প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

রাজধানী ছাড়ছে অনেক মানুষ

আতাউর অপু: সর্বাত্মক লকডাউনের ঘোষণায় ঢাকা ছাড়ছে মানুষ। ট্রেন-লঞ্চসহ দূরপাল্লার পরিবহন চলাচল বন্ধ থাকায় পণ্যবাহী ট্রাক, মাইক্রোবাস, প্রাইভেটকার, অটোরিকশায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বাড়ি ফিরছে তারা। এতে তাদের গুনতে হচ্ছে কয়েকগুণ বেশি ভাড়া।

গতকাল সোমবার রাজধানীর বিভিন্ন বাস টার্মিনালে দেখা গেছে যানবাহনের অপেক্ষায় থাকা ঘরমুখো মানুষের ভিড়। করোনা সংক্রমণের ঝুঁকি থাকলেও তারা মানেননি স্বাস্থ্যবিধি।

করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ দিনদিন বেড়েই চলেছে। এ সংক্রমণ রোধ করতে সরকার কঠোর থেকে আরো কঠোর অবস্থানে যাচ্ছে। একদিমে সাধারণ মানুষ যেমন মানছেনা নিয়ম নীতি, তেমনি থামছেই না মৃত্যুর মিছিল। এ কারণে ১৪ এপ্রিল থেকে ২০ এপ্রিল পর্যন্ত কঠোর লকডাউন ঘোষণা করেছে সরকার।

সকাল সাড়ে ১০টায় রাজধানীর গাবতলী বাস টার্মিনালের সামনে সারি বেঁধে দাঁড়িয়ে কয়েকটি মাইক্রোবাস ও প্রাইভেটকার। মধ্যস্থতাকারীরা ডেকে বলছিলেন, ‘ঘাটে ৫০০, যশোর ২৫’। এর অর্থ পাটুরিয়া বা দৌলতদিয়া ঘাটে গেলে জনপ্রতি ভাড়া ৫০০ টাকা। আর যশোর পর্যন্ত গেলে দুই হাজার ৫০০ টাকা। কিছু সময় অপেক্ষা করতেই দেখা গেল যাত্রীও জুটছে মন্দ না। একেকটা প্রাইভেটকার-মাইক্রোবাস যাত্রীঠাসা হয়ে ছেড়ে যাচ্ছে।

কুড়িগ্রামের বাসস্ট্যান্ড পাড়ার বাসিন্দা সালমা বেগম জানালেন, একজন তাকে বলেছে কুড়িগ্রাম যেতে আড়াই হাজার টাকা লাগবে। তাতেই তিনি রাজি হয়েছেন। ঢাকার কমলাপুরে থাকা সালমা লকডাউনের কারণে বাড়ি যাচ্ছেন। ফিরবেন একেবারে ঈদের পর।

দেখা গেল, মোটরসাইকেলে করেও অনেকে রওনা দিচ্ছেন। ফজলু নামের এক মোটরসাইকেল চালক জানান, তার বাড়ি ঝিনাইদহ। লকডাউন শুরু হওয়ার পর ঢাকা থেকে ঝিনাইদহে মোটরসাইকেলে যাত্রী আনা-নেওয়া করছেন।

একটি মাইক্রোবাসকে দেখা গেল জনাদশেক যাত্রী নিয়ে যশোরের উদ্দেশে রওনা দিতে। আরেকটি প্রাইভেটকার রওনা দিল পাটুরিয়া ঘাটের উদ্দেশে। চালকরা জানান, এভাবে ট্রিপ দিয়েই তারা যাত্রী পরিবহন করছেন।

 

 

চট্টগ্রামের নানুপুর মাদ্রাসার শিক্ষার্থী আলিফ হোসেন জানালেন, চট্টগ্রাম থেকে একটি লোকাল বাসে ৬০০ টাকা ভাড়া দিয়ে আগের রাতে ঢাকা এসেছেন। এখান থেকে চুয়াডাঙ্গার দামুড়হুদার গ্রামের বাড়িতে যাবেন। তবে মাইক্রোবাস-প্রাইভেটকারে ভাড়া অনেক বেশি।

সায়েদাবাদ বাস টার্মিনালে গিয়ে দেখা যায়, দূরপাল্লার কোনো পরিবহন ছাড়ছে না। কিন্তু যাত্রীরা ভিড় করছেন টার্মিনালে। খুলনা, গোপালগঞ্জ, বরিশাল, পিরোজপুর, নোয়াখালী, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, সিলেট, ব্রাহ্মণবাড়িয়া অঞ্চলের হাজার হাজার মানুষ গাড়ির জন্য অপেক্ষা করছেন। টার্মিনালের আশপাশে প্রাইভেটকার, মাইক্রোবাস, সিএনজিচালিত অটোরিকশা আর মোটরসাইকেলের দীর্ঘ লাইন। এসব ছোট যানবাহনের ভেতর গাদাগাদি করে যাত্রীরা রওনা দিচ্ছেন। নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে তিন-চারগুণ বেশি ভাড়া গুনতে হচ্ছে।

ঢাকা থেকে পিরোজপুরগামী হামিম পরিবহনের কাউন্টার সুপারভাইজার সায়েদুল জানান, সরকারি বিধিনিষেধে তাদের সব পরিবহন বন্ধ। কিন্তু এরপরও যাত্রীদের গন্তব্যে যাওয়া বন্ধ হচ্ছে না।

তবে নৌপথে ঘরে ফেরার জন্য সদরঘাটে বিপুলসংখ্যক যাত্রী উপস্থিত হলেও কোনো লঞ্চ ছাড়েনি। ফলে তারা ঘাট থেকে ফিরে যান। সদরঘাট ফাঁড়ির ইনচার্জ পাভেল রহমান বলেন, সদরঘাট থেকে লঞ্চ বন্ধ। যারা এসেছেন তাদের ফেরত পাঠানো হয়েছে।

ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লার দাউদকান্দি এলাকায় সোমবার ভোর থেকেই দীর্ঘ যানজট সৃষ্টি হয়। উপজেলার গৌরীপুর বাসস্ট্যান্ড থেকে শহীদনগর পর্যন্ত তিন কিলোমিটার এলাকায় সৃষ্টি হয় এই যানজট। হাইওয়ে পুলিশ, কুমিল্লা অঞ্চলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোল্লা মোহাম্মদ শাহিন বলেন, পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে হাইওয়ে পুলিশ মহাসড়কে কাজ করছে।

কুমিল্লার নন্দনপুর থেকে বুড়িচংয়ের নিমসার পর্যন্ত ফোর লেনের উভয় অংশে প্রায় ১৫ কিলোমিটার যানজটের সৃষ্টি হয়। প্রচণ্ড গরমে এ সময় বিভিন্ন গন্তব্যমুখী হাজার হাজার যাত্রীকে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে।

সকাল থেকে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে নারায়ণগঞ্জের কাঁচপুর এলাকা থেকে গাউছিয়া এবং গাজীপুর-চট্টগ্রাম এশিয়ান হাইওয়ে সড়কে মদনপুর থেকে কাঞ্চন ব্রিজ পর্যন্ত উভয় পাশে ২০ কিলোমিটারেরও বেশি দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়েছে। প্রচণ্ড গরমে যানজটে আটকেপড়া মানুষ চরম দুর্ভোগে পড়েন। এ সময় অনেককে রোদের মধ্যে হেঁটে গন্তব্যের উদ্দেশে যাত্রা করতে দেখা গেছে।

ভুলতা ট্রাফিক পুলিশের টিআই মনির বলেন, সকাল থেকেই আমরা যানজট নিরসনে কাজ করছি। শুধু গাউছিয়াই নয়, ঢাকার আশপাশের সড়কগুলোতেও একই অবস্থা বিরাজ করেছে। হঠাৎ করে এত মানুষ কোথা থেকে এলো ভেবেই পাচ্ছি না। কঠোর লকডাউনের খবর শুনে মানুষ যেন বেপরোয়া হয়ে পড়েছে।

পাটুরিয়া ও আরিচা ঘাটে সকাল থেকে ঘরে ফেরা যাত্রীদের উপচে পড়া ভিড় দেখা গেছে। পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া এবং আরিচা-কাজীরহাট নৌ-রুটে লঞ্চ ও স্পিডবোট বন্ধ থাকায় একশ্রেণির অসাধু লঞ্চ স্টাফ ও ট্রলার মালিক যাত্রীদের জিম্মি করে তিন-চারগুণ বেশি ভাড়ায় পারাপার করছেন। বিআইডব্লিউটিএর সহকারী পরিচালক ফরিদুর রহমান জানান, এই নৌ-রুটে ট্রলার চলাচলের কোনো অনুমতি নেই। অবৈধভাবে যাত্রী পারাপার করা হচ্ছে।

আরিচা লঞ্চ মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আব্দুল কুদ্দুস জানান, সরকারের নিয়ম নেমে লঞ্চ ও স্পিডবোট চলাচল বন্ধ থাকলেও কিছু অসাধু ব্যক্তি ট্রলারে ও স্পিডবোটে যাত্রী পারাপার করছে।

দৌলতদিয়ার জিরো পয়েন্ট থেকে ঢাকা-খুলনা মহাসড়কের বাংলাদেশ হ্যাচারি পর্যন্ত চার কিলোমিটার এলাকায় শত শত পণ্যবাহী যানবাহন পদ্মা পারাপারের অপেক্ষায় ছিল। বিআইডব্লিটিসি দৌলতদিয়া ঘাটের সহকারী ব্যবস্থাপক ফিরোজ শেখ জানান, লকলাউনের খবরে সবাই যার যার গন্তব্যে যাওয়ার জন্য ছুটছে। যে কারণে ঘাটে যানবাহনের চাপ বেড়েছে।

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত