প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

শৈশবের খেলার মাঠ ‘জালে বন্দি’

নিউজ ডেস্ক: পুরান ঢাকার লালবাগের বাসিন্দা জোবায়ের আহমেদের শৈশবের প্রায় পুরোটা সময় কেটেছে আবদুল আলীম খেলার মাঠে সহপাঠীদের সঙ্গে খেলাধুলা করে। সমাজের সব শ্রেণি-পেশার মানুষের দেখা মিলত এ মাঠে এসে। কিন্তু এখন চিত্রটা ভিন্ন। এ মাঠের বিষয়ে খেদোক্তি জানিয়ে গত বৃহস্পতিবার তিনি বলেন, ‘বছরখানেক আগে সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে মাঠটি উন্নয়নের কাজ শেষে হয়েছে। মাঠের সৌন্দর্য বাড়িয়ে উঁচু খাঁচার মতো বেড়া দেওয়া হয়েছে। মাঠের চারপাশে হাঁটার রাস্তা করে মাঠটি ছোট করে ফেলা হয়েছে। এখন মাঝেমধ্যে কিছুটা সময়ের জন্য খুলে দেওয়া হয়। মাঠে প্রবেশ করতে না পেরে দিনের বেলায় সাধারণ শিশুরা মাঠের পাশের রাস্তা ও গলির সরু সড়কে খেলাধুলা করে।’

 রাজধানীর বাসাবো খেলার মাঠটি ঢাকার মধ্যে বেশ পুরনো। স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, এ মাঠ থেকে উঠে আসা কয়েকজন পরবর্তীকালে জাতীয় পর্যায়ে খেলোয়াড় হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন। এ মাঠটিতেও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) উন্নয়ন কার্যক্রম শেষ করে উদ্বোধন করেছে। কিন্তু লোহালক্কড়ের উপস্থিতি বাড়িয়ে মাঠের ‘চরিত্র’ পরিবর্তন করা ফেলা হয়েছে। একই সঙ্গে বাসাবো খেলার মাঠের নাম পরিবর্তন করে নতুন নামকরণ হয়েছে ‘শহীদ আলাউদ্দিন পার্ক’। এসব নিয়ে হতাশা প্রকাশ করে বাসাবোর বাসিন্দা খোকন মিয়া বলেন, ‘২০১৯ সালের ডিসেম্বর মাসে এ মাঠের উন্নয়ন শেষে উদ্বোধন করা হয়েছে। সেই থেকে শিশু-কিশোররা আর খেলাধুলা করতে পারে না। বিকেলে কিছু সময়ের জন্য খুলে দেওয়া হয় শুধু বয়স্ক লোকজনের হাঁটার জন্য। খেলার মাঠে এখন শুধু হাঁটার কাজ হয়।’

একই এলাকার একাধিক বাসিন্দা ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, তিন-চার বছর মাঠটি উন্নয়নের নামে বন্ধ ছিল। তখন বলা হয়েছিল, বিশ্বমানের খেলার মাঠ হচ্ছে এখানে। কিন্তু দীর্ঘসময়ের অপেক্ষার পর উন্নয়নকাজ শেষে এ মাঠে এলাকাবাসী এখন আর প্রবেশই করতে পারছে না। শিশুরাও আর মাঠে গিয়ে খেলার সুযোগ পাচ্ছে না। স্থানীয় দুজন নেতা রয়েছেন, তারা মাঠের দুই ফটকে দুজন নিরাপত্তাকর্মী বসিয়েছেন। অবশ্য প্রভাবশালীদের আশীর্বাদপুষ্ট লোকজনকে মাঝেমধ্যে মাঠে খেলতে দেখা যায়।

একই অবস্থা রাজধানীর খিলগাঁও এলাকার জোড়পুকুর মাঠেরও। এ মাঠটি সারাদিন বন্ধ রেখে শুধু সন্ধ্যার পর খুলে দেওয়া হয়। এভাবে বেশকিছু মাঠে আর ইচ্ছে হলেই স্থানীয় শিশু-কিশোররা প্রবেশ করতে পারে না।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রকল্প কর্মকর্তা জানান, ২০১৭ সালের জুন মাসে ‘জলসবুজের ঢাকা’ নামে একটি প্রকল্পের অধীনে ২০টি খেলার মাঠ ও ১১টি পার্কের উন্নয়নকাজ করা হয়েছে। এ প্রকল্পে মোট ব্যয় হয়েছে ৩০০ কোটি টাকা। উন্নয়নকাজ শেষে ইতিমধ্যে খিলগাঁও জোড়পুকুর মাঠ, বাসাবোর শহীদ আলাউদ্দিন পার্ক, লালবাগে শহীদ আবদুল আলীম মাঠ, সিক্কাটুলীতে শহীদ বুদ্ধিজীবী খালেক সরদার পার্ক, বাহাদুরশাহ পার্ক, সাঈদ খোকন পার্ক ও ধলপুর আউটফল স্টাফ কোয়ার্টার পার্কসহ বেশ কয়েকটি মাঠ ও পার্কের উদ্বোধনও করা হয়েছে। এসব পার্ক ও মাঠে ব্যায়ামাগার, কফি হাউজ, গণশৌচাগার, এটিএম বুথ তৈরি করা হয়েছে। দেওয়া হয়েছে আধুনিকতার ছোঁয়া। মাঠ রক্ষায় এটি দীর্ঘমেয়াদি সুফল আনবে বলে আশা প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের।

স্থানীয় লোকজন জানান, এসব পার্ক ও মাঠের বেশিরভাগই ব্যবহার হতো স্থানীয় মানুষের বিনোদন ও শিশু-কিশোরদের খেলার স্থান হিসেবে। বছরের কোনো কোনো সময়ে সামাজিক-সাংস্কৃতির অনুষ্ঠানসহ হতো বৈশাখী মেলাও। কিন্তু এখন আর আগের মতো সাধারণ মানুষ যখন-তখন মাঠে প্রবেশ করতে পারেন না। কিছু মাঠ রাতের বেলায় খুলে দেওয়া হলেও অন্যগুলো বিশেষ অনুষ্ঠান ছাড়া বন্ধ থাকে। নিজেদের এলাকার মাঠে প্রবেশ করতে না পেরে সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভের শেষ নেই। তবে এ বিষয়ে কিছুটা ভিন্নমত রয়েছে পুরান ঢাকার আবদুল আলিম খেলার মাঠের দায়িত্বে থাকা ডিএসসিসির ২৬ নম্বর কাউন্সিলর হাসিবুর রহমান মানিকের। তিনি বলেন, ‘মাঠ নিয়মিত খুলে দেওয়া হয়। সারাদিন খুলে রাখলে মাঠের মধ্যে যে ঘাস রয়েছে তা নষ্ট হয়ে যাবে। তাই আমরা একটি নির্দিষ্ট সময়ে অর্থাৎ সন্ধ্যার সময় খুলে দিই।’ এ মাঠটি উন্নয়নের আগে এখানে অবৈধ দখলদার ও মাদকসেবীদের আড্ডা ছিল বলেও দাবি করেন তিনি।

নগর পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক ড. আকতার মাহমুদ বলেন, ‘এ শহরে (রাজধানী ঢাকা) যত মানুষ বসবাস করে, তাদের জন্য যে পরিমাণ গণপরিসর দরকার তার তুলনায় ৯০ শতাংশের মাত্র একভাগ গণপরিসর রয়েছে। আমরা দেখলাম বেশকিছু পার্ক ও খেলার মাঠের উন্নয়ন করা হয়েছে। কিছু খেলার মাঠ মাল্টিপারপাস অ্যাপ্রোচে ডিজাইন করা হলো, শহরের অবস্থা বিচারে সেটা হয়তো ঠিকই আছে। কিন্তু সেগুলো এমন সব উপকরণ দিয়ে সাজানো হলো যে এলাকার ছেলেমেয়েরা আগে যেভাবে এসে মাঠে খেলাধুলা করতে পারত, নতুন উপকরণে সাজানোর ফলে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ছেলেমেয়েদের মধ্যে এক ধরনের মানসিক প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়েছে। তারা কিন্তু এ জায়গাগুলোয় ঠিক আগের মতো স্বচ্ছন্দে যেতে পারছে না। ডিজাইনের মধ্য দিয়ে সামাজিক বিভক্তি আরও প্রকট হয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘এ ধরনের কাজগুলো যখন করা হয়, সেখানে গণসম্পৃক্ততার প্রয়োজন রয়েছে। কীভাবে এটাকে উন্নয়ন করলে গণসম্পৃক্ত হবে, সব মানুষ এটাকে ব্যবহার করতে পারবে, সে চাহিদাটুকুকে গুরুত্ব দিয়ে যদি নকশা করা হয় তখন এগুলো অনেক বেশি অন্তর্র্ভুক্তিমূলক হবে। সরকারের সব দপ্তর, প্রতিষ্ঠান টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়ন করার চেষ্টা করছে। সেখানে অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের কথা বলা হয়েছে। এটা করতে হলে সব মানুষের চাহিদাগুলোকে গুরুত্ব দিয়ে উন্নয়ন করতে হবে।’

রাজধানীর মাঠগুলো নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব সংগঠন বা ব্যক্তির হাতে দেওয়ার বিরোধিতা করে আকতার মাহমুদ বলেন, ‘আমরা দেখেছি কিছু মাঠ হয়তো কোনো সংগঠনের কাছে দিয়ে দেওয়া হয়েছে। ফলে সংগঠনের লোকেরা ছাড়া এলাকার বাকি মানুষ হয়তো এটি আর ব্যবহার করার সুযোগ পায় না। তাই খেয়াল রাখতে হবে মাঠগুলো সংগঠন বা ব্যক্তিমালিকানায় যেন চলে না যায় এবং মাঠ ও পার্কগুলোকে যখন তৈরি করা হবে সেখানে যেন দেয়াল তুলে দেওয়া না হয়। আমাদের গণপরিসরের পরিমাণ কম। তাই শিশু থেকে শুরু করে বয়স্ক ও সব ধরনের মানুষ যেন এগুলো ব্যবহার করতে পারে সেদিকে গুরুত্ব দিতে হবে।’

প্রায় একই ধরনের মত দিয়ে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সাধারণ সম্পাদক ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, ‘উন্নয়নের নামে বৈষম্য তৈরি করা হয়েছে। খেলার সুযোগ থাকছে না। সাধারণ মানুষের অধিকার থাকছে না। এটা ধীরে ধীরে প্রভাবশালীদের হাতে যাচ্ছে। উন্নয়নের নামে যদি গরিবের সন্তান প্রবেশ করতে না পারে সেই উন্নয়ন দরকার নেই। এর চেয়ে ভালো মাটিতে গড়াগড়ি খাবে। একশ্রেণির মানুষের জন্য খেলার মাঠের আধুনিকায়ন মোটেও ভালো হচ্ছে না।’

তিনি আরও বলেন, ‘যে মাঠগুলো সংগঠনের নামে দখলে রেখেছে তা সিটি করপোরেশন দখলমুক্ত করে দ্রুত তাদের হাতে নেওয়া উচিত। প্রতিটি খেলার মাঠ ২৪ ঘণ্টা খোলা থাকবে। এখানে সব শ্রেণি পেশার মানুষের প্রবেশাধিকার থাকবে।’

খেলার মাঠ ও পার্কগুলো বন্ধ থাকার বিষয়ে জানতে চাইলে ডিএসসিসির এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘খেলার মাঠ ও পার্কগুলোর আধুনিকায়নের কাজ প্রায় শেষ হয়েছে। ইতিমধ্যে বেশকিছু পার্ক ও পাঠ সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়েছে। লোকজনের জন্য একটি নির্দিষ্ট সময়ে খুলে দেওয়া হচ্ছে। মাঠের ঘাসে পানি ছিটানোর জন্য কিছুটা সময় বন্ধ রাখতে হয়। তবে বেশিরভাগ সময় বন্ধ বা সাধারণ মানুষ প্রবেশ করতে পারছে না এমন হওয়ার কথা নয়।’ – দেশ রূপান্তর

সর্বাধিক পঠিত