প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

এমএলএম আইন কার্যকর হয়নি

ডেস্ক রিপোর্ট : প্রণয়নের ৮ বছর পরও কার্যকর হয়নি ‘মাল্টি-লেভেল মার্কেটিং কার্যক্রম (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০১৩’। কতিপয় বিধির সংশোধনীর প্রশ্নে ঝুলে আছে আইনটির কার্যকরিতা এবং সুফল। এই সুযোগে বিস্তার লাভ করেছে এমএলএম- প্রতারণা। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী এই প্রতারণার বিরুদ্ধে মাঝেমধ্যেই ব্যবস্থা নিচ্ছে। তা সত্ত্বেও বন্ধ হয়নি ভূইফোঁড় প্রতিষ্ঠানগুলোর অবৈধ কার্যক্রম। বিশ্লেষকরা বলছেন, আইনটি কার্যকর হলে প্রতারণা বন্ধ হবে। এমএলএম প্রতিষ্ঠানগুলোকেও শৃঙ্খলায় ফেরানো সম্ভব হবে। সরকারের তহবিলে আসতে পারে রাজস্ব। দূর হবে বেকারত্বও।

বিশ্লেষকদের মতে, ‘বহুস্তর বিপণন’ পদ্ধতির সংক্ষিপ্ত নাম ‘এমএলএম’। মার্কেটিংয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা এটিকে সরাসরি বিক্রয় পদ্ধতি কিংবা ‘ডিরেক্ট সেলিংও’ বলে থাকেন। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পণ্যের বহুস্তর বিপণন ব্যবস্থা চালু রয়েছে। ভারত, মালয়েশিয়াসহ এশিয়ার অনেক দেশেই সরাসরি বিক্রয় পদ্ধতিকে আইনি ভিত্তি দেয়া হয়েছে। আইনের আওতায় পরিচালিত এমএলএম প্রতিষ্ঠানগুলো সেসব দেশের সরকারকে রাজস্ব যোগান দিচ্ছে। বেকারত্ব নিরসনে সহযোগিতা করছে। এসব দেশের অনুকরণে বাংলাদেশেও বহুস্তর বিপণন-বিক্রয় পদ্ধতিকে আইনি ভিত্তি দেয়ার উদ্যোগ নেয়া হয়। এ প্রক্রিয়ায় ২০১৩ সালে ‘মাল্টি লেভেল মার্কেটিং কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ আইন-২০১৩’ (২০১৩ সালের ৪৪ নম্বর আইন) প্রণয়ন করা হয়। আইনটি কার্যকরের লক্ষ্যে কিছু বিধি-বিধানও তৈরি করা হয়। কিন্তু সেই বিধিতে বিচ্যুতি লক্ষ্য করা যায়। সেটি সারাইয়ে ২০১৪ সালে প্রণয়ন করা হয় বিধির সংশোধনী (এসআরও নং-১৯১/২০১৪) খসড়া। ওই খসড়ার অদ্যাবধি প্রজ্ঞাপন হয়নি। আর এ কারণে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বহুস্তর বিপণনে কোনো প্রতিষ্ঠানকেই লাইসেন্স দিচ্ছে না। এর সুযোগ নিচ্ছে একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী। তারা কোনো প্রকার লাইসেন্স ছাড়াই অবৈধভাবে পণ্য বিপণন করছে। গ্রাহক প্রতারিত হলেও কার্যকর কোনো আইন না থাকায় প্রতিকার পাচ্ছেন না। সংশোধিত বিধির প্রজ্ঞাপন হবে- এই আশায় কিছু প্রতিষ্ঠান এমএলএম ব্যবসা শুরু করে। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানের মুখে এদের অনেকেই পরে ব্যবসা গুটিয়ে নেয়। তবে এখনও অনেক প্রতিষ্ঠান গোপনে চালিয়ে যাচ্ছে এমএলএম ব্যবসা। কেউবা পুরনো লাইসেন্সের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞার ওপর স্থগিতাদেশ নিয়েছেন হাইকোর্ট থেকে। ফলে এমএলএম ব্যবসা এখনও বৈধ কি অবৈধ- এই বিভ্রান্তিই কাটছে না। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যা ‘বৈধ’ বা ‘স্বীকৃত’-বাংলাদেশে সেটি চলছে ‘অবৈধ’ হিসেবে।

লাইসেন্স না পাওয়ায় কয়েক হাজার ডাইরেক্ট সেলিং বা এএলএম প্রতিষ্ঠান চলছে গলি-ঘুপচি ও আড়ালে। কেউবা ব্যবসার ধরন পাল্টে কর্মকান্ড চালাচ্ছে ওয়েবসাইট ভিত্তিক। প্রকাশ্য এবং গোপনে সক্রিয় কিছু এমএলএম প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইড ঘাটলে দেখা যায়, ২০১৯ সালে প্রায় ১১৯ দশমিক ৯ মিলিয়ন মানুষ বিশ্বব্যাপী সরাসরি বিক্রয় প্রক্রিয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিলেন। ২০১৬ সালে এই সংখ্যা ছিল ১১৩ দশমিক ৬ মিলিয়ন। যুক্তরাষ্ট্রের ডিরেক্ট সেলিং প্রতিষ্ঠান ‘এমওয়ে কর্পোরেশন’র ২০১৯ সালে বার্ষিক পণ্য বিক্রয় ছিল ৮ দশমিক ৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। ‘ওয়ার্ল্ড ফেডারেশন অব ডাইরেক্ট সেলিং এসোসিয়েশনের (ডব্লিওএফডিএসএ)’র তথ্য অনুযায়ী সরাসরি বিক্রয় হচ্ছে এমন একটি ব্যবসায়িক মডেল, যেখানে কোনও পণ্য পণ্য বিক্রির জন্য ব্যক্তি-থেকে ব্যক্তি সম্পর্ক ব্যবহার করে। সাধারণত এই প্রক্রিয়ায় স্বতন্ত্র বিক্রেতাকে মূল কোম্পানির কাছ থেকে পণ্য কেনা এবং অতঃপর সেসব অন্য ব্যক্তির কাছে বিক্রি করা হয়। কখনও কখনও স্বতন্ত্র বিক্রেতার হয়ে অন্যজনকে নিয়োগ দেয়া হয়। সরাসরি বিপণন প্রতিষ্ঠানগুলো সুস্বাস্থ্যের পরিপূরক, কসমেটিকস থেকে শুরু করে গৃহস্থলী পণ্যসহ বিভিন্ন পণ্য বিক্রি করতে পারে।’ বাংলাদেশেও আইনের সংশোধনীয় কি কি ধরনের পণ্য বিক্রি করা যাবে তার একটি বিস্তারিত তালিকা দেয়া হয়েছে।

‘ডব্লিওএফডিএসএ’র ওয়েব সাইটের তথ্যমতে, ‘সরাসরি বিক্রয় পদ্ধতিকে বিতর্কিত করেছে পিরামিড বিক্রয় পদ্ধতি’। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বেশ কয়েকটি বড় সংস্থার বিরুদ্ধে ‘পিরামিড স্কিম’ গঠনের অভিযোগ তোলা হয়েছে। বলা হয়েছে যে, এটি একটি অনর্থক ব্যবসায়িবক মডেল। এখানে বিক্রেতারা অন্য বিক্রেতাদের নিয়োগের জন্য অর্থ নেন। তাদেরও লাভ করার জন্য আবার নিজস্ব বিক্রেতাদের নিয়োগ করতে হয়। একটি লাভের চক্র তৈরি করতে ব্যবসায়িক কাঠামো তৈরি হয় যা পিরামিডের অনুরূপ।’ বাণিজ্য মন্ত্রণালয় আইনের সংশোধনীর খসড়ায় যদিও এধরণের বিক্রিকে নিষিদ্ধ করার প্রস্তাব করেছে।

‘ডব্লিওএফডিএসএ’ জরিপ করে জানায়, ২০১৫ সাল থেকে ডিরেক্ট সেলিং থেকে বিশ্বব্যাপী খুচরা বিক্রয় ১৮৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার থেকে ১৯২ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে। সঠিক পণ্যভিত্তিক সরাসরি বিক্রয় প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের বিক্রয়ের ৩৩ শতাংশ অংশীদারিত্ব তৈরি করেছে। অথচ আইন আটকে থাকায় বাংলাদেশে কোন উদ্যোক্তা এখন পর্যন্ত এই ব্যবাস আইনানুগভাবে শুরুই করতে পারেনি।

কয়েকটি আন্তর্জাতিক সংস্থার জরিপ বলছে, যুক্তরাষ্ট্রে সরাসরি বিক্রয়ের তুলনায় গত কয়েক বছরে খুচরা বিক্রির হার কমেছে। ২০১০ সাল থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত আমেরিকায় খুচরা বিক্রিতে প্রায় ২০ মিলিয়ন গ্রাহক হ্রাস পেয়েছে। সাম্প্রতিক এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, ২০১২ সালের পর থেকে সরাসরি বিক্রির দিকে যুক্ত গ্রাহকদের অংশীদারিত্ব ২ শতাংশ হারে বেড়েছে।

জরিপে আরও বলা হয়, মার্কিনযুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি বিক্রয়কারি শীর্ষ বিক্রয় সংস্থা ‘এমওয়ে,’ ‘অ্যাভন’ এবং ‘হার্বালাইফ’ দৈনিক অন্তত : ৪ বিলিয়ন ডলার উপার্জন করে। এমওয়ে বিশ্বজুড়ে পুষ্টি পণ্য, প্রসাধনী এবং গৃহস্থালী পণ্য বিক্রি করছে। দ্বিতীয় বৃহত্তম সংস্থা ‘অ্যাভন’ প্রসাধনী, ফ্যাশন এবং ফার্নিচার জাতীয় পণ্য বিক্রয়ে বিশেষ দক্ষতা অর্জন করেছে। ইন্টারনেট থেকে পাওয়া জরিপ অনুযায়ী, ৭৭ শতাংশ আমেরিকান বিশেষ করে তরুণরা সরাসরি বিক্রয়কে তাদের আয়ের মূল উৎস হিসেবে দেখে। সরাসরি বিক্রয়কে উদ্যোক্তরাও একটি আকর্ষণীয় বিকল্প হিসেবে দেখে।

পক্ষান্তরে এই বিপণন ব্যবস্থা সম্পর্কে বাংলাদেশের মানুষের ধারণা এখনও নেতিবাচক। এমনকি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সংশোধিত আইনের সংশোধিত বিধির খসড়াতেও পিরামিড সদৃশ বিক্রয় কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এতে বলা হয়, ‘মাল্টি লেভেল কার্যক্রম (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা ২০১৯ দ্বারা অবৈধ অর্থ সঞ্চালন বা পিরামিড স্কিমের আওতাভুক্ত যে কোনো কার্যক্রম বা পরিকল্পনা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হলো। কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে মাল্টি লেভেল মার্কেটিংয়ের ছদ্মবেশে বা আচ্ছাদনে অবৈধ অর্থ সঞ্চালন বা পিরামিড স্কিমের আওতাভুক্ত কোনো ধরনের কার্যক্রম বা পরিকল্পনায় তালিকাভুক্ত বা অংশগ্রহণ করবেন না বা প্রচার চালানো যাবে না।’

এমএলএম বিধির সংশোধিত খসড়া সম্পর্কে জানতে চাইলে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. মো. জাফর উদ্দীন বলেন, ‘আমরা সংশোধিত বিধির একটি খসড়া করেছি। সেটা নিয়ে একাধিক পর্যালোচনা সভা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা এ নিয়ে কাজ করছেন। এ বিষয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (ডিটিও) সোলেমান খান একই কথা বলেন। তিনি বলেন, ‘খসড়া নিয়ে কাজ চলছে। আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিং শেষে সেটির প্রজ্ঞাপন হবে। সূত্র:ইনকিলাব

সর্বাধিক পঠিত