে, তারা নিবাসীর যে কোনো সমস্যায় ডাকলে আসতে বাধ্য। সে অনুযায়ী স্বজনেরা এসে পরে অ্যাম্বুলেন্সে করে লাশ নিয়ে যায়।’ প্রবীণ সংঘ কর্তৃপক্ষ ও প্রবীণদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, যারা এখানে ঠাঁই পান তাদের মধ্যে শিক্ষক, ডাক্তার, গবেষক ও ব্যাংকার উল্লেখযোগ্য। বেশিরভাগই পেনশন

[৬] বা নিজেদের সঞ্চয়ের অর্থে এখানকার ব্যয় সামলান। স্বামী বা স্ত্রীর মৃত্যুর পর একাকিত্ব, ছেলেমেয়েরা চাকরি, ব্যবসায় ব্যস্ত বা বিদেশে রয়েছেন- এমন নানাবিধ কারণে প্রবীণরা স্বেচ্ছা বা বাধ্য হয়ে এখানে ভর্তি হন। কমিউনিটি বৃদ্ধ-বৃদ্ধার সঙ্গে জীবনের গল্প বিনিময়, লাইব্রেরিতে বই পড়া, গান, ছবি এঁকে সময় কাটান তারা। পেছনের দিনগুলোয় নিজের একটু ভুলের কারণে কষ্ট লালন, মান-অভিমানের গল্পও আছে আগারগাঁও আইডিবি ভবনসংলগ্ন এ বহুপরিবারে। এভাবে এক যুগ বা তারও বেশি বসবাসের পর একে একে জীবন সায়াহ্নে চলে গেছেন অনেকে।

[৭] তাদেরই একজন শেখ মুজিবুল হক (৮০)। ১৯৯৫ সালে স্ত্রীর মৃত্যুর পর থাকছেন গত ২৫ বছর ধরে। কাস্টমস কালেক্টরেট বাবার চাকরির সুবাদে তার জন্ম রংপুরে। পৈতৃক নিবাস ছিল যশোর শহরের শেখপাড়ায়।

[৮] জীবনের এতগুলো বছর কেটে গেলেও মনের দিক থেকে তারুণ্যদ্বীপ ও অভিমানী শেখ মুজিবুল হকের ভাষ্য, স্ত্রী আমাকে কখনো বিশ্বাস করত না। ভাবত প্রেম-পরকীয়া করছি। তবে আমি যে প্রেমে বিশ্বাসী নই, নিজের গ-ির ভেতরে চলতাম। আবার বাবা চাইছিলেন যেন কমার্সে পড়ি, ঢাকা কলেজে ভর্তি হলাম ইংরেজি সাহিত্যে। পড়াশোনা শেষে জাপানে স্কলারশিপ পেলাম। সেখানেও যাওয়া হয়নি। এর পর লালমাটিয়ার বাডস ইন্টারন্যাশনাল কলেজে শিক্ষকতার চাকরি নিই। সব সঞ্চয়ে ধানমন্ডির শঙ্করে একটি ভবনের পুরো এক ফ্লোর কিনে লিখে দিই এক ছেলে ও তিন মেয়ের নামে। বাবা বেঁচে থাকতে সব সম্পত্তি লিখে দেন ফুফুদের নামে। এদিকে স্ত্রীও মারা যায়। এখন পরিবারের এতগুলো মানুষের মধ্যে আমার জায়গা কী আর হবে, তাই বড় বোন এখানে রেখে যায়। এই তো বেশ ভালো আছি। দেখছেন না কেমন সুন্দর পরিবেশ, বিনা পয়সায় বাতাস খাই। আমি বাসায় যেতে চাইলেও তারা বলবে জায়গা নেই…।

[৯] প্রবীণ নিবাসে বসে মাঝে মাঝে ক্যানভাসে ছবি আঁকেন শেখ মুজিবুল হক। গাছপালা, পরিবেশ, প্রকৃতির ছবি। আঁকেন না মানুষ, জীবজন্তু নিয়ে। প্রবীণ নিবাসের দুটি ভবনের মাঝে সবুজ আচ্ছাদিত বিশাল জায়গা সেখানে বসে গল্প করেন কমিউনিটির সদস্যদের সঙ্গে। এরই মধ্যে তার মতো ১২-১৩ জন প্রবীণ হারিয়ে গেছেন, এখন নিজেকে নিয়ে চিন্তা।

[১০] বড় মেয়ে একটা চাকরি করে, সেই প্রবীণ নিবাসের খরচ বহন করছে। আর কেউ খবর নেয় না। ২৫ বছর আগে বৃদ্ধাশ্রমে যে টেলিভিশনটি নিয়ে এসেছেন তাতেও গত কয়েকমাসে সমস্যা দেখা দিয়েছে। টাকার অভাবে সারতে পারি না। কেন জানি আমার সব স্বপ্ন শেষ হয়ে গেছে…। সূত্র: আমাদের সময়

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত