প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

এম আমির হোসেন: বিকাশের পথে সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতার নাম ‘ভয়’

এম আমির হোসেন: বিকাশের পথে সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতার নাম ‘ভয়’। সবাই তো পেশিশক্তিতে বাহুবলি হয়ে জন্মায় না। পাঁচ-ছয় ফুট গড় উচ্চতার শরীরে তো এতো শক্তি সবার থাকে না যে, এই অচলায়তন ভেঙ্গেচুরে ঠিকই জেগে ওঠবে। স্ফীত উদরটি জড়িয়ে ধরবে স্ত্রী-সন্তান, শীর্ণকায় শরীর নিয়ে মেতে থাকবে প্রেম-মমতায়- নিষ্পাপ এই আকাক্সক্ষাগুলো থেকে সবাই তো মুক্ত হতে পারে না। এসব হারানোর ভয় মানুষের সম্ভাবনাকে ক্রমশ সঙ্কুচিত করে ফেলে। হারানোর এই ভয়টুকু দূর করে দিন। প্লিজ! আপনারা ভয়ার্ত এক সমাজ তৈরি করেছেন। টিভিতে দেখা ভৌতিক সিরিজের চরিত্রের মতো ভয়ে দমবন্ধ লাগে। এখানে যেতে ভয়, সেখানে যেতে ভয়, এটা-সেটা পড়তে ভয়, করতে ভয়, জানতে ভয়, বলতে ভয়, ভাবতে ভয়। কী কাণ্ড বলুন! আমরা কি ভয়ে ভয়ে অসুস্থ হয়ে যাবো? এই পরিবেশে কী করে বিকশিত হবো আমরা? কী করে এগুবে দেশ? এই দেশটা আসলে কাদের জন্য? নারী হলে সম্ভ্রম হারানোর ভয়ে থাকতে হয়, গরিব হলে নিষ্পেতিত হওয়ার ভয়ে থাকতে হয়। সংখ্যালঘু হলে নিরাপত্তাহীনতার ভয়ে থাকতে হয়, সরকার বিরোধীদের সমর্থক হলে নির্যাতনের ভয়ে থাকতে হয়। একই দলের দুর্বল গ্রুপের কর্মী হলে ভয়ে ভয়ে দিনাতিপাত করতে হয়। নিরীহ হলে পদে পদে ঠকতে হবে। ভদ্রজন হলে অভদ্রতার শিকার হতে হয়। হিন্দুধর্মাবলম্বী ‘সুমন চৌধুরী’ এই ভেবে পিতামাতার ওপর কৃতজ্ঞ যে তারা তার নাম ‘সুমন’ রাখাতে নামটুকু বলতে গিয়ে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠের দেশে তাকে হীনম্মন্যতায় ভুগতে হয় কম যা তার বন্ধু গৌতম কিংবা হরিকে ভুগতে হয় ঠিকই। সতত নিষ্পেষণের ভয়ে থাকে সংখ্যালঘুর মন- একটু বেশি ভালোত্ব দিয়ে, একটু বেশি ত্যাগ দিয়ে, একটু বেশি ঘুষ দিয়ে, কর্মস্থলে একটু বেশি ডিউটি করে সংখ্যাগুরুর সমাজে তাকে টিকে থাকতে হয়। সংখ্যালঘু পরিচয়ের ঘাটতিটি তাকে নানান ওপায়ে পুষিয়ে দিতে হয়। মানুষের সমাজে মানুষকে নিয়ে কতো বিচিত্র ভয় মানুষের! ভয় একটি প্রজন্মের শক্তি ও সম্ভাবনাকে কী করে তিলে তিলে নিঃশেষ করে দিচ্ছে তা ভেবে দুঃখ হয়। হায়!

ধর্মীয় পরিচ্ছদ, দাড়ি-গোঁফ, জীবনাচার নিয়ে ভয়ে থাকতে হয়, এতে না ট্যাগ খেতে হয় নির্দিষ্ট কোনো রাজনৈতিক গোষ্ঠীর। শোষকশ্রেণি শোষণের স্বার্থে সমাজে বিবিধ গোষ্ঠীর সংজ্ঞা নির্ধারণ করে রেখেছে যা সাধারণের উপর সুবিধামতো প্রয়োগ করে গ্রহণ-বর্জনের কার্যক্রম পরিচালনা করে। গোষ্ঠীভুক্ত হিসাবে ট্যাগ খাওয়ার ভয় নিয়ে সাধারণকে দিনাতিপাত করতে হয়। চাকরি হারানোর ভয়, থানা-অফিস-আদালতের ভয়, পাসপোর্ট-ভিসা পাওয়া নিয়ে ভয়-আরও কতো শতো ভয় আমাদের মনে। অযোগ্য প্রতিষ্ঠান-প্রধান কিংবা পদস্থদের দ্বারা অপদস্ত হওয়ার ভয়ে অনেক প্রতিভাবান তরুণ বুকে লাভা নিয়ে অবিস্ফোরিত থেকে যায়, মৃত অগ্নিগিরি হয়ে কোনোমতে নিজেকে টিকেয়ে রাখে। নির্ঝঞ্ঝাট টিকে থাকার প্রয়োজনে প্রতিভাকে বিসর্জন দেয়। কেউ কেউ পরবর্তী প্রজন্মের নিরাপত্তাহীনতার ভয়ে দেশত্যাগ করে। ভয়ের এই পরিবেশ সমাজকে ক্রমশ পিছিয়ে দিচ্ছে। কারো ভ্রূক্ষেপ নেই এতে। পৃথিবীটা আসলে কাদের জন্য?

ছোট-রাষ্ট্র হলে বড়-রাষ্ট্র দ্বারা শোষণের ভয়ে থাকতে হয়, ছোট-জাতি হলে বড়-জাতি দ্বারা আগ্রাসনের ভয়ে থাকতে হয়। ছোট্ট জীবন মানুষের, তবুও  কতো জটিলতা! কতো ভয়! কাদের জন্য এ পৃথিবী? সুন্দর এই পৃথিবীতে নিরাপদে, সুখে-শান্তিতে, নিজস্ব বিশ্বাস ও সংস্কৃতি নিয়ে সবাই কেন আনন্দের সঙ্গে বাঁচতে পারে না? এই পৃথিবীকে কারা বিভক্ত করলো- কারা নষ্ট করলো? স্বর্গের লোভে কারা এই পৃথিবীকে নরক বানালো? ক্ষমতার লোভে কারা মনুষ্যত্বকে বোধহীন অক্ষম বানালো? মুষ্টিমেয় মানুষের স্বার্থে এ পৃথিবীকে কুক্ষিগত করলো কারা? চিন্তা করার ভয়, চিন্তা প্রকাশের ভয়- যতো ভয় আছে, যাবতীয় সব ‘ভয়’ দূর করে দিন। প্লিজ! পৃষ্ঠপোষকতার অভাব, সিস্টেমের অভাব- সফলভাবে দাঁড়াতে না পারার যতো মেকি অজুহাত। বলি, পুরো বিশ্বের না পারুন, অন্তত নিজ দেশের বিবিধ এই ‘ভয়’ দূর করে দিন। আমি নিশ্চিত, উল্টো এ দেশই একদিন পৃষ্ঠপোষক হবে অন্য দেশের; গড়বে দৃষ্টান্তমূলক সিস্টেম ; এবং প্রকাণ্ড হয়ে দাঁড়াবে আপন শক্তিতে, উড়াবে সাফল্যের পতাকা। শুধু ভয় থেকে মুক্তি দিন আমাদের। লেখক : চিকিৎসক

সর্বাধিক পঠিত