প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

সীমান্তে সেতু বানাতে চায় ভারত : জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নে দ্বিধায় বাংলাদেশ

ডেস্ক রিপোর্ট : চট্টগ্রাম বন্দরের সঙ্গে সড়কপথে মিজোরামের যোগাযোগ স্থাপনে রাঙামাটির বরকল উপজেলার ঠেগাবাজার সীমান্তে সেতু নির্মাণ করতে চায় ভারত। এ জন্য চার বছর ধরে চিঠি চালাচালি করছে দেশটি। বাংলাদেশকে রাজি করাতে বিস্তারিত প্রকল্প প্রতিবেদনও (ডিপিআর) দিয়েছে। সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় ভারতের এ প্রস্তাবে অনাপত্তি দিয়েছে। তবে জাতীয় নিরাপত্তায় ঝুঁকি রয়েছে উল্লেখ করে আপত্তি জানিয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

দুই দেশের মধ্যে ট্রান্সশিপমেন্ট চুক্তিতে চট্টগ্রাম ও মোংলা সমুদ্রবন্দর ব্যবহার করে উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোতে পণ্য পরিবহনের সুবিধা পেয়েছে ভারত। চুক্তি অনুযায়ী, ভারতের মূল ভূখণ্ড থেকে সাগরপথে আনা পণ্য বাংলাদেশের বন্দরে খালাসের পর সড়কপথে আসাম, মেঘালয়, ত্রিপুরায় যাচ্ছে। ত্রিপুরার সাব্রুম শহরকে চট্টগ্রাম বন্দরের সঙ্গে সড়কপথে যুক্ত করতে গত মার্চে খাগড়াছড়ির রামগড়ে ফেনী নদীর ওপর ভারতীয় অর্থায়নে নির্মিত সেতু উদ্বোধন করা হয়েছে।
একই প্রক্রিয়ায় বরকল সীমান্তে ঠেগা নদীর ওপর সেতু নির্মাণ করতে ২০১৭ সালে প্রস্তাব দেয় ভারত। ভারতীয় অংশের ঠেগা নদী বাংলাদেশে প্রবেশের পর কর্ণফুলী নামে পরিচিত। মিজোরামের লুসাই পাহাড়ে উৎপন্ন কর্ণফুলী নদী রাঙামাটির কাপ্তাই লেক হয়ে চট্টগ্রাম পাড়ি দিয়ে বঙ্গোপসাগরে মিলিত হয়েছে। নদীটি চট্টগ্রাম বন্দরের ‘লাইফ লাইন’ হিসেবে খ্যাত।
ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশন গত বছরের ৩০ ডিসেম্বর সেতুর বিষয়ে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেয়। এতে বলা হয়, ঠেগা সেতু নিয়ে বাংলাদেশের সংশ্নিষ্ট কর্তৃপক্ষ যেসব পর্যবেক্ষণ উত্থাপন করেছিল ভারত তার জবাব দিয়েছে। দ্রুত সেতু নির্মাণে বাংলাদেশে সংশ্নিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর মতামত জানা প্রয়োজন।

এই চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৮ মার্চ সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়কে চিঠি দেয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এতে বলা হয়, ঠেগা সেতুর নির্মাণ এলাকাটি সীমান্তের কাছে ‘কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ’। সেতুটি নির্মিত হলে ওই অঞ্চলের নিরাপত্তায় প্রভাব পড়তে পারে। এ ছাড়া স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবনাচারের ওপরও দৃশ্যমান প্রভাব পড়তে পারে। একই সঙ্গে ঠেগা নদী কর্ণফুলীতে পানির জোগান দেয়, ফলে সেতু নির্মিত হলে কর্ণফুলীর ওপর বিরূপ প্রভাবের আশঙ্কা রয়েছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় চিঠিতে আরও বলেছে, ভারতের প্রস্তাবিত ঠেগা সেতু নির্মাণে অনাপত্তি প্রদানের আগে সংশ্নিষ্ট দপ্তরগুলোর মধ্যে আলোচনা প্রয়োজন।
তবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন বলেন , ‘ঠেগা সেতুর বিষয়ে কিছুই জানা নেই।’ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের চিঠির বিষয়ে জানালে তিনি বলেন, ‘চিঠি হয়তো আমার কাছে এসেছিল। কিন্তু এই মুহূর্তে মনে করতে পারছি না। খবর নিয়ে দেখব কী চিঠি দেওয়া হয়েছে সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়কে।’

দায়িত্বশীল একটি সূত্র জানায়, সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয় অনাপত্তি দেওয়ার আগে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের (সওজ) মতামত নিয়েছিল। ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে মিজোরামের গণপূর্ত বিভাগের (পিডব্লিউ) পাঠানো সেতুর পরিকল্পনা ও নকশার ওপর পাঁচ দফা পর্যবেক্ষণ জানিয়েছিল সওজ। এর মধ্যে ছিল সেতুর প্রতিটি লেনের প্রশস্ততা ৩ দশমিক ২৫ মিটার থেকে বাড়িয়ে ৩ দশমিক ৬৫ মিটার করা, সেতুর দৈর্ঘ্য ও উচ্চতা বৃদ্ধি এবং সংযোগ সড়কে নকশা পরিবর্তন।
গত ৭ ফেব্রুয়ারি সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগে পাঠানো সংস্থাটির প্রধান প্রকৌশলী আবদুস সবুর স্বাক্ষরিত চিঠিতে বলা হয়, সওজের পর্যবেক্ষণের ওপর ভারতের কাছ থেকে যে মতামত এসেছে তা সন্তোষজনক।

তবে আবদুস সবুর দাবি করেছেন, ‘ঠেগা সেতুর অনাপত্তির বিষয়ে কিছু জানা নেই। খোঁজ নিয়ে দেখব সওজ কী মতামত দিয়েছিল।’
এ বিষয়ে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব নজরুল ইসলামের বক্তব্য জানা যায়নি। বারবার চেষ্টা করেও যোগাযোগ স্থাপন সম্ভব হয়নি। তবে এ বিভাগের দায়িত্বশীল একটি সূত্র জানিয়েছে, শুধু অবকাঠামো নির্মাণের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে অনাপত্তি দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় আসেনি।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, শুধু তাদের নয়, সীমান্তে সেতু নির্মাণে আপত্তি রয়েছে নিরাপত্তা-সংশ্নিষ্ট সংস্থাগুলোর। কারণ, পাবর্ত্য চট্টগ্রামে বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর তৎপরতা রয়েছে। রাঙামাটিতে গত তিন বছরে অন্তত ৫৮ জন নিহত হয়েছেন এসব গোষ্ঠীর হানাহানিতে। সেনাবাহিনীর টহলেও হামলার ঘটনা ঘটেছে। এমন ‘স্পর্শকাতর’ এলাকায় আন্তর্জাতিক যোগাযোগ স্থাপিত হলে স্থানীয় নিরাপত্তা বিঘ্নিত হতে পারে। এছাড়াও সেতু নির্মিত হলে, বন্দরের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনে মহাসড়ক নির্মাণ করতে হবে। যাতে পরিবেশ ও প্রতিবেশের ক্ষতি হবে। স্থানীয় ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জীবনাচার ও জীবিকার ঐতিহ্যে বিঘ্ন ঘটাবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, ভারত সেতু নির্মাণে কতটা আগ্রহী তা বিবেচ্য নয়। তাদের চাওয়া থাকতেই পারে। আগে দেখতে হবে, সেতু হলে বাংলাদেশের কী লাভ হবে। পার্বত্য চট্টগ্রাম যেমন কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ এলাকা, তেমনি তা স্পর্শকাতরও। নিরাপত্তার দিকটিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। তাছাড়া স্থানীয় মানুষের ঐতিহ্যগত জীবনাচার ও জীবিকা বিঘ্নিত হলে তা বাংলাদেশের জন্যই ক্ষতিকর হবে।

সূত্র-সমকাল

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত