প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

রাজ প্রসাদের আভিজাত্যের পাশেই মধুকবি’র কষ্টকর জীবন!

আসাদুজ্জামান সম্রাট: প্যারিস পর্যন্ত এসে ভার্সাইয়ে যাবো না, তাহলে তো ফ্রান্স ভ্রমণ বৃথা। কারণ আমার আকর্ষণ ভার্সাই প্যালেস নয়, যেখানে চরম দারিদ্রতার মধ্যে সময় কাটিয়ে দেশের জয়গান গেয়েছেন মাইকেল মধুসুধন দত্ত। ছোট বেলার বইয়ে পড়া সেই ভার্সাইয়ে মাইকেল মধুসুধন দত্তের স্মৃতি খুঁজতে আরো একটা দিন সময় ব্যয় করলো আমার বন্ধু। সঙ্গে তার আরেক বন্ধুকে নিয়ে এসেছে যার একটা মার্সিডিস গাড়ি আছে। প্যারিস থেকে সড়ক পথে প্রায় ৪০ কিলোমিটার দূরের ভার্সাই পৌছে যাই এক ঘণ্টারও কম সময়ে। শহরতলীর সৌন্দর্য দেখতে দেখতে ভার্সাই পৌছানোর আগের ল্যান্ডস্কেপ ছিল মনোমুগ্ধকর।

আমার বন্ধুটি জানালেন, ভার্সাইয়ে থাকার সময়ে মাইকেল মধুসুধন দত্ত দুটি বাড়িতে ছিলেন। একটি ভার্সাই প্যালেস থেকে একটু দূরে অন্যটি প্যালেসের কাছেই। প্যালেস থেকে দূরের যেই বাড়িটিতে কবি ছিলেন সেখানে ভারতীয় দূতাবাস একটি নামফলক লাগিয়েছে। ফলে সমগ্র ফ্রান্সসহ ইউরোপবাসী জানে যে, মাইকেল মধুসুধন দত্ত ভারতীয় কবি। যশোরের সাগরদারি গ্রামের মাইকেল মধুসুধন দত্তের জীবনে অনেকটা সময়ে অবিভক্ত ভারতেই কেটেছে। কিন্তু আমাদের কবিকে এভাবে পরিচিত হতে দেখতে আমার ভালো লাগেনি। ভার্সাই যাওয়ার আগেই আমরা ঠিকানাটা সংগ্রহ করে নিয়েছিলাম। আমার বন্ধু জানতে চাইলো, ভার্সাইয়ে দু’টি বাড়িতে বসবাস করেছিলেন কবি। আমি কোন বাড়িটি দেখতে চাই। তিনি এও জানালেন যে, ভার্সাই প্যালেসের কাছে একটি বাড়িতে কবি থাকলেও শনতিয়েরের বাড়িটিই মাইকেলে বসবাসের স্থান হিসেবে বেশি পরিচিত।

আমরা যেহেতু গাড়ি নিয়ে গিয়েছি, তাই এক ঘণ্টারও কম সময়ের মধ্যে পৌছে যাই শনতিয়েরে। যেতে যেতেই বন্ধুটি জানালো এখন এই এলাকার নাম আর শনতিয়ের নেই। এর নাম পাল্টে হয়ে গেছে ‘রু দ্য লা এতা জেনেরো’। তবে বাড়ির নম্বরটি ঠিক ১২-ই আছে। তবে নাম্বারটি এমন এক জায়গায় লাগানো যা খুঁজে পেতে সমস্যাই হয় বটে। সাদামাটা একটি বাড়ি। বাড়িটির জানালাগুলো ফরাসি স্থাপত্যের আদলেই বেশ বড়ো বড়ো। একটি ফিংলিং স্টেশনের সামনের দিকে এই তিনতলা বাড়ির উজ্জ্বল লাল দরজা সহজেই চোখে পড়ে। ভবনের গ্যারেজ স্পেসে আছে একটি গ্রাউন্ড স্টোর এবং একটি পুরোনো দোকান, যার জানালাগুলোও বড় বড়। নিচতলার একটি রেস্টুরেন্টও আছে। ভবনটির প্রথম তলায় দুটি কক্ষের জানালার মাঝে ভারতীয় দূতাবাস একটি নামফলক লাগিয়েছে। ভারত, বাংলাদেশ থেকে অনেক দর্শণার্থী সেখানে যাওয়ায় আশেপাশের মানুষও এখন জানে এখানে কোনো এক ভারতীয় কবি বাস করতেন। কবি মোপাসা’য় আরো একটি বাসায় দু’বছর ছিলেন। সেখানে না গিয়েই আমরা চলে যাই ভার্সাই প্যালেসের দিকে। কবির জীবনী থেকে জানা যায়, ১৮৬৩ থেকে ১৮৬৫ সাল পর্যন্ত ভার্সাইয়ের এই বাসায় নিদারুন দারিদ্রতার মধ্যে দিন কেটেছে কবির। ১৮৬৫ সালে তিনি বারিস্টারি পড়তে লন্ডনে গিয়েছিলেন। সেখান থেকে আবার ১৮৬৭ সালে ফিরে এসে ভার্সাইয়ের মোপাসা’র বাড়িতে ওঠেন। সেখান থেকেই ১৮৬৯ সালে তিনি ভারতে ফিরে যান। ভার্সাইয়ে কবির জীবন ছিল অভাব-অনটনে ভরা। ফলে এখানে বসে লেখালেখি ছাড়া গৌরবময় কোনো স্মৃতি নেই।

ভার্সাই প্যালেস আমার কাছে পরিচিত ভার্সাই চুক্তির কারনে। স্কুল জীবনে পড়েছিলাম, এই ভার্সাই প্যালেসের একটি চুক্তির কারনে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধ। সে হিসেবে এই প্যালেস আমার শিশুমনে একটা শান্তির বার্তা দিত সবসময়। এসব বিষয় নিয়ে আমার আগ্রহ না থাকায় তখন কী হয়েছিল তা জানার ইচ্ছে বা চেষ্টাটা কোনোকালেই ছিলনা। তবে ভার্সাই প্যালেস সম্পর্কে জানার আগ্রহ আমার সবসময়ই ছিল। ইতিহাস বলছে, এখন থেকে ৪৫০ বছর আগে ভার্সাই মূলত প্যারিসের অদূরের একটি গ্রাম ছাড়া আর কিছুই ছিলনা। এই এলাকায় জলাভূমি বেশি থাকার কারণে রোগের প্রবল প্রাদুর্ভাব দেখা যেত। ফলে মানুষের তুলনায় এদিকটায় পশুপাখির বসতি ছিল বেশি। ফ্রান্সের রাজা ত্রয়োদশ লুই সর্বপ্রথম ১৬২৩ খ্রিস্টাব্দে ইট ও পাথর দিয়ে ভার্সাইতে শিকারের জন্য একটি লজ নির্মাণ করেন। সেটাই ছিল প্যালেস অব ভার্সাইয়ের শুরু। এরপর ভার্সাইয়ের সম্প্রসারণে ত্রয়োদশ লুই এর চারপাশে চল্লিশ হেক্টর জমি ক্রয় করেন। ত্রয়োদশ লুইয়ের মৃত্যুর পর প্রায় ১৮ বছর এই প্যালেস অব্যবহৃত ছিল। এরপর চতুর্দশ লুই এটিকে রাজপ্রাসাদে সম্প্রসারণ করেন। স্থপতি ‘লুই লা ভাউ’ প্রাসাদটির ডিজাইন এবং নির্মাণকাজ তদারকি করেন। প্যালেস অব ভার্সাইয়ের সর্বাধিক সংস্করণ এবং সংযোজন ঘটে চতুর্দশ লুইয়ের শাসনামলে যার কারণে লুই চতুর্দশকে প্যালেস অব ভার্সাই-এর প্রতিষ্ঠাতা বলা হয়। বর্তমানে প্রতিবছর ৬০ লক্ষাধিক পর্যটক এই রাজপ্রাসাদ পরিদর্শনে আসেন।

যাই হোক, আমরা মূল রাজপ্রাসাদের পাশে বিশাল চত্বরে গাড়ি থেকে নামলাম। সামনেই চতুর্দশ লুইয়ের মূর্তি। কেউ কারো ছবি তুলে দিবে এমনটা না ভেবেই সেলফি তুলতে থাকলাম। বিশাল ঘোড়ার পিঠে রাজা রাজকীয়ভাবেই আসীন। ছুটির দিন থাকায় টিকেট কাউন্টারে দীর্ঘ লাইন ছিল। টিকেট কেটে আবার প্রবেশপথে লম্বা লাইন। আমরা দু’ভাগে ভাগ হয়ে একভাগ টিকিট কাউন্টারে, আরেক ভাগ প্রবেশ পথে দাড়ালাম। এখানে নুন্যতম ভদ্রতা না দেখিয়ে ‘খাটি বাঙালি’ চরিত্র প্রদর্শন করে সিকিউরিটি চেক শেষে ভেতরে প্রবেশ করলাম। প্রবেশমুখের বিশাল গেটের বর্ণনা একটু দিতেই হয়। বিশাল গেটে সোনালি রঙের সূক্ষ্ম কারুকাজ। চোখ ধাধানো সেসব কাজের দিকে তাকিয়ে থাকতেই ডাক পড়লো গাইডের। আমরা যার যার কানে হেডফোন লাগিয়ে নিলাম। একেকটি ঘরে এক এক গল্প। এমন হাজারটি ঘরের গল্প মনে রাখা, নোট নেয়া কিংবা লেখা-সবই অসম্ভব। অসাধারণ সব চিত্র আর ভাস্কর্যে এসব ঘরে রাজপরিবারের জীবনগাথা রচিত হয়েছে। আমরা সবগুলো ঘর ঘুরতে পারিনি কিন্তু যতগুলো দেখেছি সে সবই বিস্ময়। শুধু ছবি দেখে বোঝা যাবে না সেসব দিনে রাজা-রানিরা কী আড়ম্বরপূর্ণ জীবন-যাপন করতেন। একটি হলরুমে এসে থমকে গেলাম। সিলিং এবং পুরো দেয়ালজুড়ে অসম্ভব সুন্দর আর জৌলুসপূর্ণ তৈলচিত্রে ঠাঁসা। বেশির ভাগ ফরাসি মিথলজি এবং রাজপরিবারের গল্পগাথা। এমন কাজ আমি ভ্যাটিক্যান মিউজিয়াম আর লুভর মিউজিয়ামেও দেখেছি।

এই রাজপ্রাসাদে রয়েছে ৭০০ বেডরুম। ২০০০ জানালা। যার আকারে অনেক বড়ো এবং ধনুকাকৃতি। রয়েছে ৬৭টি সিঁড়ি। প্রচণ্ড ঠান্ডা থেকে আরাম পেতে রয়েছে ১২শ’ ৫০টি ফায়ারপ্লেস। ভেতরের আয়তন ৮১ লাখ ৫০ হাজার ২৬৫ স্কয়ার ফিট। রাজা, রাণী এবং রাজপরিবারের সদস্যরা ছাড়াও সরকারের মন্ত্রী, অভিজাতবর্গ, ডিপ্লোম্যাট, সরকারি কর্মচারিদের বসবাসের জন্য প্রাসাদ চত্বরের বাইরে একই স্টাইলে নির্মিত হয়েছে অনেকগুলো এ্যাপার্টমেন্ট। রাজা চতুর্দশ লুই বিচারবিভাগকেও স্থানান্তরিত করেছিলেন রাজপ্রাসাদের নাগালের মধ্যে। কারণ তিনি সবার আনুগত্য লাভ করেই রাজশক্তিকে অপ্রতিদ্বন্দ্বী করে তুলতে চেয়েছিলেন। হাজার খানেক রুম দেখা সম্ভব হবেনা জেনেই ঐতিহাসিক রুমগুলোকে টার্গেট করে আমরা আগাতে থাকে। ‘দ্যা ওয়ার রুমে’ দেখা গেলো- বিশাল গ্যালারি রাজরাজরা, সৈন্যসামন্ত, যুদ্ধবিগ্রহের জীবন্ত দলিলে ভরপুর। এখানে ফেঞ্চ সৈন্যদের বিজয়লাভের গৌরবময় ইতিহাসের অনেক কিছুই রয়েছে। আর এ কারনে এটি ফরাসি ইতিহাসের মূল্যবান মিউজিয়াম হিসেবে মনে করা হয়। এ্যাপোলো রুমটি রাজা চতুর্দশ লুইকে উৎসর্গ করা হয়েছে। হারকিউলেস রুম পেরিয়ে আমরা হল অব মিরর রুমে পৌছি। এটাকে ফরাসিতে ‘গ্রান্ডে গ্যালারি’ বলে। চতুর্দশ লুই নির্মিত তৃতীয় প্রাসাদ এটি এবং ভার্সাই প্রাসাদের কেন্দ্রীয় গ্যালারি।

এই ‘গ্রান্ডে গ্যালারি’র বিশেষত্ব হলো, সতেরোটি গ্লাস আচ্ছাদিত খিলান। প্রতিটি খিলানে একুশটি করে সব মিলিয়ে ৩৫৭টি নানা আকৃতির মিরর ও চোখধাঁধানো সব ঝাড়বাতি ঝুলছে। তবে হল অব মিররের সবকিছু এখন আর আগের মতো নেই, কারণ যুদ্ধের খরচ জোগাতে অনেক কিছু খুলে বিক্রি করতে হয়েছিল। রাজা চতুর্দশ লুই তাঁর ব্যক্তিগত বাসস্থান থেকে যখন চ্যাপেলের দিকে যেতেন তখন এই হল অব মিরর ব্যবহার করতেন। এই মিরর রুমের একটি অসাধারণ ঐতিহাসিক ভুমিকা আছে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরে ১৯১৯ খ্রীষ্টাব্দে ২৮শে জুন এই ঘরেই ‘ভার্সাই চুক্তি’ সম্পাদিত হয়। নিজেকে ঐতিহাসিক এই জায়গায় দেখতে সত্যিই ভালো লাগছে। এর পাশেই রয়েছে ‘পিস রুম’। শান্তির দূত হয়ে ইউরোপে ফ্রান্স যে নির্মল পরিবেশ সৃষ্টি করেছিল এই ঘর তার প্রতীক। আর আমি তার প্রতিটি কোনায় কোনায় চোখ রাখি।

এভাবে আমরা অনেকগুলো রুম দেখে পেছনে চলে যাই গার্ডেনের দিকে। গার্ডেনে ঢোকার জন্য আলাদা একটি গেট রয়েছে, সেই গেটের বাইরে গিয়ে চোখ মেললে যতদূর দৃষ্টি যায় নয়নাভিরাম সব গাছ আর গাছ। একেকটা একেক আকারের সুবিন্যস্ত পাতা সম্বলিত। কোথাও কোথাও ভাস্কর্য, ফোয়ারা। দূরে লেক দেখা যাচ্ছে। ডিসেম্বর মাস হওয়ায় মেঘলা আকাশ। সূর্য্যমিামার দেখা পাইনি ইউরোপে আসার পর থেকে। প্রাসাদ চত্বর থেকে কয়েক সিঁড়ি নেমে তবে গার্ডেন ও লেক ইত্যাদি। আমরা সেদিকেই এগোলাম। ১৬৩২ খ্রিস্টাব্দে প্রাসাদসংলগ্ন এই গার্ডেন তৈরির কাজ শুরু হয়। এরপর ১৬৬২ সালে প্রথম পর্ব এবং ১৬৬৪ সালে দ্বিতীয় পর্বের কাজ। সেই শুরু, তার পর থেকে চলতে থাকে নতুন নতুন সংযোজন। এই বাগানে রয়েছে পঞ্চাশটি ঝরনা। এসব ঝরনার প্রতিটির নকশার নেপথ্যে রয়েছে কোনো না কোনো ফরাসি পৌরাণিক কাহিনী বা লোকগাথা। ঝরনাগুলোর মধ্যে বিখ্যাত ‘অ্যাপেলো’ ঝরনা। এখানে সূর্য দেবতা তাঁর বাহনে চড়ে আকাশ আলোকিত করছেন সেই কাহিনী ফুটে উঠেছে। এই গার্ডেনে অনেক দুষ্প্রাপ্য ভাস্কর্য রয়েছে যা ফরাসি ঐতিহ্যকে বহন করছে। যতদূর জানা যায়, ১৬৬১ থেকে ১৭০০ সাল পর্যন্ত প্রায় ৪০ বছর ধরে ‘আভ্রে লি নটোরে’র পরিকল্পনায় হাজার হাজার শ্রমিক আর ফরাসি সৈন্যদের অক্লান্ত পরিশ্রমে গড়ে উঠেছে এই বাগান। বর্তমানে ৮০০ হেক্টর জমিতে দুই লাখ গাছ, দুই লক্ষাধিক ফুলগাছ এবং ছয় কিলোমিটার খাল নিয়ে গার্ডেন অব ভার্সাই।

বাগানের সৌন্দর্য দেখতে দেখতে লেকের পাশে চলে এলাম। লেকটিতে বিশাল একটি ভাস্কর্য আধা জাগরণ অবস্থা পানির ওপর ভেসে আছে। সামনে অবারিত বনানী। তবে শীত বলেই হয়তো গাছে সবুজ পাতা কম। গ্রীষ্মকাল নাকি এই গার্ডেন দেখার আসল সময়। তখন নানা বর্ণের ফুলে ফুলে বাগানটি স্বর্গরূপ ধারণ করে। এই অংশের পরিবেশটা অত্যন্ত রোমান্টিক। বেশ কয়েকটি যুগলকে দেখলাম বসে আছে জড়াজড়ি করে। সময়ে সময়ে গভীর চুম্বনে ডুবে যাচ্ছেন। ঠান্ডার কারনে এই অংশে দর্শণার্থীও অনেক কম। আর হবেই বা না কেনো-ভার্সাই প্যালেস দেখতে দেখতে অনেকেই ক্লান্ত হয়ে পড়েন। পরে আর এই অপার সৌন্দর্য্য দেখার মতো এনার্জি থাকেনা। আমাদের অবস্থাটাও ঠিক তেমনই। কিন্তু জীবনে আর আসা হবে কি-না এই ভেবে পৃথিবীর সবচে’ সুন্দর গার্ডেন দেখার লোভ সামলাতে পারলাম না।

গার্ডেন সোজা বেরিয়ে গাড়িতে উঠবো। কিন্তু শরীর এতো ক্লান্ত যে, এই পথটুকু যেনো শেষই হতে চাইছে না। ফিরতে ফিরতে ভার্সাই প্যালেসের সৌর্য-বীর্জ আর জৌলুসের যে প্রদর্শনী দেখে এসেছি তা নিয়ে ঘোর কাটছিলনা কিছুতেই। তবে ১৯৭৯ তে ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট হিসেবে ভার্সাই প্যালেস তালিকাভুক্ত হওয়ার পরে ১৯৯৪ সালে এর একটি মূল্যমান নির্ধারিত হয়। তাতে তাবৎ তা পৃথিবীর সবগুলো রাজপ্রাসাদের চেয়ে ভার্সাই প্যালেস সবচে’ দামী হিসেবে বিবেচিত হয়। ভার্সাই প্যালেস শুধুমাত্র শৌর্য, বীর্য, আভিজাত্য, অহংকার এবং অপরিমেয় ধনবিলাসিতার দুর্দান্ত কারুকার্যই নয়। ফ্রান্সের তৎকালীন জীবনযাত্রার অনন্যসাধারণ শিল্পসংস্কৃতির নান্দনিক উৎকর্ষতার এক নিদর্শনও বটে।

ফিরতে ফিরতে মন খারাপ হয়ে গেলো, যে জীবনের আশায় মাইকেল মধুসুধন দত্ত মাতৃভূমি ছেড়ে বিদেশ বিভুঁইয়ে এসেছিলেন তার কোনটাই পূর্ণ হয়নি। লন্ডনের ব্যয়বহুল জীবন থেকে সাশ্রয়ী ভার্সাইয়ে এসেও তিনি নিদারুন কষ্টে ছিলেন। সেই কষ্টের প্রদর্শনীর দেখার চেয়ে বেশি মন খারাপ হয়েছে, ভারতীয় দূতাবাসের কান্ডে। মধু কবির বাড়ি চিহ্নিত করে নামফলক লাগিয়ে প্রশংসার কাজ করলেও আমাদের কবিকে পরিচিত হতে হচ্ছে ভারতীয় কবি হিসেবে। অবশ্য বিদেশে আমাদের দেশে কেউ আলাদা করে জানতে চায়না, আমরা বাংলাদেশী কি-না? সবাই ইন্ডিয়ান মনে করেই কথা বলতে শুরু করে। যেমনটি আমার সাথে করেছিল, ল্যুভর মিউজিয়ামের ভারতীয় বংশোদ্ভুদ গার্ড।

লেখক: আসাদুজ্জামান সম্রাট, নগর সম্পাদক-দৈনিক আমাদের অর্থনীতি ও সম্পাদক-পার্লামেন্ট জার্নাল

সর্বাধিক পঠিত