প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

জাহিদুর রহমান:  কোভিড রোগীর চিকিৎসায় জড়িত বাংলাদেশের প্রতিটি স্বাস্থ্যকর্মী  শারীরিক এবং মানসিকভাবে ক্লান্ত

জাহিদুর রহমান: আমার প্রতিষ্ঠানের কোভিড ১৯ পিসিআর ল্যাবে যারা ডিউটি করে তাদের সবাই দক্ষ, আন্তরিক এবং ইচ্ছায়-অনিচ্ছায় দুর্নীতিমুক্ত। এজন্যই হয়তো এখন পর্যন্ত ল্যাবে বড় ধরনের কন্টামিনেশন হয়নি, টাকার বিনিময়ে টেস্ট করিয়ে দেওয়া বা ভুয়া রিপোর্ট দেওয়ার জন্য কারো নাম মিডিয়ায় আসেনি, এখন পর্যন্ত কেউ ভুল রিপোর্টের অভিযোগ আনেননি, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে সরবরাহ করা একটা পিসিআর কিটও আমাদের ল্যাবে অপচয় বা অপব্যবহার হয়নি। গত কয়েক মাস করোনার সংক্রমণ কমে থাকায় ল্যাবে কর্মরত সবাই নিয়মিত অফিস টাইমেই ডিউটি শেষ করে বাসায় যেতে পারতেন। গত কয়েকদিন আবার কাজের চাপ বেড়েছে, সামনে আরও বাড়বে। আবারও ২-৩ ব্যাচে পিসিআর করা লাগতে পারে। আমার লেখা বলে বড় স্যাররা পড়েন।

তাদের সামনে নির্দ্বিধায় বিভিন্ন সমস্যার কথা বলে ফেলতে পারি। তাই সবার সব বঞ্চনা, অবহেলা, অবিচার, ইত্যাদি উটকো কাজের দায়িত্ব অলিখিতভাবে আমার। আমি অবশ্য নিজেও এই কাজগুলো আনন্দ নিয়েই করি। কিন্তু সব কিছুরই তো একটা সীমা থাকা দরকার। আমার একজন স্টাফ বলেই ফেলেছে, ‘স্যার খালি পেটে এভাবে আর কতোদিন কাজ করা যায়, সামনে তো অবস্থা আরও খারাপ হবে। আপনি কিছু একটা করেন।’ প্রথম কয়েক মাস আমি তাদের এরকম কথাবার্তা লেখালেখির ফুয়েল হিসেবে ব্যবহার করতাম, খুব দেশপ্রেম দেখতাম, সবাইকে ধৈর্য্য ধরতে বলতাম।

কিন্তু আজকে আমি তার প্রশ্নের কোনো উত্তর দিতে পারিনি। খুবই বিব্রত এবং লজ্জা পেয়েছি। আমি যদি তাদের ল্যাবের দামি দামি রি-এজেন্টগুলো বিক্রি করার সুযোগ করে দিতাম, রোগীদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে আগে টেস্ট করিয়ে দেওয়ার সুযোগ করে দিতাম, কনটামিনেশন উপলক্ষে কিছুদিন পর পর অলিখিত ছুট কাটানোর ব্যবস্থা করে দিতাম, তাহলে হয়তো এতো লজ্জা লাগত না। এটা কেমন কথা? একবছর পরেও ডাক্তার, নার্স, মেডিকেল টেকনোলজিস্ট, এমএলএসএস, তারা একটা পয়সা পাবে না? দেশে কি দুর্ভিক্ষ চলে, কোষাগারে টাকা নেই? রাষ্ট্র কি বর্বর নাকি অন্ধ? ঘর থেকে বের না হয়ে কেউ কেউ করোনা উপলক্ষে টাকার কুমির হয়ে যাচ্ছে, করোনা যোদ্ধা হিসেবে সম্বর্ধনা পাচ্ছে। আর জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করা স্বাস্থ্যকর্মীদের একবছর পরও কোনো রকম আর্থিক সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হচ্ছে না? কোথায় বিএমএ, কোথায় স্বাচিপ, কোথায় ডাক্তারদের ভাগ্য পরিবর্তন করার উছিলায় লাখ লাখ টাকা চাঁদা উঠিয়ে হজম করে ফেলা ফেবু নেতারা!

তাছাড়া এরকম একটা স্পর্শকাতর বিষয়ে এতো করুণ ভাব করে চাইতেই বা হবে কেন? এটা কি অনুদান, ভিক্ষা, দয়া-দাক্ষিণ্য করা? করোনার বাজেট হিসেবে যেসব হাসপাতালে ১ কোটি বা ২ কোটি এসেছিল, সেখান থেকে কি পিসিআর ল্যাবের জন্য ১০ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা যেতো না? মাসের পর মাস ধরে সারা দেশে প্রতিদিন যে ১৫-২০ হাজার টেস্ট হচ্ছে, সেগুলো কি ফেরেশতারা এসে করে দিয়ে যাচ্ছে? তাহলে কি কাজের প্রতি সৎ এবং আন্তরিক থাকতে চাওয়াটাই দোষ হয়েছে? আমার বন্ধু তালিকায় বিভিন্ন ইস্যুতে প্রচুর প্রতিবাদ দেখি।

অথচ ডাক্তারদের কোনো বিষয়ে তারা লজ্জাবতী গাছের মতো আচরণ কেন করেন, বুঝি না। আমরা কি কোনো অন্যায়ের প্রতিবাদের ক্ষেত্রে ভিক্টিমের পেশা বিবেচনা করি? তাহলে আপনারা কেন করবেন? তাছাড়া ডাক্তাররা যদি নিজেরাই সুস্থ না থাকেন, তারা আপনাদের কীভাবে চিকিৎসা করবে? কোভিড-১৯ আক্রান্ত রোগীর চিকিৎসা প্রদান এবং করোনা মহামারি নিয়ন্ত্রণের সাথে জড়িত বাংলাদেশের প্রতিটি স্বাস্থ্যকর্মী এই মুহূর্তে শারীরিক এবং মানসিকভাবে ক্লান্ত, বিধ্বস্ত। মিডিয়ায় যে গুটিকয়েক তেলতেলে চেহারা দেখেন, তারা এই গোত্রের অন্তর্ভুক্ত নন। তাদের উত্তেজনা, উদ্দীপনার কারণ আপনারাও জানেন। করোনা মহামারি তাদের জন্য আশীর্বাদ হয়ে এসেছে।

কিন্তু বাকি ৯৯ শতাংশ স্বাস্থ্যকর্মীদের অবস্থা শোচনীয়। তাদের পরিবারের সদস্যরা কেউ করোনায় প্রাণ হারিয়েছেন, কেউ সংক্রমিত হয়েছেন এবং সবাই আতংকিত অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন। আমরা আসলে আর নিতে পারছি না। কাজ করার ফিটনেস না থাকলে সেই কাজে ভুল হবে, ফাঁকিবাজি হবে, দুর্নীতি হবে। ফোন করলে আগের মতো কণ্ঠে আগের মতো আন্তরিকতা খুঁজে নাও পেতে পারেন। আর কতো? ফেসবুক থেকে

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত