প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

সাহারা’য় অন্য শিহরণ…

আসাদুজ্জামান সম্রাট: ২০১৬ সাল। জাতিসংঘের বিশ্বজলবায়ু সম্মেলনের ২২তম আসর বসেছিল পশ্চিম আফ্রিকার দেশ মরোক্কোর অন্যতম পর্যটন নগরী মারাক্কেশে। ঢাকা থেকে সৌদি এয়ারলাইন্সের রিয়াদ হয়ে কাসাব্লাঙ্কা পৌছি। সেখানে আয়োজক সংস্থার পক্ষ থেকেই মারাক্কেশ পৌছানোর ব্যবস্থা ছিল। সবমিলিয়ে আটজন যাত্রী নিয়ে বিশাল একটি বাসে আমাদের কাসাব্লাঙ্কা থেকে মারাক্কেশে নেয়ার ব্যবস্থা ছিল। পুরো পথে আমাদের ভিআইপি প্রটোকল দেয়া হয়েছে। সামনে পেছনে ছিল নিরাপত্তারক্ষী।

সম্মেলনের মাঝে দু’দিনের বিরতি। আমি সাধারণত: জলবায়ু সম্মেলনের মাঝের সময়ের এই বিরতিতে দর্শনীয় স্থান দেখার সুযোগ হাতছাড়া করি না। মরোক্কোতে এসেছি আর সাহারা মরুভুমি দেখতে যাবো না এটা হয়না। পশ্চিম সাহারার বেশিরভাগ অংশই মরোক্কোর দখলে – এ নিয়ে প্রতিবেশী দেশ ও আদিবাসী গোষ্ঠীগুলোর দ্বন্ধ এখনও মিটেনি। মারাক্কেশ থেকে পশ্চিম সাহারার মেহমিদ পর্যন্ত দূরত্ব সাড়ে চারশ’ কিলোমিটার। এর মধ্যে পাড়ি দিতে হবে বিপদজনক এটলাস পর্বতমালার সর্পিল রাস্তা। যা পৃথিবীর অন্যতম ভয়ানক রাস্তার একটি হিসেবে পরিচিত। এই সড়কে যেতে হলে ফোর হুইল জীপ নিতে হবে। একজন গাইড ও ড্রাইভার এবং সাহারা মরুভুমির তাবুকে এক রাত অবস্থান ও ডিনারসহ পুরো প্যাকেজ জনপ্রতি তিনশ’ ডলারের। বাংলাদেশী মুদ্রায় যা ২৫ হাজার ৫শ’ টাকা। ভ্রমণসঙ্গীদের কেউই রাজি হলো না। তারা পরের সপ্তাহে মাইক্রোবাসে একটা ‘বাজেট ট্যুর’ বেছে নিলেন।

আমি এই ট্যুরের বিষয়ে আগ্রহী হওয়ার কথা জেনে আরো দু’জন সঙ্গী হলেন। একজন ইউএনডিপির মামুন ভাই অন্যজন আইএলও’র জিয়াউল হক মুক্তা ভাই। তারা দু’জন আবার জাহাঙ্গীনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সহপাঠী। এর মধ্যে মামুন আবার বিয়ে করেছে আমার শ্বশুরবাড়ির কাছেই। ফলে হৃদ্যতা একটু বেশিই বটে। তারা রাজি হওয়ায় হাফ ছেড়ে বাঁচলাম। ভোর সাতটায় মারাক্কেশের মদিনা এলাকা থেকে একটি ল্যান্ডক্রুজারে করে আমরা যাত্রা করলাম। নাস্তা না করে বেরিয়ে পড়ায় এ্যাটলাস পর্বতমালার মাঝামাঝি একটি রেষ্টুরেন্টে বসে নাস্তা করলাম। রেষ্টুরেন্ট থেকে এটলাস পর্বতমালার চূড়া দেখা যাচ্ছিল। বরফচ্ছাদিত চুড়া দেখতে দেখতেই আমরা অরগান অয়েল, ডিম, বাটার, পাউরুটি খেলাম। গাইড ও ড্রাইভার তাড়া দিচ্ছিলেন যেনো বেশি সময় নষ্ট না করি। কারণ, এটলাসের এই বিপদজনক সড়কে খুব জোরে গাড়ি চালানো যায়না। বিলম্ব হলে আমরা সূর্যাস্ত মিস করবো। ড্রাইভার ও গাইড খুবই আমুদে প্রকৃতির। মরোক্কান গান ছেড়ে তার সঙ্গে তালি বাজিয়ে চালাচ্ছিলেন গাড়ি। আমরাও তাল মেলালাম।
আফ্রিকা মহাদেশের উত্তর প্রান্তে আটলান্টিক মহাসাগরের তীর ঘেঁষে অবস্থিত একটি স্বাধীনতাকামী অঞ্চল পশ্চিম সাহারা। বর্তমানে অঞ্চলটির অধিকাংশ এলাকা মরক্কোর নিয়ন্ত্রণে থাকলেও পশ্চিম সাহারার স্বাধীনতাকামী সংগঠন ‘পোলিসারিও ফ্রন্ট’-এর গেরিলাদের সাথে দেশটির সশস্ত্র সংঘাতের ঘটনা চলমান রয়েছে। প্রায় ২ লাখ ৬৬০০০ বর্গকিলোমিটার আয়তনের পশ্চিম সাহারা অঞ্চলটির বর্তমান জনসংখ্যা প্রায় ছয় লক্ষ। অঞ্চলটির জনসংখ্যার প্রায় চল্লিশ শতাংশ মানুষ বৃহত্তম শহর লাইয়ুনে বসবাস করে থাকে। অঞ্চলটির প্রায় আশি ভাগ এলাকা বর্তমানে মরক্কোর নিয়ন্ত্রণাধীন, যেটিকে মরক্কো দক্ষিণাঞ্চলীয় প্রদেশসমূহ হিসেবে দাবি করে থাকে এবং বাকি বিশ শতাংশ এলাকা পোলিসারিও ফ্রন্ট নিয়ন্ত্রিত, যেটি মুক্তাঞ্চল নামে পরিচিত। পোলিসারিও ফ্রন্ট পুরো অঞ্চলটি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে এনে সেখানে ‘সাহরাউয়ি আরব গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র’ নামে একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে।

পশ্চিম সাহারা অঞ্চলটি ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত স্পেনের ঔপনিবেশিক শাসন ব্যবস্থার অধীনে ছিল। শুরুর দিকে স্পেন সরকার পশ্চিম সাহারা অঞ্চলটিকে আন্তর্জাতিক দাস বাণিজ্যের একটি বন্দর হিসেবে ব্যবহার করার জন্য সেখানে কিছু নাগরিক নিয়ে বসতি স্থাপন শুরু করেছিল। ১৭০০ সালের দিকে স্পেন সরকার কর্তৃক বাণিজ্যিকভাবে মৎস্য আহরণের মধ্য দিয়ে সেখানে তাদের অর্থনৈতিক কার্যক্রম শুরু করেছিল। এরপর আফ্রিকা মহাদেশে বাণিজ্য করা ঔপনিবেশিক শক্তিগুলোর মধ্যে ১৮৮৪ সালে জার্মানির বার্লিনে একটি সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সে সম্মেলনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, স্পেন সরকার পশ্চিম সাহারা অঞ্চলটি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেয়। এভাবে পশ্চিম সাহারা অঞ্চলটিতে স্পেনের উপনিবেশ গড়ে ওঠে।

১৯৪৫ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তির পর থেকে বিভিন্ন ঔপনিবেশিক শক্তি উপনিবেশগুলো থেকে তাদেরকে গুটিয়ে নিতে শুরু করে। এভাবে বিভিন্ন অঞ্চল ঔপনিবেশিকতার শৃঙ্খল থেকে মুক্ত হয়। ১৯৬৫ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ পশ্চিম সাহারা অঞ্চলে ঔপনিবেশিক শাসনের অবসান ঘটাতে স্পেন সরকারের কাছে আহবান জানায়। অন্যদিকে, পোলিসারিও ফ্রন্ট ১৯৭৩ সালের দিক থেকে স্পেনের ঔপনিবেশিক অপশাসনের অবসানের জন্য সংগ্রাম শুরু করেছিল। ফসফেট খনি, সমুদ্রবন্দর এবং ভৌগোলিক অবস্থানগত সুবিধার কারণে স্পেনের উপনিবেশ থাকা অবস্থায় আলজেরিয়া, মরক্কো এবং মৌরিতানিয়া- এই তিনটি দেশ পশ্চিম সাহারা অঞ্চলটিকে ঐতিহাসিকভাবে নিজেদের ভূখণ্ড দাবি করে সেটির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে পরস্পরের মধ্যে তীব্র বিরোধে জড়িয়ে পড়ে। যা এখনও বিদ্যমান। আমরা যে পথ দিয়ে মেহমিদ গিয়েছি তার দুই পাশে দুই দেশের ক্যান্টনমেন্ট রয়েছে।

১৯৭৫ সালের শেষের দিকে, স্পেনের সামরিক শাসক ফ্রান্সিসকো ফ্রাঙ্কো নিজ দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক সংকটে পড়ে পশ্চিম সাহারা অঞ্চলটি থেকে উপনিবেশ সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। আফ্রিকা মহাদেশের সর্বশেষ ইউরোপীয় উপনিবেশগুলোর মধ্যে একটি ছিল পশ্চিম সাহারা। সে বছরের ৬ নভেম্বর, মরক্কোর তৎকালীন বাদশাহ দ্বিতীয় হাসানের নির্দেশে প্রায় সাড়ে তিন লক্ষ মরক্কোর নাগরিক আকস্মিকভাবে জাতীয় পতাকা হাতে নিয়ে নিরস্ত্র অবস্থায় পশ্চিম সাহারা অঞ্চলটিতে প্রবেশ করেছিল। ঘটনাটি ঐতিহাসিক গ্রিন মার্চ নামে পরিচিত। মূলত পশ্চিম সাহারার বাসিন্দাদের মতামতের তোয়াক্কা না করে অঞ্চলটির নিয়ন্ত্রণ মরক্কোর হাতে নেওয়ার জন্য এটি করা হয়েছিল।

এরপর ১৯৭৫ সালের ১৪ নভেম্বর, স্পেনের রাজধানী মাদ্রিদে পশ্চিম সাহারার ঔপনিবেশিক শাসনের অবসানে স্পেন, মরক্কো এবং মৌরিতানিয়া- এই তিন দেশের মধ্যে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তির শর্তানুযায়ী, পশ্চিম সাহারা অঞ্চলটির উত্তরাংশ মরক্কো এবং দক্ষিণাংশ মৌরিতানিয়ার মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হয়। এই মাদ্রিদ চুক্তি পশ্চিম সাহারার স্বাধীনতাকামী সংগঠন পোলিসারিও ফ্রন্ট পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করে। এরপর পোলিসারিও ফ্রন্ট আলজেরিয়ার সহায়তা নিয়ে ১৯৭৬ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি ‘সাহরাউয়ি আরব গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র’ নামে একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের ঘোষণা দিয়েছ। পোলিসারিও ফ্রন্ট আলজেরিয়ার টিনডুফ শহরে একটি প্রবাসী সরকার গঠন করে পশ্চিম সাহারা অঞ্চলে স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে। আলজেরিয়া পোলিসারিও ফ্রন্টের গেরিলাদের সামরিক সহায়তা প্রদান করে থাকে। ১৯৮৪ সালে আফ্রিকা মহাদেশের দেশগুলোর সর্ববৃহৎ সহযোগিতা সংস্থা আফ্রিকান ইউনিয়নের পূর্ণাঙ্গ সদস্যপদ অর্জন করে, এ ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় মরক্কো আফ্রিকান ইউনিয়ন থেকে পদত্যাগ করেছিল। যদিও প্রায় ৩৩ বছর পর ২০১৭ সালের ৩০ জানুয়ারি, মরক্কো আবারও আফ্রিকান ইউনিয়নে ফিরে এসেছে। পোলিসারিও ফ্রন্টের গেরিলাদের প্রতিরোধ আক্রমণের কারণে মৌরিতানিয়ার সৈন্যদের ব্যাপক হতাহতের ঘটনা ঘটেছিল। ফলে মৌরিতানিয়া ১৯৭৯ সালের দিকে এসে পশ্চিম সাহারা অঞ্চলটির উপর নিজেদের দাবি প্রত্যাহার করে নিতে বাধ্য হয়েছিল। কিন্তু, মরক্কো পোলিসারিও ফ্রন্টের গেরিলাদের প্রতিরোধের মুখোমুখি হলেও কখনোই অঞ্চলটি থেকে নিজেদের সরিয়ে নিতে ইতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করেনি। মরক্কো যেকোনো মূল্যে পশ্চিম সাহারা অঞ্চল নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে বদ্ধপরিকর। ফলে পোলিসারিও ফ্রন্টের গেরিলাদের সাথে মরক্কোর সামরিক সংঘাত অব্যাহত থাকে। দু’পক্ষে বিপুল সংখ্যক হতাহতের ঘটনা ঘটে এবং ব্যাপক অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতি হয়। সংঘাতের কবল থেকে রক্ষা পেতে পশ্চিম সাহারা অঞ্চলের প্রায় লক্ষাধিক বাসিন্দা আলজেরিয়ার টিনডুফ শহরে স্থাপিত শরণার্থী শিবিরে বসবাস করতে বাধ্য হয়েছে।

পোলিসারিও ফ্রন্টের গেরিলাদের আক্রমণ প্রতিহত করার জন্য মরক্কো সরকার ১৯৮০ সালে একটি নিরাপত্তা বেষ্টনী তৈরি করার কাজ শুরু করে, যেটি মরোক্কান পশ্চিম সাহারা দেয়াল নামে পরিচিত। ১৯৮৭ সালের ১৬ এপ্রিল, ছয় পর্যায়ে তৈরি ১,৭০০ মাইল দীর্ঘ এই বেলে প্রাচীরটির নির্মাণ কাজ শেষ করা হয়েছিল। কৌশলগতভাবে এই নিরাপত্তা বেষ্টনীটি মরক্কোর জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এর মাধ্যমে মরক্কোর সামরিক বাহিনী পোলিসারিও ফ্রন্ট নিয়ন্ত্রিত মুক্তাঞ্চল থেকে মরক্কোর দাবিকৃত দক্ষিণাঞ্চলীয় প্রদেশসমূহ পৃথক করেছে। জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় ১৯৯১ সালে বিবাদমান দু’পক্ষের মধ্যে যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। যদিও সে যুদ্ধবিরতি ভেঙে বিভিন্ন সময়ে দু’পক্ষ সংঘর্ষে লিপ্ত হয়েছে। সেই চুক্তিতে শান্তিপূর্ণভাবে সংকটের সমাধানের কথা বলা হয়েছিল, এমনকি একটি গণভোট আয়োজনের প্রতিশ্রুতিও এতে ছিল। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ও ফ্রান্স সরকারের সমর্থনপুষ্ট মরক্কোর

অসহযোগিতার কারণে গণভোট আয়োজন সম্ভব হয়নি। এ সংকটে রাশিয়া এখন পর্যন্ত নিরপেক্ষ অবস্থান বজায় রেখেছে, দেশটি দু’পক্ষের মধ্যে একটি শান্তিপূর্ণ সমাধান প্রত্যাশা করে। মরক্কো সরকার বারবার ভোটার তালিকাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে গণভোট আয়োজনে বাধা সৃষ্টি করে আসছে। গণভোটের আয়োজন ব্যাহত করে মরক্কো জাতিসংঘ স্বীকৃত পশ্চিম সাহারা অঞ্চলের বাসিন্দাদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে আসছে।

আমাদের ভ্রমণ সময়েও এই অঞ্চল নিয়ে সংঘাত অব্যাহত ছিল। চলতে চলতে গাইডের কাছ থেকে সে নিয়ে নানা তথ্য জানার চেষ্টা করলাম। পৃথিবীর অনেক পার্বত্য এলাকা আমার দেখার সুযোগ হয়েছে। কিন্তু এটলাস পর্বতমালার মতো এমন কঠিন শিলার পর্বতমালা দেখিনি। পুরো পার্বত্য এলাকার কোথাও গাছ তো দূরের কথা লতা-গুল্ম জাতীয় কোনো কিছু দেখলাম না। পাথরের উপর শ্যাওলা ছাড়া আর কিছুই চোখে পড়েনি। এটলাস পার্বতমালা পার হয়ে কিছুটা সমতল সড়কে এসে পৌছলাম। আমাদের যাত্রা পথের মাঝে কোয়ার্টজ এলাকায় পৌছে আমরা দুপুরের খাবার খেলাম এবং ঐতিহ্যবাহী বারবার পোষাক কিনলাম। তিন জনে মিলে ছবি দেখলাম। বারবার পোষাকে আমাদের দারুন মানিয়েছে বলে প্রশংসা করলেন স্থানীয়রা। তারাই আমাদের মাথায় পাগড়ী বাধার জন্য সাহায্য করেছেন। ওদিকে ঘটলো আরেক বিপত্তি। দোকানদার সম্ভবত: দাম একটু বেশি নিয়েছেন। আমাদের গাইড তার কাছ থেকে কমিশন চেয়ে বসলেন। তা দিতে রাজি হয়নি দোকানদার। গাইড এসে পোষাকগুলো আরো কমদামে কেনা যাবে বলে নিরুৎসাহিত করার চেষ্টা করলেন। দোকানদার এসে আমাদের কাছে অভিযোগ জানালে আমরাই মিটিয়ে দিলাম সে বিবাদ। পরে একটি চেইন শপ থেকে ওয়াইন ও হুইস্কিসহ কিছু পানীয় নিয়ে আবারও মেহমিদের দিকে ছুটে চললাম।

দীর্ঘ পাহাড়ী পথ পাড়ি দিয়েই আবারও বড়ো পাহাড় পড়লো। দুই পাহাড়ের মাঝ থেকে যাওয়া রাস্তা শেষেই চোখে পড়লো-ওয়েলকাম টু সাহারা ডেজার্ট। মুহুর্তেই পুরো পথের ক্লান্তি মুছে গেলো অন্যরকম এক উত্তেজনায়। গাড়ি থেকে নেমে ছবি তুলতে চাইলাম। কিন্তু ড্রাইভার বললো, তাবুতে যেতে যেতে সন্ধ্যা হয়ে যাবে। তখন আমরা উটের পিঠে চড়ে সূর্যাস্ত দেখতে পারবো না। সাহারা মরুভুমির ভেতরে প্রায় আধাঘন্টা পড়ে আমাদের জন্য নির্দিস্ট তাবুতে পৌছলাম। লাগেজ রেখেই উঠে পড়লাম উটের পিঠে। তখন পশ্চিমে হেলান দিচ্ছে লাল সূর্য। সমতলে কিন্তু সন্ধ্যা নেমে এসেছে। আমরা সাহারা মরুভুমির এক উচু বালিয়াডির দিকে এগিয়ে চলছি উটের পীঠে। আমার জীবনে এমন সূর্যাস্ত কোনোদিক দেখিনি। সূর্যাস্তের সময়ে আকাশ এতো লাল হতে পারে তা আমার কল্পনায়ও ছিলনা। প্রায় এক ঘণ্টার ডেজার্ট সাফারি করে ফিরে এলাম তাবুতে। ততোক্ষণে মরুভুমির বুকে কার্পেট বিছিয়ে বালিশ দেয়া হয়েছে। পুরো এলাকা আলোকিত করা হয়েছে কান্ডেল দিয়ে। এক ভিন্ন আবহের মধ্যে ফ্রেশ হয়ে এসে বসে পড়লাম পানাহারে। বলে রাখি, আমি পানাহারে খুব একটা সাচ্ছন্দ্যবোধ করিনা কখনোই। তারপরেও এমন পরিবেশে ওয়াইনে গলা না ভিজিয়ে থাকতে পারলাম না।

দুই বাংলার জনপ্রিয় লেখক প্রদোষ চন্দ্র মিত্রের ফেলুদা সিরিজের একটি বই আছে ‘সাহারায় শিহরণ’। সেটি পড়ার আগে স্কুলে পড়েছি পৃথিবীর সবচে’ বড়ো সাহারা মরুভুমির কথা। সেই মরুভুমি দেখা আর সেখানে রাত কাটানো সত্যিই অন্যরকম এক শিহরণ। রাতে পানাহার আর গল্পে কাটিয়ে দেয়ার পর আমাদের জন্য ডিনারে রাখা হলো মরোক্কোর ঐতিহ্যবাহী খাবার তাজিন এবং সঙ্গে রুটি। এর সঙ্গে অর্গান অয়েল আর এক বাটি সিদ্ধ ফল। এটি খুই স্বাস্থ্যকর একটি ফল। অরগান অয়েল দিয়ে পাউরুটি ভিজিয়ে খাওয়া সেখানের ঐতিহ্য। এই পাউরুটিগুলো এতোই শক্ত হয় যে, যা কামড়িছে ছেড়া সত্যিই কষ্ঠদায়ক। আমার সামনের একটি দাত বাঁধানো ছিল। সেটি এই রুটির কামড়িয়ে ছিড়তে গিয়ে আবার খুলে গেছে। ঢাকায় এসে আবারও বাধাতে হয়েছে।

আমরা ভ্রমণে গিয়েছিলাম ডিসেম্বরে। সাহারায় দিনের বেলায় উষ্ণ আবহাওয়া বিদ্যমান থাকলেও সন্ধ্যা গড়াতে গড়াতেই তাপমাত্রা কমতে থাকে। এক পর্যাতে ৩-৪ ডিগ্রিতে নেমে আসে। আমাদের একটি তিনটি আলাদা আলাদা বেডের একটি তাবুতে থাকতে দেয়া হলো। পাশেই রয়েছে বাথরুম। গোসলের জন্য গরম পানিরও ব্যবস্থা আছে। আমি ব্রাশ করতে বাইরে বেশ সময়টা কাটানোর চেষ্টা করলাম। প্রচণ্ড ঠান্ডায় টিকতে না পেরে তাবুতে ফিরে এলাম। তাবু গরম রাখার কোনো ব্যবস্থা চোখে না পড়লেও তাবুর ভেতরটা বেশ গরমই বটে। রাতে ঘুমাতে কোনো সমস্যা হয়নি। গাইডের আগের দিনের দেয়া নির্দেশনা অনুযায়ী খুব সকালেই ঘুম থেকে উঠলাম। মরুভুমিতে সুর্যোদয়ও না-কি অনেক সুন্দর হয়। ভোরে উঠে বাইরে তাকাতেই অন্যরকম এক অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হলাম। পূর্ব দিগন্তে সূর্যিমামা উকি দিচ্ছে। এখানে প্রতিটি মিনিটে নয় সেকেন্ডে সেকেন্ডে আকাশের আলোর পরিবর্তন ঘটছে। লাল থেকে ধীরে ধীরে অতি উজ্জ্বল আলোতে রূপান্তর হতে খুব একটা সময় নিলো না। আমার সম্বিত ফিরলো গাইডের ডাকে। নাস্তা করে দ্রুত সাহারা এলাকা ত্যাগ করতে হবে। নইলে এটলাস পর্বতমালার চূড়া দেখা সম্ভব হবে না। ফেরার পথে অনেকগুলো ইউরোপীয়না ক্যারাভ্যান দেখেছি। যারা জিব্রাল্টার প্রণালী পাড়ি দিয়ে এখানে এসেছে। কেউ কেউ বাইরে দাড়িয়ে দাঁত ব্রাশ করছে। কেউ কেউ নাস্তা সারছে।

এরুভুমি থেকে মূল সড়কে ওঠার আগে একটা সাইনবোর্ডে আমার চোখ আটকে গেলো। তাতে পাঁচটি ভাষায় স্পষ্ট নির্দেশনা ছিল। ইংরেজীতে লেখা ‘ফর ক্লিন ডেজার্ট টেক ইউর গার্বেজ উইথ ইউ।’ যা বাংলা করলে দাড়ায় ‘পরিচ্ছন্ন মরুভুমির জন্য তোমার ময়লা-আবর্জনা তোমার সাথে নিয়ে যাও।’ সাইনবোর্ডটির সামনে একটি সেলফি তুলে ফিরতে ফিরতে আফসোস হলো আমাদের সুন্দরবন, কক্সবাজার, কুয়াকাটায় যেখানে যেখানে ময়লা ফেলার চিত্র। কিভাবে আমরা নিজেরাই নিজেদের প্রকৃতিকে নষ্ট করছি। সাইনবোর্ডটি আমাকে এক ধরনের গ্লানিতে ডুবিয়ে দিলো। সেই গ্লানিভরা মন নিয়ে ফিরে চললাল। ফেরার পথে আমরা দু‘টি জায়গায় থেমে হাতে তৈরি তৈজসপত্র এবং একটি প্রাচীন বিশ্ববিদ্যালয়ের ধ্বংসাবসেস ও খেজুর বাগান দেখলাম। ঢাকায় ফিরে বাসা পাল্টে নিজের ফ্ল্যাটে ওঠার সময়ে সেই ডায়রিটি হারিয়ে ফেলেছি। ফলে সবগুলোর নামও ঠিক মনে করতে পারছিনা। প্রাচীন যে বিশ্ববিদ্যালয়ের ধ্বংসাবসেস দেখেছিলাম তার নামটিও মনে করতে পারছিনা।

মরোক্কোতে ধনী-গরীবের পার্থক্যটা খুব বেশি। পথিমধ্যে এমনই একটি পাহাড়ের উপর বাংলোর সামনে দাড়ালাম। পাহাড়ের পাদদেশে বাংলোর মালিকের মালিকানাধীন বিশাল খেজুরের বাগান। পথে ছোট ছোট ছেলেরা খেজুর বিক্রি করছে। পর্যটকবাহী গাড়ি দেখলেই উচ্চ দর হাকাচ্ছে। গাইডের পরামর্শক্রমে আমরা সেই খেজুর কেনা থেকে বিরত থাকলাম। দীর্ঘপথ পাড়ি দিয়ে আমরা এটলাসের চূড়ায় এসে থামলাম। এটলাসের চূড়া আরো অনেক উপরে। কিন্তু এর চেয়ে বেশি উপরে ওঠা সম্ভব নয়। আমরা এখানে ছবি তুললাম। এটি কতোফুট উপরে তার একটা মাইলফলক রয়েছে। এখান থেকে কিছু স্যুভেনির কিনে আমরা ফিরে এলাম মারাক্কেশে আমাদের হোটেলে। এদিন রাতে পৃথিবীর অন্যতম ব্যায়বহুল বেলি ড্যান্স দেখার আয়োজন ছিল। বুদ্ধা বার নামের এই বারে ‘বুদ্ধ প্রতিমা’র সামনে সুন্দরী ললনাদের অসাধারণ বেলি ড্যান্স আমার সারাজীবনের এক অন্যরকম অভিজ্ঞতা হয়ে আছে। প্রথম দিনে বুকিং দিয়ে না যাওয়ায় আমরা কাঙ্খিত টেবিলে বসতে পারিনি। এজন্য পরেরদিনে স্টেজের সামনের টেবিল বুকিং দিয়ে এসেছিলাম এবং ভোর রাত অবদি সেই ড্যান্স দেখেছিলাম।

মরোক্কোর এই সফরে স্মরণে রাখার মতো অনেক ট্যুর থাকলে ছোট বেলায় স্কুলের পাঠ্যবইয়ে যে সাহারা মরুভুমি ভ্রমণ এবং উন্মুক্ত মরুভুমিতে বসে পানাহার, রাতে তাবুতে রাত কাটানোর যে শিহরণ তা লিখে প্রকাশ করার মতো ভাষা আমার মতো একজন ‘পিওর রিপোর্টারে’র পক্ষে সত্যিই কঠিন।

লেখক: আসাদুজ্জামান সম্রাট, নগর সম্পাদক- দৈনিক আমাদের অর্থনীতি ও সম্পাদক-পার্লামেন্ট জার্নাল

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত