প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

প্রবীর বিকাশ সরকার: রবীন্দ্রনাথ এবং শিল্পী তাইকান

প্রবীর বিকাশ সরকার: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অনেক জাপানি ভক্ত ছিলেন তাঁর জীবদ্দশায়। অধিকাংশই ছিলেন অভিজাত বংশের। বিভিন্ন স্তরের জাপানিদের সঙ্গে তাঁর গভীর বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছিল এবং মৃত্যু পর্যন্ত সম্পর্ক বজায় ছিল। জাপান সম্পর্কিত প্রথম দিকের ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের মধ্যে য়োকোয়ামা তাইকান (১৮৬৮-১৯৫৮) অন্যতম প্রধান। তাইকান জাপানের ইবারাকি-প্রিফেকচারস্থ মিতো-হান অঞ্চলের এক সম্ভ্রান্ত সামুরাই পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। বাল্যকালে তাঁর নাম ছিল সাকাই হিদেমারো। পরবর্তীকালে মাতৃবংশের পদবি য়োকায়ামা এবং নাম হিসেবে তাইকান গ্রহণ করেন।

য়োকোয়ামা তাইকান আধুনিক জাপানের উষালগ্নে প্রতিষ্ঠিত মেইজি সরকার কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত টোকিও জাতীয় চারুকলা ও সঙ্গীত বিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন, বর্তমানে এটা বিখ্যাত তোওকিয়োও গেইদাই বা টোকিও চারুকলা বিশ্ববিদ্যালয়। পরবর্তীকালে শিল্পগুরু মনীষী ওকাকুরা তেনশিনের (১৮৬৩-১৯১৩) প্রতিষ্ঠিত নিহোন বিজুসুৎইন বা জাপান চারুকলা ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থী ছিলেন। পরিণত বয়সে জাপানি ঐতিহ্যগত চিত্রকলার অন্যতম প্রধান শিল্পী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন এবং আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও তাঁর সুনাম প্রতিষ্ঠিত হয়।

১৯০৩ সালে য়োকোয়ামা তাইকান ও হিশিদা শুনসোও (১৮৭৪-১৯১১) শিক্ষাগুরু ওকাকুরা তেনশিন কর্তৃক ভারতে প্রেরিত হয়েছিলেন বিশেষ কাজ করার পরিকল্পনাধীনে। পরিকল্পনাটি ছিল ত্রিপুরার নতুন রাজপ্রসাদে দেয়ালচিত্র অঙ্কন। জানা যায়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শিল্পাচার্য ওকাকুরা তেনশিনকে অনুরোধ করেছিলেন কাজটি করে দেবার জন্য। কিন্তু ব্রিটিশ সরকার অনুমোদন দেবে না ওকাকুরাকে ভারতে যেতে। তাই তিনি তাঁর সবচেয়ে প্রিয় শিষ্যদের মধ্যে দুজনকে ভারতে পাছিয়েছিলেন। কিন্তু তাঁরাও কাজটি করতে পারেননি, সরকারের অনুমোদন মেলেনি। ফলে বেশ অর্থকষ্টে পড়ে যান দুজনে। তখন তাঁরা ছবি এঁকে কলকাতার ল্যান্ড রোড নামক ক্লাবে প্রদর্শনী এবং বিক্রি করেন। ফেব্রুয়ারি মাসের ১৩ তারিখ থেকে জুন মাসের মাঝামাঝি পর্যন্ত প্রায় চার মাস তাঁরা কলকাতায় সুরেন্দ্রনাথ ঠাকুরের বাড়িতে অবস্থান করেন। জোড়াসাঁকোস্থ ঠাকুর পরিবারের সঙ্গে তাঁদের ঘনিষ্ঠতা গড়ে ওঠে। অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর, গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর, নন্দলাল বসু, অসিত হালদার প্রমুখের সঙ্গে জাপান-ভারত শিল্পকলা বিষয়ে মতবিনিময় করেন। তখনই রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে গভীর বন্ধুত্ব হয় তাইকানের যা কখনো ছিন্ন হয়নি। ১৯১৬ সালে রবীন্দ্রনাথ যখন প্রথম জাপান ভ্রমণে আসেন তখন টোকিওর উয়েনো শহরস্থ তাঁর বাসভবনে প্রথমবার নয় দিন (৫ জুন থেকে ১৩ জুন) আতিথ্যগ্রহণ করেছিলেন। তারপর ১৪ জুন থেকে বন্দরনগরী য়োকোহামায় অবস্থিত অভিজাত রেশমবণিক হারা তোমিতারোও’র (১৯৬৮-১৯৩৯) সুবিখ্যাত সবুজের অমরাবতী ‘সানকেইএন’ বাগানবাড়িতে প্রায় তিন মাস অবস্থান করেন নভেম্বর মাসের ১ তারিখ পর্যন্ত। আগস্ট মাসের ২৫ তারিখ বন্ধুবর ওকাকুরার বাড়ি ইজুরা থেকে ফেরার পথে তাইকানের বাড়িতে একরাত যাপন করেন।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সর্বমোট পাঁচবার জাপানের মাটিতে পা রাখেন যথাক্রমে, ১৯১৬, ১৯১৭, ১৯২৪ এবং ১৯২৯ সালে দুবার। প্রতিবারই শিল্পী তাইকান রবীন্দ্রনাথকে অভ্যর্থনা জানিয়েছেন, তাঁর সান্নিধ্যে থেকেছেন। ১৯৫৮ সালে যখন জাপানে রবীন্দ্রনাথের জন্মশতবর্ষ উদযাপনের উদ্যেগ গ্রহণ করা হয় তিনি বার্ধক্যজনিত রোগে আক্রান্ত হওয়া সত্ত্বেও সাড়া দিয়ে অংশগ্রহণ করেছেন। যদিওবা ১৯৬১ সালের মূল অনুষ্ঠান পর্যন্ত তিনি আর বেঁচে থাকেননি, তবে অনুষ্ঠান উপলক্ষে প্রকাশিত বুলেটিন ‘সাচিয়া’ বা ‘সত্য’র একটি সংখ্যায় মুদ্রিত তাইকানপত্নী য়োকোয়ামা শিজুকোর স্মৃতিকথা থেকে জানা যায় যে, রবীন্দ্রনাথের আরাম-আয়েশ এবং আপ্যায়নের কোনো ত্রুটি রাখেননি স্বামী-স্ত্রী দুজনেই।

ভারতে থাকাকালীন বিভিন্ন ঐতিহাসিক স্থান তাইকানরা ভ্রমণ করেছেন। বিশেষ করে পাশ্চাত্যশৈলীতে নির্মিত কলকাতা শহর, পবিত্র গঙ্গা নদী এবং ভারতীয় পৌরাণিক দেবদেবীর প্রভাবে গভীরভাবে আচ্ছন্ন হয়েছিলেন তাইকান। জাপানে ফিরে এসে তাই বেশকিছু ছবি এঁকেছিলেন, যা কালজয়ী হয়ে আজও তাঁর ভারতপ্রীতিকে আমাদের সামনে তুলে ধরে।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর এই জাপানি-শিল্পীবন্ধু সম্পর্কে কি বলেছেন তাঁর ভ্রমণলিপি ‘জাপান-যাত্রী’তে জেনে নেয়া যাক: ‘টোকিওতে আমি যে-শিল্পীবন্ধুর বাড়িতে ছিলুম সেই টাইক্কানের (তাইকান) নাম পূর্বেই বলেছি, ছেলেমানুষের মতো তাঁর সরলতা, তাঁর হাসি তাঁর চারি দিককে হাসিয়ে রেখে দিয়েছে। প্রসন্ন তাঁর মুখ, উদার তাঁর হৃদয়, মধুর তাঁর স্বভাব। যতদিন তাঁর বাড়িতে ছিলুম, আমি জানতেই পারিনি তিনি কতো বড় শিল্পী। ইতোমধ্যে য়োকোহামায় একজন ধনী এবং রসজ্ঞ ব্যক্তির আমরা আতিথ্য লাভ করেছি। তাঁর এই বাগানটি নন্দনবনের মতো এবং তিনিও সকল বিষয়ে এখানকারই যোগ্য। তাঁর নাম হারা। তাঁর কাছে শুনলুম, য়োকোয়ামা টাইক্কান এবং কানজান শিমোমুরা আধুনিক জাপানের দুই সর্বশ্রেষ্ঠ শিল্পী। তাঁরা আধুনিক য়ুরোপের নকল করেন না, প্রাচীন জাপানেরও না। তাঁরা প্রথার বন্ধন থেকে জাপানের শিল্পকে মুক্তি দিয়েছেন। হারার বাড়িতে টাইক্কানের ছবি যখন প্রথম দেখলুম, আশ্চর্য হয়ে গেলুম। তাতে না আছে বাহুল্য, না আছে শৌখিনতা। তাতে যেমন একটা জোর আছে তেমনি সংযম।’

এহেন বিশ্বমাপের চিত্রশিল্পী য়োকোয়ামা তাইকান তাঁর শিক্ষাগুরু ওকাকুরা তেনশিন এবং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে কেমন দেখেছেন আর বুঝেছেন তাঁর এক সাক্ষাৎকার থেকে জানা যায়,http://d.hatena.ne.jp/tagore150japan/ 20110425/1303687797। জানা যায় এমন কিছু তথ্য যা অন্যত্র পরিষ্কার করে কেউ জানাননি, এমনকি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও লেখেননি। তাঁর বক্তব্য থেকে চারটি কৌতূহলোদ্দীপক তথ্য পাওয়া যায় যা নতুন করে ভেবে দেখার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, তাইকানের ভাষ্য থেকে জানা যাচ্ছে যে, ওকাকুরা তেনশিন ভারতের নিদ্রিত থাকাটা পছন্দ করেননি। উষ্মা প্রকাশ করেছেন বিপ্লবী সুরেন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাছে। সুরেন্দ্রনাথের বাড়িতে তিনি আতিথ্য গ্রহণ করেছিলেন। ওকাকুরা ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের কথা জানতেন খুব ভালো করেই। তিনি সুরেন্দ্রনাথের বাড়িতে তরুণসমাজকে উদ্বুদ্ধ করে তুলতেন স্বাধীনতা আন্দোলন এবং অর্জনের জন্য। তরুণরাও সমবেত হতেন সুরেন্দ্রনাথের বাড়িতে। সেই সময় এভাবে তরুণসমাজকে উস্কে দেবার মতো কোনো নেতা ছিল বলে মনে হয় না কলকাতায়, কারণ ১৯০২ সাল বলে কথা। তার ১৬ বছর আগে ১৮৮৫ সালে গঠিত হয়েছে ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেস পার্টি, প্রথম জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক সংগঠন। তাও গঠিত হয়েছে আইসিএস অ্যালান অক্টাভিয়ান হিউম (১৮২৯-১৯১২) নামক একজন প্রভাবশালী ইংরেজ রাজকীয় কর্মকর্তার উদ্যোগে। আর আরেক বিদেশি জাপানি মনীষী, শিল্পাচার্য ওকাকুরা তেনশিন কলকাতায় এসে তরুণদেরকে জাতীয়তাবাদে উদ্বুদ্ধ করছেন। য়োকোয়ামা তাইকানের ভাষ্য অনুযায়ী, সুরেন্দ্রনাথের বাড়িটি তরুণদের সমাবেশকেন্দ্র হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

১৯০২ সালে কলকাতায় বিপ্লবী সংস্থা ‘অনুশীলন সমিতি’ গঠনের পেছনে ওকাকুরা তেনশিনের প্রভাব যে কাজ করেছিল সেই বিষয়ে যে বিতর্ক রয়েছে বাঙালি বুদ্ধিজীবী মহলে তার একটি সমাধানের আলো দেখা যাচ্ছে এই সাক্ষাৎকারে। ওকাকুরার একনিষ্ঠ শিষ্য এবং রবীন্দ্রনাথের বিশ্বস্ত বন্ধু য়োকোয়ামা তাইকান যে অসত্য কিছু বলেননি তা বলাই বাহুল্য। ওকাকুরার ভারত ভ্রমণের ১৩ বছর পর অর্থাৎ ১৯১৫ সালে তিনি এই সাক্ষাৎকার দেন। এমনকি জাপানি যেসকল গবেষকরা এই বিতর্কিত বিষয়টি নিয়ে সংশয়ে আছেন তাঁরাও এই বক্তব্য পাঠ করে দেখতে পারেন।

দ্বিতীয়ত, ওকাকুরা ভারতকে নিয়ে রাজনৈতিকভাবে ব্যঙ্গাত্মক একটি পুস্তিকা রচনা করেছিলেন মূলত ভারতবাসীকে স্বাধীনতার লক্ষ্যে জাগিয়ে তোলার জন্য যা ব্রিটিশ কর্মকর্তারা পুড়িয়ে ফেলে আবর্জনায় নিক্ষেপ করে। শুধু তাই নয়, ওকাকুরা ভারতীয় বুদ্ধিজীবী মহলে স্বাধিকারের আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছিলেন। পরবর্তীকালে সেই আগুন অসংখ্য শিখা হয়ে দাবানলে পরিণত হয়েছিল। তাইকানের নির্ভুল সূত্র ধরেই বলতে হয়, সেই অসংখ্য শিখার অন্যতম মহাবিপ্লবী রাসবিহারী বসু ও বিপ্লবী হেরম্বলাল গুপ্ত জাপানে সেই স্বাধিকার আন্দোলনের আগুন বুকের ভেতরে লুকিয়ে জাপানেও নিয়ে এসেছিলেন ১৯১৫ সালে।

উল্লেখিত সেই ‘পুস্তিকা’টির কথা আমরা জানি না, তাইকানও নাম উল্লেখ করেননি। ভীষণ কৌতূহল জাগায় যে, সেই পুস্তিকায় কী লিখেছিলেন, কী এঁকেছিলেন ওকাকুরা যা ব্রিটিশ সরকারের কর্মকর্তাদের প্রচণ্ড বিরাগের কারণ হয়েছিল! সেই পুস্তিকার অনুসন্ধান জরুরি বলে মনে করি। বলা বাহুল্য, কলকাতায় অবস্থানকালে ভারতের স্বাধীনতাকামী স্বামী বিবেকানন্দ, সুরেন্দ্রনাথ ঠাকুর, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ভগিনী নিবেদিতা, মিসেস ওলে বুল প্রমুখের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা, তরুণসমাজকে উদ্দীপ্ত করা, পুস্তিকা প্রকাশ এবং তাঁর প্রথম গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ ‘The Ideals of the East’ (London: J. Murray, 1903) এর পাণ্ডুলিপি তৈরি ইত্যাদি কাজের জন্য ব্রিটিশ গোয়েন্দারা তাঁর গতিবিধির ওপর কঠোর নজরদারি আরোপ করেছিল। যে-কারণে তাঁর দু-দুটো পরিকল্পনা ব্যর্থতায় পর্যবশিত হয়। তাইকানের সাক্ষাৎকারে সে-দুটি পরিকল্পনার কথা বিধৃত হয়েছেও। একটি হচ্ছে ১৮৯৩ সালে আমেরিকার শিকাগো শহরে অনুষ্ঠিত বিশ্ব ধর্ম সম্মেলনের আদলে জাপানের কিয়োতো শহরেও একটি বৌদ্ধধর্ম মহাসম্মেলনের আয়োজন। এ ব্যাপারে ওকুকারা অনেক দূর এগিয়ে গিয়েছিলেন। স্বামী বিবেকানন্দকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন কিন্তু শারীরিক অসুস্থতার কারণে তিনি রাজি হননি। ওকাকুরার কলকাতায় অবস্থানকালে স্বামীজি দেহত্যাগ করলেন ১৯০২ সালেই। তথাপি, সম্মেলনটি করার জন্য দৃঢ়প্রতীজ্ঞ ছিলেন ওকাকুরা, সুরেন্দ্রনাথ ঠাকুরও আর্থিক সহযোগিতা দিয়েছিলেন কিন্তু সেটা বাস্তবায়ন হয়নি কারণ ১৯০২ সালের ৩০ শে জানুয়ারি ইঙ্গো-জাপান মৈত্রী চুক্তি হয়ে যায়। ওকাকুরা চেয়েছিলেন এই সম্মেলনের মাধ্যমে প্রাচ্যবাসীর আধ্যাত্মিক চেতনাকে জাগিয়ে দিয়ে একটি ঐক্য গড়ে তুলতে, যা ব্রিটিশ শাসক সঙ্গত কারণেই সুনজরে দেখেনি। অন্যটি হচ্ছে, ত্রিপুরা রাজ্যের রাজপ্রাসাদের সাজসজ্জার পরিকল্পনা। যা আগে উল্লেখ করেছি।

ফলে প্রায় চারটি মাস তাঁরা কলকাতায় অবস্থান করত দুদেশের শিল্পকলা নিয়ে মতবিনিময়, চিত্রকর্ম প্রদর্শনী এবং নানা স্থানে ভ্রমণ করে কাটিয়ে দিয়েছেন। বস্তুত, তাঁদের ওপরও ব্রিটিশ গোয়েন্দাদের যে নজরদারি ছিল না তা আর না বললেও চলে। তৃতীয়ত, তাইকানের ভাষ্য থেকে জানা যায়, ওকাকুরা বুদ্ধগয়ায় ভগবান বুদ্ধের আধ্যাত্মিক স্মৃতি রক্ষার্থে মন্দির নির্মাণের জন্য জমি ক্রয় করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ব্রিটিশ শাসকদের বিরোধিতায় সেটা সম্ভবপর হয়নি। এই বিষয়ে বিতর্ক ও সংশয় বিদ্যমান। তাইকানের ভাষ্য থেকে পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে, ওকাকুরা বুদ্ধগয়ায় কোনো জমি ক্রয় করতে পারেননি, সুতরাং কোনো স্থাপত্যও নির্মিত হয়নি। পরবর্তীকালে অবশ্য হয়েছিল তবে অন্য জাপানিদের দ্বারা।

উল্লেখ্য যে, নয় মাস (৩১.১২.১৯০১-৫.১০.১৯০২) ভারতে অবস্থানকালে ওকাকুরা অজন্তা, ইলোরাসহ নানা জায়গা ভ্রমণ করেছেন। কিন্তু তিনি তিন বার পবিত্র বুদ্ধগয়া পরিদর্শনে যান এবং নাতিদীর্ঘকাল অবস্থান করেন। ভগবান বুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত এই তীর্থস্থানটি তাঁকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। গৌতম বুদ্ধ বিহার প্রদেশের নিরঞ্জনা নদীর তীরে অশ্বত্থ তথা বোধিবৃক্ষের নিচে কঠোর তপস্যার মধ্য দিয়ে বুদ্ধত্ব অর্জন করেছিলেন। এই ঐতিহাসিক ঘটনা যে ওকাকুরার কাছে বৌদ্ধধর্মের আধ্যাত্মিক চেতনার মহান কীর্তি এবং রোমাঞ্চকর ঘটনা হিসেবে প্রতিভাত হয়েছিল তা বলাই বাহুল্য। সেই সময় শ্রীলঙ্কার বৌদ্ধ মহাপুরোহিত অনাগারিক ধর্মপালের (১৮৬৪-১৯৩৩) নেতৃত্বে বৌদ্ধধর্মের নবজাগরণের আন্দোলন গড়ে উঠেছিল যেটা ওকাকুরাকে প্রভূত প্রভাবিত করেছিল।

চতুর্থত, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জাপান ভ্রমণের উপলক্ষ বা উদ্দেশ্য কী ছিল-এই বিষয়ে তাইকানের ভাষ্য থেকে পরিষ্কার হওয়া যাচ্ছে। যেহেতু কলকাতায় রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতা গড়ে উঠেছিল তিনি অনুধাবন করেছিলেন রবীন্দ্রনাথের জাপান ভ্রমণের কী কারণ থাকতে পারে? জাপান বিষয়ে কৌতূহল নিবারণের জন্য তাইকানের সঙ্গে কি তিনি আলাপ-আলোচনা করেননি? অথবা তাইকানের আগে ওকাকুরা তেনশিন এবং তাঁর সঙ্গী তরুণ বৌদ্ধভিক্ষু হোরি শিতোকুর (১৮৭৬-১৯০৩) সঙ্গে বন্ধুত্ব হলে পরে তাঁদের চিন্তা-ভাবনা এবং আচার-আচরণে জাপানি সংস্কৃতির প্রতিফলন কি রবীন্দ্রনাথ প্রত্যক্ষ করেননি? নিশ্চয়ই করেছিলেন। এই দুই জাপানি নাগরিকের দ্বারা যে একই এশিয়ার প্রাচীন এক সভ্যতা জাপানকে জানার ও দেখার আগ্রহ রবিঠাকুরকে উদ্বেল করেছিল তা আর না বললেও চলে। তাইকান তাই যথার্থ বলেছেন, রবীন্দ্রনাথের জাপান ভ্রমণের লক্ষ্য সম্পর্কে যা কবিগুরু তাঁর কোনো রচনায় কখনো উল্লেখ করেছেন বলে জানা নেই। তাইকান বলেছেন: ‘রবীন্দ্রনাথের জাপান ভ্রমণের উপলক্ষ জাপানি জনগণের অভ্যন্তরীণ জীবনযাপন দর্শন করা বলে মনে হয়। জাপানের পাহাড়ি জল, জাপানের পুরনো শিল্পসামগ্রী দেখার চেয়ে, জাপান দেশের জনসাধারণের মানসিক অবস্থা, জাতিগত চরিত্রের মূল ভিত্তি এবং আধ্যাত্মিক সংস্কৃতির অগ্রগতিকে দেখার প্রত্যাশা। সম্রাটের সঙ্গে সাক্ষাৎ, অভ্যর্থনার সরগরমকে বাদ দিয়ে বরং গ্রামীণ জনজীবন, মন্দিরে পুরোহিতদের জীবনযাপনের স্বাদ গ্রহণ পর্যন্ত-সর্বত্রব্যাপীই তিনি কবি হিসেবে প্রতিভাত।’

বস্তুত, তাইকানের বর্ণনা থেকেই সুস্পষ্ট যে, রবীন্দ্রনাথের তৃষ্ণা ছিল ভিন্ন, সেটা জাপানের রাজনীতি নয়, প্রযুক্তিগত যান্ত্রিক উন্নয়ন নয়-বরং জাপানি মানুষের সংস্কৃতি ও আধ্যাত্মিক শক্তিকে দেখা ও জানার আগ্রহে তৃষ্ণার্ত ছিলেন। তাই দেখা যায় জীবদ্দশায় জাপানের ইকেবানা বা ফুলসজ্জা, চাদোও বা ঐতিহ্যবাহী চা-সমাবেশ, জুদোও ক্রীড়া, চিত্রকলা, দারুশিল্প, তেইএন বা বাগানচর্চার সংস্কৃতি শেখাতে শান্তিনিকেতনের বিদ্যালয়ে চালু করেছিলেন প্রসিদ্ধ জাপানি প্রশিক্ষকদের আমন্ত্রণ করে। তাঁর জাপানি বন্ধুরাও আন্তরিকভাবে সাড়া দিয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ঠিকই অনুধাবন করেছিলেন, যে-জাতির সংস্কৃতি যত বেশি গভীর, বৈচিত্র্য যত বেশি সুরঞ্জিত, আচরণ যত পরিশীলিত সে-জাতির আধ্যাত্মিক চেতনা তত বেশি শক্তিশালী। যেটা বাঙালির চরিত্রে অনুপতি থাকার দুর্বলতা রবীন্দ্রনাথ ছাড়া আর কে কবে বুঝতে পেরেছেন! আজকে বাঙালির এই যে হযবরল অবস্থা, দুর্দশা, অধঃপতন তার মূলে রয়েছে আমাদের সংস্কৃতির দুবর্লতা। বাঙালিসংস্কৃতি সুশৃঙ্খল নয়, বৈচিত্র্য প্রকাশে দুর্বল এবং সমন্বয়হীন। লেখক : রবীন্দ্রগবেষক ও কথাসাহিত্যিক

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত