শিরোনাম

প্রকাশিত : ১৬ এপ্রিল, ২০২১, ০৪:০৯ সকাল
আপডেট : ১৬ এপ্রিল, ২০২১, ০৪:০৯ সকাল

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

উৎসবের আমেজ নেই, ভিন্ন পরিবেশে রমজান

ডেস্ক রিপোর্ট : করোনা ভাইরাসের ভয়াল থাবায় সবকিছু এলোমেলো। সর্বাত্মক লকডাউন পরিস্থিতিতে ভিন্ন এক পরিবেশে পার হচ্ছে রোজা। আগের মতো নেই কোন উৎসবের আমেজ। ইফতার বাজারেও বাহারি খাবার কিনতে নেই ক্রেতাদের ভিড়। মসজিদগুলোতে ২০ জনের বেশি মুসল্লির নামাজ আদায় করার সুযোগ না থাকায় এবার ঘরে ঘরে হচ্ছে তারাবিসহ বিভিন্ন ওয়াক্তের নামাজ। এভাবেই বুধবার থেকে শুরু হয়েছে ঘরবন্দী রোজার রোজনামচা।

করোনা পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় লকডাউনের কারণে জরুরী সেবার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কিছু অফিস ছাড়া সারাদেশের সকল পর্যায়ের সরকারী-বেসরকারী অফিস বন্ধ। তাই এবার ইফতারের আগে অফিস থেকে বাসায় ফেরার তাড়া নেই। বাজারে ইফতার কেনার হিড়িকও লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। এবারের রোজায় নেই বাহারি ইফতারের কদর। আগে রাজধানীর চকবাজারে বাহারি ইফতার সামগ্রী নিয়ে যে বিশেষ ইফতার বাজার বসত তাও লকডাউনের কারণে বন্ধ। ফুটপাথে ইফতার বিক্রি বন্ধ থাকায় সীমিত পরিসরে খোলা থাকা রেস্টুরেন্টগুলো থেকে ক্রেতাদের ইফতার সংগ্রহ করতে দেখা গেছে। তবে বেইলি রোডসহ কিছু কিছু এলাকায় বিশেষ বিশেষ কিছু ইফতার সামগ্রী বিক্রির ব্যবস্থা থাকলেও ক্রেতারা হয়রানির শিকার হচ্ছেন। স্বাস্থ্য বিধি না মানা এবং ‘মুভমেন্ট পাস’ না থাকায় পুলিশ তাদের পথে আটকে দিচ্ছে পুলিশ। এতে বিভিন্ন এলাকা থেকে ইফতার ক্রয় করতে আসা মানুষ বিড়ম্বনার শিকার হচ্ছেন। তবে এবার অধিকাংশ মানুষই ঘরে তৈরি করা খাবার সামগ্রী দিয়ে পরিবার-পরিজন নিয়ে ইফতার করেছে।

ইফতারের পর মাগরিব নামাজ আদায়ের পর কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে তারাবি নামাজ আদায় করেন ধর্মপ্রাণ মুসল্লিরা। আগে ইফতার পার্টি ছাড়াও তারাবি নামাজ ঘিরে হতো এক উৎসবের আমেজ। আজান দেয়ার সঙ্গে সঙ্গে শিশু থেকে বৃদ্ধ সব বয়সী মুসল্লিরাই ছুটে যেত মসজিদ পানে। অধিকাংশ মানুষ জামাতেই আদায় করতেন তারাবি নামাজ। সবাই তারাবির নামাজের আগেই নিজ নিজ কাজ শেষ করে মসজিদে গিয়ে হাজির হতেন। এ জন্য মসজিদগুলোতে দেখা যেত মুসল্লিদের উপচেপড়া ভিড়। কিন্তু এবার সে চিত্র লক্ষ্য করা যায়নি। কারণ ধর্ম মন্ত্রণালয় থেকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে মসজিদে তারাবিসহ কোন নামাজেই ২০ জনের বেশি মুসল্লি অংশ নিতে পারবেন না।

এবার রোজা শুরুর আগেই করোনার ভয়ঙ্কর থাবার কারণে সারাদেশের মানুষের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করে। তাই রোজা শুরুর পরও প্রতিদিনই আত্মীয়স্বজনসহ প্রিয়জনদের খবর শুনে মানুষ অস্বস্তিতে। শুধু বাংলাদেশ নয় সারাদেশের মুসলিম সম্প্রদায়ই রয়েছেন অস্বস্তিতে। দেশে এখন সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবেশও করোনার কারণে প্রতিকূলে। তবে সীমিত পরিসরে সামাজিক ও রাজনৈতিক কর্মকা- চলছে শুধু অনলাইনে।

হিজরী বর্ষের রমজান মাসের প্রথম দিন বুধবার থেকে শুরু হয়েছে রোজা। রোজনামচা বদলে দিয়েছে রমজান মাস। আজ শুক্রবার তৃতীয় রোজার দিন। করোনার প্রকোপ বেড়ে যাওয়ার পর সরকার লকডাউন দেয়ায় রমজান মাসে রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশের চেহারা বদলে গেছে। বিশ্বের অধিকাংশ দেশেই একই অবস্থা। সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে মুসলিম সম্প্রদায় এবার এই ভিন্ন পরিবেশেই রোজার দিন অতিক্রম করছে।

সরকারী নির্দেশনা অনুসারে এবার রমজান মাসে কোন ইফতার পার্টি করা যাচ্ছে না। তাই আগে রোজার মাসে ইফতার পার্টিকে কেন্দ্র করে যে উৎসবমুখর পরিবেশ সৃষ্টি হতো এবার সে চিত্র লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। এছাড়া এবার করা যাচ্ছে না কোন সেহরি পার্টিও। এছাড়া আগে সেহরির আগে মহল্লায় মহল্লায় মুসল্লিদের ডাকাডাকি করে জাগিয়ে দেয়ার যে সংস্কৃতি ছিল এবার লকডাউনের কারণে সে পরিস্থিতি নেই। তবে প্রতিটি এলাকার মসজিদ থেকে মাইকে সেহরি খাওয়ার জন্য মুল্লিদের ঘুম থেকে জাগিয়ে তোলার আহ্বান জানানো হচ্ছে। এ ছাড়া পরিবারের প্রবীণ সদস্যরা ছোটদের ঘুম থেকে ডেকে তুলছেন সেহরি খাওয়ার জন্য। এভাবেই চলবে শেষ রোজা পর্যন্ত।

চিরাচরিত রীতি অনুসারে রোজা শুরু মানেই ঈদের প্রস্তুতি। এ প্রস্তুতির অংশ হিসেবে যে যার সাধ্যমতো কেনাকাটার কাজ শুরু করে আগেভাগেই। কিন্তু এবার ভয়ঙ্কর করোনা পরিস্থিতিতে দেশব্যাপী সর্বাত্মক লকডাউনের কারণে মার্কেট ও শপিংমলগুলো রয়েছে বন্ধ। যে কারণে এবার এখন পর্যন্ত কেনাকাটার কোন সুযোগ নেই। মানষের যাতে খাবার কষ্ট না হয় সে জন্য রেস্তরাঁগুলো দুপুর ১২টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা এবং রাত ১২টা থেকে সকাল ৬টা পর্যন্ত খোলা থাকলেও ভেতরে বসে কেউ ইফতার কিংবা সেহরি খেতে পারছেন না। তবে অনলাইনে বা সরাসরি রেস্তরাঁয় গিয়ে ইফতার কিংবা সেহরির জন্য খাবার কিনে বাসায় নিয়ে খেতে পারছেন।

লকডাউনের কারণে এবার রোজা শুরুর পর থেকেই গণপরিবহন রয়েছে বন্ধ। জরুরী সেবার দায়িত্বে নিয়োজিত লোকজন ছাড়া কেউ যানবাহনে চড়ে রাস্তা পাড়ি দিতে পারছে না। বৃহস্পতিবার সরেজমিনে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, রাস্তা ঘাট বেশ ফাঁকা। কোথাও যানজট। তবে কাঁচাবাজারে মানুষের আনাগোনা লক্ষ্য করা গেছে। এছাড়া হাসপাতাল ও রেস্টুরেন্টগুলোতে কিছু মানুষের উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে।

এবার রমজানে সবকিছুতেই দেখা যাচ্ছে ব্যতিক্রম। করোনাভাইরাসের সংক্রমণের কারণে গতবছরও প্রায় একই অবস্থা ছিল। এমন পরিস্থতি এর আগে কখনও হয়েছে কিনা তা কেউ বলতে পারছেন না। মুসলিম সম্প্রদায়ের জন্য রমজান মাস খুবই গুরুত্বপূর্ণ। পবিত্র এ মাহে রমজানে ধর্মপ্রাণ মুসল্লিরা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত সব ধরনের খাবার ও পানাহার থেকে বিরত থাকেন। এছাড়া এ সময়ের মধ্যে নামাজ আদায়, কোরান তেলাওয়াত ও বিভিন্ন দোয়া কালাম পাঠে ব্যস্ত থাকেন।

আগে রমজান মাসকে কেন্দ্র করে করে মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে এক উৎসবের আমেজ তৈরি হতো। কিন্তু এ বছর করোনাভাইরাসের কারণে এমন চিত্র উধাও। বিশ্বজুড়ে মহামারী পরিস্থিতি তৈরি করেছে প্রাণঘাতী করোনাভাইরাস। দেশে এখন এর দ্বিতীয় ঢেউ চলছে। এ ভাইরাস মানুষ থেকে মানুষে ছড়িয়ে পড়ে। সে কারণে এই ভাইরাসের সংক্রমণ থেকে মানুষকে বাঁচাতে সারাদেশে লকডাউন দেয়া হয়েছে। লকডাউন চলাকালে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা, জনসমাগম এড়িয়ে চলা, বার বার হাত পরিষ্কার করা এবং জরুরী প্রয়োজন ছাড়া বাড়ির বাইরে বের না হওয়ার নির্দেশ দিয়েছে সরকার।

আগে তারাবি নামাজের সময় মসজিদগুলোর সামনে ভিড় করত গরিব-মিসকিন। মুসল্লিারা মসজিদে প্রবেশ ও বাহির হওয়ার পথে তাদের দান-খয়রাত করতেন। এতে দরিদ্র মানুষ তাদের নিত্যনৈমিত্তিক খরচের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ সহায়তা পেতেন। কিন্তু এবার ছিল না সেই চিত্র। এর ফলে হতদরিদ্র মানুষগুলো অসহায় হয়ে পড়ে।

এদিকে বৈশাখ মাসের খরতাপের কারণে প্রকৃতি এখন উত্তপ্ত। এ পরিবেশ রোজাদারদের জন্য কষ্টের পরিমাণ বাড়িয়ে দিয়েছে। বিশেষ করে বয়স্ক মানুষগুলো রোজা রাখতে গিয়ে অতিরিক্ত গরম পানির পিপাসায় অস্থির হয়ে পড়ছে। রোজাদাররা আশা করছেন বৃষ্টি হলে পরিবেশ কিছুটা শান্ত হবে।

এদিকে রোজার মধ্যেই চলছে করোনার টিকা প্রদান কার্যক্রম। তাই রোজা রেখে করোনার টিকা নেয়া যাবে কি যাবে না এমন জল্পনা-কল্পনার মধ্যেই ইসলামী ফাউন্ডেশন দেশের সর্বস্তরের আলেম সমাজের মতামত নিয়ে জানিয়ে দিয়েছেন রোজা রেখে করোনা টিকা নিলে রোজা ভাঙ্গবে না। তাই রোজা রেখেও করোনা টিকা নিচ্ছেন মানুষ। করোনা পরিস্থিতির উন্নতি না হলে এবার ঈদ পর্যন্ত মানুষকে ঘর বন্দীই থাকতে হবে।

করোনার কারণে গতবছরের মতো এবারের রমজান মাসও মুসলিম ইতিহাসে একেবারে ব্যতিক্রমী ঘটনা। রোজা বা ঈদে, সামজিক বিচ্ছিন্নতা ইসলামের ঐতিহ্যের পরিপন্থী। কিন্তু করোনাভাইরাসের কারণে বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অগণিত মুসলমানকে এবার রোজা করতে গিয়ে অনেক কিছুর সঙ্গেই আপোস করতে হচ্ছে। তবে বাস্তবতার কারণে সবাই তা মেনে নিচ্ছে।

মঙ্গলবার সন্ধ্যায় মাহে রমজানের চাঁদ দেখা যাওয়ায় বুধবার থেকে রোজা রাখা শুরু করেছেন দেশের মুসলমানরা। ইসলামী ফাউন্ডেশনের দেয়া সময়সূচী অনুযায়ী রোজাদাররা ভোরে সেহরি খাচ্ছেন। এরপর শুরু হয় উপবাস। সারাদিন উপবাস শেষে ইফতার করতে হয় সন্ধ্যায় ইসলামিক ফাউন্ডেশন নির্ধারিত সময়ে। সেহরি থেকে ইফতার পর্যন্ত এই সময়ের ব্যবধান প্রায় সাড়ে ১৪ ঘণ্টা। ইসলাম ধর্মের বিধান অনুযায়ী বিশ্বের মুসলমানরা প্রতিবছর হিজরি রমজান মাসে রোজা পালন করে থাকেন। প্রাকৃতিক পরিবেশ বৈশাখের খরতাপে উত্তপ্ত থাকায় এবার রোজাদারদের কিছুটা কষ্ট হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সেহরি খাওয়ার পর ৮ ঘণ্টা পর্যন্ত মানুষের শরীরের রোজা বা উপবাসের কোন প্রভাব পড়ে না। আমরা যে খাবার খাই তা পাকস্থলীতে হজম হতে এবং এর পুষ্টি শোষণ করতে শরীর প্রায় ৮ ঘণ্টা সময় নেয়। ফলে দুপুরের পর থেকেই মানুষের শরীরে ক্ষুধা বাড়তে থাকে। ফলে রোজার প্রথম দিকে রোজাদারদের কিছুটা কষ্ট হলেও পরে অভ্যাস হয়ে যায়। তবে অভ্যাস হয়ে যেতে এক সপ্তাহ সময় লাগে। এর পর রোজাদারদের সবকিছুকেই স্বাভাবিক মনে হয়।

মুসলিম সম্প্রদায়ের জন্য এটি সিয়াম সাধনার মাস। মঙ্গলবার রাতে তারাবির নামাজ পড়া এবং শেষ রাতে সেহরি খাওয়ার মধ্য দিয়ে শুরু হয় এবারের মাহে রমজানের আনুষ্ঠানিকতা। রোজাদাররা বুধবার সন্ধ্যায় ইফতার গ্রহণের মাধ্যমে প্রথম রোজা পালন পর্ব শেষ করেন। বৃহস্পতিবার তারা পালন করেন দ্বিতীয় রোজা। আজ শুক্রবার তৃতীয় রোজা। আগামী ২৬ রমজান (৯ মে রবিবার রাতে) সারাদেশে পবিত্র লাইলাতুল কদর উদ্যাপিত হবে। ৩০ রোজা পালন শেষে মুসলিম সম্প্রদায় উৎসবমুখর পরিবেশে পালন করবে ঈদ-উল-ফিতর। তবে রোজা ৩০ নাকি ২৯ হবে তা নির্ভর করবে চাঁদ দেখা স্বাপেক্ষে।

রমজান মাসে সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে এবারও বিভিন্ন ব্যক্তি ও সংগঠন অসহায় মানুষের মাঝে ইফতার ও সেহরিসহ বিভিন্ন ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করছেন। জনসমাগম না করেই স্বাস্থ্যবিধি মেনে তারা তা করছেন। অন্যান্য বছরের মতো এবার রোজার দিনে আত্মীয়স্বজন ও পরিচিতজনরা পরস্পরের মধ্যে ইফতারসামগ্রী বিতরণের সুযোগ পাচ্ছেন না। তাই করোনা পরিস্থিতিতে লকডাউনের মধ্যে যে যার অবস্থানে থেকে ইফতার ও সেহরি গ্রহণসহ রোজার বিভিন্ন আনুষ্ঠানিকতা পালন করছেন। জনকণ্ঠ

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়