প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

‘নাটের গুরু’ পিকুলকে ধরতে পারেনি পুলিশ

ডেস্ক রিপোর্ট : ফরিদপুরের সালথায় তাণ্ডবের ঘটনায় স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা ইমারত হোসেন পিকুল মোল্যা এখনও ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়েছেন। তাকে ‘নাটের গুরু’ বলা হলেও ১০ দিনেও পুলিশ ধরতে পারেনি। যদিও তিনি প্রতিদিনই ফেসবুকে লাইভ করছেন। উপজেলা প্রশাসন ও সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে পোস্ট দিচ্ছেন। ফোনেও তাকে পাওয়া যাচ্ছে।

তবে সালথা-নগরকান্দা সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার সুমিনুর রহমান দাবি করেছেন, পিকুলকে ধরতে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। খুব দ্রুতই তাকে গ্রেপ্তার করা হবে।

গত ৫ এপ্রিল রাতে গুজব ছড়িয়ে বিভিন্ন সরকারি অফিস ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। রাত ৮টা থেকে ১১টা পর্যন্ত চলে এ তাণ্ডব। এ ঘটনায় পাঁচটি মামলা করা হয়। এতে পিকুল মোল্যাকে আসামি করা হয়েছে।

স্থানীয় একাধিক গণ্যমান্য ব্যক্তি ও জনপ্রতিনিধি জানান, প্রথমে ঘটনাটি ছোট পরিসরে থাকলেও পরে ক্ষমতাসীন দলের কিছু নেতার কারণে ভয়াবহ রূপ নেয়। তাণ্ডব উস্কে দেওয়ার নেপথ্যে ছিলেন পিকুল মোল্যা ও তার লোকজন।

স্থানীয় কয়েক বাসিন্দার ভাষ্য, ওই তাণ্ডবের মাধ্যমে প্রশাসনের বিরুদ্ধে জমানো ক্ষোভের বদলা নিয়েছেন পিকুল। কারণ, গত ২৫ জানুয়ারি সালথা বাজারের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করায় উপজেলা প্রশাসনের ওপর ক্ষুব্ধ হন উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি পিকুল। ওই সময় ১৮টি অবৈধ স্থাপনা ভেঙে দেয় প্রশাসন। এ ঘটনায় পিকুল ও তার সমর্থকরা তাদের ক্ষোভের কথা বিভিন্ন সময় প্রকাশ্যে ও সামাজিক মাধ্যমে প্রচার করেন। এ ছাড়া গত ২৩ মার্চ রাতে সালথা প্রেস ক্লাবের নবনির্মিত ভবনের দেয়াল ভেঙে ফেলা হয়। এরও নেপথ্যে ছিলেন পিকুল। যে জমিতে প্রেস ক্লাবের ভবন নির্মাণ করা হচ্ছিল, সেটি পিকুল তার লোকদের জন্য লিজ নেওয়ার আবেদন করেছিলেন। কিন্তু ভূমি অফিস তাদের লিজ না দিয়ে প্রেস ক্লাবকে দেয়। এ কারণেও ক্ষিপ্ত হন পিকুল। তাই ৫ এপ্রিলের হামলায় তারা সরাসরি অংশ নেন এবং হামলাকারীদের অস্ত্র, লাঠিসোটা সরবরাহ করেন।

অবশ্য পিকুল স্বেচ্ছাসেবক লীগের বৈধ নেতা নন বলে জানিয়েছেন ফরিদপুর জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি শওকত আলী জাহিদ। তিনি বলেন, ‘পিকুলের কমিটি ভুয়া। সালথায় স্বেচ্ছাসেবক লীগের কমিটির অনুমোদন দেওয়া হয়নি। এ ব্যাপারে আমরা সাংগঠনিকভাবে ব্যবস্থা গ্রহণ করব।’

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, পিকুলের বিরুদ্ধে থানায় হত্যাসহ একাধিক মামলা রয়েছে। তিনি দীর্ঘদিন ধরে উপজেলায় বিভিন্ন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ও সরকারি জমি দখল করে আলোচিত।

তাণ্ডবের রাতের প্রত্যক্ষদর্শী একাধিক ব্যক্তি জানান, পিকুলের হাতুড়ি বাহিনী নামে পরিচিত ৫০-৬০ জনের একটি দল ৫ এপ্রিল রাতে প্রশাসনের বিরুদ্ধে স্লোগান দিয়ে বিক্ষোভ করে। একপর্যায়ে তারা ভূমি অফিসে হামলা ও ভাঙচুর করে। পরে তারা কলেজ সড়কের সামনে অবস্থানকারী জনতাকে উত্তেজিত করে উপজেলা কমপ্লেক্স ও থানা ঘেরাও করে। এ সময় হাতুড়ি বাহিনীর সদস্যরা উত্তেজিত জনতার মাঝে দেশি অস্ত্র সরবরাহ করে। এর পরপরই সরকারি অফিস ও স্থাপনায় হামলা শুরু হয়। হামলা চলাকালে পিকুলের কয়েক সমর্থক সরাসরি ফেসবুক লাইভে উস্কানিমূলক কথাবার্তা বলতে থাকে।

সালথা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হাসিব সরকার বলেন, তাণ্ডবের ঘটনার মামলায় পিকুল মোল্যাকে আসামি করা হয়েছে। তিনি আসামি হওয়ার পর থেকে উপজেলা প্রশাসনকে নিয়ে ফেসবুকে বাজে মন্তব্য করছেন। এগুলো আমরা দেখেছি। এ বিষয়ে পুলিশ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

হামলার সঙ্গে যুক্ত নন বলে দবি করেছেন ইমারত হোসেন পিকুল মোল্যা। অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের বিষয়ে প্রশাসনের সঙ্গে অসন্তোষ ও ফেসবুকে তার বিরূপ মন্তব্যের কথা তিনি স্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, ‘আমি দুর্নীতি নিয়ে ইউএনও-এসিল্যান্ডের বিরুদ্ধে ফেসবুকে লেখালেখি করেছি, তাই আমার বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। আমি এ ঘটনায় কোনোভাবেই জড়িত নই।’

প্রসঙ্গত, গত ৫ এপ্রিল সন্ধ্যায় করোনা মোকাবিলায় বিধিনিষেধ কার্যকর করতে দুই আনসার সদস্য ও ব্যক্তিগত সহকারীকে নিয়ে স্থানীয় ফুকরা বাজারে যান সালথা উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মারুফা সুলতানা খান। সেখানে তিনি যাওয়ার পর মানুষের জটলা সৃষ্টি হয়। পরে তিনি ফিরে যান এবং সেখানে পুলিশ পাঠান। ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গে উত্তেজিত জনতা এসআই মিজানুর রহমানের ওপর হামলা চালায়। এতে তার মাথা ফেটে যায়।

পরে পুলিশের গুলিতে দু’জন নিহত ও বাহিরদিয়া মাদ্রাসার মাওলানা আকরাম হোসেন এবং আরেক মাওলানার গ্রেপ্তারের গুজব ছড়িয়ে পড়ে। হাজারো মানুষ এসে থানা ঘেরাও করে। সেই সঙ্গে উপজেলা পরিষদ, থানা, সহকারী কমিশনারের (ভূমি) কার্যালয়, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার বাসভবন, উপজেলা কৃষি অফিস, সাব-রেজিস্ট্রি অফিস, উপজেলা চেয়ারম্যানের বাসভবনে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়।

এ সময় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার গাড়ি ও সহকারী কমিশনারের (ভূমি) গাড়ি আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হয়। সালথা উপজেলা সদর এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। এতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর আট সদস্যসহ আহত হন ২০ জন। আহতদের মধ্যে দু’জন হাসপাতালে মারা যান।

এদিকে সালথায় সরকারি স্থাপনায় হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় প্রতিবেদন জমা দিয়েছে তদন্ত কমিটি। কমিটির প্রধান অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক আসলাম মোল্লা জানান, তদন্তে যে বিবরণ পাওয়া গেছে, তাতে প্রায় তিন কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। সমকাল

সর্বাধিক পঠিত