প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

বন্দরে পণ্যের ঢল, দাম নাগালে থাকবে তো?

নিউজ ডেস্ক: পবিত্র রমজান মাস সামনে রেখে একের পর এক ভোগ্যপণ্যবোঝাই জাহাজ আসছে চট্টগ্রাম বন্দরে। ফলে চাল, ডাল, ছোলাসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে বন্দর এখন ভরপুর। রমজানের আগে বাজার ধরতে এসব পণ্য দ্রুত খালাসও করছেন ব্যবসায়ীরা। গতবারের মতো এবারও প্রচুর পণ্য এসেছে। ব্যবসায়ীরা জানান, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় এবার পণ্যের পরিবহন ব্যয় বেশি পড়ছে। কিছুটা বেশি পড়ছে আমাদানি খরচও।

এদিকে, ভোগ্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে আগামীকাল মঙ্গলবার থেকে বাজার মনিটরিংয়ে নামছে জেলা প্রশাসন।

জানা যায়, বর্তমানে বন্দরের বহির্নোঙরে ভোগ্যপণ্যবোঝাই ছয়টি জাহাজ আছে। এর মধ্যে দুটিতে আছে চিনি তৈরির কাঁচামাল। ৫৪ হাজার ১৪ টন ও ৬০ হাজার ৮০০ টন চিনি তৈরির কাঁচামাল নিয়ে এ দুটি জাহাজ এসেছে ১৮ মার্চ। ৬৪ হাজার ৪৩০ টন চিনি তৈরির কাঁচামাল নিয়ে আরেকটি জাহাজ এসেছে ২৪ মার্চ। ৫৯ হাজার ৯২৫ টন মটরবোঝাই একটি জাহাজ আসে ২১ মার্চ। ৪৯ হাজার ৪৯৪ টন গমবোঝাই একটি জাহাজ এসেছে ১৮ মার্চ। ৩৩ হাজার টন গম নিয়ে আরেকটি জাহাজ এসেছে ২৩ মার্চ। এ ছাড়া খেজুর এসেছে কনটেইনারে। খেজুরবোঝাই এমন কনটেইনার আছে দুটি জাহাজে। এর আগে জানুয়ারিতে ১৩ হাজার ২২৯ টন, ফেব্রুয়ারিতে ১৪ হাজার ৭৪৬ টন ও মার্চে ১৫ হাজার ৮৬০ টন খেজুর আসে। এ বছরের ২২ মার্চ পর্যন্ত বন্দর জেটিতে মোট ৪৬ হাজার ৩৯ টন চিনি ও ২১ হাজার ৩২ টন ছোলা খালাস হয়েছে। শিগগির আসবে আরও অন্তত এক ডজন জাহাজ। পাইপলাইনে থাকা এসব জাহাজ আসবে রমজান শুরুর আগেই।

এ ব্যাপারে চিটাগং চেম্বারের সভাপতি মাহবুবুল আলম বলেন, গতবার করোনা আতঙ্কের মধ্যেও অনেক পণ্য এসেছে। এখন আগের চেয়ে কিছুটা স্বাভাবিক আছে বিশ্ব পরিস্থিতি। তবে জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় গতবারের তুলনায় এবার পরিবহন ব্যয় কিছুটা বেড়েছে। তার পরও পর্যাপ্ত পণ্য আমদানি হয়েছে দেশে। সরবরাহ প্রক্রিয়ায় কোনো প্রতিবন্ধকতা না থাকলে এবার নিয়ন্ত্রণে থাকবে রমজানের বাজার। ভোক্তারা একসঙ্গে যদি বেশি পণ্য না কেনেন, তাহলে অসাধু ব্যবসায়ীরা দাম বাড়ানোর সুযোগ পাবেন না।

চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের কমিশনার মোহাম্মদ ফখরুল আলম জানান, ভোগ্যপণ্যের শুল্ক্কায়নে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছেন তারা। তবে এবার পণ্যের আমদানি মূল্য কতটা বেশি, সে ব্যাপারে সরাসরি কোনো মন্তব্য করেননি তিনি।

অবশ্য চট্টগ্রাম বন্দরের পরিচালক (পরিবহন) এনামুল করিম বলেন, যেসব পণ্য এরই মধ্যে বন্দরে এসে পৌঁছেছে, সেগুলো দ্রুত খালাস নিচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। পাইপলাইনে থাকা পণ্যবোঝাই জাহাজগুলো পৌঁছাবে রমজানের আগে। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ রমজানের পণ্য খালাসে দ্রুত ব্যবস্থা নিচ্ছে।

ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহসভাপতি এস এম নাজের হোসাইন বলেন, এবারও পর্যাপ্ত পণ্য আমদানি হলেও রমজান শুরুর এক মাস আগেই কিছু পণ্যে অতিরিক্ত মুনাফা করছেন ব্যবসায়ীরা। মন্ত্রণালয় থেকে কার্যকর কোনো মনিটরিং না হওয়ায় পণ্য পরিবহন ব্যয় বাড়ার ঘটনাকে এবার অজুহাত হিসেবে দাঁড় করিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।

২০১৯ সালে বিশ্বে করোনা ছিল না। তারপরও ওই বছরের মতো স্বাভাবিক আছে আমদানি চিত্র। ২০১৯ সালের মার্চে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে চাল, ডাল, গম, তেল, ছোলা, খেজুর ও চিনি তৈরির কাঁচামালসহ ভোগ্যপণ্য আসে ১৬ লাখ ৮১ হাজার টন। গত বছরের একই সময় এটি ছিল ১৫ লাখ ৮৯ হাজার টন। এবারও অব্যাহত আছে আমদানির এ ধারা। এরই মধ্যে দেশে পৌঁছে গেছে প্রায় ১২ লাখ টন পণ্য। পাইপলাইনে থাকা জাহাজগুলো এ মাসের মধ্যে নোঙর করলে গতবারের মতোই হবে আমদানির চিত্র।

বন্দর দিয়ে ২০১৯ সালের মার্চে ভোজ্যতেল এসেছে দুই লাখ ৩২ হাজার টন। তবে করোনা আতঙ্কের মাঝেও গতবার একই সময়ে এসেছে দুই লাখ ৫০ হাজার টন। এবার একই মাসের প্রথম ১৫ দিনে ভোজ্যতেল আমদানি হয়েছে অর্ধেকেরও বেশি। ওই বছরের একই মাসে চিনি তৈরির কাঁচামাল তিন লাখ ৫৯ হাজার টন এলেও গতবারের একই সময় এসেছে চার লাখ ৫২ হাজার টন। এবার একই মাসের অর্ধেকেই চিনি তৈরির কাঁচামাল এসেছে প্রায় আড়াই লাখ টন। ২০১৯ সালের মার্চে সয়াবিন দুই লাখ ১৯ হাজার ও গম পাঁচ লাখ ৪৬ হাজার টন এলেও ২০২০ সালে এসেছে যথাক্রমে দুই লাখ সাড়ে ২১ হাজার ও ছয় লাখ ১৭ হাজার টন। এবার মাসের প্রথম ১৫ দিনে সয়াবিন ও গম এসেছে অর্ধেকেরও বেশি। পাইপলাইনে থাকা জাহাজগুলো নোঙর করলে এ মাসে আমদানি ছাড়িয়ে যাবে গতবারের রেকর্ড। ২০১৯ সালের মার্চে এক লাখ দুই হাজার টন মটর এসেছে দেশে। গত বছর একই মাসে মটর এসেছে ৮৯ হাজার ৮০০ টন। তবে এ বছর মার্চে এখন পর্যন্ত মটর এসেছে প্রায় ৩০ হাজার টন।

এখন রমজানের পণ্য নিয়ে যেসব জাহাজ এসেছে, সেগুলো দ্রুত খালাস করা হচ্ছে। আগামী ১৫ দিনের মধ্যে সেগুলো বাজারজাত হবে পাইকারি মোকামে। দেশের অন্যতম বড় পাইকারি মোকাম হচ্ছে চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জ। ঢাকার মৌলভীবাজার থেকেও পণ্য যায় সারাদেশে।

খাতুনগঞ্জ ট্রেড অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক ছৈয়দ ছগীর আহম্মদ বলেন, রমজানকে ঘিরে পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক রয়েছে। তবে গতবারের তুলনায় আন্তর্জাতিক বাজারে মসুর ডাল, ছোলাসহ কিছু পণ্যের দাম বাড়তি। গত তিন মাসে এ দুই ধরনের ডালের দাম টনে ১০০ ডলারের বেশি বেড়ে গেছে। বেড়ে গেছে সয়াবিন ও পাম তেলের দামও। তবে পর্যাপ্ত আমদানি হওয়ায় বাজার নিয়ন্ত্রণে থাকবে। কেউ যাতে পণ্য মজুদ করে অতিরিক্ত মুনাফা করতে না পারে, সে জন্য সজাগ থাকতে হবে মন্ত্রণালয়কে।

চট্টগ্রামের ভোগ্যপণ্যের বাজার মনিটরিং করতে ৩০ মার্চ থেকে মাঠে নামছে জেলা প্রশাসন। গত ২২ মার্চ ব্যবসায়ী প্রতিনিধিসহ বিভিন্ন মহলের সঙ্গে আয়োজিত এক সভায় এ ঘোষণা দেন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মমিনুর রহমান। তিনি বলেন, রমজানে জনদুর্ভোগ কমাতে ও দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখতে অ্যাকশন প্ল্যান তৈরি করা হয়েছে। ৩০ মার্চ থেকে বাজারে গিয়ে দ্রব্যমূল্য মনিটরিং ও মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হবে।

সভায় চট্টগ্রাম চেম্বার, খাতুনগঞ্জ ট্রেড অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনসহ বিভিন্ন ব্যবসায়িক সংগঠনের নেতারা, আমদানিকারক ও ব্যবসায়ীরা উপস্থিত ছিলেন। তারা ভোগ্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখার বিষয়ে জেলা প্রশাসককে আশ্বস্ত করেন।

– সমকাল

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত