প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ভারতের কোভিড পরিস্থিতি: শঙ্কা এখন বৈশ্বিক নৌবাণিজ্যেও

নিউজ ডেস্ক: আন্তর্জাতিক নৌবাণিজ্য খাতেও বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে ভারতের কভিড পরিস্থিতি।বিশ্বের বিভিন্ন বন্দরে এখন ভারত ছেড়ে আসা জাহাজগুলোকে নোঙর ফেলার অনুমতি দেয়া হচ্ছে না। এমনকি অনুমতি পাচ্ছে না ভারতীয় নাবিকবাহী জাহাজগুলোও। যদিও আন্তর্জাতিক নৌ-পরিবহন খাতে কর্মরত নাবিকদের বড় একটি অংশ ভারতীয়।

লন্ডনভিত্তিক সংবাদমাধ্যম এফটি জানাচ্ছে, ভারত থেকে আসা জাহাজগুলো এতদিন সিঙ্গাপুর ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজাইরাহ বন্দরে নাবিক ও ক্রু পরিবর্তনের সুযোগ পেয়েছে কিন্তু সম্প্রতি স্থানীয় কর্তৃপক্ষ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এর ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। জাহাজের ক্রু সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান উইলহেলমসেন শিপ ম্যানেজমেন্ট জানিয়েছে, চীনের ঝাউশানে সর্বশেষ তিন মাসের মধ্যে ভারত বা বাংলাদেশ ছেড়ে আসা জাহাজের নোঙর ফেলার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে।

খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, ভারত থেকে আসা জাহাজগুলোর ক্রুদের মধ্যে প্রচুর কভিড-১৯ আক্রান্ত শনাক্ত হচ্ছে। এসব জাহাজে ক্রুদের তোলার আগে কোয়ারেন্টিনে রাখা হচ্ছে।জাহাজ রওনা হওয়ার আগ মুহূর্তে সংক্রমণ পরীক্ষাও করা হচ্ছে। তার পরও গন্তব্যে পৌঁছার পর তাদের মধ্যে কভিড সংক্রমণ শনাক্ত হচ্ছে।

অন্যদিকে বর্তমানে জাহাজে সংক্রমণও খুব দ্রুত ছড়াচ্ছে এ বিষয়ে আরেক ক্রু সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান সিঙ্গাপুরভিত্তিক সিনার্জি মেরিন গ্রুপের প্রধান নির্বাহী রাজেশ উন্নির ভাষ্য হলো, আগে আমরা দেখেছি একটি জাহাজে হয়তো একটি-দুটি সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে। কিন্তু এখন এমন এক পরিস্থিতি এসে দাঁড়িয়েছে, যেখানে গোটা জাহাজের সবাই খুব দ্রুত সংক্রমিত হয়ে পড়ছে। ফলে জাহাজগুলোও অচল হয়ে পড়ছে।

ভারতের করোনা সংক্রমণ পরিস্থিতি বর্তমানে মারাত্মক আকার ধারণ করেছে।গতকাল সকালে কেন্দ্রীয়ভাবে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, এর আগের ২৪ ঘণ্টায় দেশটিতে নভেল করোনাভাইরাসের সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে ৪ লাখ ১২ হাজারের বেশি। এরই মধ্যে সংক্রমণ শনাক্তের যাবতীয় বৈশ্বিক রেকর্ড ভেঙে ফেলেছে দেশটি। অন্যদিকে চাপ পড়েছে দেশটির স্বাস্থ্য খাতেও।

দক্ষিণ আফ্রিকার বন্দর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, চলতি সপ্তাহে ভারত থেকে ডারবানে আসা একটি জাহাজকে কোয়ারেন্টিন করা হয়েছে। এখন পর্যন্ত জাহাজটির ১৪ ফিলিপিনো ক্রুর করোনা সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে।অন্যদিকে জাহাজটির প্রধান প্রকৌশলী মারা গিয়েছেন হূদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে।

বিশ্বব্যাপী সমুদ্রপথে চলাচলকারী জাহাজের নাবিক ও ক্রু সরবরাহের দিক থেকে শীর্ষ তিন দেশের অন্যতম ভারত। বাণিজ্য সংগঠন ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব শিপিংয়ের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী মোট ১৬ লাখ নাবিকের মধ্যে ২ লাখ ৪০ হাজারই ভারতীয়।

আন্তর্জাতিক নৌবাণিজ্যের বড় হাব সিঙ্গাপুর ভারতীয়র পাশাপাশি বাংলাদেশী ও পাকিস্তানি নাবিকবাহী জাহাজের ওপরও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে।

জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ৮০ শতাংশ পণ্যই পরিবাহিত হয় নৌপথে।এ অবস্থায় এ ধরনের নিষেধাজ্ঞা বা সীমাবদ্ধতা আরোপের ফলে আন্তর্জাতিক নৌবাণিজ্যে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।

জাহাজের ক্রু ব্যবস্থাপনা শিল্পের প্রতিনিধিত্বকারী প্রতিষ্ঠান ইন্টারম্যানেজারের প্রেসিডেন্ট মার্ক ও’ নিলের মতে, বৈশ্বিক সরবরাহ চেইনে এ নিষেধাজ্ঞার প্রভাব হবে অনেক সুদূরপ্রসারী।এমনকি মার্চের সুয়েজ খাল অবরুদ্ধ হয়ে পড়ার ঘটনাটিও এর কাছে কিছুই না।

এর আগে গত বছর কভিড-১৯-এর কারণে সমুদ্রে আটকা পড়েছিলেন প্রায় চার লাখ নাবিক নির্ধারিত চুক্তির সময় পার করেও অনেক দিন তাদের জাহাজে অবস্থান করতে হয়েছে। অন্যদিকে বিশ্বব্যাপী গত মার্চের পর আবারো কভিড-১৯-এর সংক্রমণ বাড়তে থাকার কারণে এ নিয়ে নতুন করে শঙ্কা তৈরি হয়েছে।

বিশ্বের বৃহত্তম কনটেইনার শিপিং কোম্পানি মার্স্কের মেরিন হিউম্যান রিসোর্স বিভাগের প্রধান নেইলস ব্রুসের ভাষ্যমতে, চলাচলে নিষেধাজ্ঞা এখন যে পর্যায়ে আছে, তা যদি অব্যাহত থাকে, তাহলে আমরা বৈশ্বিক নৌবাণিজ্যে ২০২০ সালের ক্রু পরিবর্তন সংকটের পুনরাবৃত্তি দেখতে পারি।

ক্রু সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান উইলহেলমসেন শিপ ম্যানেজমেন্টের অধীন নাবিকের সংখ্যা প্রায় ১০ হাজার।এর মধ্যে ১৫ শতাংশই ভারতীয়। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী কার্ল শোউ বলেন, ক্রু পরিবর্তন নিয়ে পরিস্থিতি এখন খারাপ থেকে আরো খারাপের দিকে গিয়েছে। আসলে এটুকু বললেও এখন কম বলা হয়।

নরওয়েভিত্তিক কোম্পানিটি গত ২৪ এপ্রিল থেকে ভারতে ক্রু পরিবর্তন বন্ধ রেখেছে।অন্তত মে মাসের শেষ পর্যন্ত তা বন্ধ রাখা হবে। এর কারণ প্রসঙ্গে কার্ল শোউ জানান, ভারতে এখন গোটা স্বাস্থ্য ব্যবস্থাই ভেঙে পড়েছে। এ অবস্থায় ভারতীয় নাবিকদের করোনা পরীক্ষার ফলাফলও জাহাজের বন্দর ত্যাগের পূর্বনির্ধারিত সময়ের আগে পাওয়া যাচ্ছে না।

জার্মান ক্রু ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান বার্নহার্ড শুল্ট শিপ ম্যানেজমেন্ট জানিয়েছে, ক্রু বদলের সময় এখন সাময়িকভাবে ভারতীয় নাবিকদের জাহাজে তোলা বন্ধ করে দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। এর পরিবর্তে জাহাজে তোলা হচ্ছে অন্যান্য দেশের নাবিকদের।

শিল্পসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বৈশ্বিক টিকাদান কার্যক্রমে এখন নাবিক ও সমুদ্রগামী জাহাজের ক্রুদের অগ্রাধিকার দেয়া উচিত। কারণ বিভিন্ন দেশে এখন টিকা না নেয়া ব্যক্তিদের ঢুকতে দেয়া হচ্ছে না। অন্যদিকে নৌপরিবহন সংশ্লিষ্ট জাতিসংঘের সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল মেরিটাইম অর্গানাইজেশনও এখন পর্যন্ত নাবিকদের টিকাপ্রাপ্তি নিশ্চিতে কাজ করছে খুবই ধীরগতিতে। বিষয়টি খাতসংশ্লিষ্টদের জন্য হতাশার কারণ হয়ে উঠেছে।

এ বিষয়ে ও’ নিলের বক্তব্য হলো, এ টিকাদান ইস্যুতে যে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও রাজনৈতিক পিংপং খেলা চলছে, তাতে আমাদের এখন বসে বসে মাথার চুল ছেঁড়া ছাড়া আর কোনো উপায় নেই।

একই বক্তব্য ভারতের ন্যাশনাল ইউনিয়ন অব সি ফেয়ারার্স অব ইন্ডিয়ার সাধারণ সম্পাদক আবদুলগনি সেরাংয়েরও। তিনিও মনে করছেন, ভারতীয় নাবিকদের টিকা নিশ্চিতে এখন পর্যন্ত পর্যাপ্ত উদ্যোগ নিতে পারেনি কর্তৃপক্ষ।

– বণিক বার্তা

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত