প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

[১] আরমানিটোলার কেমিক্যাল গোডাউনে অগ্নিকাণ্ড , নারীসহ নিহত ৪, চার ফায়ার ফাইটারসহ আহত ২৫ (ভিডিও)

সুজন কৈরী : [২] পুরান ঢাকার আরমানিটোলার আরমানিয়ান স্ট্রিটের হাজী মুসা ম্যানসন নামক ছয়তলা ভবনের নিচতলায় কেমিক্যাল গোডাউনে অগ্নিকাণ্ডে নারীসহ চারজনের মৃত্যু হয়েছে। আগুনে দগ্ধ ও ধোঁয়ার কারণে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন অন্তত ২১ জন।

[৩] নিহতরা হলেন- কবির, মার্কেটের প্রহরী রাসেল, রাসেলের ফুপা আরেক প্রহরী ওয়ালিউল্লাহ বেপারী ও চতুর্থ তলার বাসিন্দা ইডেন মহিলা কলেজের তৃতীয় বর্ষের ছাত্রী সুমাইয়া। নিহতদের মধ্যে দুজনের বাড়ি চাঁদপুরে। কবির ওই ভবনের চিলেকোঠায় থেকে কাগজের বান্ডিল বাধার কাজ করতেন বলে জানিয়েছেন তার ভাতিজা সাইফুল।

[৪] আর দগ্ধ ২১ জনকে শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে ভর্তি করা হয়েছে। এদের মধ্যে ৩ জন পুরুষ ও ১ জন নারী আশঙ্কাজনক অবস্থায় আইসিইউতে ভর্তি আছেন। বাকি ১৬ জন বিভিন্ন ওয়ার্ডে ভর্তি আছেন। তাদের মধ্যে মোস্তফা নামে একজন চিকিৎসা নিয়ে ফিরে গেছেন। ভর্তি ২০ জনের শ্বাসনালী পুড়ে গেছে। এদের মধ্যে দুজনের ফিজিক্যাল বার্ন।

[৫] আহতরা হলেন- আশিকুজ্জামান (৩৩), তার স্ত্রী ইসরাত জাহান মুনা (৩০), শ্বশুর ইব্রাহিম সরকার (৬০), শাশুড়ি সুফিয়া বেগম (৫০), শ্যালক জুনায়েদ (২০), মোস্তফা (৪০), ইউনুস মোল্লা (৬০), সাকিব হোসেন (৩০), সাখাওয়াত হোসেন (২৭), সাফায়েত হোসেন (৩৫), চাষমেরা বেগম (৩৩), দেলোয়ার হোসেন (৫৮), আয়সাপা (২), খোরশেদ আলম (৫০), লায়লা বেগম (৫৫), মোহাম্মদ ফারুক (৫৫), মেহেরুন্নেসা (৫০), মিলি (২২), পাবিহা (২৬), আকাশ (২২) ও আসমা সিদ্দিকা (৪৫)।

[৬] শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের আবাসিক চিকিৎসক তন্ময় প্রকাশ ঘোষ সাংবাদিকদের বলেন, আমাদের এখানে চিকিৎসা নিতে আসা ২১ জনের মধ্যে ২০ জনের শ্বাসনালী পুড়ে গেছে। আশিকুজ্জামান, ইসরাত জাহান মুনা, সাফায়ত হোসেন ও খোরশেদ আলম আইসিইউতে ভর্তি আছেন। মোস্তফা নামের একজন চিকিৎসা নিয়ে চলে গেছেন। ভর্তি ২০ জনের ১৫ থেকে ২২ ভাগ দগ্ধ হয়েছে। বাকি ১৬ জন বিভিন্ন ওয়ার্ডে চিকিৎসা নিচ্ছেন।

[৭] শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের সমন্বয়ক ডা. সামন্ত লাল সেন বলেন, ২১ জনের মধ্যে ৪ জনের অবস্থা গুরুতর হওয়ায় তাদের আইসিইউতে রাখা হয়েছে। বাকি সবার শ্বাসনালী পুড়ে গেছে। কেউই আশঙ্কামুক্ত নন, তাদের পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে।

[৮] এদিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে ও আটকা পড়া বাসিন্দাদের উদ্ধার করতে গিয়ে চার ফায়ার ফাইটার আহত হয়েছেন। তাদের পঙ্গু হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

[৯] বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত ৩টা ১৮ মিনিটে হাজী মুসা ম্যানসনে আগুনের সূত্রপাত ঘটে। ফায়ার সার্ভিসের সদরঘাট, সিদ্দিকবাজার, মোহাম্মদপুর ও খিলগাঁও ও সিদ্দিকবাজার সদর দপ্তর ফায়ার স্টেশন, হেড কোয়ার্টারের লাইটিং ইউনিট, টিটিএল, ক্রাউট কন্ট্রোল ইউনিট, অ্যাম্বুলেন্স, মিডিয়া সেলসহ বিভিন্ন ফায়ার স্টেশনের মোট ১৯টি ইউনিট কাজ করে শুক্রবার সকাল সাড়ে ৬টার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে।

[১০] জানা গেছে, আগুন লাগার সঙ্গে সঙ্গে বিকট শব্দ হয়ে বিদ্যুৎ চলে যায়। এতে বাসিন্দারা আটকে পড়েন। ভবনটিতে ১৮টি পরিবার বসবাস করে। অতিরিক্ত ধোঁয়ার কারণে প্রথমে আশপাশের ভবন থেকে বাসিন্দাদের সরিয়ে নেওয়া হয়। আটকে পড়া অনেককেই মুমূর্ষু অবস্থায় গ্রিল কেটে, জানালা ভেঙে, ছাদের দরজা ভেঙে উদ্ধার করে ফায়ার ফাইটাররা। আগুন নিয়ন্ত্রণের পরে কয়েক ঘণ্টা ফায়ার ফাইটাররা সার্চ অ্যান্ড রেসকিউ অভিযান পরিচালনা করেন।

[১১] প্রত্যক্ষদর্শী হাজী মুসা ম্যানসনের পাশে মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের এটিএম বুথের সিকিউরিটি গার্ড বজলুর রহমান বলেন, এটিএম বুথের দরজা খুলে ভেতরে রেস্ট নিচ্ছিলাম। হঠাৎ করে রাত ৩টা ১৮ মিনিটের দিকে ভবনটিতে আলোর ঝলকানি দেখতে পাই এবং সঙ্গে বিকট শব্দ হয়। ভবনটির সামনে গিয়ে দেখি, আগুন দ্রুত ভবনে ছড়িয়ে পড়ছিল। ভবনের লোকজন তখন বাঁচার জন্য জানালার কাঁচ ভেঙে চিৎকার করছিলেন। তখন রাস্তায় থাকা একজনকে নিয়ে ভবনটির নিচ তলার গেট ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করি। ঢুকতেই একজনকে নিচে আহত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখি। তখন আমি সঙ্গে থাকা লোকটি তাকে উদ্ধার করে বাইরে নিয়ে আসি। তারপর আমরা দুজন দোতলায় যাই। কিন্তু আগুন বেড়ে যাওয়ায় আমরা দ্রুত বের হয়ে আসি। আগুনের পরিমাণ আরও বাড়তে থাকে।

[১২] তিনি বলেন, নিচ থেকে উপরে তাকিয়ে দেখি ভবন থেকে নারী-পরুষ বাঁচার জন্য চিৎকার করছেন। তারা বিভিন্নভাবে জানালার কাঁচ ভেঙে লাফ দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। আগুন লাগার ঠিক ১০ মিনিটের মধ্যে ফায়ার সার্ভিস ঘটনাস্থলে আসে। তারা এসে অল্প কিছুক্ষণের মধ্যে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনলেও ভবনের ভেতরে প্রচুর ধোঁয়ার সৃষ্টি হয়। ধোঁয়া থেকে বাঁচতে ভেতরের লোকজন তখনও চিৎকার করছিল। পরে ফায়ার সার্ভিসের লোকজন প্রথমে ভবনের গ্রিল কেটে প্রথমে শিশু ও নারীদের এবং পরে পুরুষদের উদ্ধার করে নিচে নামিয়ে আনে।

[১৩] এছাড়া ভবনের ৩তলায় রাস্তার পাশের ফ্ল্যাটে থাকা লোকজনকে দুটি ওড়না আর একটি লুঙ্গি গ্রিলের সঙ্গে পেঁচিয়ে নিচে নেমে জীবন বাঁচানোর আপ্রাণ চেষ্টা চালাতে দেখা যায়। জীবন বাঁচানোর এমন চেষ্টা দেখে ফায়ার ফাইটাররা তাদের ঝুঁকি নিতে বারণ করেন। তারা আশ্বস্ত করেন নিরাপদে তাদের নামিয়ে আনা হবে। এরপর পরিবারটি আর ঝুঁকি নেয়নি। পরে ফায়ার ফাইটাররা ভবনের ৩ তলা থেকে ল্যাডারের মাধ্যমে তাদের নিরাপদে উদ্ধার করেন।

[১৪] এদিকে হাজী মুসা ম্যানসনে সার্চ অ্যান্ড রেসকিউ অভিযানের শেষ দিকে শুক্রবার সকাল সাড়ে ৭টায় ভবনের দ্বিতীয় তলায় ফায়ার ফাইটাররা একটি টিয়া পাখিকে খাঁচার ভেতরে ছটফট করতে দেখেন। তখন তারা পাখিটির দিকে যতই এগোচ্ছিলেন, পাখিটির ছটফট করা আরও বেড়ে যায়। এ অবস্থা দেখে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা ল্যাডারের মাধ্যমে পাখিটি উদ্ধার করে নিচে নামান।

[১৫] স্থানীয়রা বলছেন, এলাকার প্রায় প্রতিটি ভবনের নিচে কেমিক্যালের গোডাউন রয়েছে। আগে এই এলাকায় সব ছিল কেমিক্যালের গোডাউন। ধীরে ধীরে মানুষের বসবাস শুরু হয়। ভবনও বহুতল হতে থাকে। এটি বাণিজ্যিক এলাকা হিসেবেই বেশি পরিচিত।

[১৬] ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. সাজ্জাদ হোসাইন বলেন, আগুনের ঘটনায় ফায়ার সার্ভিস তদন্ত কমিটি গঠন করবে। এরপরই আগুন লাগার কারণ জানা সম্ভব হবে। ফায়ার সার্ভিস তার আইন অনুযায়ী কার্যকর ব্যবস্থা নেবে।

[১৭] শুক্রবার সকালে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সির ঢাকা বিভাগের উপ-পরিচালক দেবাশীষ বর্ধন সাংবাদিকদের বলেন, হাজী মুসা ম্যানসনে থাকা কেমিক্যাল গোডাউনের লাইসেন্স দেয়নি ফায়ার সার্ভিস। তবে সিটি করপোরেশন তাদের ট্রেড লাইসেন্স দিয়েছে কিনা বিষয়টি যাচাই করে দেখা হবে।

[১৮] তিনি বলেন, হাজী মুসা ম্যানসনে প্রচুর পরিমাণ কেমিক্যাল রয়েছে। এগুলো অবৈধ কেমিক্যালের দোকান। আমার জানা মতে ফায়ার সার্ভিস এদের কোনো ধরনের লাইসেন্স দেয়নি। তবে আমি জানি না সিটি করপোরেশন তাদের ট্রেড লাইসেন্স দিয়েছে কিনা। অনেকগুলো কেমিক্যাল গোডাউনে রয়েছে, যেগুলোর কোনও বৈধতা নেই। সম্পূর্ণ অবৈধভাবে কেমিক্যাল গোডাউন গড়ে উঠেছে। নিচ তলায় কেমিক্যাল গোডাউন আর ওপরে মানুষের বসবাস, এর মানে অগ্নিকুণ্ডেই বসবাস। এজন্য দায়ীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত।

[১৯] গোডাউনের কেমিক্যালগুলোর ধরণের বিষয়ে তিনি বলেন, পাউডার ও লিকুইড জাতীয় হ্যাজার্ডিয়াস কেমিক্যালসহ বিভিন্ন ধরনের কেমিক্যাল রয়েছে। কেমিক্যালগুলোর জন্য আগুন নেভাতে অনেক সমস্যা হয়েছে। কেমিক্যালগুলোতে কোনও লেবেল নেই। ফলে এগুলো কোথা থেকে আনা হয়েছে বা কতদিন ধরে মজুত রয়েছে তা বলা যাচ্ছে না। বিষয়লো তদন্তের জন্য একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে। আসলে এগুলো কেমিক্যাল কেমিক্যালগুলো এখানে যারা রেখেছেন, এ মৃত্যুর জন্য তারা দায়ী।

[২০] আগুনের সূত্রপাত প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এটা তদন্তের পর জানা যাবে। ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্স অধিদফতরের নিয়ম অনুযায়ী প্রতিটি অগ্নিকাণ্ডের পর একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে কেমিক্যাল রিঅ্যাকশনের কারণে আগুন লাগার ঘটনা ঘটে। তাৎক্ষণিক আমরা কিছুই বলতে পারছি না। তদন্তের পর অগ্নিকাণ্ড সূত্রপাতের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যাবে।

[২১] ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদফতরের পরিচালক (অপারেশন ও মেইনটেন্যান্স) লেফটেন্যান্ট কর্নেল জিল্লুর রহমান বলেন, এটি অপরিকল্পিত কেমিক্যাল মার্কেট। ভবনটিতে আমরা কোনো ধরনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা দেখতে পাইনি। ঘটনা তদন্তে চার সদস্যে কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত কমিটি ১০ থেকে ১৫ দিনের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেবে।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত