প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা ইসলামের শিক্ষা

রাহাত ইসলাম: এক মাসের বেশি সময় ধরে বাংলাদেশে করোনা সংক্রমণ আবার ঊর্ধ্বমুখী। এরই মধ্যে দেশে করোনায় আক্রান্তের সংখ্যা ছয় লাখ ছাড়িয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে করণীয় সম্পর্কে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রোগী শনাক্তের ভিত্তিতে সংক্রমণের উৎস চিহ্নিত করে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। অজানা উৎসের ঝুঁকি থাকায় সবাইকে কঠোরভাবে স্বাস্থ্যবিধি, সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখাসহ অন্যান্য বিধি মানতে হবে। আর যত দ্রুত সম্ভব টিকা নিতে হবে। দেশ রূপান্তর

করোনা একটি অতিমাত্রায় ছোঁয়াচে রোগ। ফলে এই ভাইরাস প্রতিরোধে কার্যকর উপায় হচ্ছে, স্বাস্থ্যবিধি মেনে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা। কিন্তু আমাদের দেশের মানুষের মধ্যে করোনা আমলে না নেওয়ার মানসিকতা তীব্র হওয়ায় বাড়ছে কোভিড-১৯ মহামারীর সংক্রমণ এমনটাই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। করোনাভাইরাসকে পাত্তা না দেওয়ার মানসিকতা আর স্বাস্থ্যবিধি না মেনে বাইরে চলাচল করতে প্ররোচিত করছে গণমানুষকে। ফলে যা হওয়ার তাই হচ্ছে, করোনা আক্রান্তের হার ফের হু-হু করে বাড়ছে; যা জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করেছে।

এই পরিস্থিতিতে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে রাখতে টিকাকার্যক্রমের পাশাপাশি স্বাস্থ্যবিধি কঠোরভাবে মেনে চলতে হবে এবং কঠোরতার সঙ্গে সবাইকে মানতে বাধ্য করতে হবে।

স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা ইসলামেরও শিক্ষা। মানুষের সুস্বাস্থ্য নিশ্চিতকল্পে ইসলাম বরাবরই গুরুত্ব প্রদান করে। এ কারণে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘হে ইমানদাররা! তোমরা সতর্কতা অবলম্বন করো।’ (সুরা আন নিসা : ৭১)

একাধিক হাদিসেও শারীরিক সুস্থতার জন্য প্রয়োজনীয় বিষয় গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। হজরত মুহাম্মদ (সা.) বলেন, ‘তোমার ওপর তোমার শরীরেরও অধিকার রয়েছে।’ (সহিহ বুখারি : ১৯৬৮)

সুতরাং এ পরিস্থিতিতে আতঙ্কিত না হয়ে সৃষ্টিকর্তা মহান আল্লাহর ওপর আরও নির্ভরশীল হতে হবে। সুস্থ থাকার নিমিত্তে বাহ্যিকভাবে পালনীয় বিষয়গুলো যথাযথভাবে মানতে হবে। সেই সঙ্গে মনে বিশ্বাস রাখতে হবে, আল্লাহর হুকুম ছাড়া কোনো বিপদ আমাদের স্পর্শ করতে পারবে না। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আল্লাহ যা আমাদের জন্য লিপিবদ্ধ করেছেন তা ছাড়া কোনো কিছুই আমাদের স্পর্শ করবে না; তিনিই আমাদের অভিভাবক। আল্লাহর ওপরই মুমিনদের নির্ভরশীল হওয়া উচিত।’ (সুরা আত তাওবা : ৫১)

মহান আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস রাখার পাশাপাশি সরকার ঘোষিত স্বাস্থ্যবিধিগুলো মেনে চলতে হবে। যেমন আইসোলেশন। মহামারী আক্রান্ত ব্যক্তিকে পৃথক রাখাকে চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় আইসোলেশন বলা হয়। নবী করিম (সা.) এ সম্পর্কে ঘোষণা করেছেন, ‘অসুস্থকে সুস্থের কাছে নেওয়া হবে না।’ (সহিহ বুখারি : ৫৭৭১)

তদ্রুপ হোম কোয়ারেন্টাইন যার প্রযোজ্য, তিনি তা পরিপূর্ণভাবে পালন করবেন। সুস্থ ব্যক্তি মহামারী আক্রান্তের আশঙ্কায় জনবিচ্ছিন্ন থাকাকে কোয়ারেন্টাইন বলা হয়। বিভিন্ন হাদিসে এভাবে বিচ্ছিন্ন থাকার ফজিলত বর্ণিত হয়েছে। যেমন নবী করিম (সা.) বলেন, ‘কোনো বান্দা যদি মহামারী আক্রান্ত এলাকায় থাকে এবং নিজ বাড়িতে ধৈর্যসহকারে, সওয়াবের নিয়তে এ বিশ্বাস বুকে নিয়ে অবস্থান করে যে, আল্লাহ তাকদিরে যা চূড়ান্ত রেখেছেন তার বাইরে কোনো কিছু তাকে আক্রান্ত করবে না, তাহলে তার জন্য রয়েছে শহীদের সমান সওয়াব।’ (সহিহ বুখারি : ৩৪৭৪)

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, পরস্পরে মুসাফাহা ও কোলাকুলি এড়িয়ে চলা করোনা প্রতিরোধের অন্যতম উপায়। কেননা এর মাধ্যমে সংক্রমণের ভয় থাকে। হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) সাকিফের প্রতিনিধিদলের মধ্যকার কুষ্ঠ রোগীকে হাতে হাতে বায়াত না দিয়ে লোক মারফত বলে পাঠান, ‘তুমি ফিরে যাও। আমি তোমার বায়াত নিয়ে নিয়েছি।’ (সহিহ মুসলিম : ২২৩১)

সার্বিকভাবে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকা করোনা সংক্রমণ ঠেকানোর উপায়। এ বিষয়ে কোরআনে বিভিন্ন আয়াতে মুমিনদের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। হাদিসে পবিত্রতাকে ইমানের অঙ্গ বলা হয়েছে। ইসলামি শরিয়তের বিভিন্ন বিধানকে পবিত্রতা অর্জনের মাধ্যম নির্ধারণ করা হয়েছে। যেমন অজুর মাধ্যমে মানুষের শরীরের অনাবৃত্ত অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ধৌত করা হয়; মেসওয়াকের মাধ্যমে মুখের সব ধরনের জীবাণু ধ্বংস হয়। এভাবে ইসলামে সামগ্রিকভাবে সর্বক্ষণ ও বিশেষত নামাজে পরিধেয় কাপড় পরিচ্ছন্ন থাকা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘তোমার কাপড় পরিষ্কার রাখো।’ (সুরা আল মুদ্দাচ্ছির : ৪)

করোনা প্রতিরোধে আলোচ্য বিষয়গুলোকে ইতিবাচক মনে ভাবতে হবে। পরিবারের সদস্য ও দেশবাসীর কল্যাণার্থে নিয়মগুলো মানতে হবে। কোনোভাবেই উদাসীনতা প্রদর্শন কিংবা আমি এসব না মেনেও ভালো আছি মনোভাব নিয়ে চলা যাবে না।

ইসলামি স্কলাররা বারবার বলছেন, করোনাভাইরাস প্রতিরোধ ও জনগণের নিরাপত্তার জন্য সরকারের দেওয়া স্বাস্থ্যবিধিসমূহ মেনে চলাতে কোনো অসুবিধা নেই। ইসলামের দৃষ্টিতে মুসলিম সরকার জনকল্যাণ বিবেচনায় কোনো নির্দেশনা দিলে এবং তা শরিয়তের সঙ্গে সাংঘর্ষিক না হলে তা মান্য করা অপরিহার্য।

ইসলাম একটি পরিপূর্ণ জীবন বিধান। আর ধর্মের মূল ভিত্তি হলো বিশ্বাস। ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর ওপর ভরসা করে তার জন্য তিনিই যথেষ্ট। আল্লাহ তার কাজ পূর্ণ করবেন। আল্লাহ সবকিছুর জন্য একটি পরিমাণ স্থির করে রেখেছেন।’ (সুরা আত তালাক : ৩ )

মহান আল্লাহর ওপর ভরসার অর্থ হলো, আল্লাহকে নিজের অভিভাবক নিযুক্ত করা এবং তার ওপর পূর্ণভাবে ভরসা করা। অভিভাবক তাকেই বলে যিনি তার অধীনস্থ লোকের কল্যাণের কথা চিন্তা করেন এবং অকল্যাণ থেকে বাঁচিয়ে রাখেন। হাত-পা গুটিয়ে ঘরে বসে থাকার নাম আল্লাহর ওপর ভরসা (তাওয়াক্কুল) নয়, বরং আল্লাহর দেওয়া সুযোগ-সুবিধা ও উপায় উপকরণসমূহ কাজে লাগিয়ে ফলাফলের জন্য তার ওপর নির্ভর করার নামই হচ্ছে তাওয়াক্কুল।

সর্বাধিক পঠিত