প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

দেশে করোনায় নারীর মৃত্যুর হার বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণ

নিউজ ডেস্ক: দেশে করোনাভাইরাস মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়ার পর চলতি বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত এ মরণব্যাধিতে নারীর মৃতু্যর হার ১৯ থেকে ২১ শতাংশে সীমাবদ্ধ ছিল। যা গত দুয়েক মাসে বেড়ে ৩৬ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে। যদিও চলতি মাসের কয়েক দিনে নারীর মৃতু্যর হার বেড়ে ৪২ শতাংশে এসে দাঁড়িয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের করোনাভাইরাস সংক্রান্ত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানা গেছে।

আইইডিসিআর সূত্র জানায়, গত বছরের জুলাইয়ে যখন কোভিড-১৯ সংশ্লিষ্ট মৃতু্যহার সর্বোচ্চ ছিল, সে সময় নারী-পুরুষের মৃতু্যর হার ছিল যথাক্রমে ১ অনুপাত ৩ দশমিক ৫। এ বছর এপ্রিলে এসে দেখা যায়, নারী-পুরুষের মৃতু্যর হার ১ অনুপাত ২ দশমিক ২৩। অর্থাৎ গত বছরের চেয়ে নারীর মৃতু্যর হার প্রায় দ্বিগুণ বেড়েছে।

প্রতিষ্ঠানটির দেওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত বছরের আগস্টে করোনা আক্রান্ত হয়ে ৯১৬ পুরুষের মৃতু্য হয়। অন্যদিকে নারী ২৪৫ জন। একইভাবে সেপ্টেম্বরে পুরুষ ৬৯৬ এবং নারী ২৭৩ জন, অক্টোবরে পুরুষ ৪৯০ ও নারী ১৭৪ জন, নভেম্বরে পুরুষ ৬৬৫, নারী ২৬০ জন, জানুয়ারিতে পুরুষ ৪৩০ এবং নারী ১৫৫ জন, ফেব্রম্নয়ারিতে নারী ৪৪৫ এবং পুরুষ ১৪০ জন, মার্চে পুরুষ ৪৪৩ এবং নারী ২৮৩ জন।

দেশের করোনা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণকারী জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হঠাৎ করে নারীর মৃতু্য বেড়েছে। এ কারণ হিসেবে তারা বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় চিহ্নিত করেছে।

করোনায় মৃতের সংখ্যা পর্যালোচনায় দেখা গেছে, এ মরণব্যাধিতে মারা যাওয়া বেশির ভাগ নারীর বয়স ৫০ থেকে ৬০ বছর এবং তাদের খুবই স্বল্প সংখ্যক কর্মজীবী। মৃত নারীদের একটি বড় অংশ করোনা শুরুর পর দীর্ঘ সময় বাড়ির বাইরে বের হননি। অর্থাৎ তাদের বেশির ভাগই ঘরে থেকেই স্বামী-সন্তানসহ অন্যান্য আত্মীয়স্বজনের মাধ্যমে করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন।

অন্যদিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দেওয়া সারাদেশে করোনার নমুনা পরীক্ষার তথ্য চিত্র পর্যালোচনায় দেখা গেছে, এতে নারীর সংখ্যা অস্বাভাবিক কম। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, দীর্ঘ লাইনের ভোগান্তিসহ নানা প্রতিবন্ধকতার কারণে বিপুলসংখ্যক নারীই মৃদু উপসর্গ নিয়ে নমুনা পরীক্ষার জন্য নির্ধারিত হাসপাতাল কিংবা কেন্দ্রগুলোতে আসতে পারেনি। ফলে তারা সংক্রমিত হওয়ার শুরুতে চিকিৎসা পাননি। যা পরে তাদের মৃতু্যর দিকে ঠেলে নিয়ে গেছে।

কোভিড ডেডিকেটেড একাধিক হাসপাতালে করোনায় মারা যাওয়া নারীদের তথ্য বিশ্লেষণে চিকিৎসা সংশ্লিষ্টরা জানান, এদের মধ্যে বিপুল সংখ্যকের মৃতু্য হয়েছে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার ৪৮ থেকে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে। অর্থাৎ গুরুতর অসুস্থ অবস্থাতেই তারা সেখানে এসেছেন।

মৃত নারীদের ৪৩ শতাংশের উচ্চ রক্তচাপ, ৪২ শতাংশের ডায়াবেটিস এবং ১৫ শতাংশে দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগ ছিল। কেউ কেউ একাধিক রোগেও ভুগছিলেন।

যদিও করোনায় মৃত অনেক নারীই দীর্ঘদিন ধরে নানা জটিল রোগে ভুগলেও তাদের একটি বড় অংশ এ ব্যাপারে অজ্ঞাত ছিলেন। এছাড়া জটিল রোগে আক্রান্ত নারীর নিয়মিত চিকিৎসা গ্রহণের হারও পুরুষের তুলনায় অনেক কম।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, করোনার প্রথম ঢেউয়ে সংক্রমণের তীব্রতা ততটা বেশি না হওয়ায় ঘরে বন্দি নারীরা অনেকটা কম আক্রান্ত হয়েছেন। তবে এবারের পরিবর্তিত ভ্যারিয়েন্ট যথেষ্ট শক্তিশালী হওয়ায় মোট আক্রান্তের সংখ্যা যেমন বেড়েছে, তেমননি নারীদের সংক্রমিত হওয়ার হারও বৃদ্ধি পেয়েছে।

কোভিড ডেডিকেটেড হাসপাতালের চিকিৎসক-নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, করোনায় আক্রান্ত নারীরা বেশির ভাগই ঘর থেকেই সংক্রমিত হওয়ার কথা বলেছেন। বিশেষ করে তরুণ সন্তানদের মাধ্যমে তারা বেশি আক্রান্ত হয়েছেন। তবে তরুণদের মৃদু উপসর্গ এবং প্রতিরোধ ক্ষমতা বেশি থাকায় তারা সহজেই ঘরে থেকেই সুস্থ হয়ে গেছে। অথচ পরিবারের বয়োবৃদ্ধ মা এবং অন্যান্য বয়স্ক নারী সদস্যরা তাদের মাধ্যমে সংক্রমিত হওয়ার পর সহজে সুস্থ হয়ে উঠতে পারেননি।

প্রসঙ্গত, গত বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত রাজধানীর মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মারা যাওয়া ২০২ জন রোগীর তথ্য পর্যালোচনা করেন প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক ও চিকিৎসকেরা। তাতে দেখা যায়, নারীর মৃতু্যহার ২৬ শতাংশ এবং পুরুষ ৭৪ শতাংশ।

মুগদা হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক রুবিনা ইয়াসমিন বলেন, মৃত ব্যক্তিদের মধ্যে ৬০ থেকে ৭০ বছর বয়সি পুরুষ বেশি ছিল। অন্যদিকে মৃতদের মধ্যে ৫০ থেকে ৬০ বছর বয়সি নারী বেশি। তবে কেন এই পার্থক্য, তা জানা যায়নি। তিনি বলেন, এটা জানার জন্য বড় পরিসরে গবেষণা দরকার।

গত ৮ মার্চ দেশে প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হয়। এর ঠিক ১০ দিন পর ১৮ মার্চ করোনা আক্রান্ত হয়ে প্রথম কোনো রোগী মারা যায়। গত বছরের ৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে করোনা আক্রান্ত হয়ে মৃতের সংখ্যা এসে দাঁড়ায় মোট চার হাজার ৫৯৩ জনে। যার মধ্যে পুরুষ তিন হাজার ৫৮২ (৭৭ দশমিক ৯৯ শতাংশ) এবং নারী এক হাজার ১১১ (২২ দশমিক ০১ শতাংশ)।

এদিকে দেশে নারীর করোনায় সংক্রমিত ও মৃতু্য বাড়লেও সারা বিশ্বে এ হার অনেকটা আগের জায়গাতেই রয়েছে। উন্নত দেশগুলোতে এ হার এখনো ৩০ শতাংশেরও নিচে অবস্থান করছে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা জানান, করোনাভাইরাসে নারীদের মৃতু্যর হার কম হওয়ার নেপথ্যে বিশেষ কিছু কারণ রয়েছে। একদল মার্কিন বিজ্ঞানী সম্প্রতি সে রহস্য উন্মোচন করেছেন।

তারা দাবি করেন, করোনায় মারা যাওয়া অনেকের ক্ষেত্রে দেখা গেছে তারা আগে থেকেই হৃদরোগ, স্ট্রোক, ফুসফুসের রোগ এবং উচ্চ রক্তচাপের মতো অন্তর্নিহিত স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছিলেন। মহিলাদের ক্ষেত্রে এ ধরনের দীর্ঘস্থায়ী রোগ তুলনামূলক কম হয়। আর সে কারণে করোনাও নারীদের শরীরে সুবিধা করতে পারে না।

গবেষকেরা আরও জানান, ধূমপান এবং অ্যালকোহল পান করেন এমন ব্যক্তিদের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করে করোনাভাইরাস। বিশ্বব্যাংক ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, পুরুষদের মধ্যে ধূমপান এবং অ্যালকোহল সেবনের মাত্রা নারীদের তুলনায় অনেক বেশি। এই অভ্যাসের কারণে করোনাভাইরাসে পুরুষের মৃতু্যর হার অনেক বেশি।

এর আগে এক গবেষণায় দেখা গেছে, হেপাটাইটিস সি এবং এইচআইভিসহ বিভিন্ন সংক্রমণ প্রতিরোধের জন্য পুরুষদের সহজাত কম অ্যান্টিভাইরাল প্রতিক্রিয়া বাড়ানোর জন্য হরমোনগুলোও প্রধান ভূমিকা পালন করে।

এই গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, পুরুষের দেহে একটি এক্স ক্রোমোসোম রয়েছে। নারীদের রয়েছে দুটি। ফলে প্রাকৃতিকভাবেই নারীদেহ বেশি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার অধিকারী। গবেষকরা দেখেছেন, পুরুষের চেয়ে নারীর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা এ ক্ষেত্রে বেশি ভূমিকা রেখেছে। নারীরা প্রাকৃতিকভাবে ভাইরাসের সঙ্গে যুদ্ধ করতে ভূমিকা পালন করে।

 

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত