প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

প্রভাষ আমিন: গত আট বছরে সরকারের ছাড়ের সুযোগে হেফাজত দেশের অনেক ক্ষতি করেছে

প্রভাষ আমিন: দুধকলা দিয়ে হেফাজত নামের কালসাপ পোষার বিপদ সম্পর্কে সরকারকে সতর্ক করে দিয়েছিলেন অনেকেই। কিন্তু সে বিপদটা আমলে নেয়নি সরকার। গত বছর হাটহাজারী মাদ্রাসায় জুনায়েদ বাবুনগরী গ্রুপের বিদ্রোহ এবং বিনা চিকিৎসায় আল্লামা শফীর মৃত্যুর পর পাল্টে যায় দৃশ্যপট। সরকারের সঙ্গে হেফাজতের প্রেমের পরিসমাপ্তি ঘটে তখনই। আল্লামা শফীর পর হেফাজতের ক্ষমতায় আসেন উগ্রপন্থী বাবুনগরী। আর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ দৃঢ় করতে মাঠ গরম করার কৌশল নেন মামুনুল হক। বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্যের বিরোধিতা দিয়ে শুরু হয় হেফাজতের নতুন পথচলা। তারপর মামুনুল গং একের পর সহিংসতার উস্কানি দিতে থাকে। সর্বশেষ বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীকে বানচাল করতে মাঠে নামে হেফাজত। এবার তারা ইস্যু বানায় সুবর্ণজয়ন্তীর আয়োজনে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আগমনকে। নরেন্দ্র মোদি এর আগেও ভারতের প্রধানমন্ত্রীর হিসেবেই বাংলাদেশে এসেছিলেন। তখন সমস্যা ছিল না। কিন্তু এবার এই নরেন্দ্র মোদির সফরকে ঘিরে দেশজুড়ে মাসব্যাপী ঘৃণা-বিদ্বেষ আর উস্কানি দেয় হেফাজত। স্বাধীনতা দিবসে সংঘর্ষ হয় ঢাকা, চট্টগ্রাম, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়; স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর উৎসবে লাগে রক্তের দাগ। এই সংঘর্ষ চলে পরের দুদিনও।

এই তাণ্ডবের যবনিকাপাত ঘটে গত ৩ এপ্রিল চলমান সহিংসতার মূল উস্কানিদাতা মামুনুল হক পরস্ত্রী নিয়ে নারায়ণগঞ্জের রয়েল রিসোর্টে গিয়ে ধরা খাওয়ার পর। সেদিন তার সমর্থকরা মামুনুলকে ছিনিয়েই নেয়নি শুধু, রয়েল রিসোর্ট এবং সোনারগাঁয়ের বিভিন্ন স্থাপনায় ব্যাপক ভাংচুর চালায়। রয়েল রিসোর্ট তাণ্ডবের পরেই যেন টনক নড়ে সরকারের। কারণ, চট্টগ্রাম, ব্রাহ্মণবাড়িয়া এবং সোনারগাঁয়ে হেফাজতের মূল টার্গেট ছিল আওয়ামী লীগ। হেফাজতের কর্মীরা বেছে বেছে আওয়ামী লীগের অফিস, নেতাকর্মীদের বাসা, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা-ভাংচুর, অগ্নিসংযোগ করে। হামলা করে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের ওপর। কোথাও কোথাও প্রশাসনকে অকার্যকর মনে হয়েছে। অসহায় ছিল ক্ষমতাসীন দলও। নিজেদের ঘাড়ে এসে পড়ার পর সরকার বুঝতে পেরেছে দুধকলা পুষলেও কালসাপ সুযোগ পেলেই ছোবল দেয়। ছোবল খেয়ে এখন ঘুরে দাঁড়াচ্ছে সরকার। গত কয়েকদিনে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রাম, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় সুনির্দিষ্ট মামলায় হেফাজতের অন্তত ৫০০ নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। হেফাজত আবার সরকারের সঙ্গে সমঝোতার জন্য মরিয়া হয়ে চেষ্টা করছে। কিন্তু এবার মনে হয় আর হেফাজত জুজুর ভয় দেখিয়ে কাজ হবে না।

কারণ, সেই জুজুটা কাল্পনিক সেটা দেরিতে হলেও সরকার বুঝতে পেরেছে। ২০১৩ সালের ৫ মে শাপলা চত্বরে হেফাজতের উপস্থিতিকেই জুজু বানিয়ে সরকারকে ভয় দেখাচ্ছিল সরকারের ভেতরেরই একটি অংশ। তাই তো অসাম্প্রদায়িক আওয়ামী লীগ কৌশলগত সমঝোতায় গিয়েছিল উগ্র সাম্প্রদায়িক হেফাজতের সঙ্গে। যে সমাবেশকে ঘিরে এতো ভয়, সে সমাবেশে অনেক লোক ছিল বলে বলা হয়, কিন্তু সেই অনেক মানে কতো। যতোটুকু এলাকায় তারা অবস্থান নিয়েছিল, বৈজ্ঞানিকভাবে মাপলে সেখানে সাড়ে ৩ লাখের মতো মানুষ বসতে পারে। আমি ধরে নিচ্ছি সেদিন ৫ লাখ লোক সমবেত হয়েছিল। ঠিক আছে, হেফাজতের দাবিই মানলাম, সেদিন ১০ লাখ এসেছিল সরকারের পতন ঘটাতে।

কিন্তু ১৮ কোটি মানুষের দেশে ১০ লাখ লোকের সমাবেশ কি বিশাল কিছু। দেশের সব কওমি মাদ্রাসা হেফাজতের নিয়ন্ত্রণে। ‘বড় হুজুর’ ডাকলে মাদ্রাসার ছাত্রদের যেকোনও জায়গায় যেতে হয়। তাই চট করে ডাক দিলেই হেফাজত বিশাল সমাবেশ করে ফেলতে পারে। কিন্তু সমাবেশের একটা বড় অংশ মাদ্রাসার শিশু ছাত্র। ৫ মে রাতে সেই শিশুদের অসহায়ত্ব আমরা দেখেছি। সরকার যতোই ঘুষ দিক, স্বীকৃতি দিক, হেফাজত কখনোই আওয়ামী লীগকে ভোট দেবে না। বরং হেফাজত তোষণ করতে আওয়ামী লীগ তার অনেক সহজাত সমর্থক হারিয়েছে। দেরিতে হলেও তারা ভুলটা, ক্ষতিটা বুঝতে পেরেছে। তবে এই ক্ষতি শুধু সরকারের নয়, আওয়ামী লীগের নয়; গোটা দেশের, জাতির। গত আট বছরে সরকারের ছাড়ের সুযোগে হেফাজত দেশের অনেক ক্ষতি করেছে। এই সময়ে তাদের শিকড়ও পৌঁছে গেছে সমাজের অনেক গভীরে। সময় এসেছে এই অপশক্তির শিকড় উপড়ে ফেলার, কাল সাপের বিষদাঁত ভেঙে ফেলার। লেখক : হেড অব নিউজ, এটিএন নিউজ

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত