প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

মামলা নিয়ে তোলপাড় : ‘অপহৃত ‘ বিএনপি নেতা বাসায় বহাল তবিয়তে!

ডেস্ক রিপোর্ট : মো. মহিউদ্দিন- ‘জীবনচিত্র’ নামের একটি এনজিওর সচিব। এনজিওটির চেয়ারম্যান ডা. লুচি খান। পরে ২৯ মার্চ চট্টগ্রাম নগরীর চকবাজার থানায় তিনি একটি মামলা করেন। মামলার অভিযোগে বলা হয়, কোটি টাকা চাঁদা দাবি করে না পেয়ে গত ২০ মার্চ ‘অপহরণ’ করা হয়েছে মো. মহিউদ্দিনকে।

কিন্তু এ রকম অভিযোগ করা হলেও অপহরণের দিন থেকে মামলা করার দিন পর্যন্ত প্রায় প্রতিদিনই বাসা থেকে বেরিয়ে, ফের বাসায় ঢুকতে দেখা গেছে মহিউদ্দিনকে! অর্থাৎ কাগজপত্রে অপহরণ দেখানো হলেও বাস্তবে বাসাতেই বহাল তবিয়তে ছিলেন তিনি। নগরীর ফিরিঙ্গীবাজারে তার বাসভবনের সিসিটিভির ভিডিও ফুটেজও একই কথা বলছে।
চাঁদা দাবি ও অপহরণের অভিযোগে যে তিনজনের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে, তাদের একজন নগর বিএনপির আহ্বায়ক ডা. শাহাদাত হোসেন। যিনি মামলা করেছেন সেই ডা. লুচি খানও বিএনপি নেতা- নগর বিএনপির সাবেক মহিলাবিষয়ক সহ-সম্পাদিকা। আর যিনি অপহৃত হয়েছেন তিনিও নগরীর কোতোয়ালি থানা বিএনপির তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক! লুচি ও মহিউদ্দিন দু’জনই আবার নগর বিএনপির রাজনীতিতে ডা. শাহাদাতের ঘরানাভুক্ত হিসেবে পরিচিত।
গত ২৭ জানুয়ারি চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক) নির্বাচনে মেয়র পদে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছিলেন বহুল আলোচিত-সমালোচিত বিএনপি নেত্রী ডা. লুচি খান। অবশ্য মনোনয়ন না পেলেও দল মনোনীত প্রার্থী ডা. শাহাদাত হোসেনের জন্য কাজ করেন তিনি। কিন্তু তাদের মধ্যে হঠাৎ কী এমন ঘটনা ঘটল, যে কারণে ‘গুরু’ শাহাদাতের বিরুদ্ধে কোটি টাকার চাঁদাবাজি ও অপহরণ মামলা করলেন তার ‘শিষ্য’ লুচি? মামলা করার পর এ নিয়ে চাঞ্চল্য দেখা দিয়েছে চট্টগ্রামের রাজনৈতিক অঙ্গনে।
গত ২৯ মার্চে মহানগর বিএনপি আয়োজিত কর্মসূচি ঘিরে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ হয় দলটির নেতাকর্মীদের। এ ঘটনায় কোতোয়ালি থানা ও ট্রাফিক পুলিশের পক্ষ থেকে দুটি মামলা হয়। এগুলোতে ডা. শাহাদাতসহ বেশকিছু নেতাকর্মীকে আসামি করা হয়। ডা. শাহাদাতসহ কয়েকজনকে গ্রেপ্তারও করা হয়। বিএনপির নেতাকর্মীরা মামলা দুটিকে স্বাভাবিকভাবে নিলেও একই দিন চকবাজার থানায় ডা. শাহাদাতের বিরুদ্ধে হওয়া আরেকটি মামলার খবর শুনে ধাক্কা খেয়েছেন। ‘চাঁদাবাজি ও অপহরণের’ এ মামলার বাদী দলেরই নেত্রী ডা. লুচি খান- এ বিষয়টি তাদের আরও বিস্মিত করে।
ডা. লুচির মামলায় অভিযোগ করা হয়, চসিক নির্বাচনের সময় এনজিও সংস্থা জীবনচিত্র থেকে কোটি টাকা চাঁদা চেয়েছিলেন ডা. শাহাদাত হোসেন। চাঁদা না পেয়ে সেই এনজিওর সচিব মো. মহিউদ্দিনকে অপহরণ করা হয়েছে। এ অভিযোগে তার করা মামলায় অন্য দুই আসামি হলেন প্রবাসী মোজাফফর আহমদ ও তার স্ত্রী ফাতেমা।
ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের মামলায় ১৯ এপ্রিল জামিন পেয়েছেন ডা. শাহাদাত। তবে আরও একটি মামলাসহ ডা. লুচি খানের মামলায় জামিন পাননি তিনি।
ডা. লুচি সল্ফ্ভ্রান্ত পরিবারের সদস্য হলেও তার বিরুদ্ধে প্রতারণাসহ বিতর্কিত নানা কাজের এবং কথায় কথায় মামলা করার অভিযোগ রয়েছে। টাকা আত্মসাতের অভিযোগসহ একাধিক মামলাও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এর আগে নগর বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য ইয়াছিন চৌধুরী লিটনের বিরুদ্ধেও শ্নীলতাহানির মামলা করেছেন তিনি। সেই মামলায় জামিনে রয়েছেন লিটন।

বিএনপি নেতা ইয়াছিন চৌধুরী লিটন বলেন, ‘ডা. লুচি খান দলীয় কর্মসূচিতে শৃঙ্খলা মানতেন না। সিনিয়রদের চেয়ারে বসে পড়তেন। এক কর্মসূচিতে এ নিয়ে কথা বলায় তিনি আমার বিরুদ্ধে শ্নীলতাহানি ও মারধর করার মিথ্যা অভিযোগে মামলা করেন। তাকে আমি কিল-ঘুসি মেরেছি- মামলার এজাহারে এমন ডাহা মিথ্যা অভিযোগও করেছেন তিনি।’

এদিকে ২০ মার্চে মহিউদ্দিন অপহরণ হয়- অভিযোগ করে ২৯ মার্চে চকবাজার থানায় মামলা করেন লুচি খান। এতে প্রবাসী মোজাফফর আহমদ এবং তার স্ত্রীকেও আসামি করা হয়। কিন্তু ডা. শাহাদাত ও তার আইনজীবী কামরুল ইসলাম সাজ্জাদ বলেন, ‘লুচি খানের অভিযোগ, ২০ মার্চ অপহরণ করা হয়েছে। কিন্তু এই সময় দেশেই ছিলেন না মোজাফফর। এর আগেই ১১ মার্চে তিনি সৌদি আরব যান। এ থেকেই বোঝা যায়, মামলাটি একেবারে মিথ্যা ও ভিত্তিহীন।’ সিনিয়র এই আইনজীবী দাবি করেন, ‘২৯ মার্চের মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে, ২০ মার্চ মহিউদ্দিন অপহরণ হয়েছেন। অথচ নগরীর ফিরিঙ্গীবাজারে মহিউদ্দিনের বাসভবনের ভিডিও ফুটেজ সংগ্রহ করে দেখা গেছে, ২২ থেকে ২৯ মার্চ পর্যন্ত প্রতিদিনই তিনি বাসা থেকে বের হচ্ছেন ও ফিরে আসছেন।

ডা. লুচি খানের এনজিও জীবনচিত্র কার্যালয় ও চেম্বার হচ্ছে নগরীর কাপাসগোলার ৩ নম্বর মাহমুদ আলী লেনে। বৃহস্পতিবার সেখানে গিয়ে দুটি অফিসেই তালা ঝুলতে দেখা যায়। অনেক আগেই সিটি করপোরেশনের চাকরি হারালেও চেম্বারের সাইন বোর্ডে তার নামের পাশে লেখা রয়েছে ‘মেডিকেল অফিসার, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন’।

পরে লুচি খানের সঙ্গে মোবাইল ফোনে কথা হয়। ভিডিও ফুটেজের বিবরণ দিয়ে মহিউদ্দিন বাসায় কেন, জানতে চাইলে ডা. লুচি বলেন, ‘ভিডিও ফুটেজ সম্পর্কে আমার ধারণা নেই, তাই বলতে পারব না।’ উল্লিখিত অপহরণের ঘটনার সময় মোজাফফর সৌদি আরবে ছিলেন- এমন তথ্যের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমি মামলা করেছি। কী অভিযোগ করেছি, মামলায় সব আছে।’ বিভিন্ন মানুষের সঙ্গে প্রতারণা এবং জেলে যাওয়ার বিষয়ে প্রশ্ন করলে তিনি কোনো উত্তর দেননি। পরে বেশ কয়েক দফা ফোন করা হলেও তিনি তা রিসিভ করেননি।

ঘটনার নেপথ্যে :জীবনচিত্র এনজিও সচিব মহিউদ্দিন, মামলার আসামি ডা. শাহাদাত ও মোজাফফরের গ্রামে বাড়ি চট্টগ্রামের চন্দনাইশে, পাশাপাশি গ্রামে। মোজাফফরের কাছ থেকে দুই কোটি ১৪ লাখ টাকায় একটি জায়গা কেনেন মহিউদ্দিন। অভিযোগ, দেড় কোটি ও ৬৪ লাখ টাকার পৃথক দুটি চেক দিয়ে পাওয়ার অব অ্যাটর্নি মূলে জায়গাটি নেন মহিউদ্দিন। কিন্তু মোজাফফর ব্যাংকে চেক জমা দিলে অ্যাকাউন্টে টাকা না থাকায় তা ডিজঅনার হয়। বারবার একই ঘটনা ঘটলে, নিরূপায় হয়ে এলাকার মানুষ হিসেবে ডা. শাহাদাতের কাছে আসেন মোজাফফর। শাহাদাত লুচির মাধ্যমে মহিউদ্দিনকে চাপ দিতে থাকেন। একপর্যায়ে টাকা না পেয়ে পাওয়ার অব অ্যাটর্নি বাতিল করেন মোজাফফর। যদিও তার আগেই স্ত্রীর নামে জায়গাটি রেজিস্ট্রি মূল্যে হেবা করে দেন মহিউদ্দিন।

ডা. শাহাদাতের খালাতো ভাই অ্যাডভোকেট তৌহিদুর রহমান তুহিন বলেন, ‘মহিউদ্দিনের মাধ্যমে জায়গাটি মূলত ডা. লুচি খানই কেনেন। তারা পরস্পরের যোগসাজশে প্রতারণা করে জায়গার টাকা পরিশোধ না করে আত্মসাতের অপচেষ্টা করেন। ডা. শাহাদাত তাতে বাধা হয়ে দাঁড়ানোর কারণে তাকেও মামলায় জড়ানো হয়েছে।’
নগর বিএনপির নির্বাহী কমিটির সাবেক সদস্য জাকির হোসেন বলেন, ‘ডা. শাহাদাত একজন ভদ্র ও সজ্জন মানুষ। তার বিরুদ্ধে রাজনৈতিক কারণে অনেক মামলা হয়েছে বা আছে। কিন্তু ডা. লুচি খান যে অভিযোগে মামলা করেছেন, তাতে আমরা বিস্মিত, হতবাক। এর পেছনে অন্য খেলা রয়েছে।’
সূত্র- সমকাল

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত