প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

৪৩ জেলা হাসপাতাল: তিন মাসের আগে শেষ হচ্ছে না আইসিইউ অবকাঠামোর কাজ

নিউজ ডেস্ক: দেশে গত বছর নভেল করোনাভাইরাসের সংক্রমণ শুরুর পর সরকারি চিকিৎসা ব্যবস্থাকে পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেয়া হয়। মহামারী মোকাবেলা ও জেলা পর্যায় পর্যন্ত চিকিৎসা কাঠামো উন্নত করতে বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় হাতে নেয়া হয় একটি প্রকল্প। এরপর পেরিয়েছে ১১ মাসের বেশি সময়। নানা জটিলতা ও সমন্বয়হীনতার কারণে এখনো আটকে রয়েছে প্রকল্পটির অনেক কার্যক্রম। বর্তমানে এসব প্রকল্পের যে অবস্থা তাতে দেশের ৪৩টি জেলা হাসপাতালের বিদ্যমান অবকাঠামোতেই নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্র বা আইসিইউ স্থাপনে আরো অন্তত তিন মাস বা তারও বেশি সময় লাগতে পারে। অন্যদিকে আইসিইউ স্থাপনের উদ্যোগ সম্পর্কে এখনো অবগত নন মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তারা।

জেলা পর্যায়ের এ হাসপাতালগুলোকে বলা হয় দ্বিতীয় পর্যায়ের সরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান। স্থানীয় মানুষ এসব হাসপাতালে প্রয়োজনীয় ও জরুরি সেবা পেলে বিভাগীয় শহর বা রাজধানীতে ভিড় করে না। এতে টারশিয়ারি পর্যায়ের অর্থাৎ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও বিশেষায়িত হাসপাতালগুলোতে চাপ কমে। ফলে স্বাভাবিক থাকে গোটা দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থা।

জানা গেছে, গত বছর এপ্রিল মাসে বিশ্বব্যাংকের ঋণে ‘কভিড-১৯ ইমার্জেন্সি রেসপন্স অ্যান্ড প্যানডেমিক প্রিপেয়ার্ডনেস’ শীর্ষক প্রকল্পটি শুরু হয়। প্রকল্পের জন্য বরাদ্দ আছে ৬ হাজার ৭৮৫ কোটি টাকা। এ প্রকল্পের অধীনে দেশের সব জেলা হাসপাতালে ১০ শয্যার আইসিইউ ও ২০ শয্যার আইসোলেশন বা বিচ্ছিন্নকরণ ইউনিট স্থাপনের কথা বলা হয়। উন্নয়ন প্রকল্পের প্রস্তাব (ডিপিপি) অনুযায়ী আইসিইউ স্থাপনের জন্য অবকাঠামো উপযুক্ত করতে গণপূর্ত অধিদপ্তরকে দায়িত্ব্ব দেয়া হয়।

অবকাঠামো মূল্যায়ন করে গত ডিসেম্বরে গণপূর্ত অধিদপ্তর জানায়, দেশে ৬২টি জেলা হাসপাতালের মধ্যে ১৯টিতে যে অবকাঠামো বিদ্যমান, তাতে আইসিইউ ইউনিট স্থাপন করা যাবে না। বাকি ৪৩টি জেলা হাসপাতালে আইসিইউ স্থাপনের জন্য অবকাঠামোকে উপযুক্ত করার পরিকল্পনা নেয়া হয়। বর্তমানে গণপূর্ত অধিদপ্তর জানিয়েছে, এ জেলা হাসপাতালগুলোর বিদ্যমান অবকাঠামোকে প্রস্তুত করতে আরো অন্তত তিন মাস সময় লাগবে। তবে এখন পর্যন্ত কোন কোন জেলা হাসপাতালে কাজ শুরু হয়েছে তা জানাতে পারেনি প্রকল্প পরিচালকের কার্যালয়।

অন্যদিকে বেশ কয়েকটি জেলার সিভিল সার্জন বলেছেন, ১০ শয্যার আইসিইউ ও ২০ শয্যার আইসোলেশন ইউনিট স্থাপনের বিষয়ে তারা আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানেন না। প্রকল্পের কাজ এখনো শুরু হয়নি। কেউ কেউ বলেছেন, তারা বিষয়টি শুনেছেন, তবে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ বা স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে কোনো চিঠি পাননি।

নেত্রকোনার সিভিল সার্জন ডা. মো. সেলিম মিঞা বলেন, প্রকল্পের অধীনে আইসিইউ ইউনিট স্থাপনের বিষয়টি শুনেছি। তবে এ বিষয়ে কোনো চিঠি এখনো পাইনি। গণপূর্ত থেকে কোনো কাজও শুরু হয়নি। বর্তমানে যে অবকাঠামো রয়েছে তাতে আইসিইউ ইউনিট স্থাপন করা যাবে না। নতুন যে ভবন নির্মাণ হচ্ছে তার ৬০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। ২০২২ সালের জুন নাগাদ এ কাজ শেষ হবে। এ ভবনে আইসিইউ স্থাপন করা গেলেও তা রোগীদের চিকিৎসার জন্য উপযুক্ত হতে ছয় মাসের বেশি সময় লাগবে।

একই অবস্থা জয়পুরহাটেও। জেলার সিভিল সার্জন ডা. মো. ওয়াজেদ আলী বলেন, পুরনো ভবনে আইসিইউ স্থাপন করা যাবে না। নতুন ভবনে আইসিইউর জন্য অবকাঠামো থাকবে, তবে সেটা ওই প্রকল্পের কাজ নয়। কভিড রেসপন্স প্রকল্পের মধ্যে যে আইসিইউ ইউনিট স্থাপনের কথা রয়েছে, সে বিষয়ে অধিদপ্তর এখনো কিছু জানায়নি।

জরুরি পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য কাজে অগ্রাধিকার দেয়া হচ্ছে না বলে অভিযোগ করেছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক পরিচালক (রোগ নিয়ন্ত্রণ) ডা. বে-নজির আহমেদ। তিনি বলেন, জেলা হাসপাতালকে সংকটাপন্ন রোগীদের জন্য উপযুক্ত করা হবে, এটা বেশ কয়েক বছর আগের পরিকল্পনা। বিভিন্ন সময় বিছিন্নভাবে কিছু কাজ চলেছেও। তবে মহামারী ঠেকাতে সরকারিভাবে তৃণমূলের মানুষদের জরুরি ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেয়ার জন্য কভিড-১৯ ইমার্জেন্সি রেসপন্স অ্যান্ড প্যানডেমিক প্রিপেয়ার্ডনেস নামে যে প্রকল্প নেয়া হয়েছে তা কেবল নামেই ইমার্জেন্সি রেসপন্স। ১০ মাস হয়ে গেছে, এখনো কাজ শুরু হয়নি। এখানেও লালফিতার দৌরাত্ম্য বজায় রয়েছে। এভাবে চলতে থাকলে প্রকল্পের উদ্দেশ্যই ব্যাহত হবে।

প্রকল্পের কাজে সমন্বয়হীনতা ও ধীরগতির কারণ জানতে কথা হয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কয়েকজন কর্মকর্তার সঙ্গে। পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে তারা বলেন, এসব কাজের জন্য বিভিন্ন দপ্তরের সমন্বয়ের প্রয়োজন হয়। তাতেই সময় লাগছে। যেসব জেলায় আইসিইউ অবকাঠামো নেই সেখানে মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল রয়েছে। তাই ওই সব অঞ্চলের সংকটাপন্ন রোগী সেবা পাচ্ছেন না, এমন অভিযোগ করা যাবে না। দপ্তরগুলোর মধ্যে যথাযথ সমন্বয় হলেই প্রকল্পের কাজ দ্রুত এগিয়ে যাবে বলেও তারা আশা প্রকাশ করেন।

তবে এ ধীরগতির জন্য প্রকল্পের আগের পরিচালকদের কিছুটা দোষ দিলেন বর্তমান পরিচালক ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের লাইন ডিরেক্টর (বিকল্প চিকিৎসা সেবা-এএমসি) ডা. আজিজুর রহমান সিদ্দিকী। তিনি বলেন, আমি এ প্রকল্পের তৃতীয় পরিচালক। আমার আগে আরো দুজন পরিচালক ছিলেন। গত নভেম্বরে আমাকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। চলতি বছরের জানুয়ারিতে সংশোধিত প্রকল্পের সরকারি আদেশ পেয়ে মার্চ ও এপ্রিলে গণপূর্ত অধিদপ্তরের সঙ্গে চার দফা সভা করেছি। আমরা দ্রুতই কাজ করে যাচ্ছি। আগের পরিচালকরা যদি কিছু কাজ এগিয়ে নিতেন তাহলে এখন এমন দিন দেখতে হতো না।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল বাশার মোহাম্মদ খুরশীদ আলম বলেন, প্রকল্পটি শুরু হওয়ার আগেই কিছু প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয়েছিল। এরপর নানা কারণে দুজন প্রকল্প পরিচালককে অব্যাহতি দেয়া হয়। এখন খুব দ্রুত কাজ এগিয়ে যাচ্ছে বলেও জানান তিনি।

প্রকল্পের একটি সূত্র জানিয়েছে, বিশ্বব্যাংকের ঋণেই সম্পাদন করা হবে বেশির ভাগ কাজ। বর্তমানে ২৯ জেলা ও পাঁচটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সেন্ট্রাল অক্সিজেন লাইন (কেন্দ্রীয় অক্সিজেন সরবরাহ), ১০টি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১০ শয্যার সিসিইউ ইউনিট, ২৭টি মেডিকেল কলেজের মাইক্রোবায়োলজি বা প্যাথলজি বিভাগের আধুনিক পিসিআর ল্যাবের জন্য আরটি-পিসিআর মেশিন স্থাপন, ঢাকা ও চট্টগ্রামে দুটি সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে পাঁচটি করে ১০ শয্যার আইসিইউ ইউনিট, ৪৩টি জেলা হাসপাতালে ২০ শয্যার আইসোলেশন এবং ১০ শয্যার আইসিইউ ইউনিট স্থাপন করা হবে। এর জন্য চিকিৎসা সরঞ্জাম কিনতে ২০৩ কোটি ৮৬ লাখ ও অবকাঠামো প্রস্তুতের জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে ২৩৮ কোটি ৮৭ লাখ টাকা। গণপূর্ত অধিদপ্তরকে বলা হয়েছে কাজ শেষ হওয়ার এক মাস আগে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে বিষয়টি জানাতে। এরপর প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জাম কেনা হবে। তাতেও সময় লাগবে এক-দেড় মাস। এসব সরঞ্জামও কিনে দেবে বিশ্বব্যাংক।

এ ৪৩ জেলা হলো ঢাকা বিভাগের গোপালগঞ্জ, মাদারীপুর, মুন্সীগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী, রাজবাড়ী, শরীয়তপুর ও টাঙ্গাইল; রাজশাহী বিভাগে জয়পুরহাট, নাটোর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও সিরাজগঞ্জ; রংপুর বিভাগে দিনাজপুর, গাইবান্ধা, লালমনিরহাট, নীলফামারী, পঞ্চগড় ও ঠাকুরগাঁও; চট্টগ্রাম বিভাগে বান্দরবান, কুমিল্লা, ফেনী, খাগড়াছড়ি, লক্ষ্মীপুর, নোয়াখালী ও রাঙামাটি; সিলেট বিভাগে মৌলভীবাজার, সুনামগঞ্জ ও সিলেট; খুলনা বিভাগে বাগেরহাট, খুলনা, চুয়াডাঙ্গা, যশোর, ঝিনাইদহ, কুষ্টিয়া, মাগুরা, মেহেরপুর ও নড়াইল; ময়মনসিংহ বিভাগে নেত্রকোনা ও শেরপুর এবং বরিশাল বিভাগে বরগুনা, ভোলা, ঝালকাঠি ও পিরোজপুর। – বণিক বার্তা

সর্বাধিক পঠিত