শিরোনাম

প্রকাশিত : ০৮ এপ্রিল, ২০২১, ০৪:০৮ দুপুর
আপডেট : ০৮ এপ্রিল, ২০২১, ০৪:০৮ দুপুর

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

স্বপ্নের দেশে দুস্বপ্নের তাড়া

মেহেদী হাসান তমাল : পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার ৩.৫ শতাংশ মানুষ প্রবাসী জীবন বেছে নিয়েছে বিভিন্ন কারণে। বাংলাদেশেরও প্রায় ১ কোটি ৪০ লাখ মানুষ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে অবস্থান করছে। এরমধ্যে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক আছে শ্রমিক হিসেবে, যারা নির্দিষ্ট মেয়াদের পরে দেশে ফিরে আসে। আবার অনেকে স্থায়ীভাবে বিদেশেই থেকে যায়। সংখ্যার অর্থে এর পরেই আছে শিক্ষার্থীরা। তাদের সামনে দুটি পথই খোলা থাকে, পড়াশুনা শেষে দেশে ফিরে আসা কিংবা প্রবাসেই স্থায়ীভাবে থেকে যাওয়া। এর বাইরেও পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে উচ্চবিত্ত বা উচ্চমধ্যবিত্ত অংশের অনেকেই পরিবারের সঙ্গে উন্নত দেশে পাড়ি জমান সামাজিক নিরাপত্তার আশায়।

প্রবাসী সম্পর্কিত আলোচনায় সংখ্যা যতো গুরুত্ব পায়, অন্য বিষয়ে আলোচনা সে তুলনায় কম। জিডিপিতে তাদের অবদান আমরা জানলেও জীবনের গল্পগুলো অজানাই থেকে যায়। সম্প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে দুই ভাই মিলে পরিবারের অন্য ৪জনকে গুলি করে হত্যার পরে নিজেরাও আত্মহত্যার ঘটনায় সংবেদনশীল মানুষমাত্রই মর্মাহত হয়েছে।

তরুণ ফারহান তার আত্মহত্যার নোটে উল্লেখ করেছে গত ৫ বছর ধরেই চরম হতাশা আর বিষন্নতায় ভুগছিল সে। কিশোর-তরুণ বা যে কোন বয়সী মানুষের জন্যই এ সমস্যা দেখা দিতে পারে এবং সংখ্যাটাও অনেক। বাংলাদেশের স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে প্রায় ১৬ শতাংশ মানুষ মানসিকভাবে অসুস্থ। যার প্রধান কারণ সামাজিক-পারিবারিক ও অর্থনৈতিক হতাশা-বিষন্নতা। যুক্তরাষ্ট্রের মতো উন্নত বিশ্বে এই সংখ্যা আরো বেশি। স্কুল শিক্ষার্থী নির্বিচারে গুলি করে সহপাঠি-শিক্ষকদের হত্যা করার ঘটনা প্রায়ই খবরের শিরোনাম হয় সেখানে। এ প্রসঙ্গে আমেরিকার সাবেক শিক্ষা সচিব উইলিয়াম জে ব্যানেট এক প্রবন্ধে লিখেছেন, পৃথিবীর চোখে আমরা সভ্যরাষ্ট্র কিন্তু আমাাদের শিক্ষা ও সামাজিক ব্যবস্থা চরম অসভ্য একটা প্রজন্ম তৈরি করছে। আমাদের সমস্ত রাস্তা ষ্ফটিকে মুড়িয়ে দিলেও এ প্রজন্ম সভ্যভাবে হাঁটতে পারবে না। আমাদের তরুণ প্রজন্ম মাদক-যৌনতা আর যৌনরোগে আক্রান্ত।
বিচ্ছিন্নতার ভবিষ্যত বইয়ে ধীরেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায় লিখেছেন, মানসিক অসুস্থতার পর্যায়ে যাওয়ার প্রধান কারণ বিচ্ছিন্নতা। মানুষ ক্রমাগত দেশে, সমাজ, পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হতে হতে নিজের থেকেই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। মানুষের সামাজিক সম্পর্কের দু’টি প্রধান ভিত্তি থাকে। সেটা হচ্ছে যৌথ বস্তুগত ও ভাবগত সম্পদ। যেমন গ্রামের নদী, মাঠ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এরকম অনেক কিছুকেই ঐ সমাজের সব মানুষই নিজেকে মালিক মনে করে। সেকারণেই উক্ত সমাজের সবাই সবার সাথে ঘনিষ্টতা অনুভব করে। একে অন্যের সুখ-দুঃখের সাথী হয়। কিন্তু সে মানুষই যখন চলে আসে অন্য কোথায়, দেশে বা বিদেশে। তার মালিকানা বোধ থাকে না। কোন কিছুই তার নিজের না। সব কিছু থেকেই সে বিচ্ছিন্ন। যে কারণে পাশের ফ্লাটে আগুন লাগলেও সাহায্যে এগিয়ে যায় না।

ফারহানের হতাশার সময়ে তার বন্ধুরাও তাকে ছেড়ে গিয়েছিল একই কারণে। পরিবারে বাবা-মা’র সাথেও বিচ্ছিন্নতা ছিল চিন্তা ও সম্পর্কের। বাবা-মা কথা বলতো বাংলায় তাদের চিন্তার ভাষাও বাংলা কিন্তু সন্তানরা যখন ইংরেজিতে চিন্তা করে কথা বলে তখনই তৈরি হয় দূরত্ব। এটা শুধু প্রবাসেই নয় দেশে থেকেও এ দূরত্ব তৈরি হতে পারে।

সমাধানের পথ কি? সবাই মিলে সৃষ্টি করতে হবে সামাজিক সম্পদ, চিন্তার আদান-প্রদান বাড়াতে হবে। তৈরি করতে হবে সম্মিলিত জ্ঞান যার মালিকানা হবে সবার। এটাই ইঙ্গিত দিয়েছেন ধীরেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায়।

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইন্সটিটিউটের সহযোগি অধ্যাপক ডা. মেখলা সরকার বলেন। বয়সের ধর্মের কারণে নানারকম ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করে শিশু-কিশোররা। এই বয়সে শরীরে এক ধরণের শারীরিক শক্তি কাজ করে যা প্রকাশ করতে উন্মুখ থাকে তারা। এ বয়সে তারা নিজেদের পরিচিত করতে চায়। হিরোইজম কাজ করে। সবার দৃষ্টি, মনযোগ কাড়তে চায় তারা। এই বয়সে সঠিক বেঠিক ধারণাটা পরিপক্ক ভাবে থাকেনা। তাই যুক্তির চেয়ে আবেগের বিষয়টা বেশি প্রাধান্য পায়। যেটাতে মজা পাবে তারা সেটাই করবে। আরেকজনের ক্ষতি হচ্ছে কি না তা বিবেচনা করার সময় এ বয়সের মধ্যে অতটা থাকেনা।এসব কারণেই অপরাধের প্রতি আগ্রহ তৈরি হয়। অনেকসময় বাচ্চারা কাউকে তোয়াক্কা করতে চায়না, নিজের মধ্যে একটা স্বাধীনচেতা মনোভাব থাকে। নিজের ইচ্ছামতো পোশাক পরতে চায়। বন্ধু নির্বাচন করতে চায়। ভাল-মন্দ ঠিকমত বুঝতে পারেনা শিশু- কিশোররা খোলামেলা কথা বলে ভাল আর মন্দের পার্থক্য বুঝাতে হবে তাদের। সন্তানের ১৮ বছর পর্যন্ত যা কিছু হবে, অভিভাবকের তত্ত্বাবধানে থাকতে হবে। সন্তান কি করছে, কার সঙ্গে মেলা-মেশা করছে, বাইরে কি করছে ইত্যাদি ইত্যাদি জানতে হবে।

এ বিষয়ে সমাজবিজ্ঞানী মাহবুবা নাসরীন বলেন, শিশু কিশোরদের খেলাধুলার সুযোগ কমে যাওয়া, বিভিন্ন ধরণের বিনোদনের সুযোগ কমে যাওয়া এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে অংশ না নেয়াও অপরাধ-প্রবণতার বড় কারণগুলোর অন্যতম। এমন অবস্থায় পরিবারের পাশাপাশি, সামাজিক সব সংগঠনকে এগিয়ে আসতে হবে বলে মনে করেন তিনি। সম্পাদনা : রাশিদ

  • সর্বশেষ