প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

আবদুন নূর তুষার: এলসেভিয়ের এর জার্নালগুলোর মধ্যে ৯ টা জার্নাল ফেক প্রবন্ধ ছাপে বলে সরাসরি অভিযোগ আছে

আবদুন নূর তুষার: ল্যান্সেট এ প্রকাশিত একটি নিবন্ধ যা  আলাদাভাবে কোনো গবেষণা নিবন্ধ নয় বরং বিভিন্ন গবেষকদের অনেকগুলো আলাদা আলাদা দুর্বল গবেষণার ভিত্তিতে লেখা হয়েছে, সেটাকে গণমাধ্যমে এমনভাবে প্রচার করা হচ্ছে যেন মনে হয় লকডাউন না করে বাইরে বাইরে ঘুরলে করোনা ভাইরাস থেকে বেশি নিরাপদ থাকা যাবে। এটাও বলা হচ্ছে করোনা ভাইরাস বাতাসে ছড়ায়। বিজ্ঞান বিষয়ক নিবন্ধ বোঝার ক্ষেত্রে দুর্বলতা এবং ইচ্ছাকৃতভাবে লকডাউনের বিপক্ষে জনমত গঠনে এই প্রবন্ধটি ব্যবহার করে সেনসেশন তৈরির চেষ্টাও সামাজিক মাধ্যমে পরিলক্ষিত হচ্ছে। [১] প্রবন্ধটির শুরুতেই বলা হয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অর্থায়নে হেনেহান ও তার সহকর্মীদের গবেষণায় বলা হয়েছে বাতাস থেকে ভাইরাল স্যাম্পল কালচার করা না যাওয়ায় কোভিড ভাইরাসের বায়ুনির্ভর সংক্রমণের বিষয়টি সন্দেহাতীতভাবে প্রমান করা সম্ভব না। তারপর তারা বলেছেন ড্রপলেট ইনফেকশনের ক্ষেত্রে যে সব প্রতিরোধক কাজ করা হয় সেসব ঠিকই আছে। তবে যদি প্রমাণিত হয় যে কোভিড ভাইরাস মূলত বাতাসে ভেসে থাকে তাহলে এটা প্রতিরোধের জন্য ভেন্টিলেশন, অ্যারোসল তৈরি যাতে না হয় সে চেষ্টা করা, ভীড় কমানো, বদ্ধঘরে না থাকা এসব করতে হবে। ভালো করে বোঝেন ‘যদি প্রমাণ করা যায়’ অর্থাৎ বিষয়টা হাইপোথিসিস। কোনো অকাট্য প্রমাণ নেই। আর প্রমাণ হলেও যা করছিলাম সেটাই করতে হবে। যেমন মাস্ক, সামাজিক দূরত্ব ও হাত ধোয়া। [২] এরপর তারা বলেছেন বায়ুনির্ভর সংক্রমণ সরাসরি প্রমাণ করা দু:সাধ্য।

[৩] তারা বলেছেন যে বায়ুনির্ভর সংক্রমণ প্রমান করা যায় না। অধিকাংশ গবেষণায় যেহেতু বাতাস থেকে জীবন্ত ভাইরাস সংগ্রহ করার উপায় নেই এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রে যদি গবেষণায় ড্রপলেট ইনফেকশন এর পক্ষেই প্রমানাদি থাকে তবে এটা প্রমাণ করা কষ্টকর যে জীবাণুটি বাতাসে ভেসে ছড়ায়। অতীতে এরকম হয়েছে যে কিছু কিছু জীবানুর ক্ষেত্রে বহুদিন পরে বোঝা গেছে যে এটা বাতাসে ভেসে ছড়ায়। এটাও কিন্তু অনুমান নির্ভর মন্তব্য। [৪] এরপর তারা বলেছেন যে দশটি নিবন্ধ আছে যা কোভিড ভাইরাসের বাতাসে ভেসে থাকা বা এয়ারবোর্ন সংক্রমণের যে হাইপোথিসিস বা অনুমানকে সমর্থন করে। লক্ষ্য করুন, অনুমানকে সমর্থন করে তারা বলছেন, প্রমাণ করে না। এরপর তারা দশটি গবেষণার বিষয় বলেছেন [ক] সুপারস্প্রেডিং প্রমাণ করে যে এটা বায়ুনির্ভর।  এটা মোটেও সেটা প্রমাণ করে না। বরং ভীড় এর মধ্যে মানুষে মানুষে শারিরীক স্পর্শ বাড়া, নিরাপদ দূরত্ব না রাখা, হাঁচি কাশি সরাসরি দেওয়া, এসব এর মাধ্যমে সুপারস্প্রেডিং বেশি প্রমাণিত। [খ] তারা বলেছেন ক্রুজ শিপ, কনসার্ট, কেয়ার হোম, জেলখানা এসব জায়গায় সংক্রমণ বায়ুবাহিত। এটা কিন্তু নি:সন্দেহ নয় কারণ এই বদ্ধ এলাকাগুলোতে ভীড় হয়। ভীড়ের মধ্যে বায়ুবাহিত না ড্রপলেট ইনফেকশন সেটা আলাদাভাবে কোন গবেষণায় প্রমাণিত না। বহু জায়গাতে বদ্ধ জায়গায় এয়ারকুলার এর কমন ভেন্ট আছে। এটাকে তারা বায়ুবহনের প্রমাণ হিসেবে দিয়েছেন। কিন্তু একটা মেকানিকাল কারণ কিন্তু ভাইরাসটির নিজস্ব বায়ুবাহিত হবার প্রমাণ না। যেমন আপনি যদি একটা স্প্রেগান দিয়ে কিটনাশক ছিটান সেটা গানটার কারণে বায়ুবাহিত হয়, কীটনাশক নিজে বায়ুবাহিত না।

[গ] কোয়ারেন্টিন হোটেলে এক ঘর থেকে অন্য ঘরে ইনফেকশন গেছে বলে তারা উল্লেখ করেছেন। এজন্য এটা এয়ার বোর্ণ। কিন্তু এখানেও কমন ভেন্ট দিয়ে দুটো ঘরের সংযোগকে তারা আমলে নেননি। সমস্যাটা ভেন্টিলেশনের, ভাইরাসের না। [ঘ] এরপর তারা বলেছেন কম্যুনিটি ট্রান্সমিশন শূণ্য হলেই কেবল সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করা যায় যে ভাইরাসটি বায়ুবাহিত। সেই প্রমাণ তারা দিতে পারেন নেই। [ঙ] কোভিড ভাইরাস উপসর্গহীণ রোগীদের মাধ্যমে ছড়ায়। এটা তারা বলেছেন। হাঁচি কাশি না দিলেও এটা কিভাবে বায়ুবাহিত হয় সেটা তারা ব্যাখ্যা করেন নেই। তারা বলেছেন এর কারণ হলো কথা বললে ভাইরাসটি অ্যারোসল তৈরি করে। কথা বললে অ্যারোসল তৈরি হয় এটা সত্য। কিন্তু তাতে ভাইরাসটি অ্যারোসলের মাধ্যমে ছড়ায় এটা কিন্তু প্রমাণিত হয় না। চযরষরঢ় অহভরহৎঁফ ধহফ অফৎরধধহ ইধী এই দুই গবেষক কিন্তু এটাও বলেছেন যে সাধারন কথোপকথনে ড্রপলেটই বেশি হয়। তারা এটাও বলেছেন এই অ্যারোসল পরীক্ষাগারে মাত্র ৯ মিনিট বাতাসে ভেসে ছিল কিন্তু তারা বলেছেন যে এরজন্য মাস্ক ব্যবহার করাই সবচেয়ে ভালো প্রতিষেধক। বাড়ির বাইরে যেতে বলেন নেই। [চ] তারা বলেছেন ঘরের ভেতরে এটা বেশি ছড়ায়। এটা কিন্তু বাসার ঘর না। মল, অডিটোরিয়াম, সিনেমা হল এসব। [ছ] তারা বলেছেন হাসপাতালে পিপিই পরার পরেও ইনফেকশন হয়েছে। এটাও বায়ুবাহিত হবার প্রমাণ। কিন্তু এর জন্য সরাসরি বাতাসকে দায়ী করা বুদ্ধিমানের কাজ না। কারণ পিপিই খোলার সময় ও অসাবধানতায় এই ইনফেকশন হবার অকাট্য প্রমাণ আছে। [জ] ল্যাবরেটরীতে বায়ুতে এই ভাইরাস তিনঘন্টা ভেসে থাকার প্রমাণ পাওয়া গেছে।

এটা যেমন পাওয়া গেছে আরেকজন বলেছেন সময়টা নয় মিনিট। বুঝতেই পারছেন এর বিশ্বাসযোগ্যতা  কতোটা? [ঝ] গাড়ীতে ও ঘরে যেখানে কোভিড রোগী ছিল এমন জায়গার বাতাসে কোভিড ভাইরাস পাওয়া গেছে। এখানেও কিন্তু বদ্ধ এলাকা ও এয়ারকুলারের ব্যবহার আছে। [ঞ] তারা বলেছেন বাতাস থেকে ভাইরাস আলাদা করা খুব কঠিন হাম ও যক্ষাকে কখনোই বাতাস থেকে আলাদা করা যায়নি। একটা হলো ভাইরাস ও আরেকটা ব্যাকটেরিয়া। তাই এটাকেও না পেলে সমস্যা নেই। তারা যুক্তি দিয়ে প্রমাণ করে দেবেন কোভিড ভাইরাস বায়ুবাহিত। বলা বাহুল্য যে এই বক্তব্যটা গোঁজামিল। [ত] কোভিড ভাইরাসকে হসপিটালের ডাক্টে ও এয়ার ফিল্টারে পাওয়া গেছে। তাই এটা বায়ুবাহিত। হাসপাতালে এটা হতেই পারে কারণ রোগীদের ইনটিউবেশন করা হয়, নেবুলাইজ করা হয়, উচ্চচাপে সি প্যাপ বাই প্যাপ ব্যবহার করা হয়। এটা কোন প্রমাণ না আসলে। হাসপাতালে ভাইরাসের অ্যারোসল বানানো হয়। [থ] চিড়িয়াখানার জানোয়ারদের বেলায় ভেন্টিলেশন ডাক্ট দিয়ে এর সংক্রমণ হতে দেখা গেছে। জানোয়ারদের হাঁচি কাশির জোর ও তাদের খাঁচার দেয়াল বেয়ে উপরে ওঠা এসব তো মানুষ করে না। তাই এটা কোন অকাট্য প্রমাণ না। আর এখানেও কিন্তু ডাক্ট এর বিষয়টা আছে।

[দ] তারা বলেছেন যে কিছু ক্ষেত্রে এক ঘরে থাকার পরেও দুজন ইনফেকটেড হয়নি। তারপর বলেছেন যে এর কারণ হতে পারে যে তাদের ভাইরাল শেডিং কম ছিলো। এটাও একটা অনুমান নির্ভর কথা। যে প্রমাণ তাদের বিপক্ষে গেছে সেটাকে তারা এরকম অদ্ভুত কথা দিয়ে প্রতিহত করেছেন। যার কোনো প্রমাণ নেই। [ধ] এয়ারবোর্ণ ভাইরাসের আর নট বেশি হয়। অথচ কোভিড ভাইরাসের আর নট হলো ২.৫। আর হামের ১৫। এটাকে তারা যুক্তি দিয়েছেন কোভিড রোগীর ভাইরাল লোড হামের সমান না। এই যুক্তিটা বড়ই মাজুল। [ন] এরপর তারা ড্রপলেটের সাইজ ও কনসেন্ট্রেশন নিয়ে কথা বলেছেন। যেটা সাধারণ মানুষের বোঝা কঠিন। তবে যে কথাগুলো বলেছেন তার কোনোটাই গবেষণা নয় বরং ধারণা থেকে বলা। এবার উপসংহারে তারা বলেছেন তারা মনে করেন যে কোভিড ভাইরাস বাতাসে ছড়ায় এর স্বপক্ষে সরাসরি বৈজ্ঞানিক প্রমানের অভাবের কারণে এটা বলা যাবে না যে কোভিড বাতাসে ভেসে ভেসে ছড়ায় না। তারা মনে করেন যে তাদের অনুমাননির্ভর ও দুর্বল প্রমাণগুলো শক্তিশালী। তারা বিশ্বাস করেন যে এই ভাইরাস বাতাস দিয়েই ছড়ায়। এবার আমার কথা শোনেন। সমস্যা হলো দুর্বল ও সন্দেহাতীতভাবে অপ্রমাণিত গবেষণা দিয়ে এই বিশ্বাস একধরনের বায়াস বা পক্ষপাত। ল্যান্সেটের এই নিবন্ধ কোনো গবেষণা প্রবন্ধ না বরং অনেকগুলো দুর্বল গবেষণার ভিত্তিতে বলা একটি বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধ। এটা কোনো সরাসরি গবেষণার ফলাফল না। তাই পত্রিকাতে যে লেখা হচ্ছে ঘরে বিপদ বেশি, এই কথাটা সত্য না।

এখানে ইনডোর মানে বাসা বোঝায়নি। এখানে বোঝানো হয়েছে সেইসব  ইনডোর যেখানে ভীড় হয় ও কৃত্রিম বাতাস ব্যবহার করা হয়। যেমন সিনেমা হল, মল, হাসপাতাল, জনসভা, অডিটোরিয়াম এসব। বাসায় লকডাউন করলে যে সংক্রমণ কমে এটা হাজার বছরের প্রমাণিত বৈজ্ঞানিক সত্য। আর করোনা ভাইরাস যেভাবেই ছড়াক, মাস্ক সামাজিক দূরত্ব আর হাত ধোয়াই সমাধান।  শুধু তাই না, লকডাউন নিয়ে এই গবেষণায় কোনো নেতিবাচক মন্তব্য নেই। শব্দটাই নেই। ল্যান্সেটের আগে এটা সায়েন্স ডিরেক্ট নামে আরেকটা প্রকাশনায় ছাপা হয়েছে, সেটাও এলসেভিয়েরের একটি পত্রিকা। আর গত কয়েক বছর ধরে এলসেভিয়েরকে একটি প্রেডেটরি পাবলিশিং প্রতিষ্ঠান হিসেবে ইওরোপে সমালোচনা করছে। যারা কাটতি বাড়ানোর জন্য মাঝে মাঝেই এরকম গোঁজামিল প্রবন্ধ ছাপে। এলসেভিয়ের এর জার্নালগুলোর মধ্যে ৯ টা জার্নাল ফেক প্রবন্ধ ছাপে বলে সরাসরি অভিযোগ আছে। এমনকি তাদের টাকা দিলে তারা আপনার লেখা বইও ছাপে। কেবল ভুল থাকলে সেটা সম্পাদনা করে দেয়। ল্যান্সেট অবশ্য সরাসরি এটা করে না। তবে মাঝে মাঝে এরকম আরেক জায়গা থেকে নিয়ে একটা প্রবন্ধ ছেপে দেয় যাতে সবাই ল্যান্সেটের নাম নিয়ে কথা বলে। এবার যেমন নিয়েছে সায়েন্স ডিরেক্ট থেকে যেটা তাদেরই আরেকটা জার্নাল। এটা হলো প্রচারণার অংশ। এগুলো সিরিয়াস কোনো প্রবন্ধ না। ফেসবুক থেকে, মামুন

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত