প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

অর্থবছর ২০২০-২১: দশ মাসে রফতানি বেড়েছে ৯ শতাংশ

নিউজ ডেস্ক: চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরের ১০ মাসে (জুলাই-এপ্রিল) আন্তর্জাতিক বাজারে ৩ হাজার ২০৭ কোটি ২৭ লাখ ৩০ হাজার ডলারের পণ্য রফতানি করেছে বাংলাদেশ। আগের অর্থবছর রফতানির এ পরিমাণ ছিল ২ হাজার ৯৪৯ কোটি ৩৮ লাখ ৪০ হাজার ডলার। অর্থাৎ চলতি অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় রফতানি বেড়েছে ৮ দশমিক ৭৪ শতাংশ।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) থেকে সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে প্রতি মাসে রফতানির হালনাগাদ প্রতিবেদন প্রকাশ করে রপ্তানী উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি)। সংস্থাটির গতকাল প্রকাশিত সর্বশেষ প্রতিবেদনে দেখা গেছে, এপ্রিলে রফতানি হয়েছে ৩১৩ কোটি ৪৩ লাখ ৮০ হাজার ডলারের পণ্য। গত বছরের এপ্রিলে ৫২ কোটি ডলারের রফতানি বিবেচনায় প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৫০২ দশমিক ৭৫ শতাংশ।

গত বছরের এপ্রিলের তুলনায় প্রায় ৫০৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হলেও চলতি বছরের এপ্রিলে রফতানির পরিমাণ কৌশলগত লক্ষ্যের তুলনায় কম। কৌশলগত লক্ষ্য ছিল ৩৩৫ কোটি ডলারের পণ্য রফতানি। এ হিসেবে কৌশলগত লক্ষ্যের চেয়ে রফতানি ৬ দশমিক ৪৪ শতাংশ কম হয়েছে।

বাংলাদেশ থেকে বিশ্ববাজারে রফতানি করা পণ্যের ৮৫ শতাংশই তৈরি পোশাক। দেশের মোট রফতানির ওপরও তাই পণ্যটির প্রভাবই সবচেয়ে বেশি। ইপিবির পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের ১০ মাসে বাংলাদেশ থেকে ২ হাজার ৬০০ কোটি ডলারের কিছু বেশি পোশাক পণ্য রফতানি হয়েছে। গত অর্থবছরের একই সময়ে রফতানি হয় ২ হাজার ৪৪৭ কোটি ডলারের পোশাক। এ হিসেবে ১০ মাসে পোশাক পণ্যের রফতানি প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ২৪ শতাংশ। গত বছরের এপ্রিলের পোশাক রফতানির সঙ্গে চলতি বছরের এপ্রিলের তুলনামূলক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এপ্রিলে পোশাক রফতানি প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৫৭১ শতাংশ।

সংশ্লিষ্টদের দাবি, আন্তর্জাতিক সরবরাহ চেইনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে করোনায় বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সবচেয়ে বেশি। তাদের মতে, কভিডের প্রভাবে ক্ষতি আরো বেশি হতে পারত। কিন্তু কারখানা সচল রাখা ও সরকারি প্রণোদনার মতো কার্যকর সিদ্ধান্তের কারণে এ ক্ষতির মাত্রা কমিয়ে রাখা সম্ভব হয়েছে। যদিও রফতানির আন্তর্জাতিক গন্তব্যগুলোর কোথাও কোথাও তৃতীয় এবং দেশে করোনার দ্বিতীয় সংক্রমণপ্রবাহের কারণে ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি আরো খারাপ হওয়ার শঙ্কা রয়েছে।

গতকাল প্রকাশিত রফতানি পরিসংখ্যান প্রসঙ্গে বিজিএমইএর সহসভাপতি শহিদুল্লাহ আজিম জানান, গত বছর করোনার কারণে মার্চ থেকে পোশাক রফতানির পরিমাণ কমতে থাকে। ২০১৯-২০ অর্থবছরের সঙ্গে ২০২০-২১ অর্থবছরের শুধু এপ্রিলের তুলনা করলে দেখা যায়, পোশাক রফতানি প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৫৭১ শতাংশ, যা প্রকৃত চিত্র নয়। করোনার কারণে গত বছর এপ্রিলে পোশাক রফতানি কম থাকায় এমন প্রবৃদ্ধি দেখা যাচ্ছে।

করোনার সংক্রমণ প্রথম শনাক্ত হয় চীনের উহানে ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে। এর আগে থেকেই বৈশ্বিক পোশাক খাতে ভঙ্গুরতা দেখা যাচ্ছিল। ব্যবসা সংকোচনের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের মানসিকতায় ছিল ছোট-বড় ক্রেতাদের অনেকেই। ফলে অনেক খুচরা বিক্রয়কেন্দ্র ছিল বন্ধ হয়ে যাওয়ার পথে। করোনার প্রভাবে আন্তর্জাতিক ক্রেতারা আরো দুর্দশায় পড়ে যায়। সংক্রমণ প্রতিরোধে অবরুদ্ধতার কারণে অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ রাখতে হয় বিক্রয়কেন্দ্র। এর ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশেও পোশাক রফতানিকারকদের ক্রয়াদেশ বাতিল হয় একের পর এক।

বিজিএমইএর হিসাব বলছে, কভিডের প্রথম সংক্রমণপ্রবাহের কারণে গত বছরের এপ্রিলের মধ্যেই প্রায় সোয়া ৩ বিলিয়ন ডলারের ক্রয়াদেশ বাতিল হয়েছে। বাংলাদেশের পোশাক রফতানির বাজারগুলোয় ভাইরাস সংক্রমণ মোকাবেলার লড়াই এখনো চলছে। এরই মধ্যে শুরু হয়েছে তৃতীয় সংক্রমণপ্রবাহের প্রভাব। বর্তমানে ক্রেতারা ক্রয়াদেশ বাতিল না করলেও পণ্য জাহাজীকরণের সময় পিছিয়ে দিচ্ছে। রফতানির বিপরীতে বিপুল পরিমাণ অর্থ অপরিশোধিত রয়ে যাচ্ছে।

পোশাক খাতের উদ্যোক্তাদের আরেক সংগঠন বিকেএমইএর পর্ষদ প্রতিনিধিরা বলছেন, করোনার প্রভাবে সারা বিশ্বের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত। অর্থনীতির স্থবির চাকাকে চলমান রাখতে রীতিমতো সংগ্রামে লিপ্ত উদ্যোক্তাসহ খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান। সংকুচিত হয়ে পড়েছে কর্মক্ষেত্র। ইউরোপের বিভিন্ন দেশে নতুন লকডাউনে পড়ে গৃহবন্দি হয়ে পড়েছে বিশাল এক জনগোষ্ঠী। কবে নাগাদ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে তার কোনো পূর্বাভাসও নেই। বর্তমান সময় অতিবাহিত হচ্ছে চরম প্রতিকূলতা ও অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে।

বিকেএমইএর প্রতিনিধিরা বলছেন, কারখানায় পর্যাপ্ত ক্রয়াদেশ নেই। আগামী দিনগুলোতেও স্বাভাবিক মাত্রায় কার্যাদেশ পাওয়ার নিশ্চয়তা নেই। হাতে যেসব কার্যাদেশ রয়েছে বা রফতানি হচ্ছে, তারও অর্থ হাতে পেতে সময় লাগে ১৬০ থেকে ২০০ দিন। আবার ক্রেতারা আগের চেয়ে পোশাকের মূল্য কমিয়ে দিয়েছে ১০-১৫ শতাংশ। কোনো প্রকার দরকষাকষির সুযোগ নেই। শ্রমিক-কর্মচারীদের কর্মসংস্থান বজায় রাখার স্বার্থে জানা থাকলেও লোকসান দিয়েই কার্যাদেশ নিতে বাধ্য হচ্ছেন পোশাক খাতের উদ্যোক্তারা। অন্যদিকে কাঁচামালের বাজারেও চলছে এক চরম অনিশ্চয়তা। সার্বিক পরিস্থিতি মোকাবেলায় চরম হিমশিম খাচ্ছে দেশের রফতানির প্রধান খাতটি।

এ বিষয়ে বিকেএমইএর প্রথম সহসভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, এ পরিস্থিতির শেষ আমরা এখনো দেখতে পাচ্ছি না। তাই টিকে থাকতে লড়াই করতে হচ্ছে। লড়াইটা এখন পর্যন্ত সম্ভব হচ্ছে সরকারের সহযোগিতায়। পরিস্থিতি আরো দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কায় সরকারের কাছ থেকেও দীর্ঘমেয়াদি সহায়তার প্রত্যাশা করছি।

গত বছরের মার্চে দেশে করোনার প্রথম সংক্রমণ শনাক্তের পর তা প্রতিরোধে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়। প্রায় দুই মাসের অব্যাহত ওই সাধারণ ছুটিতে স্থবির হয়ে পড়ে দেশের অর্থনীতি। অঘোষিত লকডাউনে কার্যত বন্ধ হয়ে যায় রফতানিমুখী শিল্প-কারখানাও। পরে উৎপাদনের চাকা সচল হলেও মহামারীর কারণেই এখনো নিরবচ্ছিন্ন হয়নি রফতানি। এদিকে বাংলাদেশে দ্বিতীয় ঢেউয়ের প্রভাবে চলমান আছে চলাচলে বিধিনিষেধ।

ইপিবির পরিসংখ্যান বলছে, মহামারী শুরুর পরের এক বছরে (এপ্রিল ২০২০ থেকে মার্চ ২০২১) বাংলাদেশ থেকে পণ্য রফতানি কমেছে আগের ১২ মাসের তুলনায় প্রায় ১৩ শতাংশ। গত বছরের এপ্রিলে বাংলাদেশ থেকে পণ্য রফতানি হয়েছে মাত্র ৫২ কোটি ডলারের। মে মাসে রফতানির পরিমাণ ছিল ১৪৬ কোটি ডলারের। জুনে রফতানি হয় ২৭১ কোটি ডলারের পণ্য। মূলত এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্তই দেশের রফতানিতে কভিড-১৯-এর প্রভাব ছিল সবচেয়ে বেশি। – বণিক বার্তা

সর্বাধিক পঠিত