প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ইউরোপের রেডলাইট ক্যাপিটাল দেখা…

আসাদুজ্জামান সম্রাট: প্যারিস, ব্রাসেলসের রেড লাইট জোন ঘুরে দেখেছি সংকোচহীনভাবে। চেষ্টা করেছি রেডলাইট জোনের মানুষের জীবনযাত্রা এবং সার্ভিস সম্পর্কে জানতে। শুরুতে এ নিয়ে আমার খুব একটা আগ্রহ ছিলনা। ব্রাসেলসের এক সিনিয়র ভাই আমাকে গাড়িতে পাশের সিটে বসিয়ে রেডলাইট এরিয়ায় নিয়ে গেলেন। বললেন, ‘ভালো লাগলে জানাবেন। এজন্য যা ব্যায় হয় আমি দেবো।’

সঙ্গে ছিলেন দুই সাংবাদিক বন্ধু। রেডলাইট এলাকা নিয়ে তাদের আগ্রহের কমতি নেই। গাড়ি চালাচ্ছিলেন বেলজিয়াম আওয়ামী লীগের নেতা মনির ভাই। পেছনের সিটে দুই সাংবাদিক বন্ধুর সঙ্গে ছিলেন আরেক বেলজিয়াম প্রবাসী। আমি মোবাইলের ভিডিও অপশন অন করে ভিডিও করছিলাম। মনির ভাই মাঝে মাঝে থামছিলেন সেক্স শপ’গুলোর সামনে। আমাদের দেশে টিভি-ফ্রিজের দোকানে যেভাবে পণ্য সাজিয়ে রাখা হয় ঠিক তেমনই শপগুলোর সামনে ‘গ্লাস বক্সে’র ভেতরে প্রচণ্ড ঠান্ডার মধ্যে শুধুমাত্র পেন্ট্রি-ব্রা পড়া তরুণী, মধ্য বয়স্কা, স্লিম ও মোটা মহিলাগুলো তাদের দেহবল্লভী প্রদর্শন করছেন, আর ইশারায় ডাকছেন। কয়েকটি শপে নিগ্রো মোটাসোটা যৌন কর্মীদেরও দেখা মিললো। গ্রুপ বেধে যাওয়ায় মনির ভাইসহ কেউই শপগুলোতে ঢোকার আগ্রহ দেখালো না। ফলে চোখের প্রশান্তি নিয়েই ব্রাসেলসের রেডলাইট এলাকা ত্যাগ করতে হলো।

এর সপ্তাহ খানেক আগে প্যারিসের রেডলাইট এরিয়াকে যাওয়ার সুযোগ হয়েছিল। ওই এলাকার বাইরে বিভিন্ন মার্কেট ও মেট্রো স্টেশনের আশেপাশে অনেক নারীকেই ঘুরে বেড়াতে দেখেছি। কেউ ইশারা-ইঙ্গিতে কাছেও ডেকেছে। প্যারিসের বন্ধু দোলন তাদের সঙ্গে কথা বললেন, মজা করলেন আমাদের সামনেই। বিশালদেহী এক একজন সুন্দরী ললনাদের দেখে কিছুটা ভয়ও লেগেছিল। এদের বেশিরভাগই ইংরেজী জানেন না। দোলন তাদেরকে জানালেন, ‘আমার বন্ধু সাইজে অনেক ছোট হওয়ায় তোমাদের দেখে ভয় পেয়েছেন’- একথা শুনে তো হেসেই খুন।

কপ-২১ সম্মেলনে প্যারিসে যাওয়া হলেও প্রায় চারদিন আমরা ছিলাম ব্রাসেলসে। সেখানে আমাদের মুন্সিগঞ্জের মনির ভাইয়ের বাসায় ছিলাম। অসম্ভব বন্ধুবৎসল মানুষ তিনি। তার স্ত্রী ও দু’ছেলেও বেশ আন্তরিক। মুন্সিগঞ্জের বালুয়াকান্দিতে তাঁর বাড়ি। সেখানে তাকে সবাই ‘বেলজিয়াম মনির’ নামেই চেনে। এই মনির ভাই একদিন ইউরোলাইন বাসের আমস্টারডামের আসা-যাওয়ার টিকিট কেটে পাঠিয়ে দিলেন আমাদের তিনজনকে। বাসে এক দেশ থেকে অন্যদেশে যাওয়ার একটি সুবিধা রয়েছে। যাওয়া-আসার পথে এর ভুপ্রকৃতি গঠন এবং প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখা যায়। এই বাসগুলোতে টয়লেট সুবিধা বিদ্যমান থাকায় ৪/৫ ঘন্টার জার্নিতে খুব একটা সমস্যা হয়না। পথে অবশ্য একটি ম্যাগডোনালসের দোকানে ২০ মিনিটের বিরতি দিয়েছিল। আমস্টারডামে পৌছে আমরা হাটাপথে অনেকটা পৌছে গেলাম এরিনা স্টেডিয়ামে। এটি মূলত: এ্যাজাক্স ক্লাবের নিজস্ব স্টেডিয়াম। এর পাশেই মেট্টো স্টেশন। উল্টো দিকে রয়েছে হেনিক্যান মিউজিক ক্যাফে। বিয়ার পান করতে করতে গান শোনার এক অপূর্ব সুযোগ নষ্ট করলাম না। বিশাল মিউজিক ক্যাফের ভেতরে গানের সুরে সুরে গলা ভেজানোর মজাই আলাদা।

ইউকিপিডিয়া বলছে, আমস্টেল নদীর ড্যাম’র বা বাঁধের কারনেই নেদারল্যান্ডেসের রাজধানীর নামটি হয় আস্টারডাম। এটি প্রাচীন হল্যান্ড বর্তমানে নেদারল্যান্ডের অন্যতম প্রধান শহর। এটি বিশ্বের অন্যতম প্রধান বন্দর ও বাণিজ্যকেন্দ্র। রাজধানী হলেও নেদারল্যান্ডস সরকারের মূলকেন্দ্র এখানে নয়, হেগ শহরে। দ্বাদশ শতকের শেষের দিকে একটি ছোট মাছ ধরার গ্রাম হিসেবে আবির্ভূত হয়ে সপ্তদশ শতাব্দীতে ডাচ গোল্ডেন এজ-এর সময় আমস্টারডাম পৃথিবীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বন্দরগুলির মধ্যে একটি হয়ে ওঠে। সেই সময়, নগদ অর্থ এবং হীরক বাণিজ্যের জন্য প্রধান কেন্দ্র ছিল এই শহর। উনবিংশ এবং বিংশ শতাব্দীতে শহরটি বিস্তৃত হয় এবং আশেপাশের অনেক নতুন এলাকা এবং শহরতলির পরিকল্পনা নিয়ে শহরটি নির্মাণ করা হয়। সপ্তদশ শতাব্দীতে নির্মিত আমস্টারডামের খাল এবং উনবিংশ শতকের স্থাপত্য ‘স্টিলিং ভ্যান আমস্টারডাম’, ‘প্রতিরক্ষা লাইন অফ আমস্টারডাম’ ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকাভুক্ত। পরিবেশ এবং পরিকাঠামোর জন্য জীবনযাপনের মানের বিচারে আমস্টারডামকে পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ট শহরের মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। নাৎসী বাহিনীর নির্মম নির্যাতনের শিকার এ্যানা ফ্রাঙ্ক, শিল্পী রেমব্র্যান্ডট ভ্যান রিজান এবং ভিনসেন্ট ভ্যান গঘ এবং দার্শনিক বারুচ স্পিনোজা অ্যামস্টারডামে বাসিন্দা। আমস্টারডামের ১০০কিলোমিটারেরও বেশি খাল রয়েছে, যা বেশিরভাগই জলযান চলার উপযোগী। শহরটির তিনটি প্রধান খালগুলি হল প্রিন্সগ্রেচ, হেইঞ্জ্রাচট, এবং কেইসাসগ্রেচ।

প্রথমবার ভ্রমণে সঙ্গীদের কারনে আমস্টারডামের অনেক কিছুই দেখা হয়নি। ২০১৭ সালে যখন জার্মানির বন থেকে আবার আসি তখন আমার বন্ধু জানতে চায়, কোথায় যাবি? আমি ড্যাম এরিয়া আর ভিনসেন্ট ভ্যান গগের চিত্রকর্ম দেখার আগ্রহ দেখালে ও হেসেই খুন। বললো, তোকে অন্য কিছু দেখাবো। কনকনে শীতের এক বিকেলে আমাকে নিয়ে যায় আমস্টারডামের বিখ্যাত রেড লাইট ডিস্ট্রিক্টে। আমি তো ডুকেই থ। ১৯৯৯ সালে একটি এনজিও’র কাজে দৌলতদিয়া পতিতা পল্লীতে গিয়েছিলাম। সেখানকার শিশুদের কল্যাণে এনজিওটির কার্যক্রম দেখাতে নিয়ে গিয়েছিল। ঢাকার ইংলিশ রোড আর টানবাজারের উচ্ছেদ অভিযানের খবর সংগ্রহ করেছি। ব্রাসেলসে গাড়িতে বসেই দেখেছি নিষিদ্ধ পল্লী। কিন্তু হেটে এভাবে প্রবেশ করায় কিছুটা ভয় কাজ করছিল। বন্ধু জানালো, এটা ইউরোপের রেডলাইট ক্যাপিটাল। ভয় পাওয়ার কিছু নেই। ওর কথায় ভরসা পেলাম। ডায়েট কোকের একটা ক্যান হাতে ওর সঙ্গে কথা বলছি আর হাটছি।

বন্ধুটি বলছিল, নগরীর এই জায়গাটি একাধারে আবাসিক এলাকা, পতিতাপল্লী ছাড়াও এটি এদেশের প্রধান ট্যুরিস্ট আকর্ষণের এলাকা। ধীরে ধীরে বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নেমেছে। আলো নিভে যাচ্ছে, খালের জলের রেডলাইটে প্রতিবিম্ব। নগরীর বিভিন্ন লোকালয়ে পায়ে হেঁটে ঘুরতে ঘুরতে এই জায়গাটিতে এসে যেন এক ভিন্ন পরিবেশের দেখা মেলে। জনাকীর্ণ, কিছুটা কোলাহলময়, তবে সে কোলাহল যেন উল্লাসমুখরিত, রাত যত বাড়বে ভিড় এবং মানুষের কোলাহলও তত বাড়বে। পতিতাপল্লী হলেও এখানে বহু ট্যুরিস্ট ঘুরে বেড়াচ্ছে বাচ্চা-কাচ্চা নিয়ে। এসব পাড়া সচরাচর নিষিদ্ধ পল্লী হিসেবে পরিচিত হলেও আমস্টারডামের এটিকে কোনো অর্থেই নিষিদ্ধ পল্লী বলার উপায় নেই। খালের দুপাড়ে পাথর বাঁধানো রাস্তার ওপর চার শ পাঁচ শ কিংবা তার চেয়ে বেশি বছরের পুরোনো বাড়িগুলোর নিচতলায় কাঁচের বক্সের ভেতরে এক একটা উইন্ডো। ওগুলোর প্রতিটির ভেতর স্বল্পতম পোশাকে একজন করে মেয়ে দাঁড়ানো বা বসা, তাদের ভঙ্গিতে আমন্ত্রণ, লাস্য, প্ররোচনায় কোনো কিছুই লুকানো নেই। ব্রাসেলসের সঙ্গে এর কোনো পার্থক্য নেই। তবে এখানকার ঘণত্ব ব্রাসেলসের চেয়ে অনেক কম। প্রত্যেকটি উইন্ডোর উপর লম্বা টিউবলাইটের লাল আলোর ফ্রেম। ভেতরে প্রতীক্ষমাণ রমণীদের কাউকে কাউকে ‘ভিক্টোরিয়া সিক্রেট’ কিংবা ‘সিলভিয়া’ অন্তর্বাস পরিহিত। দেখে এক এক জনকে মনে হচ্ছে, ইংলিশ সিনেমার কোনো নায়িকা কিংবা বিদেশী ম্যাগাজিনের সুন্দরী মডেল।

খোলামেলা এই পতিতাপল্লীর সামনে এসে বন্ধুটি বলছিল, রেড লাইট ডিস্ট্রিক্টের সীমানা এদিক-সেদিক ছড়ালেও সবচেয়ে প্রাচীনটি হচ্ছে ‘ডা ভালেন’। ওলন্দাজ আর বিদেশি নাবিকদের জন্যই এটির যাত্রা শুরু হয়েছিল ১২৭০ সাল নাগাদ। তবে মজার ব্যাপার, কয়েক শ’ বছর ধরে এখানে যাজক আর বিবাহিত পুরুষের প্রবেশ নিষিদ্ধ ছিল। কিন্তু কে যাজক আর কে বিবাহিত তা নির্ধারিত হতো কোন মানদণ্ডে তা বলতে পারলোনা বন্ধুটি। হাটতে হাটতে পকেট থেকে মোবাইল বের করতেই বন্ধুটি হাত চেপে ধরলো। বললো, মনের ভুলেও এখানে কোনো মেয়ের ছবি তোলার চেষ্টা করিস না। গোপন ক্যামেরা ছাড়াও এখানে বাউন্সার রয়েছে। আমাদের দেশে মদের বারগুলোতে সুঠাম দেহের বাউন্সার রয়েছে। এরা এক ধরনের ‘গুন্ডা’। এরা শারীরিকভাবে হেনস্তা করা ছাড়াও, জরিমানা এমনকি এখান থেকে বের করেও দিতে পারে।

হাটতে হাটতে বাড়ির উইন্ডোগুলো দেখছিলাম। নিচে পতিতাপল্লী হলেও ২/৩ তলা বাড়ির ওপরতলার পরিবেশ পুরোটাই আবাসিক। নিচতলার কর্মকাণ্ড নিয়ে কারও কোনো মাথাব্যথা নেই। এখানকার মেয়েরা রীতিমতো ইনকাম ট্যাক্স দেয়, সরকারিভাবে তাদের চিকিৎসার ব্যবস্থা রয়েছে, রয়েছে জীবনযাত্রা এবং তাদের পেশার মানোন্নয়নের চেষ্টা। অনেকগুলো ট্যুরিস্ট গ্রুপ দেখলাম দলবেধে হাটছে। কেউ কেউ আমাদের মতো দু’জন। কেউ একাও হেটে বেড়াচ্ছে। কোনো খদ্দের উইন্ডোর সামনে গিয়ে ইশারা করলে ভেতরের মেয়েটি পাশের দরজা খুলে বেরিয়ে আসে। এক বৃদ্ধ লোককে দরকষাকষি করতে দেখে একদল যুবক একযোগে স্লোগানের মতো করে আওয়াজ দিলো। বৃদ্ধ সেদিকে কর্নপাত না করেই ভেতরে চলে গেলো। কোনো খদ্দের ভেতরে চলে গেলে সেই শোকেস বা উইন্ডোর লাল আলো নিভে যায়। তিনি যতোক্ষণ ভেতরে থাকবেন ততোক্ষণ বন্ধ থাকবে লাইট। এখানে সাধারণত: ঘণ্টার হিসেবে খদ্দেরদের সঙ্গে চুক্তি হয়ে থাকে।

আমস্টারডামেও যৌনকর্মীদের সুরক্ষায় আমাদের দেশের মতো এনজিও রয়েছে। তবে এসব এনজিও’র বেশিরভাগই চালায় সাবেক যৌনকর্মীরা। এমনই একটি সংগঠনের নাম ‘পিক’ যার পুরো নাম প্রস্টিটিউশন ইনফর্মেশন সেন্টার। অবাঞ্ছিত মাতৃত্বে জন্ম নেওয়া এ পাড়ার বাচ্চাদের জন্য এখানে চালু করা হয়েছে চাইল্ড কেয়ার সেন্টার। আমাদের দেশের মতো এখানেও তাদের রয়েছে বঞ্চনার ইতিহাস। কিছু ব্যাংক এখনো এখানকার মেয়েদের হাউস মর্টগেজ লোন দিতে রাজি নয়। সামাজিক বঞ্চনার বিষয়টি এখানে খুব একটা চোখে পড়েনা।

হাটতে হাটতে আমরা চলে যাই আউডিকের্কস প্লেইন চত্বরে। এখানে একটা অর্ধনগ্ন ব্রোঞ্জের নারীর ভাস্কর্য রয়েছে। ‘বেলে’ নামের ওই ভাস্কর্যের ভিত্তির গায়ে খোদাই করে লেখা রয়েছে ‘সারা বিশ্বের যৌনকর্মীদের সম্মান করুন’। ভাস্কর্যটি একটি পুরোনো গির্জা কাছাকাছি। ১২১৩ সালে তৈরি আমস্টারডামের সবচেয়ে পুরোনো গির্জা এটি। এই গির্জার ঠিক সাথেই এখানকার সবচেয়ে পুরোনো রেড লাইট এরিয়া এই ভাস্কর্য স্থাপনের বিরোধিতা হয়েছে ব্যাপকভাবে। নেদারল্যান্ডের রাণীর সরাসরি হস্তক্ষেপে এই ভাস্কর্যটি স্থাপন করা সম্ভব হয়েছে। গির্জা ও অর্ধনগ্ন নারীর ভাস্কর্য পাশাপাশি অবস্থানই হচ্ছে, আমস্টারডামের সৌন্দর্য্য। কয়েক শ’ বছর আগে এই চত্বরটা ছিল গোরস্থান। সেই গোরস্থান সরিয়ে দেওয়ার পর তৈরি হয় চত্বরটি। এখন নগর কর্তৃপক্ষ চেষ্টা করছে এই চত্বর ঘিরে যে ‘উইন্ডো ব্রথেলগুলো’ আছে তা সরিয়ে দিয়ে এখানে রেস্তোরাঁ, দোকান, হাট-বাজার ইত্যাদি বসাতে।


আমস্টারডামের রেড লাইট ডিস্ট্রিক্টে বিশ্বের সম্ভবত সবচেয়ে বড় ও বৈধ পতিতাপল্লী। নেদারল্যান্ড সরকারের অনুমোদিত এই পতিতাপল্লীতে প্রায় ৬০০০ নারী দেহব্যবসা করেন। বছরে সেখানে ভিজিট করেন কমপক্ষে ২ কোটি পুরুষ। দেশটিতে প্রাপ্ত বয়স্ক নর-নারীর মধ্যে উভয়ের সম্মতিতে অর্থের বিনিময়ে যৌন সম্পর্ক স্থাপনে বৈধতা রয়েছে। কিন্তু এই যৌনতাকে কেন্দ্র করে সেখানে মাদকের বিস্তার ঘটছে বলে অনেকে মনে করছেন। তাই অর্থের বিনিময়ে যৌনতা ও মাদক বন্ধের জন্য আন্দোলনে নেমেছেন নারীবাদী ও খ্রিস্টানদের একটি গ্রুপ। তারা এমন সংস্কৃতি বন্ধের জন্য প্রচারণা শুরু করেছেন। ফলে ওই পতিতাপল্লীতে যেসব যুবতী অর্থের বিনিময়ে দেহ দান করেন, তারা রীতিমতো হুমকিতে পড়েছেন। তাদের ভয়, দেহব্যবসা বন্ধ হয়ে গেলে তাদেরকে পথে বসতে হবে। এখানে যেসব নারী দেহব্যবসা করেন তাদের প্রতি ঘন্টায় আয় ১০০ ইউরো যা বাংলাদেশী মুদ্রায় সাড়ে নয় হাজার টাকার মতো। তাদের এ ব্যবসাকে বন্ধ করে দেয়া হলে তাদের জীবিকা কেড়ে নেয়া হবে বলে আতঙ্কিত। তাই তারা প্রতিবাদী নারীবাদী সংগঠনগুলোর বিরুদ্ধে তারা পাল্টা জনমত তৈরির চেষ্টা করছেন।

যৌনকর্মীরা বলছেন, কিভাবে আপনারা নারীবাদী হন? কিভাবে আপনারা অন্য নারীর জীবিকা কেড়ে নেয়ার চেষ্টা করেন? আমস্টারডামে যেসব নারীরা যৌন ব্যবসায় আছেন তারা নিজেরাই নিজ দায়িত্বে আছেন। একজন খদ্দেরকে কিভাবে ধরতে হবে কিংবা কী সার্ভিস দিতে হবে সে বিষয়ে পরিষ্কার আইন আছে। ফলে একজন যৌনকর্মী এ বিষয়ে নিজের সিদ্ধান্ত নিতেই নিতে পারেন। প্রতিটি যৌনপল্লীর ভেতরে আছে একটি ‘প্যানিক বাটন’। কোনো পুরুষ খদ্দের যদি মনে করেন তিনি কোনোভাবে নির্যাতিত হচ্ছেন তাহলে তিনি তা ব্যবহার করতে পারেন। প্যানিক বাটন চাপ দিয়ে উইনডো ম্যানেজারকে তলব করে অভিযোগও করতে পারেন। এমন কি কোনো দ্বিধাদ্বন্দ্ব ছাড়াই পুলিশকে কল করতে পারেন। এসব নিয়ে আলাপ-আলোচনা করতে করতে আমরা এগিয়ে যাচ্ছিলাম। বন্ধুটি বলছিল, এ নিয়ে বিতর্ক বাড়ার কারণ হচ্ছে, নরডিক অঞ্চলে টাকার বিনিময়ে যৌন সম্পর্ককে অবৈধ ঘোষণা করা হয়েছে। নেদারল্যান্ডের উপর এ নিয়ে প্রচণ্ড চাপ রয়েছে। এ ব্যাবসাকে কেন্দ্র করে নারী পাচারের অভিযোগ অনেক পুরোনো। নেদারল্যান্ডসে বর্তমানে এমন দেহব্যবসায়ী নারীর সংখ্যা পনেরো থেকে ত্রিশ হাজারের মতো। একযুগ আগেও সেখানে শুধু যৌন কর্মকাণ্ডে বছরে প্রায় ১০ কোটি ইউরো হাত বদল হতো। আর বর্তমানে যৌনকর্মীরা তাদের উপার্জন থেকে আয়কর দিচ্ছেন। যা রাষ্ট্রীয় কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে।


রেডলাইট এরিয়ায় হাটতে হাটতে বেশ ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলাম। ফলে ‘ভিনসেন্ট ভ্যান গগ কিংবা অমর শিল্পী রেমব্রান্ডের ‘দি নাইট ওয়াচ’ দেখার সুযোগ হাতছাড়া করলাম। পরের দিন অবশ্য দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালে জার্মান নাৎসি বাহিনীর হাতে গুম ইহুদি বালিকা এ্যানা ফ্রাঙ্কের বাড়ি দেখতে গিয়েছিলাম। ছোট্ট একটি তিন তলা ভবন। টালির দোচালা খাড়া ছাদ। প্রতি তলায় পাশাপাশি দুটো মাত্র জানালা। এতেই ভবনটির আয়তন অনুমান করা যেতে পারে। ঘর থেকে বাইরে বেরোতে হয় সিঁড়ি ভেঙে। সিঁড়ির লাগোয়া পিচঢালা পথ। পথের পরেই খাল। বেশকিছু গাছপালাও আছে বাড়িটির সামনে। রাস্তা বরাবর গা ঘেঁষাঘেঁষি একই আকৃতির আরও অনেক বাড়ি। দিনভর বাড়িটিতে ভীর লেগেই থাকে।

উইকিপিডিয়ার মতে, আনেলিস মারি ‘এ্যানা’ ফ্রাঙ্ক হচ্ছেন হলোকস্টের শিকার সবচেয়ে বেশি আলোচিত ও বিখ্যাত ইহুদি বালিকা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ সময়কার তার ডায়রিতে লেখা ‘দিনলিপি’ এখন পর্যন্ত বিশ্বের অন্যতম সর্বাধিক পঠিত বই এবং অনেক চলচ্চিত্র ও নাটকের মূল বিষয় হিসেবে গৃহীত। তার জন্ম ভাইমার জার্মানির ফ্রাঙ্কফুর্ট আম মাইন শহরে, কিন্তু তার জীবনের বেশিরভাগ সময় কেটেছে নেদারল্যান্ডসের আমস্টারডামে। জাতীয়তায় ১৯৪১ সাল পর্যন্ত তিনি ছিলেন একজন জার্মান। নাৎসি জার্মানির সেমিটিক বিদ্বেষী নীতির কারণে তিনি তার জার্মান নাগরিকত্ব হারান। ১৯৩৩ সালে ফ্রাঙ্কের পরিবার আমস্টারডামে চলে যায়। সেই বছরেই নাৎসিরা জার্মানির ক্ষমতায় আসে। ১৯৪০ সালে তারা নাৎসি জার্মানির আমস্টারডাম দখলের কারণে সেখানে অন্তরীন হয়ে পড়েন। ১৯৪২ সালের দিকে ইহুদি জনগণ নিধন বাড়তে থাকায় তারা তার বাবার অটো ফ্রাঙ্কের লুকানো কক্ষে লুকিয়ে অবস্থান করতে থাকেন। দুই বছর পর ৪ আগস্ট ১৯৪৪ সালের সকালে তারা জার্মান নিরাপত্তা রক্ষীদের হাতে ধরা পড়েন। এ্যানা ফ্রাঙ্ক ও তার বোন মার্গোট ফ্রাঙ্ককে বার্গেন-বেলজান কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। সেখানে ১৯৪৫ সালে টাইফাসে আক্রান্ত হয়ে তারা দুজনেই মৃত্যুবরণ করেন।

যুদ্ধ শেষে তার পরিবারের একমাত্র বেঁচে থাকা ব্যক্তি বাবা অটো ফ্রাঙ্ক আমস্টারডামে ফিরে আসেন, এবং আনার ডায়েরিটি খুঁজে পান। তার প্রচেষ্টাতেই দিনলিপিটি ১৯৪৭ সালে প্রকাশিত হয়। সারাবিশ্বে যেটি ‘এ্যানা ফ্রাঙ্কের ডায়রি’ হিসেবে পরিচিত। এটি মূল ওলন্দাজ ভাষা থেকে পরবর্তীকালে ১৯৫২ সালে প্রথম বারের মতো ইংরেজিতে অনূদিত হয়। এর ইংরেজি নাম হয় ‘দ্যা ডায়েরি অফ আ ইয়াং গার্ল’। এটি বিশ্বের বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়েছে। ডায়েরিটি আনার ১৩তম জন্মদিনে উপহারস্বরূপ দেওয়া হয়েছিলো। যেখানে ১২ জুন ১৯৪২ থেকে ১ আগস্ট ১৯৪৪ সাল পর্যন্ত সময়ের ঘটনাগুলো ফুটে উঠেছে।

সন্ধ্যায় ফ্লাইট থাকায় আমরা ‘শিফল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে’র দিকে যাত্রা করি। শহর থেকে খুব একটা দূরে নয় বিমানবন্দরটি। শতাব্দী প্রাচীন এই বিমান বন্দরটি ১৯১৬ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর একটি সামরিক বিমানবন্দর হিসাবে চালু হয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের শেষের দিকে শিফল বিমানবন্দরটির বেসামরিক ব্যবহারের সূচনা ঘটে এবং শেষ পর্যন্ত বিমানবন্দরের সামরিক ভূমিকা পুরোপুরি ভাবে বিলুপ্ত হয়। ১৯৪০ সালের মধ্যে, শিফলে ৪৫ ডিগ্রি কোণে চারটি অ্যাসফল্ট রানওয়ে ছিল। একই বছর বিমানবন্দরটি জার্মান সেনাবাহিনীর দ্বারা দখল করা হয় এবং তার নামকরণ করা হয়েছিল ‘ফিয়েগারহর্স্ট শিফল’। বোমা ফেলার মাধ্যমে বিমানবন্দরটি ধ্বংস করা হয়। তবে যুদ্ধ শেষে শীঘ্রই এয়ারফিল্ডটি পুননির্মাণ করা হয়। ১৯৪৯ সালে থেকে এটিতে পুরোপুরি যাত্রীপরিবহনের বিমানবন্দর হিসেবে ব্যবহার শুরু হয়। ব্যস্ততা আর যাত্রী পরিবহনের দিক থেকে এটি ইউরোপের তৃতীয় ব্যস্ততম বিমানবন্দর। শিফল বিমানবন্দরকে ২০২০ সালে পশ্চিম ইউরোপের সেরা বিমানবন্দর হিসাবে আখ্যায়িত করা হয়। ঐতিহাসিক এই বিমান বন্দরে যাওয়ার পথে ‘ভিনসেন্ট ভ্যান গগ’ কিংবা রেমব্রান্ডের শিল্পকর্ম দেখতে না পাওয়ার মনোবেদনা চেপে বসেছিল।

লেখক: আসাদুজ্জামান সম্রাট, নগর সম্পাদক-দৈনিক আমাদের অর্থনীতি ও সম্পাদক-পার্লামেন্ট জার্নাল

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত