প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

বহুতল ভবনে ঢাকা চিরচেনা কলোনি

ডেস্ক রিপোর্ট:  আজিমপুর কলোনিতে পাঁচ-ছয় বছর আগে আসা যে কেউ এখন গেলে সবকিছু অচেনা মনে হবে। সবুজঘেরা চারতলা ভবনগুলোর কলোনি এখন ২০তলা ভবনে ভরে গেছে। রাস্তার পাশ ধরে কিংবা মাঠগুলোতে অগণিত গাছপালার অস্তিত্ব নেই বললেই চলে। মুখ তুলে ওপরে তাকালে বহুতল ভবনের চাপে নীলাভ আকাশের দেখা মেলা ভার। কংক্রিটের ভিড়ে হারিয়ে গেছে পাখপাখালির কিচিরমিচির শব্দ।

আজিমপুর কলোনির বর্তমান চিত্র এভাবে তুলে ধরে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন একজন অতিরিক্ত সচিব। সাহিত্য-সংস্কৃতি নিয়ে কাজ করা এই কর্মকর্তা বলেন, ‘বাসা বরাদ্দ নিয়ে দীর্ঘদিন কলোনিতে আছি। অনেকেই সাজসজ্জার আধুনিক বহুতল ভবনের ফ্ল্যাটে উঠেছেন। কলোনি ছেড়ে যেতে কখনো মন সায় দেয়নি। এখানকার পুকুর, গাছপালা, খেলার মাঠ, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানসহ প্রাকৃতিক পরিবেশই আমাকে আটকে রেখেছে।’ আক্ষেপ করে তিনি আরও বলেন, ‘কিন্তু গত কয়েক বছরে কলোনির দক্ষিণ-পশ্চিম অংশে বহুতল ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। কয়েক মাসের মধ্যে এই অংশের (ইডেন কলেজের উল্টো দিকে) ভবনগুলো ভেঙে বহুতল ভবন ওঠাবে। ফলে কলোনির চিরচেনা রূপ আর থাকবে না। বড় বড় দালানের ভিড়ে অন্য রকম শূন্যতা তৈরি হচ্ছে। হয়তো আমারও কলোনির বাসা ছাড়ার সময় এসে গেছে।’

নথিপত্র ঘেঁটে দেখা যায়, আজিমপুর কলোনি হচ্ছে বহুতলবিশিষ্ট গুচ্ছ আবাসনের প্রথম প্রকল্প। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর একতলা বা দোতলা বাংলো ধরনের পাকা আবাসিক ভবন নির্মাণের সূত্রপাত হলেও বহু পরিবারভিত্তিক বসবাসের জন্য তিন-চারতলাবিশিষ্ট ফ্ল্যাট বা অ্যাপার্টমেন্ট ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে পরিকল্পিত আজিমপুর কলোনি বাকিদের কাছে উদাহরণ হয়ে ওঠে। এই কলোনির শুরু থেকে সফল বাস্তবায়নের নানা ঘটনাবলি লিখে রেখে গেছেন তৎকালীন সরকারের পূর্ত দপ্তরের দায়িত্বে থাকা ব্রিটিশ স্থপতি কোলম্যান হিকস। তিনি ভারত ভাগ-পরবর্তী সময়ে পূর্ব বাংলা সরকারের পরামর্শক স্থপতি ছিলেন। তৎকালীন ঢাকা শহরের অনেক সরকারি প্রকল্পের সঙ্গে আজিমপুর এস্টেটও তার স্থাপত্য পরিকল্পনা ও নকশায় গড়ে ওঠে।

ওই সময়ে বাসস্থানের সংকট প্রকট আকার নিলে সরকারি কর্মচারীদের আবাসনে ঢাকার আজিমপুর এলাকায় প্রকল্পটি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়। বর্তমানে বিশাল এলাকাজুড়ে কলোনি থাকলেও প্রথমে তা ছিল আজিমপুর রোডের  দক্ষিণাংশে। পরে ১৯৫০-এর দশকে আজিমপুর রোডের উত্তর পাশ থেকে নিউমার্কেট পর্যন্ত পরিধি বাড়ানো হয়। এরপর ১৯৪৯ সালের সাইট প্ল্যানে একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানের জন্য নির্ধারিত জমি আজিমপুর মাতৃসদন এবং আজিমপুর গার্লস স্কুলের নামে বরাদ্দ দিয়ে কলোনি এলাকা বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ^বিদ্যালয়ের (বুয়েট) ক্যাম্পাস পর্যন্ত সম্প্রসারিত করা হয়।

লন্ডন থেকে প্রকাশিত ‘বিল্ডিং-নভেম্বর ১৯৫০’ সাময়িকীতে প্রকাশিত একটি প্রবন্ধের বরাত দিয়ে নগর পরিকল্পনাবিদরা বলেছেন, আজিমপুর এস্টেট প্রকল্প শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত একটি পথ প্রদর্শনকারী পদক্ষেপ হয়ে আছে। এশিয়ার অন্যান্য দেশে নির্মাণশিল্প যখন প্রায় স্থবির, তখন অনগ্রসর পূর্ব বাংলার ঢাকা শহরে প্রকল্পটি রেকর্ড সময়ে শেষ করা হয়। চারটি ব্লকে তিন কক্ষবিশিষ্ট ৪৮টি এবং ৩৮টি ব্লকে দুই কক্ষবিশিষ্ট ৪৫৬টি ফ্ল্যাট ছিল প্রকল্পে। আবাসিক ঘনত্ব রাখা হয় একরপ্রতি ৮৫ জন। ১৯৪৯ সালের জানুয়ারিতে শুরু হয়ে অক্টোবরে শেষ হয় নির্মাণকাজ। গড়ে দিনে দুটি ফ্ল্যাট করা হয়। প্রকল্প ব্যয় ছিল ৭৫ লাখ টাকা; বিশেষ করে ইমারত নির্মাণ দপ্তরের প্রথম প্রধান প্রকৌশলী খান বাহাদুর মো. সুলায়মানের হাতে প্রকল্পের কাজ শেষ হয়। পরে আজিমপুর কলোনিকে উদাহরণ ধরে এ দেশে বহু সমজাতীয় সরকারি আবাসিক এলাকা করা হয়েছে।

আজিমপুর কলোনির বাসিন্দা বকুল আহমেদ বলেন, ‘কর্র্তৃপক্ষ আমাদের জুলাই মাসে নতুন ভবনে যেতে বলেছে। এখানকার ভবন ভেঙে ফেলা হবে। সেখানে প্রতিটি ভবনে ৭৬টি পরিবার থাকবে। একই এলাকায় ২০তলার ২৩টি ভবনে কমপক্ষে ১৫ হাজার মানুষ বাস করবে। এই বিশাল জনগোষ্ঠীর চলাচল ও যানবাহন ঘিরে ঘিঞ্জি পরিবেশ সৃষ্টি হবে। যেসব খেলার মাঠ রাখার কথা বলা হচ্ছে, তা আগের তুলনায় খুবই ছোট। কলোনিতে বসবাস করে যে মানসিক শান্তি পেতাম, সেটি আর থাকছে না।’

কলোনির বাসিন্দা ঢাকার একটি সরকারি কলেজের শিক্ষক শরীফ মামুন বলেন, ‘শহরে এখানকার মতো ভালো পরিবেশ খুব একটা চোখে পড়ে না। বহুতল ভবন নির্মাণে রাস্তা-ঘাট, খেলার মাঠ বিলীন হচ্ছে। নারী-শিশুরা বাসার নিচে নেমে যে স্বস্তির নিঃশ্বাস নিত, তা আর পারবে না।’ কলোনিতে শৈশবের স্মৃতিচারণা করে লেখক ও গবেষক স্বপন কুমার দাস দেশ রূপারন্তকে বলেন, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক এলাকায় বড় হলেও আজিমপুর কলোনিতেই ছিল আমার বেশিরভাগ সহপাঠী। ৩০-৩৫ বছর আগে কলোনির মাঠে খেলাধুলা করতাম। একাধিক টিম গঠন করে সেরা খেলোয়াড় বাছাই হতো। বৈশাখী মেলাসহ নানা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হতো। এখন সেখানে দালান আর দালান।’

কলোনির আরেক বাসিন্দা রেজাউল করিম বলেন, ‘এখন সরকারিভাবে বিভিন্ন উপশহর; যেমন পূর্বাচল, ঝিলমিল ও উত্তরায় হাজার হাজার ফ্ল্যাট হচ্ছে। সেখানে যাতায়াতে মেট্রোরেলের মতো আধুনিক ব্যবস্থা যুক্ত হচ্ছে। এত কিছুর পরও পরিকল্পিত এ কলোনির গাছপালা-মাঠঘাট নষ্ট করে কেন বহুতল ভবন করা হচ্ছে, তা আমার বুঝে আসে না।’

গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, রাজধানীর বিভিন্ন সরকারি অফিসে যে সংখ্যক কর্মকর্তা-কর্মচারী রয়েছেন, তাদের মাত্র ৮-১০ শতাংশ আবাসন সুবিধা পাচ্ছে। বাকিদের চাহিদা মাথায় রেখে এ বছর নতুন উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এর আওতায় মোট ২৪টি চারতলা ভবন ভেঙে আজিমপুর এলাকায় গণপূর্ত অধিদপ্তর প্রথম ধাপে ছয়টি ২০তলা ভবন করে। বর্তমানে আরও ১৭টি ভবন নির্মাণাধীন। সব মিলিয়ে ২৩টি ২০তলা ভবনে মোট ১ হাজার ৭৪৮টি ফ্ল্যাট করা হয়েছে। নতুন আরেকটি প্রকল্প বাস্তবায়নে কাজ করছে গণপূর্ত অধিদপ্তর। সেখানে মোট ৩৬টি পুরনো পাঁচতলা ভবন ভেঙে ২০তলা ১৫টি ভবন করা হবে। প্রতিটি ভবনে ৭৬টি করে মোট ১ হাজার ১৪০টি ফ্ল্যাটের নির্মাণকাজ শুরু হবে আগামী জুলাই মাসে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, ১৩ দশমিক ৬২ একর জায়গায় পুরনো ২৪টি ভবনে ফ্ল্যাট সংখ্যা ছিল ৩৯২টি ও উন্মুক্ত স্থানের পরিমাণ ছিল প্রায় ৮৪ শতাংশ। নতুন নকশায় ২৩টি বহুতল ভবন নির্মাণে উন্মুক্ত স্থানের পরিমাণ ৭৫ শতাংশ রাখা হয়েছে।

গণপূর্ত অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী (আজিমপুর ডিভিশন) মো. ইলিয়াস আহমেদ বলেন, ‘কলোনির ভবনগুলোর পাশাপাশি হাঁটার জায়গা, উন্নত ড্রেনেজ-সুয়ারেজ, বৃক্ষরোপণ, খেলার মাঠ, সুইমিংপুল, কমিউনিটি সেন্টার, গ্রন্থাগারসহ সব ধরনের নাগরিক সুবিধা থাকছে। জরাজীর্ণ ভবনগুলো ভেঙে অধিক মানুষের বাসস্থান নিশ্চিত করতেই সরকার বহুতল ভবন করছে।’

এ বিষয়ে বাংলাদেশ প্ল্যানার্স ইনস্টিটিউটের সাধারণ সম্পাদক ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, ‘এটি দুঃখজনক। পরিকল্পিত আবাসন কেমন হবে, তার জন্য আমরা আজিমপুর কলোনিকে অনুসরণ করতাম। কলোনির উন্নয়ন সাধারণত ‘ব্লক উন্নয়ন’ হিসেবে ধরা হয়। সেখানে ৫-৬তলা ভবন আছে, খেলার মাঠ, পুকুর, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ হাঁটার দূরত্বে সবকিছুই পাওয়া যায়। এ ধরনের স্বপ্নই দেখে নগরবাসী। সে স্বপ্ন ধূলিসাতে সরকারের আকাশছোঁয়া ভবন কাম্য হতে পারে না। আবাসন সমস্যা সমাধানে বিকল্প কিছু না করে সরকার স্রোতে গা ভাসিয়ে কলোনির চরিত্রই নষ্ট করছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘প্রয়োজনে সরকার নতুন জমি অধিগ্রহণ করে সেখানে বহুতল ভবন করুক। গাছপালা শহরের ভারসাম্য রক্ষা করে। আশা করি, সরকার এই সিদ্ধান্ত থেকে বেরিয়ে আসবে।’

পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের (পবা) চেয়ারম্যান আবু নাসের খান বলেন, ‘একটি সুস্থ জাতি পেতে ন্যূনতম চাহিদা আদর্শ বাসস্থান নিশ্চিত করা। উদাহরণ হিসেবেই আজিমপুর কলোনির এ পরিবেশ টিকিয়ে রাখা সরকারের দায়িত্ব। গায়ে গায়ে মিশিয়ে বহুতল ভবনে শুধু থাকার জায়গা করলেই চলবে না। শিশুসহ সবার জন্য স্বাস্থ্যকর পরিবেশে নিঃশ্বাস নেওয়ার ব্যবস্থাও করতে হবে।’সূত্র: দেশ রূপান্তর

সর্বাধিক পঠিত