প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

করোনায় হতদরিদ্রদের জন্য সামাজিক সুরক্ষা প্যাকেজ: অর্ধেকের বেশি এখনো অবণ্টিত

ডেস্ক রিপোর্ট: পুরান ঢাকার একটি রেস্টুরেন্টে কাজ করতেন চাঁপাইনবাবগঞ্জের সুন্দরপুরের আকবর আলী। করোনার প্রাদুর্ভাবে সবকিছু বন্ধ হয়ে যাওয়ায় গত বছরের এপ্রিলে তিনি চাকরি হারান। এর পরও কিছুদিন কাজের সন্ধানে ঢাকায়ই ছিলেন। তবে সাধারণ ছুটির মধ্যে নতুন কাজের সুযোগ মেলেনি। এদিকে জাতীয় পরিচয়পত্রে তার ঠিকানা দেয়া রয়েছে গ্রামের বাড়ির। ফলে ঢাকায় সরকার ঘোষিত কোনো সহায়তা তিনি পাননি। এক পর্যায়ে গ্রামে ফিরে যেতে বাধ্য হন। কাজ মেলেনি সেখানেও। ত্রাণের জন্য জনপ্রতিনিধির কাছে আবেদন জানান। প্রাথমিক তালিকায় থাকলেও পরে তা থেকে বাদ পড়েন। চরম অর্থকষ্টে থাকা আকবর আলী এখনো কোনো সরকারি সহায়তা পাননি।

আকবর আলীর মতো দরিদ্রদের কভিড-১৯-এর অভিঘাত থেকে সুরক্ষা দিতে ১০ হাজার ১৭৩ কোটি টাকার সাতটি প্যাকেজ ঘোষণা করেছিল সরকার। কিন্তু অর্থ মন্ত্রণালয়ের তথ্য বলছে, সামাজিক সুরক্ষার আওতায় নেয়া এসব প্যাকেজের অর্ধেকই অবণ্টিত থেকে গেছে। এজন্য প্যাকেজ বাস্তবায়নের প্রক্রিয়াগত দুর্বলতাকেই দায়ী করছেন সংশ্লিষ্টরা।

অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গিয়েছে, কভিড-১৯-এ ক্ষতিগ্রস্ত অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে ২৩টি প্যাকেজের মাধ্যমে প্রায় সোয়া ১ লাখ কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছিল সরকার। এর মধ্যে দরিদ্র ও কর্মহীন মানুষের সামাজিক সুরক্ষাসংক্রান্ত প্যাকেজ সাতটি। সরকারের লক্ষ্য ছিল, প্যাকেজগুলোর মাধ্যমে দরিদ্র ও কর্মহীনদের নগদ ও খাদ্যসহায়তা, ঘর নির্মাণ, ১০ টাকা কেজিতে চাল বিতরণ, দরিদ্র, বিধবা ও বয়স্ক ভাতাসহ সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতা বাড়ানো হবে। এজন্য মোট বরাদ্দের পরিমাণ ১০ হাজার ১৭৩ কোটি টাকা। কিন্তু এসব কর্মসূচির আওতায় এখন পর্যন্ত বিতরণ করা গিয়েছে মাত্র ৪ হাজার ৪৮১ কোটি টাকা। অর্থাৎ দরিদ্র ও কর্মহীনদের প্রণোদনা প্যাকেজের প্রায় ৫৬ শতাংশ এখনো বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি।

এ বিষয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, উপকারভোগীদের কাছে এসব প্রণোদনা প্যাকেজের অর্থ পাঠানো হচ্ছে মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের (এমএফএস) মাধ্যমে। উপকারভোগীর তালিকা তৈরির সঙ্গে কয়েকটি মন্ত্রণালয় ও বিভাগ জড়িত। এ তালিকা তৈরিতে অনেক ক্ষেত্রেই নানা অনিয়ম দেখা যায়। তাই যাচাই-বাছাই করে চূড়ান্ত তালিকা প্রস্তুতে অনেক সময় লেগে যায়। এ কারণে এসব প্যাকেজ বাস্তবায়নে সময় বেশি লাগছে। এরই মধ্যে এ কাজ দ্রুত সম্পন্ন করতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সঙ্গে বৈঠক করে তাগাদা দেয়া হয়েছে।

জানতে চাইলে অর্থ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মো. আজিজুল আলম  বলেন, ঘোষিত প্রণোদনা প্যাকেজের মধ্যে সামাজিক সুরক্ষাসংক্রান্ত প্যাকেজের বাস্তবায়ন ত্বরান্বিত করতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের দুই দফা বৈঠক করেছি। আগামীতে আরো বৈঠক করে দ্রুত এ প্যাকেজগুলো দ্রুত বাস্তবায়নে উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে।

প্রণোদনা প্যাকেজ বাস্তবায়নের অগ্রগতি-সংক্রান্ত অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদন সূত্রে জানা গেছে, সামাজিক সুরক্ষার আওতায় করোনায় কর্মহীন দরিদ্র মানুষকে খাদ্যসহায়তা দিতে ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকার প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়। গত ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ১ হাজার ৬৮ কোটি টাকা দেয়া হয়েছে। আরো ১ হাজার ৪৩২ কোটি টাকা বিতরণ বাকি আছে। এ প্যাকেজের আওতায় ৫ লাখ টন চাল ও এক লাখ টন গম বিতরণ করা হয়েছে।

করোনার নেতিবাচক প্রভাব কাটিয়ে উঠতে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিল সরকার। ১১২টি উপজেলায় শতভাগ বয়স্ক, বিধবা ও প্রতিবন্ধীদের এর আওতায় আনার কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এ প্যাকেজে ৮১৫ কোটি টাকা বরাদ্দ থাকলেও বিতরণ করা হয়েছে মাত্র ২৩ কোটি টাকা। বিতরণ বাকি আছে ৭৯২ কোটি টাকা।

এদিকে তৈরি পোশাক, চামড়াজাত পণ্য ও পাদুকা শিল্পের কর্মহীন শ্রমিকদের জন্য ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাপান ও সরকার যৌথভাবে ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকার প্রণোদনা দেয়। চিহ্নিত বেকার শ্রমিকদের তিন মাস নগদ সহায়তা হিসেবে ৩ হাজার টাকা করে প্রতি মাসে দেয়া হবে। গত ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সময়ে এ তহবিল থেকে শ্রমিকদের দেয়া হয়েছে মাত্র ৫ কোটি ৪৩ লাখ টাকা।

গৃহহীন মানুষের জন্য ঘর নির্মাণ করে দেয়া কর্মসূচির আওতায় ২ হাজার ১৩০ কোটি টাকার প্যাকেজের মধ্যে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ১ হাজার ৪৭৪ কোটি টাকা দেয়া হয়েছে। এছাড়া নিম্ন আয়ের মানুষের মধ্যে ১০ টাকা কেজির চাল বিতরণের জন্য ৭৭০ কোটি টাকা প্রণোদনার পুরোটাই ব্যয় হয়েছে। এতে ১৮ লাখ গরিব মানুষ উপকৃত হয়েছে। ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সারা দেশে খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির আওতায় অতিরিক্ত ১ লাখ ৫০ হাজার টন চাল বিতরণ করা হয়েছে। এতে সরকারের অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে ৫২৯ কোটি টাকা। পাশাপাশি শহরাঞ্চলে বিশেষ ওএমএসের আওতায় অতিরিক্ত ৬৮ হাজার টন চাল বিতরণ করা হয়েছে। এতে সরকারের ২৪১ কোটি টাকা অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে।

আর সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির বাইরে করোনায় ক্ষতিগ্রস্তদের নগদ আড়াই হাজার টাকা দেয়ার জন্য ১ হাজার ২৫৮ কোটি টাকার প্যাকেজ দেয়া হয়। সর্বশেষ তথ্যমতে ৩৭৮ কোটি ৪২ টাকা বিতরণ করা হয়নি। তবে মাঠ পর্যায়ে ৮৭৯ কোটি ৫৮ লাখ টাকা প্রায় ৩৫ লাখ গরিব মানুষকে দেয়া হয়েছে।

দ্বিতীয় ধাপে ঘোষিত প্যাকেজের আওতায় ১ হাজার ২০০ কোটি টাকায় দেশের ১৫০টি উপজেলায় দরিদ্র বয়স্ক এবং বিধবা ও স্বামী পরিত্যক্তা নারীর ভাতার ব্যবস্থা করা হবে। গত ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এ প্যাকেজ থেকে ২৬২ কোটি টাকা বিতরণ করা হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে অর্থনীতিবিদ ও পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর  বলেন, আমাদের প্রধান সমস্যা হচ্ছে গরিব জনগণের পূর্ণাঙ্গ তালিকা সরকারের হাতে নেই। এছাড়া করোনার কারণে নতুন করে যারা দরিদ্র হয়েছে তাদের তালিকাও নেই। আবার নতুন করে যেসব তালিকা করা হয়েছে অর্থ আত্মসাতের জন্য সেগুলোতে ইচ্ছাকৃতভাবে অনিয়ম করা হয়েছে। তাই সরকার ঘোষণা দেয়ার পরও উপকারভোগীদের কাছে টাকা পৌঁছাতে পারেনি।

তিনি আরো বলেন, মালয়েশিয়াসহ অনেক দেশের সরকার একটি নম্বর দিয়ে দিয়েছিল। করোনার কারণে নতুন করে যারা চাকরি হারিয়েছে তারা নিজেরাই ওই নম্বরে যোগাযোগ করে চাকরি হারানোর কথা সরকারকে জানিয়েছে। সংশ্লিষ্ট কোম্পানি বা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমে নিশ্চিত হয়ে সরকার চাকরি হারানোদের আর্থিক সহায়তা দিয়েছে। আমাদের সরকারও এ ধরনের উদ্যোগ নিতে পারত। কিন্তু তারা সে উদ্যোগ নেয়নি। বর্তমানে আবার করোনা বাড়ছে, তাই সরকার প্রয়োজন মনে করলে এ উদ্যোগ এখনো গ্রহণ করতে পারে। সূত্র: বণিক বার্তা

সর্বাধিক পঠিত