প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

অধ্যাপক ডা.এবিএম আব্দুল্লাহ: করোনা মোকাবেলায় আমাদের চ্যালেঞ্জ এবং আশার আলো

অধ্যাপক ডা.এবিএম আব্দুল্লাহ: মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে শুরু থেকেই করোনাভাইরাস মোকাবেলা করা হচ্ছে। পর্যায়ক্রমে যখন যেটা করা দরকার তিনি সেটাই করছেন। করোনাভাইরাস নতুন হওয়ায় প্রথম দিকে পৃথিবীর সব দেশের পাশাপাশি বাংলাদেশও একটু অসুবিধা ছিলো। এ ভাইরাস সম্পর্কে আমরা তেমন কিছু জানতাম না। চিকিৎসা কী, পরীক্ষা কী, পরীক্ষা-নিরীক্ষার পদ্বতি কী হবে- সে সম্পর্কে আমারা বিস্তারিত জানতাম না। হাসপাতালগুলো প্রস্তুত ছিলো না। হাই-ফ্লো অক্সিজেন, আইসিইউ, প্রশিক্ষিত লোকজন সবকিছুরই অভাব ছিলো। প্রথম দিকে ডাক্তার, নার্সরা অনেক ভয় পেতেন। রোগীর কাছে যেতে চাইতেন না, মৃতের সংখ্যাও বেশি ছিলো।

শুরুতে পরিবারের কেউ মারা গেলে অন্যরা কাছে যেতো না। কিন্তু পর্যায়ক্রমে সরকারের নানা পদক্ষেপের কারণে এরকম খারাপ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ ঘটানো সম্ভব হয়েছে। এখন ডাক্তার, নার্সরা করোনা রোগীদের নিয়মিত চিকিৎসা দিচ্ছে। সরকার আলাদাভাবে অনেকগুলো কোভিড হাসপাতাল করে দিয়েছে। শুরুর দিকে সমস্যা থাকলেও এখন পর্যাপ্ত আইসিইউ, অক্সিজেনসহ পৃথিবীর সব দেশে প্রচলিত কর্যকর করোনার ওষুধ বাংলাদেশের হাসপাতগুলোতে আছে। চিকিৎসা সেবায় ভালো করার পাশাপাশি বাংলাদেশ ভ্যাকসিন দেওয়ার ক্ষেত্রেও  সুনাম ও সফলতা অর্জন করেছে। পৃথিবীর অনেক দেশ এখনো ভ্যাকসিন পায়নি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সঠিক ও দূরদর্শী কিছু সিদ্ধান্ত আগে নেওয়ার কারণে বাংলাদেশ যথাসময়ে ভ্যাকসিন পেয়েছে। বর্তমানে জেলা-উপজেলা পর্যায়ে মানুষ স্বতস্ফূর্তভাবে ভ্যাকসিন নিচ্ছে। সবকিছু সফলভাবে সম্পন্ন করার করণেই বাংলাদেশে করোনায় আক্রন্ত ও মৃতে্যুর হার পৃথিবীর অনেক দেশের তুলনায় কম। আমেরিকায় ৫-৬ লাখ লোকের মৃত্যু হয়েছে। যুক্তরাজ্য ও ইউরোপে মৃত্যু হার অনেক বেশি। প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশ করোনা মোকাবেলায় সফলতা দেখিয়েছে। পূর্বে থেকেই বাংলাদেশে করোনাভাইরাস নিয়ন্ত্রণে থাকলেও গত কয়েক দিনে করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ বৃদ্ধি পাওয়া কিছুটা উদ্বেগজনক। তবে করোনাভাইরাসের প্রকোপ সব দেশেই বৃদ্ধি পেয়েছে।

বাংলাদেশে আবার সংক্রমণের হার বৃদ্ধি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সরকার কঠোর পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে। ইতোমধ্যে কিছু নির্দেশনা সরকার দিয়েছে, যা বাস্তবায়নের কাজ চলছে। অনেক হাসপাতালের বন্ধ কার্যক্রম পুনরায় চালু করা হচ্ছে। পৃথিবীর অনেক বড় বড় দেশের তুলনায় বাংলাদেশ অনেক সুন্দর ও শক্তভাবে করোনাভাইরাস মোকাবেলা করতে সক্ষম হয়েছে। আগামী দিনে যাতে সংক্রমণ বৃদ্ধি না পায় তারও ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। স্বাস্থ্যকর্মীরা জীবনের মায়া ও ভয়কে উপেক্ষা করে করোনা রোগীদের চিকিৎসা দিয়ে যাচ্ছে। এখন পর্যন্ত ৩০ জনের বেশি ডাক্তার চিকিৎসা দিতে গিয়ে মারা গেছেন। স্বাস্থ্য কর্মীরা ভালো মন নিয়ে সব কাজ যে পারে এটা তারই প্রমাণ। করোনাভাইরাস যেহেতু একটি বৈশ্বিক সমস্যা তাই আমাদের আত্মতৃপ্তি পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই।

সবাইকে সচেতন ও স্বস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে। সভা-সমাবেশ, মিছিল-মিটিং এড়িয়ে চলা উচিত। ধর্মী আচার-অনুষ্ঠানেও সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে হবে। পর্যটন, হাটে-বাজারে, বিবাহের অনুষ্ঠানে মানুষের চলাচল সীমিত করা উচিত। যারা এখনো করোনার ভ্যাকসিন নিতে ভয় পাচ্ছেন, তারা নির্ভয়ে ভ্যাকসিন নিন। একমাত্র টিকার মাধ্যমেই আমরা সংক্রমণ কমাতে পারবো। যারা বিদেশে থেকে আসে তাদের জন্য কঠোর কোয়ারেন্টাইন ও আইসোলেশনের ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে করোনার নতুন ধরন বাংলাদেশে ছড়িয়ে পড়তে না পারে। নতুন ধরনটা যেহেতু খুব মারাত্মক ও দ্রুত ছড়াতে সক্ষম, তাই এ ব্যাপারে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রয়োজনে যারা বিদেশ থেকে আসে তাদের বোঝাতে হবে। বিমানবন্দরেই তাদের পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও নজরদারি বৃদ্ধি করতে হবে।

[২] বিগত কয়েক দশক ধরে অনেক সীমাবদ্ধতা ও প্রতিকূলতা সত্ত্বেও বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতের অর্জন একেবারে কম নয়, সফলতা অবশ্যই যুগান্তকারী। স্বাস্থ্য বিষয়ক সহস্রাব্দ লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বাংলাদেশের অগ্রগতি বিস্ময়কর, প্রশংসিত হয়েছে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে। তার ওপর করোনা মোকাবেলায় বাংলাদেশের সফলতা পৃথিবীব্যাপী সমাদৃত হয়েছে। শুরুতে করোনা সংক্রমণের প্রথম অন্তরায় হিসেবে সকলের সামনে এসেছিল চিকিৎসক এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের সুরক্ষার জন্য যথাযথ পিপিই’র অভাব। প্রথমদিকে পিপির অভাব ছিল বিশ্বব্যাপী, পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ পিপিই, মাস্ক, গ্লাভস এসকল স্বাস্থ্য সুরক্ষার উপকরণ উৎপাদনে মনোযোগী হয়ে দেশের চাহিদা মিটিয়ে এখন সারা বিশ্বে রপ্তানি করা শুরু করেছে। ফলে চিকিৎসক-নার্সসহ স্বাস্থ্যকর্মী, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, প্রশাসনসহ করোনা যুদ্ধে ফ্রন্টলাইন যোদ্ধাদের জন্য পিপিই-মাস্কসহ স্বাস্থ্য সুরক্ষাসামগ্রী নিশ্চিত করা হয়েছে। আবার শুরুতে রোগ পরীক্ষার সুযোগ ছিল সীমিত। তবে টেস্টিং কিট আমদানি, দেশের বিভিন্ন স্থানে ল্যাব স্থাপনসহ পরীক্ষার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা করে সে সংকটেরও সমাধান হয়েছে।

পরবর্তী সময়ে পর্যাপ্ত হাসপাতাল, সুসজ্জিত আইসিইউ এবং হাই-ফ্লো অক্সিজেন সরবরাহের অভাব দেখা দেয়। নানা ধরনের বাধা বিপত্তি এবং অব্যবস্থাপনার পেরিয়েও অনেক হাসপাতালকে কোভিড ডেডিকেটেড হাসপাতাল হিসেবে প্রস্তুত করা হয়। হাই-ফ্লো অক্সিজেনসহ প্রয়োজনীয় ওষুধপত্র জনগণের জন্য সহজলভ্য ও নিশ্চিত করা হয়েছে। সময়ের সাথে সরকারি হাসপাতালের পাশাপাশি বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতাল এবং ক্লিনিক কোভিড যুদ্ধে সামিল হয়ে অত্যন্ত দক্ষতার সাথে রোগীদের চিকিৎসা সুনিশ্চিত করে। ফলে অনেক উন্নত দেশের তুলনায়ও আমাদের দেশের মৃত্যুর হার কম। শুধু প্রতিষ্ঠান নয় এই মহামারী বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য বিশেষ ব্যবস্থায় প্রায় ৪ হাজার নতুন চিকিৎসক  এবং প্রায় ৫ হাজারের অধিক প্রশিক্ষিত নার্স নিয়োগ করা হয়।  শুধু তাই নয় মনোযোগ দেওয়া হয়, স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার দিকে, দেশের অভিজ্ঞ জনস্বাস্থ্যবিদ এবং চিকিৎসকদের সমন্বয়ে  করোনা মোকাবেলায় স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় ব্যাপক পরিবর্তন আনা সম্ভব হয়েছে। সময়োপযোগী ও আকর্ষণীয় প্রণোদনা প্যাকেজ বাস্তবায়নের মাধ্যমে সরকার কর্মসৃজন ও কর্মসুরক্ষা, অভ্যন্তরীণ চাহিদা সৃষ্টি এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সচল রাখায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে। সরকার একদিকে মানুষকে বাঁচানো, আবার মানুষের খাদ্যের ব্যবস্থা, চিকিৎসার ব্যবস্থা, শিক্ষার ব্যবস্থা সেগুলো যাতে ঠিক থাকে সেদিকেও লক্ষ্য রেখেছে। কোভিড-১৯ সংকট মোকাবেলায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেওয়া সময় উপযোগী  ও পদক্ষেপের প্রশংসা করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা।

তবে সব দিক বিবেচনায় সবচেয়ে যুগান্তকারী এবং ঐতিহাসিক সাফল্য হল মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দক্ষতা, দূরদর্শী এবং সময়োপয়োগী সিদ্ধান্তের ফলস্বরূপ দ্রুততার সাথে এবং অতি স্বল্প সময়ে পৃথিবীর বড় বড় মহা শক্তিধর দেশগুলোর সাথে পাল্লা দিয়ে দেশের মানুষের জন্য করোনা ভাইরাসের ভ্যাকসিন প্রাপ্তি ও সরবরাহ নিশ্চিত করা। আর বাংলাদেশে যেহেতু পূর্বেই ভ্যাক্সিনেশন প্রক্রিয়ায় পৃথিবীর কাছে উদাহরণ হিসেবে সবসময় বিরাজমান ছিল,  তাই এই ভ্যাকসিন জনগণের কাছে সহজে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে খুব বেশি বেগ পেতে হয়নি। ভ্যাকসিন  প্রাপ্তি এবং তা জনগণের হাতে পৌঁছানোর প্রক্রিয়াটি দেশের আপামর জনগণের কাছে কোনো প্রশ্ন ছাড়াই প্রশংসা কুড়িয়েছে। তাছাড়া অত্যন্ত আনন্দের খবর এই যে, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ইতোমধ্যেই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা অনুমোদিত করোনাভাইরাসের ভ্যাকসিন আমাদের দেশেই তৈরির উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন।

মার্কিন সংবাদ সংস্থা ‘ব্লুমবার্গ’ কতৃক একটি দেশের সার্বিক কোভিড পরিস্থিতি, চিকিৎসা, মৃত্যুহার, কোভিড মোকাবেলায় দেশগুলোর প্রস্তুতি, অর্থনৈতিক ও সামাজিক অভিঘাত ইত্যাদি দিক বিবেচনা তৈরি করা ‘কোভিড সহনশীলতা ক্রম’ অনুসারে পৃথিবীর ২০তম সহনশীল ও নিরাপদ দেশের তালিকায় অবস্থান করে নিয়েছে বাংলাদেশ, যা বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য একটি ‘বিস্ময়’। ৫০ বছরের বাংলাদেশের অগ্রগতি অনেক, এই উন্নতি আরও হবে অদূর ভবিষ্যতে, এটাই আমাদের কাম্য। পরিচিতি : মেডিসিন বিশেষজ্ঞ এবং প্রধানমন্ত্রীর চিকিৎসক

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত