প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

কঠোর নজরদারিতে হেফাজত, নতুন কমিটিতে কারা জায়গা পাচ্ছেন?

নিউজ ডেস্ক : হেফাজতে ইসলামের কেন্দ্রীয় কমিটি বিলুপ্ত করার পর সংগঠনটির ভবিষ্যৎ নিয়ে নানামুখী আলোচনা সামনে আসছে। নতুন কমিটিতে কারা জায়গা পাচ্ছেন? সেখানে হেফাজতের প্রতিষ্ঠাতা শাহ আহমদ শফীর অনুসারীরা কোনো পদ পাচ্ছেন কিনা? সদ্য বিলুপ্ত কমিটির আমির জুনায়েদ বাবুনগরীসহ তার বলয়ের কেউ আবারও ভালো পদে আসীন হচ্ছেন কিনা? এসব প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। সমকাল

তবে গত কয়েক দিন হেফাজত নতুন নতুন যে ঘটনাপ্রবাহের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে তাতে স্পষ্ট, সংগঠনটি আপাতত এক ধরনের সংস্কারের পথে হাঁটতে বাধ্য হচ্ছে। এ প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে নাটকীয়ভাবে সংক্ষিপ্ত ভিডিও বার্তায় রোববার মধ্যরাতে কমিটি বিলুপ্তের ঘোষণা দেন বাবুনগরী। ওই বার্তায় তার গলার সুরও ছিল ‘নমনীয়’। এ ধরনের ভাষায় নিকট অতীতে তাকে বক্তব্য রাখতে দেখা যায়নি।

এর আগে শনিবারই সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে আল-হাইয়াতুল উলয়া লিল-জামিয়াতুল কওমিয়া বাংলাদেশের পক্ষ থেকে কওমি মাদ্রাসার ছাত্র-শিক্ষকদের প্রচলিত সব রাজনীতি থেকে দূরে রাখার ঘোষণা দেওয়া হয়। চলমান পরিস্থিতিতে হেফাজতের নানামুখী তৎপরতার ওপর কঠোর নজর রাখছে সরকারের একাধিক সংস্থা।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফরের বিরোধিতা করে নেওয়া কর্মসূচি ঘিরে নাশকতার পর ১৯ কেন্দ্রীয় নেতাকে গ্রেপ্তার ও অন্তত ৮৫টি মামলায় ৭০ হাজার জনকে আসামি করা হয়েছে। সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান জ্বালা-পোড়াওয়ের পর সমালোচনা, একের পর এক মামলা এবং গ্রেপ্তার অভিযানে নতুনভাবে চাপে পড়েছে হেফাজত। কমিটি বিলুপ্তির মধ্য দিয়ে সেই চাপ কাটানোর চেষ্টা করা হলেও সংগঠনটিকে এখনই পুরোপুরি ‘সন্দেহের’ বাইরে রাখতে চাইছে না সরকার। তাই কমিটি ভেঙে দেওয়ার পরও নাশকতায় জড়িতদের ধরতে গ্রেপ্তার অভিযান বন্ধ হয়নি। গত ২৪ ঘণ্টায় শুধু ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে ১৪ জনকে।

হেফাজতের কর্মকাণ্ডের ওপর নজর রাখেন এমন একাধিক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, সম্প্রতি নাশকতার পর সংগঠনটির ভেতর থেকেই সংস্কারের জোরালো দাবি ওঠে। এমনকি রিমান্ডে থাকা একাধিক কেন্দ্রীয় নেতাও স্বীকার করছেন, এভাবে হেফাজত চলতে পারে না। সংগঠনটি অরাজনৈতিক দাবি করলেও অনেকে বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত। আবার কেউ কেউ গোপনে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন। কোনো কর্মসূচির ডাক দেওয়া হলেই তারা বড় ধরনের নাশকতা ঘটাতে মাদ্রাসার হাজার হাজার ছাত্রকে লাঠিসোটা নিয়ে মাঠে নামান। পরে এর দায় পুরোপুরি হেফাজতকে নিতে হয়।

অন্য একজন কর্মকর্তা জানান, কওমি মাদ্রাসাকে পুরোপুরি হেফাজতের প্রভাববলয়ের বাইরে রাখার ব্যাপারে সংগঠনটির অনেকে একমত পোষণ করেছেন। আগামীতে কোনো কর্মসূচিতে মাদ্রাসাছাত্রদের মাঠে নামানো হবে না- এটাও তারা নিশ্চিত করতে চান।

সংশ্নিষ্ট এক কর্মকর্তার ভাষ্য, কমিটি বিলুপ্তি বা কওমি ছাত্রদের রাজনীতি থেকে দূরে রাখার সিদ্ধান্ত আসার পরও সম্প্রতি নাশকতায় জড়িতদের ধরপাকড় বন্ধ হবে না। চলমান অভিযান অব্যাহত থাকবে। তবে হাটহাজারী ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া ঘিরে নতুন কৌশল নিয়ে এগোচ্ছে প্রশাসন। সেখানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর যৌথ অভিযান চালানোর আভাস মিললেও পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে তা বাস্তবায়ন করা হতে পারে।

জানা গেছে, হেফাজতের ভেতর থেকেও একটি পক্ষ নানাভাবে সরকারের নীতিনির্ধারণী মহলের সঙ্গে যোগাযোগ করে সংগঠন সংস্কারে তাদের নেওয়া পদক্ষেপ ও পরবর্তী করণীয়র ব্যাপারে ধারণা দিচ্ছেন। এরই মধ্যে কয়েকজন হেফাজত নেতা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎও করেছেন। গতকাল রাতেও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করে কওমি মাদ্রাসার প্রতিনিধি দল।

জানা গেছে, হেফাজতের নতুন কমিটিতে অপেক্ষাকৃত উদার, নমনীয় ও স্বাধীনতার পক্ষে স্পষ্ট অবস্থান থাকা নেতারা পদ পেতে পারেন। সদ্য বিলুপ্ত কমিটির অনেকে পদ পেলেও তাদের সংস্কারের ভেতর দিয়ে যেতে হবে।

কমিটি বিলুপ্তের প্রতিক্রিয়ায় গতকাল আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, কমিটি বিলুপ্ত করলেই হবে না। তাদের সাম্প্রদায়িক সহিংসতার রাজনীতিও বিলুপ্ত করতে হবে।

হেফাজতের প্রতিষ্ঠাতা যুগ্ম মহাসচিব ও শফীপন্থি হিসেবে পরিচিত মাইনুদ্দিন রুহি বলেন, ‘জুনায়েদ বাবুনগরীর নেতৃত্বে নতুন করে আহ্বায়ক কমিটি গঠন করে কৌশলে হেফাজতে ইসলামের নেতৃত্ব-কর্তৃত্ব কার্যত নিজেদের হাতে ধরে রেখেছেন তারা। এটা করে তারা আবারও জাতিকে ধোঁকা দিয়েছেন। এই কমিটির কোনো বৈধতা নেই। আহমদ শফী মৃত্যুর আগে যে কমিটি করে দিয়েছেন, সেটিই বৈধ কমিটি। যারা হেফাজতকে আদর্শ থেকে লক্ষ্যচ্যুত করেছে, তাদের বাদ দিয়ে এবং শূন্য পদে সর্বজনগ্রহণযোগ্য ব্যক্তিকে যোগ করে শিগগির কমিটি পুনর্গঠন করা হবে।’

রুহি আরও বলেন, আহ্বায়ক কমিটি কার্যত বাবুনগরীর পকেট কমিটি। এ কমিটির চারজন তার আত্মীয়।

তড়িঘড়ি করে আহ্বায়ক কমিটি :রোববার রাতে হেফাজতের কমিটি ভেঙে দেওয়া হলেও নেতৃত্ব ধরে রাখতে কিছু সময় পরই একটি আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হয়েছে। এ কমিটি গঠন নিয়ে ছিল নাটকীয়তা। প্রথমে তিন সদস্যের আহ্বায়ক কমিটি গঠন করার কিছু সময় পর আরও দু’জন সদস্য বাড়ানো হয়। হেফাজতের ফেসবুক পেজে প্রকাশিত ওই কমিটিতে সদস্য হিসেবে প্রথমে তিনজনের নাম ঘোষণা করা হয়। তারা হলেন- হেফাজতের প্রধান উপদেষ্টা মুহিবুল্লাহ বাবুনগরী, আহ্বায়ক জুনায়েদ বাবুনগরী ও মহাসচিব নুরুল ইসলাম।

পরে কমিটিতে আরও দু’জনকে যুক্ত করা হয়। তারা হলেন- সালাহ উদ্দিন নানুপুরী ও অধ্যক্ষ মিজানুর রহমান। শেষ পর্যন্ত সেই মামা-ভাগিনা জুটির হাতেই আছে সংগঠনের নেতৃত্ব। হেফাজতের ভেঙে দেওয়া কমিটির আমির জুনায়েদ বাবুনগরীই হয়েছেন নতুন কমিটির আহ্বায়ক। আর সদ্যবিলুপ্ত কমিটির সিনিয়র নায়েবে আমির মাওলানা মুহিবুল্লাহ বাবুনগরী হয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা। এ দু’জনের বাড়িই চট্টগ্রামের ফটিকছড়িতে; বাবুনগর গ্রামে। এ জন্য তাদের পদবি হচ্ছে বাবুনগরী। আবার সম্পর্কে তারা মামা-ভাগিনা। তারা দু’জনই ‘কট্টরপন্থি’ হিসেবে পরিচিত। আহ্বায়ক কমিটিতে স্থান পাওয়া নুরুল ইসলামের বাড়ি ঢাকায় এবং মাওলানা সালাহ উদ্দিনের গাজীপুরে। মহিবুল্লাহ ছাড়াও আহ্বায়ক কমিটির আরও দু’জন বাবুনগরীর আত্মীয়। তাদের মধ্যে নুরুল ইসলাম হলেন বাবুনগরীর ফুফাতো ভাই আর সালাহ উদ্দিন তার ছোট মেয়ের ভাশুর।

নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়ে হেফাজতের এক নেতা বলেন, ‘হেফাজতের দুই বাবুনগরী খুবই কট্টর প্রকৃতির মানুষ। তাদের ভুল সিদ্ধান্তের কারণে হেফাজতকে এখন মাশুল দিতে হচ্ছে। এরই মধ্যে সংগঠনের অনেক ক্ষতি হয়ে গেছে। নতুন করে ঘুরে দাঁড়াতে স্মার্ট নেতৃত্ব ও কৌশল অবলম্বনের বিকল্প নেই।’

হেফাজতের প্রতিষ্ঠাতা আমির আহমদ শফীর ছেলে মাওলানা আনাস মাদানী বর্তমানে দুবাইয়ে রয়েছেন। ঈদের আগেই তার দেশে ফেরার কথা। তিনি ফেরার পর সংগঠন নিয়ে তাদের পরিকল্পনার কথা আনুষ্ঠানিকভাবে জানাবেন বলে জানা গেছে।

আহমদ শফী মারা যাওয়ার আগে যে কমিটি ছিল, সেটাকে এখনও বৈধ কমিটি হিসেবে দাবি করছেন তার অনুসারীরা। কিন্তু সে কমিটির মহাসচিব ছিলেন জুনায়েদ বাবুনগরী। এ ছাড়া আহমদ শফীর মৃত্যুতে আমিরের পদসহ অনেক পদ শূন্য। মূলত সেই কমিটিকেই চাঙ্গা করতে চাইছেন শফী অনুসারীরা। তাদের মতে, জুনায়েদ বাবুনগরীকে নিয়েই যত সমস্যা। এর পরও তাকে রেখেই কার্যক্রম চালাতে চাইছেন শফী অনুসারীরা। তিনি কোনো কারণে অপারগতা প্রকাশ করলে বিকল্প চিন্তা মাথায় রাখা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন মাওলানা রুহী।

হেফাজতের বিলুপ্ত কমিটি ঘোষণা করা হয়েছিল ২০২০ সালের ১৫ নভেম্বর। এ কমিটিতে আমির নির্বাচিত হন হেফাজতের প্রতিষ্ঠাতা মহাসচিব ও হাটহাজারী মাদ্রাসার শিক্ষা পরিচালক জুনায়েদ বাবুনগরী। এ ছাড়া মহাসচিব নির্বাচিত হয়েছিলেন ঢাকার জামিয়া মাদানিয়া বারিধারা মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল ও হেফাজতের ঢাকা মহানগর শাখার আমির নূর হোসাইন কাসেমী। তিনি পরে করোনায় মারা যান। তার স্থলাভিষিক্ত করা হয়েছিল নুরুল ইসলাম জিহাদীকে। তাকেই আহ্বায়ক কমিটির সদস্য সচিব করা হয়েছে।

তিন শর্তের দুটি পূরণ :সহিংসতা-তাণ্ডবের পর ধরপাকড়ের মুখে পড়া হেফাজতে ইসলামের নেতারা নীতিনির্ধারণী মহলের তিন শর্তের দুটি মেনে নিয়েছেন। শর্ত মেনে মাদ্রাসাকে রাজনীতিমুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। রাজনৈতিক নেতাদের নেতৃত্ব থেকে সরাতে কমিটি বিলুপ্ত করা হয়েছে। তবে আহমদ শফীর ছেলে আনাস মাদানীদের সমর্থক তথা সরকার-ঘনিষ্ঠদের সঙ্গে সমন্বয় করে নতুন কমিটি গঠনের শর্তের বিষয়টি স্পষ্ট হয়নি। অন্য একটি সূত্র আভাস দিয়েছে, নতুন কমিটিতে শফীপন্থিরাও পদ পাচ্ছেন।

তবে হেফাজতের কমিটি বিলুপ্ত করার আরেকটি কারণ ভাঙন ঠেকানোর। সহিংসতার প্রতিবাদ জানিয়ে সংগঠনটি থেকে এরই মধ্যে কয়েক নেতা পদত্যাগ করেছেন। আরও অনেকে পদত্যাগ করতে পারেন বলে শোনা যাচ্ছিল।

আহমদ শফীর মৃত্যুর পর হেফাজতের প্রথম কমিটির ১৫১ সদস্যের ৩৪ জনই ছিলেন বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের শরিক জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের কেন্দ্রীয় নেতা। বিএনপির আরেক শরিক খেলাফত মজলিস বাংলাদেশের ছয় নেতাকেও কমিটিতে রাখা হয়। কমিটি থেকে বাদ দেওয়া হয় আনাস মাদানীর সমর্থকদের। চরমোনাই পীরের নেতৃত্বাধীন ইসলামী আন্দোলনের কাউকে রাখা হয়নি। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি জোটের বাইরে থাকা খেলাফত মজলিসের ১৬ জন এবং খেলাফত আন্দোলনের ছয় নেতাকে কমিটিতে রাখা হয়। ইসলামী ঐক্যজোটের চেয়ারম্যান, মহাসচিবসহ শীর্ষ নেতাদের কমিটিতে রাখা হয়নি। তবে ঠাঁই পান তাদের বিরোধী হিসেবে পরিচিত প্রয়াত মুফতি মুহম্মদ আমিনীর তিন জামাতা। এ ছাড়া ফরায়েজি আন্দোলন, খেলাফত আন্দোলনের অপরাংশসহ আরও কয়েকটি অনিবন্ধিত দলের নেতারাও ছিলেন হেফাজতের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে। হেফাজতের কেন্দ্রীয় কমিটির কলেবর বাড়ানোর পর দেখা যায়, ২০১ জনের মধ্যে ৮৫ জনই কোনো না কোনো দলের সঙ্গে যুক্ত। যদিও তারা নিজেদের অরাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে দাবি করে আসছে।

এদিকে, হেফাজতের ঢাকা মহানগর কমিটিও বিলুপ্ত করা হয়েছে। এর সভাপতি মাওলানা জুনায়েদ আল হাবীব জমিয়তের সহসভাপতি এবং মহানগর সাধারণ সম্পাদক মামুনুল হক বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব। তাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত